কাজটা কঠিন কিন্তু আপনি চাইলে পারবেন – শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

একটা সময় ছিল, লাঞ্চ বা ডিনারে ভাত না খেলে মায়ের বকুনি খেয়েছি, তখন যা খেতাম সেটাকে বলা হতো জাঙ্ক, যেমন পেয়ারা, গাজর, কাঁচা পেপে (যেটা গোলাপি হতে শুরু করেছে, রান্নায় ব্যবহার করতে চাইতেন না মা), টমেটো, শশা এমন আরও অনেক কিছু যা প্রপার খাদ্য হিসাবে বিবেচনা করা হতো না। কাঠির মতো শুকনা ছিলাম বলে বাড়িতে যেই আসতো সেই খোটা দিয়ে কথা বলতো। পাখীর মতো খাই বলেও তিরস্কার করতো অনেকে। আজ অনেক বছর পরে মুখের সেই স্বাদ ফেরত চাই। কারণ এখন সবাই বলে কার্ব ( ভাত, রুটি, পাস্তা, নুডুলস ) কম খেতে এবং বেশী করে শাকসবজি আর সালাদ খেতে বলে সবাই। কিন্তু সমস্যা হলো এতদিনে তো আমি ভাতের মজা বুঝে গেছি সাথে যদি মাছ, ডাল, আচার, ভর্তা ভাজি থাকে তাহলে তো কথাই নেই।

আপনাদের এমন হয় কিনা জানি না, যেটা করতে ভালো লাগে, সেটা করা বারণ জানলে ওটা করবার জন্য মন আঁকুপাঁকু করতে থাকে, আর সেই কারণে মনটা ওদিকেই পড়ে থাকে বেশী। যেমন, ভাত বেশী না খাওয়াই ভালো ব্যাপারটা জানার পর থেকে ভাত খাওয়ার জন্যেই যত অস্থিরতা। কে জানতো একদিন ভাত খাওয়া নিয়েই এতো বিড়ম্বনা শুরু হবে যা একসময় শত বলেও খাওয়াতে পারেনি মা।
সেই বয়স এবং সময়টা ছিল ভিন্ন, বসবার সময় ছিল না দু’দণ্ড, শুধু দু’পায়ের ওপরেই তিড়িং বিড়িং করে ঘাস ফড়িঙের মতো লাফিয়ে বেড়াতাম। সব মিলিয়ে ওজনের কথা ভাবতে হয়নি কখনোই। কিন্তু এখন সেই  খাবারের অভ্যাস বদলেছে, লাফানো কমেছে আর বেড়েছে বয়স। বয়স তো আর কমানো যাবে না, ইচ্ছেও নেই কিন্তু মনের জোর বাড়াতে হবে অনেক, সেই সাথে বদলাতে হবে খাবারের অভ্যাস এবং পা’দুটোর সদব্যবহার।
গত ছয় বছরে ওজন বেড়েছে  ১০ কেজি। কেমন করে হলো? খুব সহজ উত্তর হলো বেশী পরিমাণে বসে থাকার কারণে। লিখতে শুরু করলে নেশা ধরে যায় ওঠা হয় কম, তাছাড়া আমার কাউন্সেলিং এর কাজটাও বসে করবার কাজ। শুধু ৩ বেলা খেলে (কম বেশী বা ভালো মন্দ যাই খাইনা কেন) আর পা দুটোকে কম ব্যবহার করলে এমন হবার সম্ভাবনা সবারই আছে।

সবার আগে সিদ্ধান্ত নেয়াটাই সবচেয়ে বেশী জরুরী। যেকোনো নতুন অভ্যাস শুরু করবার আগে অথবা পুরনো  অভ্যাস ত্যাগ করবার প্রথম পদক্ষেপ হলো মেনে নেয়া ( Acknowledge and accept the issue)  যে এই অভ্যাসটা আমাকে একটা সমস্যায় ফেলেছে, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমি এই ব্যাপারে কি করতে চাই এবং কি করতে প্রস্তুত!
তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেই ১০ কেজি ওজন বেড়েছে তা কমিয়ে আনবো। আর সেটার জন্যে আমার নিজেকেই আগে তৈরি করতে হয়েছে যে , হ্যা ,আমি এটাই চাই এবং আমি এটাই করবো। অর্থাৎ এটা আমি অন্য কারো জন্যে করছি না, শুধু নিজের জন্য।

প্রথমতঃ কাজটা নিজের জন্য করতে হবে। এই তথ্যটা খুব জরুরী, তাই আবার বলছি- যে কোন লক্ষ্যে পৌঁছুবার জন্য লক্ষ্যটা নিজের কাছে অর্থপূর্ণ হওয়া অত্যন্ত জরুরী, তাই কাউকে কিছু চাপিয়ে দিলে, বা জোর করে করাবার চেষ্টা করলে ওটার ফলাফল খুব একটা সুখকর হয় না।সেটা পড়ালেখা হোক, এক্সারসাইজ হোক, গান বাজনা হোক বা ওজন কমানো হোক অথবা যে কোনোকিছুই নিজের জন্য করলে সেটা বেশী অর্থ বহন করে। এটার আরও একটা অর্থ হলো, নিজের উপলব্ধি থেকে তৈরি সিদ্ধান্ত হতে হবে, তখনই কাজটা করবার জন্যে একটা প্রেরণা জাগবে।

দ্বিতীয়তঃ মনে করুন প্রেরণা জাগলো ঠিকই, দুদিন খুব আয়োজন করে শুরুও করলেন কিন্তু সপ্তাহ খানেক পরে একদিন করলেন তো দ্বিতীয় দিন আলসেমি লাগছে। এমন আমাদের অনেকেরই হয়। আমিও সেই জায়গা থেকেই বলছি। এবার আমি এই জায়গাটা থেকে আমি বের হবোই বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কেন? আমি সত্যি সত্যিই একটা রেজাল্ট দেখতে চাই।

তৃতীয়তঃ যে কোন কাজের পেছনে একটা কারণ থাকতে হবে, কেন ওজন কমানো জরুরী আমার জন্য। বিভিন্ন মানুষের জন্য বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, এগুলো একান্তই আমার নিজস্ব।
• আমি চেয়ারে বসে সহজ ভাবে জুতার ফিতা বা বেল্ট লাগাতে চাই (এখন এই সামান্য কাজটা করতে দম বের হয়ে যাবার জোগাড় হয়)।
• আমি খুব আরাম করে সিঁড়ি ভেঙে চার তলা পর্যন্ত উঠে যেতে চাই। (সারাজীবন দুই ধাপ সিঁড়ি লাফ না দিয়ে যেতেই পারতাম না আর এখন একটুতেই হাঁপিয়ে যাই, দোতলায় উঠতেও কষ্ট) আগের মতো লাফিয়ে পারবো না জানি কিন্তু ৪ তলা পর্যন্ত পারা উচিৎ।
• সাধারণ সুস্থ থাকার জন্য যোগাসনের যেইসব আসন করা প্রয়োজন সেগুলো আগের মতো না পারলেও কয়েকটা যেন সারাজীবনের সঙ্গী করে রাখতে পারি সেটা চাই।
• যতদিন বেঁচে থাকি এবং সুস্থ থাকি, পায়ে হেঁটে সব জায়গায় যেতে চাই। বুড়া হতে কোনই আপত্তি নেই আমার, আমি ইয়াং সাজবার চেষ্টা করছি না কিন্তু আমি ফিট বা কর্মক্ষম থাকতে চাই।
• দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে চাই, চেয়ারে বসে নয়।

এগুলো আমি অর্জন করতে চাই, তাই এগুলোই আমার লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে পৌঁছুতে আমার পরিকল্পনাটা কি ?
• সারাদিন বসে যে লেখালেখি করি সেটা ভাঙতে হবে। অর্থাৎ প্রতি ২ ঘন্টায় কমপক্ষে ১০ মিনিটের একট হাঁটাহাঁটি ঢুকাতে হবে (এটাই সর্বনাশের মুল বলে বিশ্বাস করি আমি)।
• সপ্তাহে ৪ দিন কম পক্ষে ৫/৬ কিমি ( ১০ কিমি পর্যন্ত হতে পারে) হাঁটতে হবে এটার সাথে দৌড়ানো মিলিয়ে দিতে হবে। এখন শুধু হাঁটতে পারি, দৌড়ানোটা নতুন যোগ করতে চাই, এটাই আমার চ্যালেঞ্জ। যা পারি সেটাতেই আঁটকে থাকলে নতুন কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়, নতুন অর্জনের জন্য নতুন পরিবর্তন প্রয়োজন।
• ২ দিন জিম বা সাঁতারে যাওয়া যেতে পারে, অথবা নিজের সুবিধা মতো অন্য কিছু এবং একদিন ছুটি। বিভিন্ন রকমের এক্সারসাইজ মিলিয়ে করলে রেজাল্ট ভালো হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
• এক বেলা ভাত/ রুটি/ পাস্তা খাবো ( কার্ব থাকবে এক বেলা) , সেটা সকালে বা দুপুরে হলে ভালো হয়, রাতে সালাদ বা সবজী যত খুশী খাওয়া যেতে পারে। মিষ্টি জাতীয় খাবার কমিয়ে দিতে হবে অনেকখানি। মাঝে মাঝে উইকেন্ডে নিজেকে রিওয়ার্ড দেয়া যেতে পারে যদি সপ্তাহে ওপরের সব কিছু ঠিকঠাক মতো পালন করা হয়। সবাই শুধু কার্ব খেতে নিষেধ করে কিন্তু কার্বে অনেক এনার্জি বাড়ে যেটা এই লক্ষ্যে পৌঁছোবার জন্য খুবই প্রয়োজন। এটা শিখেছি এক খাদ্য বিশারদের কাছে।
নিজের তৈরি রুটিন মেনে চলবো কি করে?

সবার জন্য সহজ নয় এটা। আমি নিজেই তার একটা ভালো উদাহরণ। নিয়ম মেনে চলা, একটা কাঠামোতে বেঁধে জীবন চালানো খুব মুশকিল আমার জন্য কিন্তু আমি যদি এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই তাহলে এটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। প্রয়োজনের খাতিরে আমি যদি আমার এইসব মূল্যবোধ গুলো পরিবর্তন না করি তাহলে আমি যা চাইছি তা কোনভাবেই পাবো না। তাই জীবনের কিছু কিছু জায়গায় নিজেকে, নিজের নীতি বা মূল্যবোধকে পরিবর্তন করতেই হয়। “আমি পারি না”, “আমার দ্বারা এসব হবে না” এইসব ভাষা আমাদের অনেক কিছু অর্জন করা থেকে বিরত রাখে, অনেক সম্ভাবনাকে সীমিত করে ফেলে, এসব মাথা থেকে তাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে , “Discipline is the bridge between goals and accomplisment” Jim Rohn এটাকে আরেকটু সিরিয়াসলি নিতে হবে। আমার এই বয়সে একদিন দৌড়ালে গা, পা, কোমর বা হাঁটু ব্যাথা করবে কিন্তু তাই বলে পরের দিন বসে থাকলে চলবে না। নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতেই হবে একটু। অনেক মহিলাকে দেখেছি হাঁটু ব্যাথা বলে হাঁটেন না। কিন্তু অনেক হাঁটু ব্যাথা হাঁটলেই ভালো হয় (ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন)।
আমি আমার নিজের লিমিটকে নিয়মিত পুশ করতে চাই, ডিসেম্বরের মধ্যে ১০ কিমি হাঁটার মধ্যে কম পক্ষে আড়াই কিমি দৌড়ানো যোগ করবো আমি, কারণ আমি জানি এটা করতে পারলেই আমি অন্যান্য অনেক কিছু পেয়ে যাবো।
ট্রিকটা হলোঃ
প্রথমে আমার এই বড় টার্গেটটাকে ছোটছোট ভাগে ভেঙে সপ্তাহের টার্গেট বানাবো। প্রত্যেক সপ্তাহে সেই লক্ষ্যকে জয় করবো। যেমন, প্রত্যেক সপ্তাহে নিজের লিমিটকে পুশ করবো। খুব ভালো হয় এই টার্গেট গুলোকে যদি কাগজে লিখে নেওয়া যায়, তাহলে সপ্তাহ শেষে ওই টার্গেটের পাশে একটা টিক দেবার সুযোগ হবে, আর এই টিক দিতে পারাটা অত্যন্ত উপকারী একটা কাজ আপনারা সবাই নিশ্চয়ই জানেন। পড়াশুনার ক্ষেত্রে, কোন প্রজেক্ট শেষ করবার বেলায় কিংবা যেকোনো কাজ যা কঠিন মনে হয় বা করা হয়ে ওঠেনা কিন্তু করতে হবে, সেসব কাজের জন্যে এটি একটি অত্যন্ত কার্যকরী পন্থা। এটা আমি কাউন্সেলিং এর সময় আমার ক্লায়েন্টদের বলি, এই ব্যাপারে একই পদ্ধতি ব্যাবহার করার কথা আমাকে এক বন্ধু মনে করিয়ে দিলো।

আমি শুরু করেছি আমার যাত্রা। প্রথম দিন থেকেই নিজেকে পুশ করছি। যখন ৪ কিমি হাঁটার পর থেমে যেতে ইচ্ছে করেছে তখন ৬ কিমি করেছি। দোহার প্রচণ্ড গরম এবং হিউমিডিটিকে অগ্রাহ্য করে আমার ব্রত পালন করেছি। সপ্তাহ শেষে আমি একটা ধাপ এগিয়ে যাবো, এমন করে ডিসেম্বরের মাথায় পৌঁছে যাবো আমার আসল লক্ষ্যে।
আমার পরিকল্পনা সবার সাথে শেয়ার করবার কারণ হোল, এই প্রেশারটাকেও আমি ব্যবহার করতে চাই নিজেকে মটিভেট করবার জন্য। আমার সাথে কেউ কেউ জয়েন করতে চাইলে করতে পারেন, ডিসেম্বরের মধ্যে একটা কিছু অর্জন হবেই হবে ইনশাআল্লাহ্‌। আশা করি আপনারা আপনাদের কাছের মানুষদের সাহায্য বা সহায়তা পাবেন। আমার পাশে আমার স্বামী আছে এটা আমার বিশাল শক্তি, আমার ছেলে মেয়েরাও দুর থেকে অনেক উৎসাহ দেয়।
এবার মানসিক উপকারটা বলে শেষ করছি, মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য, ডিপ্রেশন বা উৎকণ্ঠার ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবার জন্য প্রতিদিনের হাঁটা অত্যন্ত জরুরী একটি পদক্ষেপ। আরও একটা কথা মনে রাখবেন, একটা কঠিন কাজে সফলতা আপনাকে পরবর্তী অনেক গুলো কাজে সাহস এবং প্রেরণা জোগাবে, নিজের প্রতি বিশ্বাস বাড়বে।

( বি দ্রঃ আমি অনুরোধ করবো, আমার এই লেখা পড়ে কেউ কোনভাবেই মনে কষ্ট নেবেন না। আমি জানি ওজন কমানো অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ, অনেকেই বছরের পর বছর চেষ্টা করেও হয়তো তেমন রেজাল্ট পাননি। বিশ্বাস করুন সেই কারনেই এমন আওয়াজ দিয়ে শুরু করছি, নতুন কিছু চেষ্টা করবো বলে। আপনারা চাইলে এই পদ্ধতি ফলো করতে পারেন। আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি… যেই পদ্ধতিতে দিনের পর দিন চেষ্টা করেও কোন কাজ হচ্ছেনা সেই পদ্ধতির অবশ্যই একটা পরিবর্তন আনতে হবে। এই একই পদ্ধতি মানুষের পড়াশুনা বা অন্য যে কোন কিছু অর্জন করবার জন্যও প্রযোজ্য। আর যারা খুব সহজেই দিনের পর দিন এক্সারসাইজ করে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছেন তারা দয়া করে আমার এমন লম্বা লেখা পড়ে হাসবেন না , সবাই যার যার জায়গা থেকে চেষ্টা করবে, যার যার মতো করে চেষ্টা করবে সেটাই রেসপেক্ট করবেন, এই প্রত্যাশায় শুভকামনা সবার জন্য ) ।

শিল্পী রহমান: গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। কর্মসূত্রে এখন রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে।