করোনা ভাইরাসের দিনগুলি -শাখাওয়াৎ নয়ন

  •  
  •  
  •  
  •  

 204 views

শাখাওয়াৎ নয়ন

[এক]
২০ মার্চ ২০২০। দুপুর। ঢাকা এয়ারপোর্ট। পুরো এয়ারপোর্ট শুনসান। মানুষ-জন তেমন নেই। নিরাপত্তারক্ষীদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি শঙ্কিত মনে হলো। ধারে-কাছে এলো না। তবে সাধারণ জ্বর-সর্দি-কাশি থাকলেও এই মুহূর্তে কাউকে প্লেনে চড়তে দেয়া হচ্ছে না। কারণ একটাই, করোনা ভাইরাস। আর আমি শরীরে প্যারাটাইফয়েড এবং ব্যাগে কতগুলি CEF-3 DS এন্টিবায়োটিক নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছি।

এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকলাম, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাউন্টারে গেলাম। বেশ ভদ্র ব্যবহার। কিন্তু একটু পর জিজ্ঞেস করলো,
-কোথায় যাবেন?
-সিডনি।
-আমরা আপনাকে নিতে পারব না, স্যার।
-কেন?
-সিঙ্গাপুর কতৃপক্ষ সব ধরনের কানেক্টিং এবং ট্রানজিট যাত্রী বহন করতে নিষেধ করেছে।

হায় আল্লাহ! এখন উপায়? রিজেন্টের লোকদের অনেক কিছুই বললাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। একে একে সব যাত্রী বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন ক্রস করছে। আমি ভীষণ ক্লান্ত শরীরে হতবাক হয়ে বসে আছি।

তবে এই বিপদে আমি একা ছিলাম না। ছয়জন শ্রীলংকান নাবিক এবং অসম্ভব সুন্দর একজোড়া চোখের অধিকারী বোরকা পরিহিতা একজন মেয়েও ছিল। নিশ্চয়ই আপনাদের মনে প্রশ্ন আসছে, এয়ারপোর্টে নাবিকরা কি করে? নাবিক থাকার কথা তো সমুদ্র বন্দরে। আমার মনেও একই প্রশ্ন এসেছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করার মতো মুড এখন নেই। সুযোগ হলে পরে জানার চেস্টা করবো।

সুন্দর চোখের মেয়েটি একটু পরপর রিজেন্টের কাউন্টারে যায় আর কি যেন কী বলে! আবার ফিরে এসে মোবাইলে কার সাথে কোথায় যেন যোগাযোগ করে। কেমন জানি সন্দেহজনক গতিবিধি! পালিয়ে যাচ্ছে না তো? গেলে যাক, আমার কি? কিন্তু আমার তো কৌতুহল আছে। যাই হোক, ওসব পরে দেখা যাবে। তার দেখাদেখি আমিও ট্রাই এন্ড ক্যারেক্টার (চেষ্টা চরিত্র) করা শুরু করলাম। আমার একটা বড় কুটুম (শ্যালক) আছে, সে রিজেন্টের পাইলট। তাকে ফোন দিলাম। সৌভাগ্যবশত তাকে পাওয়া গেল। কারণ সে কখন আকাশে আর কখন মাটিতে থাকে, তা জানা খুব মুশকিল।

সবিস্তারে বললাম। শুনেটুনে সে যা বললো, তাতে মনে হলো– আমি সিঙ্গাপুর যেতে পারলেও অস্ট্রেলিয়া যেতে পারব না। এমনকি তখন সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া আজকেই রিজেন্টের সিংগাপুরে লাস্ট ফ্লাইট। আর প্যারাটাইফয়েডের মতো অসুখ নিয়ে এরকম অনিশ্চিত জার্নি করাটা ঠিক হবে না। সিঙ্গাপুর বিমানবন্দর কতৃপক্ষ জ্বর দেখলে তো রক্ষাই নাই। কোনোভাবেই আর কোথাও যেতে দিবে না। কমপক্ষে চৌদ্দ দিন কট। ফোন রাখার আগে সে বলল, ‘আপনি এয়ারপোর্টেই থাকেন, লেট মি ট্রাই ব্রো…’

আরো একজনকে বললাম। সে যে বসে আছে জানালার পাশে মেঘ ধরতে, হ্যাঁ! নীলাবতীকেও অবস্থাটা জানালাম। সে তো রণে ভঙ্গ দেয়া লোক না। স্ট্রেইট বললো,
-তুমি অপেক্ষা করো, আমি দেখছি…প্রয়োজনে অস্ট্রেলিয়ার পররাস্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করবো…
-আচ্ছা।
তাঁর উপর আমার অগাধ বিশ্বাস। সে যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে। তা না হলে আমাকে বিয়ে করে? একবার সে ব্যক্তিগত ইস্যুকে জাতীয় ইস্যু বানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখলো। আমি বললাম, ‘পাগলের কাজ-কারবার’। তিন সপ্তাহ পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড তাঁকে উত্তর পাঠাল। আমি তো হতবাক। আমার থোতামুখ ভোতা হয়ে গেল। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, আরো আছে। ক্লাস সিক্স-সেভেন পড়াকালীন সে ভারতের বিখ্যাত ক্রিকেটার মোহাম্মাদ আজহার উদ্দীনকে নিয়মিত চিঠি পাঠাত। তবে সেই চিঠির কোনো উত্তর সে আজও পায়নি, কারন ডাকটিকেট ছাড়া চিঠি পাঠালে হবে? উসকো প্যাহলা পেয়ার আধুরা রেহ গায়া…।

[দুই]

ইতোমধ্যেই শ্রীলংকান নাবিক দলটি মোটামুটি সারা এয়ারপোর্টের মধ্যে একটা বিলাচিলা অবস্থা সৃষ্টি করে ফেলেছে। এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে, উচ্চ শব্দে কথা বলছে। একজন একেবারে জলহস্তী টাইপের মোটাতাজা, লম্বা। তার মধ্যে একটা ষন্ডাগুন্ডা টাইপের  ‘নেতা’ ‘নেতা’ ভাব আছে। হাতে ওয়াকিটকির মতো দেখতে একটা জিনিস, ওটা নাকি স্যাটেলাইট ফোন। সেটা দিয়ে হাফ ইংরেজী, হাফ তামিল ভাষায় ‘আরুভারুপ্পানাতু…ইরুক্কুল্লা মুত্তিয়াতু’ উদ্ভট উচ্চারণে কী জানি বলাবলি করছে! কথা কিছু বুঝি না, কিন্তু তাদের উদ্বিগ্নতা এবং নালিশটা বোঝা যাচ্ছে।

আমি মনে মনে ভাবছি, ‘আরে ভাই! তোরা নাবিক মানুষ, সাতার কেটে কলোম্বো চলে যা… নাহলে একটা নৌকা ভাড়া করে যা…প্লেনে চড়তে আসছিস কেন?’

একটু পর রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একজন কর্তাব্যক্তি, নাম সম্ভবত সুমন। তিনি সেই আঁখিসুন্দরীকে হাতের ইশারায় ডাকলেন এবং তাকে বোর্ডিং পাস দিয়ে দিলেন। মেয়েটি হনহন করে ইমিগ্রেশনের দিকে চলে গেল। পড়ে থাকলাম, আমি আর নাবিক দল। আমার হতাশার পরিমান বাড়ল। হতাশাও কি আপেক্ষিক? হতে পারে। তা না হলে আমার এমন মনে হলো কেন? ভাবছি, বড় কুটুমকে আবার ফোন দিব কি না? অনেক সময় তো হয়ে গেল। প্লেন উড়ে যেতে আর মাত্র চল্লিশ মিনিট বাকি। হঠাৎ নাবিক দলেরও খবর এলো, তারা হুড়োহুড়ি করে যাবার সময় আমার পায়ের উপর সাত-আট কেজি ওজনের একটা ব্যাগ ফেলে দিল। ব্যথায় কুকড়ে উঠলাম। অনেক কষ্টে মুখে চলে আসা গালিটা আটকালাম, কিন্তু মনে মনে গালিটা ঠিকই দিলাম, ‘শালা মরবি তো মর…লংকায় গিয়ে মর…আমার উপরে মরোছ ক্যান? আমি তো এমনিতেই আধমরা…।’ নিচু হয়ে ব্যাগটা তুলতে গিয়ে সেই ষন্ডাটার গেল প্যান্ট ছিড়ে। মর জ্বালা…। ছেড়া প্যান্টের ভিতরে লাল রঙের আন্ডারওয়্যার দেখা যাচ্ছে, কী সুন্দর সিনেমাটোগ্রাফি! কিন্তু তা দেখার সময় কই? ছেড়া প্যান্টের নেতৃত্বেই নাবিক দল চলে গেল।

[তিন]

এবার আমার দুঃখ দ্যাখে কে? যার কেউ নেই, তারও কেউ থাকে। আমার আছে আবীর। আবীর নীলাবতীর বোনের ছেলে। সে আমাকে সি-অফ করতে এসেছে। আমার পাশেই মন খারাপ করে নতমুখে বসে আছে। ছেলেটার মুখ শুকনো দেখে মায়া লাগছে। এই ছেলেটা তখন অনেক ছোট। আমি আর নীলাবতী হানিমুনে দার্জিলিং গিয়েছি। সে তখন দার্জিলিং এ পড়ে। লিকলিকে বাচ্চাটা। সেইন্ট জেভিয়ার স্কুল, কার্সিয়ং থেকে আমরা তাকে নিয়ে আসলাম। সারাদিন ঘোরাঘুরির পরে ডিনার করে রাতে ঘুমাবার আগে আবীরকে জিজ্ঞেস করলাম,
-তুমি কার পাশে ঘুমাবে, বাবা?
একবার আমার দিকে একবার তার খালামনির দিকে তাকিয়ে বলে,
-তোমাদের মাঝখানে ঘুমাব।

মনে মনে বললাম, ‘যা… শালা!’ মাত্র পাঁচদিন আগে বিয়ে করেছি।

আবীর সারাটা রাত তার খালামনিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমালো। আমাদের হানিমুনে ভালোবাসার মহামূল্যবান রাতখানি স্নেহ-মমতার অমূল্য রাতে পরিনত হলো। আমরা যখনই বাংলাদেশে যাই- দিন-রাত, হরতাল-অবরোধ যা-ই হোক, আবীর আমাদের জন্য এয়ারপোর্টে এসে অপেক্ষা করে, ফিরে আসার সময় সি-অফ করতে এসে বসে থাকে। কে বলেছে, স্নেহ ভালোবাসা শুধু নিম্নগামী (বড়রাই শুধু ছোটদেরকে দিয়ে থাকে, ছোটরা দেয় না)? আমাদের ক্ষেত্রে উর্ব্ধগামীও।

একটু পরে সুমন সাহেব দেবতার মতো এসে বললেন,
-স্যার আপনি আসুন।
জিজ্ঞেস করলাম,
-কি খবর?
-ক্যাপ্টেন তারেক হাদী স্যার আপনার জন্য সিঙ্গাপুর পর্যন্ত যাবার ব্যবস্থা করেছেন।
-ধন্যবাদ।

মনে মনে নিজেকেই নিজে বলতে বাধ্য হলাম, ‘সবসময়ই শালারা খারাপ হয় না। মাঝে মাঝে ভীষণ ভালোও হয়। ধন্যবাদ তারেক’। দ্রুতই বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে আবীরকে বিদায় দিয়ে ইমিগ্রেশন ক্রস করলাম। এক রকম দৌড়াতে দৌড়াতেই প্লেনে উঠতে হলো। প্লেনের গেইটে এক বিমানবালা জিজ্ঞেস করলো,
-আপনার সিট নাম্বার স্যার?
-3C
-ডানদিকে আইল সিট।
-ধন্যবাদ।
বাংকারে হ্যান্ড লাগেজটা রেখে সিটে বসতেই দেখি, সেই অসম্ভব সুন্দর চোখের অধিকারি মেয়েটি আমার পাশের সিটে বসে আছে।

[চার]

যথারীতি প্লেন উড্ডয়ন করেছে। বাথরুমে গেলাম। ঔষুধ খেয়ে দিলাম একটা ঘুম। বুকের ডানপাশে সোনালী প্লেটে কালো হরফে লেখা ‘আতিয়া’ নামক এক বিমানবালার ডাকে ঘুম ভাঙল,
-স্যার, আপনার বোর্ডিং পাসটি দিন।
দিলাম। একটু পরই মেয়েটি আমার জন্য লাঞ্চ নিয়ে এলো। লাঞ্চের মেনু খারাপ না। চিকেন বিরিয়ানী, এক পিস কেক, ছোট্ট একটি কাপে তিরামিসু এবং এক বোতল পানি দিয়ে গেল। গরম গরম বিরিয়ানী খেয়ে নেয়া দরকার কিন্তু মুখে তো রুচি নেই। জ্বরে স্বাদ চলে গেছে। কোনো কিছু মুখে দিলেই বমি আসে। প্লেনের মধ্যে বমি করলে একেবারে বেড়াছ্যাড়া লেগে যাবে। গতকাল রাতে ডাঃ আহসানুল হাবীব রুবেল ভাইকে সমস্যার কথা জানালাম। তিনি বললেন, ‘খাবার আগে একটা Omadin 10 mg এবং একটা Sergel 20 mg খেয়ে নিও। তাহলে বমি এবং গ্যাসের সমস্যা থাকবে না’। এবং রক্সিক ২০০ মিলিগ্রাম বাদ দিয়ে CEF-3 DS এন্টিবায়োটিক খেতে বললেন। যথারীতি তাই করলাম। যখন বিরিয়ানীর বক্স খুললাম, দারুন ঘ্রান! খেতেও বেশ সুস্বাদু। তিরামিসুও মজা লাগল। ক্ষুধাও লেগেছিল, বেশ। বমিঠমি উধাও। ধন্যবাদ রুবেল ভাই। কেকটাও খেতে পারতাম কিন্তু খেলাম না। রেখে দিলাম। কারন প্লেন থেকে নামার চল্লিশ মিনিট আগে টার্বো প্যারাসিটামল খেয়ে নামতে হবে, তখন কেক খেয়ে ঔষুধ খাব। সিঙ্গাপুরে জ্বর নিয়ে নামা যাবে না, তাহলে খবর আছে।

একটু পর আমার পাশের সিটের মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো,
-এই ফর্মে ‘লাস্ট সিটি’ এর স্থলে কি লিখতে হবে?
-ঢাকা
-আপনি কি সিঙ্গাপুরে যাবেন?
-না। অস্ট্রেলিয়াতে যাব।
-আমি এই প্রথম একা জার্নি করছি, আগে বাবা-মা অথবা বড় বোনের সাথে এসেছি…
-আচ্ছা! আপনি কোথায় থাকেন?
-আমি খুলনা ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজিতে আন্ডার গ্রাড এক্সাম শেষ করলাম।
-আচ্ছা। আপনি কি এখন বোনের বাসায় যাচ্ছেন?
-হ্যাঁ।
-আপনার বোনের দুটি সন্তান?
-হ্যাঁ।
-একটি ছেলে একটি মেয়ে?
-হ্যাঁ। আপনি জানেন কিভাবে?
-না। আমি জানি না।
-তাহলে বলছেন কিভাবে?
-এমনিই মনে হলো।
-না, এমনি না…আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার বোনকে চিনেন।
-আমি অনেকের বোনকে চিনি কিন্তু আপনার বোনকে চিনি না।
-তাহলে তাঁর বাচ্চা সম্পর্কে বললেন কিভাবে?

মেয়েটি বেশ কনফিউসড হয়ে গেছে। তাঁর চোখের পাতার স্থিরতা অনেক কিছুই বলে দিচ্ছে। আমি স্পষ্ট পড়তে পারছি। তাঁর ভাবনাগুলো এরকম- ‘একজন অপরিচিত মানুষ আমার বোনের সন্তানদের সম্পর্কে পর্যন্ত জানে, না জানি ফ্যামিলির আরো কতকিছু জানে এই লোকটি’। মেয়েটি চুপচাপ হয়ে গেল। আমি তাঁর ভয় ভাঙ্গানোর জন্য বললাম,
-লাঞ্চ করার সময় কেক এবং তিরামিসুটি আপনি খান নাই, ব্যাগের মধ্যে একটা বক্সে রেখে দিয়েছেন, তাই না?
-হ্যাঁ। তাতে কি?
-তার মানে আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে আপনার খুব আদরের কেউ আছে, তারা দুজন হবার সম্ভাবনা বেশি।
-মানে? আমি পরে খাওয়ার জন্যও তো রাখতে পারি।
-তা রাখতে পারেন। কিন্তু আপনার ব্যাগের মধ্যের খেলনা গাড়ি এবং পুতুলটি নিজে খেলার জন্য নিচ্ছেন না, নিশ্চয়ই?

মেয়েটি কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। অতঃপর আমরা একসাথে চোখেমুখে হাসলাম।

[পাঁচ]

সিঙ্গাপুর টাইম রাত আটটায় চাংগি এয়ারপোর্টে প্লেন ল্যান্ড করল। আমি যথারীতি আগেভাগেই ঔষুধ খেয়ে জ্বর নামিয়ে রেখেছি। প্রস্তুতি মাশাল্লাহ খারাপ না। প্লেন এংকর করার পর দরজা খোলার সাথে সাথে একজন কেবিন ক্রু ঘোষনা দিলেন, প্যাসেঞ্জার “ মিঃ শাখাওয়াৎ নয়ন” আপনি সবার আগে বের হয়ে আসুন। চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমি তো ভিআইপি নই, আমাকে আগে ডাকে কেন? সুতরাং খবর আছে। বাংকার থেকে লাগেজটা নামাচ্ছি আর ভাবছি, কি হতে পারে? (১) আমার অসুস্থতার খবর আগেভাগেই প্লেন থেকে এয়ারপোর্টে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, কারন তারা হয়তো লক্ষ্য করেছে আমি বারবার ঔষুধ খেয়েছি। একবার একজন সোনা চোরাচালানীকে এভাবে প্লেন থেকে ধরিয়ে দিতে দেখেছিলাম অথবা (২) আমাকে হয়তো সিঙ্গাপুর কতৃপক্ষ ফিরতি ফ্লাইটে আবার ঢাকা পাঠিয়ে দিবে।

দুশ্চিন্তার বাচ্চা-কাচ্চা বাড়তেই থাকল। ভয় পেয়ে আর কি হবে? যা হবার তাই হবে। আমি দৃঢ় পদক্ষেপে আগালাম। প্লেনের দরজার বাইরে চার-পাঁচজন ইউনিফর্মধারী অফিসার, কোমরে রিভলভারও আছে। তাদের মধ্যে একজন আমার নাম লেখা একটা কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে যেতেই বললেন,
-ফলো মি।
তাদেরকে অনুসরণ করলাম। তারা এমনভাবে আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন যেন, আমি একজন ফেরারি আসামী কিংবা ভয়ংকর অপরাধী। যাতে কোনোভাবেই পালিয়ে যেতে না পারি। পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট সিংগাপুরের চাংগি এয়ারপোর্ট। কিন্তু আজ তেমন ব্যস্ততা নেই বললেই চলে। যাত্রীর চেয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীর সংখ্যা অনেক বেশি। করোনা ভাইরাস তাঁর শক্তি দেখাচ্ছে। ভয়ে পুরো পৃথিবী কাঁপছে। ভাবছি, অদৃশ্য শক্তিই সর্বাপেক্ষা বড় শক্তি। ইহাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। আরবের বেদূইনরা তা দেড় হাজার বছর আগেই বুঝেছিল। নিশ্চয়ই এখানে চিন্তার অবকাশ আছে।

প্রথমেই তারা আমাকে নিয়ে গেল স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে। টেম্পারেচার, পালস, ব্লাড প্রেসার চেক করল। এক বোচা ডাক্তার বলে, ‘নো টেম্পারেচার বাট হি ইজ আনওয়েল’। …লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সোবহানাকা …বুকের মধ্যে ধরফর করে উঠল। এবার বুঝি কট খেয়ে গেছি রে। কিন্তু না…বোচা ডাক্তারটার চেহারা ডেউয়া ফলের মতো এবড়ো থেব্রো হলেও মানুষ খারাপ না…কি তে কী মনে করে ছেড়ে দিল। আমি বেঁচে গেলাম। পারলে দিতাম একটা দৌড়; কিন্তু সেই উপায় কি আর আছে?

তারপর একটা বাসে টার্মিনাল ২ তে নিয়ে গেল। সেখান থেকে স্কাইট্রেনে টার্মিনাল ১ এর স্কুট এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে। কাউন্টারের মহিলা আমার পাসপোর্ট চাইলেন। আমি দিলাম। পাসপোর্ট দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
-তুমি অনলাইন চেক ইন করেছো?
-না।
-তাহলে কে করেছে?
-নীলাবতী করতে পারে…সিডনি থেকে…
-ইয়েস সি ডিড।
বুঝলাম, সে বসে নাই। মনে কিছুটা সাহস পেলাম। বোর্ডিং পাস দিয়ে দিল। সিট পেলাম একেবারে পিছনে ৪৪ নাম্বার। কি আর করা? যেতে পারলেই হলো।

পাঁচ ছয় ঘন্টার স্টপওভার। পরবর্তী ফ্লাইট রাত দুটোয়। ভাবলাম নীলাবতীকে ফোন করে তারপর রাতের খাবার খাব। ওয়াইফাই কানেক্ট করে ফোন দিলাম। ফোনে সে যা বললো, তাতে আমার চিন্তামুক্ত থাকার কোনো কারণ নাই। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত আমাকে কোয়ারেইন্টাইনে নিয়ে যেতে পারে। সাবধানে থাকতে হবে। কোনোভাবেই যাতে জ্বর না আসে। ঔষুধ খেতে হবে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সিংগাপুর সরকার মানুষের শরীরের তাপমাত্রা এবং হার্টবিট মনিটর করছে। সুতরাং মোবাইল ব্যবহার এই মুহুর্তে না করাই ভাল। ভয়ে অস্থির লাগতে শুরু করল। আমি তো সত্যি সত্যিই অসুস্থ। ভেবেছিলাম কিছু খাব কিন্তু এই অবস্থায় খাবার কি আর মুখে যায়? ক্লান্তিতে ঘুম পাচ্ছে, খুউব। বসে থাকতে পারছি না, পড়ে যাচ্ছি। কিন্তু ঘুমালাম না, যদি সময় মতো জেগে উঠতে না পারি! কিংবা জ্বর নিয়ে ঘুম থেকে উঠি!

[ছয়]

ফাইনালি যখন সিংগাপুর থেকে স্কুট এয়ারলাইন্সের প্লেনে উঠে বসলাম, তখন আর নীলাবতীকে জানাতে পারলাম না। ওয়াইফাই ডিসকানেক্ট হয়ে গেছে। উড্ডয়নের আগে রানওয়েতে প্লেন দ্রুত গতিতে ছুটে যখন আকাশে মেঘের উপরে উঠে যাচ্ছে, আমার মনে হলো যেন শীতল একটা ঘাম দিয়ে শরীরের সব জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে, সব ক্লান্তি মুছে যাচ্ছে।

একটু পর প্লেনের কেবিন ক্রুরা একটা ফর্ম দিয়ে বললেন, এটা হেলথ ডিক্লারেশন ফর্ম। সঠিক তথ্য দিতে হবে। আমি ভালো করে পড়লাম। ফর্মে যক্ষা, এইচআইভি’র কথা লেখা থাকলেও, কোথাও টাইফয়েডের কথা লেখা নাই। বেঁচে গেলাম। দুই এক মিনিট পরেই একটি ঘোষণা দেয়া হলো, ‘সিডনি এয়ারপোর্টে সকলের বাধ্যতামূলক হেলথ চেকআপ হবে। যাদের জ্বর-সর্দি-কাশি পাওয়া যাবে তাদেরকে ক্রিসমাস আইল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হবে’।

আমার তো জ্বর এবং শুকনো কাশি আছে। ঔষুধ খেয়ে দাবিয়ে রাখছি। যদি সিডনিতে যাবার পর ফেইল করি? উপায়? ক্রিসমাস আইল্যান্ড কতদূর? সিডনি থেকে মাত্র ৫২৬৯ কিলোমিটার। আমাকে যদি ক্রিসমাস আইল্যান্ডেই থাকতে হয়, তাহলে আর বাংলাদেশ থেকে এত কষ্ট করে আসলাম কেন? বাংলাদেশ থেকে সিডনির দুরত্ব ৯০৭১ কিলোমিটার। অভাগা যেদিকে যায়, সাগর সেদিকেই শুকায়। আমার এখন কি হবে? আমি কি করবো? এসব ভাবতে ভাবতে কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছি।

ঘুম ভেঙ্গেছে। ব্রেকফাস্ট দিয়েছে। খেতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু খেতে তো হবেই। ঔষুধ খেতে হবে না? ঔষুধ খেয়ে খেয়ে জ্বর নামিয়ে শরীর শীতল করে রাখতে হবে, যাতে সিডনি এয়ারপোর্টের মেডিকেল টিম ধরতে না পারে। প্রায় আটঘন্টার দীর্ঘ ফ্লাইট। প্লেন সিডনির আকাশে চলে এসেছে।

২১ মার্চ ২০২০। স্থানীয় সময় দুপুর প্রায় একটা। সিডনির আকাশে ঝকঝকে রোদ। একটু পর প্লেন ল্যান্ড করবে। প্লেন ল্যান্ড করার পর যখন থামল, তৎক্ষণাৎ একটি ঘোষণা দেয়া হলো। যাদের জ্বর-সর্দি-কাশি আছে তাদেরকে সিটে বসে থাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। প্রায় সাথে সাথেই অনেকেই কাশাকাশি শুরু করে দিল। অদ্ভুত কেইস! প্লেনের মধ্যে চারদিকে কাশির শব্দের মধ্যে আমি নিজেও দু’তিনটি দিয়ে দিলাম। কেন জানি যখন কাউকে হাসি-কাশি বন্ধ করতে বলা হয়, ঠিক তখনই পেট ফেটে হাসি-কাশি ঢেউয়ের মতো আসতে থাকে। কোনোভাবেই থামানো যায় না কেন? মুরুব্বীরা হাসি থামানোর জন্য ধমক দিলে তো কথাই নাই। মুখ টিপেও হাসি থামানো যায় না। এত কিছুর মধ্যে আমার পাশের সিটের এক ভুড়িওয়ালার সম্ভবত কাশি আটকাতে গিয়ে পাদু বের হয়ে গেল। যা শালা!

এই চেক-আপ সেই চেক-আপের পর “১৪ দিনের হোম কোয়ারেইন্টান” এর শর্তে দস্তখত দিয়ে সিডনি কিংসফোর্ডস্মিথ এয়ারপোর্ট থেকে মুক্তি পেলাম। এঘাট ওঘাট পার হতে প্রায় এক দেড় ঘন্টা চলে গেল। ট্যাক্সি নিয়ে বাসায় রওয়ানা দিলাম।

এদিকে নীলাবতী সিডনি এয়ারপোর্ট, স্কুট এয়ারলাইন্সের সিংগাপুর অফিস, সিডনি অফিস কোনো জায়গায় ফোন করতে বাকি রাখেনি। আমার খবর না পেয়ে সে মনে করেছে, আমি বোধ হয় কট খেয়ে গেছি। অথবা আমাকে ক্রিসমাস আইল্যান্ডে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমি যখন বাসার কলিং বেল চাপলাম, ওপ্রান্ত থেকে গভীর উদ্বিগ্নতা জড়ানো কন্ঠে ‘হ্যালো’ শুনে বললাম,
-নীলাবতী! আমি এসেছি…

দরজা খুলতে ভুলে গিয়ে সে শুধু কাঁদছে।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা 

শাখাওয়াৎ নয়ন: কথাসাহিত্যিক, সহযোগী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments