করোনা ভাইরাস: চীনে বাংলাদেশীদের নিদ্রাহীন জীবন যাপন -ফাহিম হিমেল(চীন থেকে)

  •  
  •  
  •  
  •  
ফাহিম হিমেল

চীনে রয়েছি বেশ কয়েক বছর ধরে। আকারে অধিকাংশ ছোট চৈনিক মানুষগুলোর কাজের স্প্রিহা, সক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা এতো কাছে থেকে না দেখলে বিশ্বাস করা দূরহ ছিলো। চীনে ছিলো পতন, চীনে আছে দীর্ঘ উত্থানের ইতিহাস। করোনা নামের ভাইরাসটি চীনকে যেনো স্থবির করে দিয়েছে। এতো করুন অবস্থা যেনো কখনো আসেনি এখানে। দেশের কয়েকটি শহর সম্পূর্ণ লকড্ ডাউন। মানুষের চলাচল স্থবির হয়ে এসেছে। ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে আটকা পড়েছে। বাংলাদেশী প্রায় ৫০০ ছাত্রের একই অবস্থা। তারা জানেনা কখন তারা উদ্ধার পাবে, কখন তারা পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারবে। সেই শঙ্কার মধ্যে যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের উদ্ধারের জন্য বিমান পাঠাতে চান তখন আমরা আশাবাদী হয়ে উঠি।

চীনে মেইনস্ট্রিম ছাত্রদের সাথে বাংলাদেশী ছাত্ররা

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০৬, আরোগ্য লাভ ৬০ জন, আক্রান্ত ৪৫৪৭ জন এবং সন্দেহভাজন ৬৯৭৩ জন। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।

করোনা ভাইরাস কী:
করোনা ভাইরাসটির অপর নাম ২০১৯-এনসিওভি। এ ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। সাধারন ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার মতো করেই এ ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর এবং শুকনা কাশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমনের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচদিন থেকে দু’সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

কীভাবে ছড়িয়েছে এই ভাইরাসঃ
মধ্যচীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করে। এরপর ১১ জানুয়ারী প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।
করোনা সংক্রমনের এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোন কারণ বলতে পারেনি, তবে সাম্প্রতিক ভাইরাস সংক্রমনের ক্ষেত্রে উহান শহরে সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা বলা হচ্ছে। শহরটি একটি মাছের বাজারে গিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এ রোগের সংক্রমন ঘটেছে বলে প্রমান পাওয়া গেছে। কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনা ভাইরাস বহন করতে পারে। এছাড়া উহানের ঐ বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ, কুকুর এবং সাপ বিক্রি হতো।এদের থেকেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে বলেও ধারনা করা হচ্ছে।

রাস্তায় মাস্ক ছাড়া কাউকে দেখা যাচ্ছেনা।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় চীন সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সমূহঃ
সমগ্র উহান শহর সিল করে বাস, ট্রেন, বিমান এবং পাতাল রেল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
চীনা কেন্দ্রীয় সরকার নববর্ষের ছুটি ২৭ জানুয়ারী থেকে বাড়িয়ে ২ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত করেছে এবং ৩ ফেব্রুয়ারী থেকে কার্যদিবস শুরু হবে বলে জানিয়েছে।
জিয়াংশু রাজ্য সরকার নববর্ষ পরবর্তী অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ ছুটি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ২৪ জানুয়ারী পর্যন্ত করেছে এবং পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত সকল কিছু বন্ধ থাকবে।
চীনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে পাতাল রেল, বিমান এবং বাস চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ৬ দিনে ১০০০ শয্যা বিশিষ্ট বিশেষায়িত মেডিকেল স্থাপনের পদক্ষেপ নিয়েছে চীনা সরকার।
প্রতিটি শহরে বিশেষ সতর্ক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা যেমন চীনের গ্রেটওয়াল, ফরবিডেন সিটি প্রভৃতি বন্ধ ঘোষণা করেছে।
এছাড়াও চীনে অধ্যয়নরত বিদেশী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ, মাস্ক এবং খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে।
উদ্বেগের বিষয় হলো- চীন ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ভারত, নেপাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড সহ প্রায় ১১টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং প্রাথমিক ভাবে এই ভাইরাস রক্ষার করণীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে এবং বিশ্ববাসীকে সতর্ক অবস্থানে থাকার আহবান জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গিয়েছে উহান সিটিসহ হেবেই রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০০ বাঙ্গালী শিক্ষার্থীর বাস। এদের সকলেই চরম আতঙ্কে ঘরবন্দী জীবন যাপন করছে। যেখানে খাদ্যের সংকট প্রবল, যদিও স্থানীয় কিছু সুপারশপ ছাড়া সকল দোকান বন্ধ রয়েছে। তবে সংক্রমনের ভয়ে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। ইতিমধ্যে ভারত, আমেরিকা সহ বেশ কিছু দেশ বিমান পাঠিয়ে সেখানে অধ্যায়নরত নিজ নিজ নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে।
তবে আজকের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনা সরকারের সাথে বাঙ্গালী শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার কথা জানালে চীনা সরকার আগামী ১৪ দিনের মধ্যে উহান থেকে কোন নাগরিককে বাংলাদেশের ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত রোগী হতে রোগ ছড়িয়ে পড়া রোধে এ ব্যবস্থা।

সবকিছুর মধ্যে আশার খবর হলো চীনা রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল শিনহুয়া মাধ্যেমে একদল চীনা গবেষক দাবী করেছেন তাঁরা করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে সফলতার মুখ দেখেছেন এবং তারা সাতজন নার্সের উপর এ ভ্যাক্সিন প্রয়োগে সফল হয়েছেন। গবেষণায় আরো বেড়িয়ে এসেছে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস উচ্চ তাপমাত্রায় টিকতে পারে না এবং ৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়েস তাপমাত্রায় ৩০ মিনিটে এ জীবানুর মৃত্যুঘটে। তাই গবেষকরা মতামত দিয়েছেন রান্নার সময় খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় সেদ্ধকরা, ঘরের রুম হিটার চালিয়ে রাখা, যথাসম্ভব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, বাহির থেকে এসে ভালো ভাবে হাত-মুখ ধোয়া এবং ঘনবশতিপূর্ণ জায়গা এড়িয়ে চলা এবং সর্বদা মাস্ক পরিধান করা। দেশবাসীর কাছে বাংলাদেশী ছাত্র ও অন্যান্য কর্মজীবীরা দোয়া প্রার্থনা করছে যেনো তারা এ শঙ্কটে না পড়ে এবং অতি দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারে। তার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন কাটছে শঙ্কায় এবং নিদ্রাহীন।

ফাহিম হিমেল
সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ারিং
হুয়াইন ইন্সসটিটিউট অব টেকনোলজি।
হুয়াইন, জিয়াংশু ,চীন।

2 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments