করোনা প্রাদুর্ভাব: শুনসান ক্যালিফোর্নিয়ায় আতঙ্ক আর বেকারত্ব -চৌধুরী আফতাবুল ইসলাম

  •  
  •  
  •  
  •  

একেবারে দমবন্ধ আবস্থা। চারিদিকে ভয়ের এক আবর্ত। কখন যে মূর্তিমান মৃত্যুদূত শিয়রে হাজির হয়-এই আতঙ্কে তটস্থ সবাই। আণুবীক্ষনিক সাইজের হলে কী হবে, গোটা বিশ্বচরাচর নাড়িয়ে দিয়েছে কোভিড-১৯ বা করেনা ভাইরাস। পুরো পৃথিবীজুড়ে এমন ভয়ার্ত আবহ আর কবে সৃষ্টি হয়েছিলো সে নিয়ে বিরাট এক গবেষণা হতে পারে। ইনফরমেশন টেকনোলজির কারণে এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ। মুহূর্তেই বিশ্নের এক প্রান্তের খবর পৌঁছে যাচ্ছে অন্যপ্রান্তে। ফলে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে দাবানলের মত দ্রুত।

ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যাবে ১৩৪৬-১৩৫৩ সাল পর্যন্ত ব্ল্যাক ডেথ বা গ্রেট প্লেগ রোগে ২ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলো। বর্তমান জনঘণত্ব বিবেচনায় নিলে এখন এই সংখ্যাটা ২৫ কোটির সমান। এর আগে ৫৪১-৭৫০ খ্রিস্টাব্দে একই রোগে ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলো বলে জানা যায়। ১৯১৮-১৯১৯ সালে স্পেনিশ ফ্লুতে ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো। এরমধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিলো ৬ লাখ ৭৫ হাজার। আর এইচআইভি পজেটিভ বা এইডস রোগ পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছিলো ৩ কোটি ২০ লাখ মানব জীবণ। এর মাঝে ইবোলা, বিভিন্ন ধরণের ফ্লু হানা দিয়েছে, কিন্তু করোনা যেরকম ব্যাপক আগ্রাসন নিয়ে ছড়াচ্ছে- এমনটা দেখা যায়নি স্মরণকালে। এ রিপোর্টটি লেখার সময় পৃথিবীতে আক্রান্তের সংখ্যা পৌণে ৩ লাখ, মৃত্যু ১১ হাজার। তবে এ পরিসংখ্যান দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। কারণ এই লেখা যখন প্রকাশিত হবে তখন সংখ্যাটি নিশ্চিতভাবেই অনেক বাড়বে। আর আতঙ্কের কারণ এটাই।
চীন, জাপান, দ. কোরিয়া ইরান কাঁপিয়ে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা হয়ে এখন আমেরিকা-কানাডায় হানা দিয়েছে এখন করোনা। ওয়াশিংটনে শুরু, তারপর দশদিনে ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই তার ভয়ঙ্কর বিস্তার।এ কদিনেই ১৮ হাজার আক্রান্ত, মৃত্যু ২৩০ জনের। ফলে দেশটি জুড়ে চলছে চরম আতঙ্ক। নিউ ইয়র্কের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। দ্বিতীয় অবস্থানে ওয়াশিংটন, তারপরেই ক্যালিফোর্নিয়া। ফলে এই রাজ্যটিতে মানুষের আতঙ্কও আকাশ ছোঁয়া।

ছবি ওপর থেকে নিচে : ১/ রাত আটটাতেই ভুতুরে ওয়েস্টার্ন বুলেভার্ড ২/ লস অ্যাঞ্জেলেসের থার্ড স্ট্রিট

গত মঙ্লবার কথা হচ্ছিলো মাইক বুচারের সঙ্গে। রেস্টুরেন্টে কাজ করেন। ৫০ বছর বয়সেও পেটানো শরীর। জন্ম লস অ্যাঞ্জেলেসে। খবর কী জানতেই বললেন, আমার এই বয়সে এর আগে এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতি আর দেখিনি। মানুষ বাইরে বেরুচ্ছে না। আমার মালিক বলেছে, কাস্টমার নেই। রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেবে। করোনার সাথে সাথে এখন বেকার হওয়ার আতঙ্ক।
পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হওয়ায় গত সপ্তাহেই ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মত ক্যালিফোর্নিয়াতেও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব মুভি থিয়েটার, বিনোদন কেন্দ্র, ইউনিভার্সাল থিয়েটার, ওয়ার্নার ব্রাদার্স, হলিউডের সব মিউজিয়াম, ডলবি থিয়েটার, নাইট ক্লাব, বার, বড় বড় শপিং মল। মেসি, জেসিপেনি, রস, সিয়ার্স, বেড অ্যান্ড বিওন্ড, খোলসের মত মেগা মলগুলোর অনেক শাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গেস্টের অভাবে ম্যারিয়ট, হিলটন, হায়াত, ইন্টার কন্টিনেন্টাল, ওয়েস্টিনের মত পাঁচ তারকা হোটেলের বহু শাখায় ঝাঁপ নামিয়ে ফেলা হয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, ডিএমভি, স্যোশাল সিকিউরিটির মত ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের অফিসগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। গত শুক্রবার থেকে রেস্টুরেন্টগুলোতেও বসে খাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বহু মানুষ কাজ করতো। তারা সবাই জব হারিয়ে এখন অনিশ্চিত জীবনে পা রেখেছে। এদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশিও রয়েছে। অনেকে উবার ও ট্যাক্সি চালান। যাত্রীর অভাবে তাদের রোজগারও বন্ধ। তাদেরই একজন জামালপুরের মিজান তার ট্যাক্সি জমা দিয়ে দেশে ফেরার টিকিট কেটে ফেলেছেন। বললেন, আয় রোজগার নাই। এখন দেশে যেয়ে হাল চাষ করে খাবো। তার পরও ঢাকায় নেমে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনের আতঙ্কও তার পিঁছু ছাড়ছে না।
এই লস অ্যাঞ্জেলেসে অনেকগুলো বাংলাদেশি গ্রোসারি কাম রেস্টুরেন্ট আছে। যেমন সোনার বাংলা, বাংলা বাজার, স্বদেশ, দেশি, আলাদিন, কস্তুরি। সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত এগুলোতে জমজমাট আড্ডা হতো। এখন সব বন্ধ। ফলে ব্যবসাও লাটে। গ্রোসারিগুলো চলছে বর্তমানে ঢিমেতালে। প্রথম কয়েকদিনের কেনার হিড়িক ছিলো, এখন স্তিমিত হয়ে এসেছে।

ছবি বাম থেকে ডানে: ৩/ শুনসান বেলফ্লাওয়ার ডিএমভি অফিস ৪/ পুরো অফিসে এক সেবা প্রার্থীর একাকী অপেক্ষা

আর আড্ডাবাজদের দিনকালও ভালো যাচ্ছে না। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট গভর্নমেন্ট শুক্রবার মধ্যরাত থেকে সবাইকে বাড়িতে থাকার নির্দেশ জারি করেছে। ফলে বেশিরভাগ মানুষেরই এখন একরকম অবরুদ্ধ জীবন চলছে। আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মসজিদ, মন্দির গির্জা, প্যাগোডাসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও বন্ধ। এ পরিস্থিতি আমেরিকার ৫০টি রাজ্য জুড়েই। ফলে পুরোপুরি লকডাউন পরিস্থিতি। জব হারানো লাখ লাখ মানুষ তাদের পুরনো কাজ ফিরে পাবেন তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে সবার মধ্যেই কাজ করছে চরম অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতি কয়েক মাস স্থায়ী হলে বহুমানুষ দেউলিয়া হয়ে যাবে।
দিনের বেলা পথেঘাটে কিছু যানবাহন চললেও রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সব শুনসান। যানবাহনশুণ্য রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতিগুলোই শুধু জেগে থাকে। একদম হলিউডের ভুতুরে হরর মুভির পরিস্থিতি যেন।
করোনা ভাইরাস অনেকদিন পর নতুন এক সমাজ ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পৃথিবীবাসীকে। ইনফরমেশন টেকনোলজির হাত ধরে আমরা এগিয়ে চলেছিলাম বিশ্বগ্রাম ব্যবস্থাপনায়। যেখানে কেউ বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষে-মানুষে, দেশে-দেশে যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদই আমরা শুনে এসেছি এতদিন। কিন্তু করোনার বিস্তার ঠেকাতে এখনকার স্লোগান হচ্ছে সোশ্যাল আইসোলেশন বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষে-মানুষে, দেশে-দেশে, মহাদেশে-মহাদেশে। বর্ডার সিল, বাস-ট্রেন-বিমান চলাচল বন্ধ। এক দেশের মানুষ আরেক দেশে নিষিদ্ধ। সব কিছুই কেমন যেন বদলে দিচ্ছে ক্ষুদে ওই ভাইরাস। মানুসে-মানুষে এই অবিশ্বাস, অর্থনীতির ধ্বস, এই বিচ্ছিন্নতা মানব সভ্যতাকে কতখানি পিছনে টেনে নিয়ে যাবে সেটা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়।

চৌধুরী আফতাবুল ইসলাম
: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।
সাংবাদিকতা: আজকের কাগজ, সমকাল, কালের কন্ঠ।
লস আ্যঞ্জেলেস, ইউএসএ।