কুযুক্তির সংযুক্তি/যেখানে যেমন -বাঘমামা

  •  
  •  
  •  
  •  

 228 views

ফেসবুক আর ফেসবুকের আগের ব্লগ জমানা! আমাদের সাথে কোন কিছু নিয়ে আলোচনা বা যুক্তিতর্ক করা খুব কঠিন একটা ব্যাপার। আবেগ আর প্রি-ডিটারমাইন্ড কনক্লুশন (বিচার মানি, কিন্তু তাল গাছ আমার) এর সাথে আছে উটভট সেলফ কনফিডেন্স! তা যে কোন বিষয়ই হোক না কেন। এলাকায় পণ্ডিত একমাত্র আমি, বাকি সবাই দুধভাত। এগুলো করতে যেয়ে আমরা বরাবর কিছু যুক্তির ফ্যালাসি বা কুযুক্তি বা কুতর্ক বা নষ্টামি বা হেত্বাভাসের আশ্রয় নিয়ে থাকি। এটা আমরা অনেকে জেনে বা না জেনেই করে থাকি। আমার আজকের এই লেখাটা হচ্ছে আমরা যারা না জেনেই এমনটা করে থাকি, তাদের জন্যে। আমাদের বহুল প্রচলিত কিছু ফ্যালাসি বা কুযুক্তির সাথে আপনাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেই চলুন।

কিন্তু, তার আগে আমাদের দুইটা কমন অসভ্যতামির কথা বলে নেই। স্কেয়ার ট্যাক্টিস এবং পার্সোনাল অ্যাটাক, দুটিই খুব কমন প্র্যাকটিস আমাদের মাঝে, এই দুটি ব্যাখ্যা করাই বাহুল্য। কেউ একজন একটা বক্তব্য দিলো, আপনার ভালো লাগে নাই। আপনি কোন যুক্তিতর্কে না যেয়ে মাইরালামু, খায়ালামু করতেছেন। পারলে সামনে আয়, তোর কল্লা কেটে কলা গাছে ঝুলামু। এটা স্কেয়ার ট্যাক্টিস, আপনি ভয় দেখিয়ে জিততে চাইছেন। আবেগে স্ববেগ।

আর লেখকের ব্যক্তিগত বিষয়ে নেগেটিভ কিছু জানেন? তবেই হয়েছে! ওইটাই ইস্যু, আলাপ শেষ! সে যা লিখেছে, আপনার ভালো লাগেনাই। বা, আপনার ব্যক্তিগত আক্রোশ আছে। আপনি কুৎসা করে জিততে চাইছেন, এটা পার্সোনাল এটাক।

এবার কিছু ফ্যালাসি দেখি, চলুন।
স্ট্রম্যান ফ্যালাসি(Strawman Fallacy):
আমি আমার প্রতিপক্ষের অবস্থানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছি যাতে তাকে হারাতে আমার সুবিধা হয়। শেষে সেই বিকৃত অবস্থানের বিপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে, প্রতিপক্ষের আসল অবস্থানের বিপক্ষে যুক্তি দেখানো হয়েছে বলে আত্নপ্রসাদের ঢেকুর তুলতেছি।

উদাহরণ: আউলা আর ডাঃ বাউলা দুই দোস্তের ভিতর কথা হইতেছে।
আউলাঃ হাঁসপাতালে যেই সব ডাক্তাররা সার্ভিসের অবহেলা করে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক।
ডঃ বাউলাঃ হ! আমরা তো ভালা না, ভালা নিয়াই থাইকো! এর পরে পেটে ব্যথা করলে ফার্মেসি থিকা প্যারাসিটামল কিন্যা রাইতে শুইয়া থাকবি। খবরদার আমারে ডাকবিনা আর হাঁসপাতালেও দৌড়াবিনা।

নিজেদের পাওনা আর মালিকের বেতন দেয়া নিয়ে ঐতিহাসিক অংকের যুক্তি, ছবি: গুগল

অথবা আলামত আর কেরামতের আলাপটা দেখুন।
আলামতঃ বাংলাদেশের মত একটা দেশে প্রতিরক্ষা খাতে এত বাজেট রাখার কি মানে, আমি বুঝিনা। এর থিকা শিক্ষা আর চিকিৎসায় বাজেট আরও বাড়ানো যেত!
কেরামতঃ হুম! নীতি নির্ধারকেরা তো ঘাস খায়, জাবর কাটে! তুই তো চাসই দেশটা ভারতের ৩০তম ষ্টেট হউক! হুন! এই যে জাহাজ হেলিকপ্টার কিনা হইতেছে, এমনে এমনেই না। কারণ আছে দেইখাই এইগুলা কিনা হইতেছে। ওয়! তুইনা, আর্মিতে ভর্তি পরীক্ষা দিছিলি? টিকোস নাই ক্যান?

এড হোমিনেম ফ্যালাসি(Ad Hominem fallacy):
আমি যুক্তি দিচ্ছি ঠিকই কিন্তু সাথে গালিবাজি ব্যাক্তিগত আক্রমণও করতেছি। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাক্তিগত বিষোদগার করে, অর্থাৎ গালিবাজি করে, পরে তাকে পরাজিত করা হয়েছে ভাব দেখানোটাই হল এড হোমিনেম। কিন্তু এটার সাথে পার্সোনাল এটাকের একটা মোটা দাগের পার্থক্য আছে।

উদাহরনঃ কোন জামাতি এসে বললো, মূর্তি বানানো তো নিষেধ করা আছে ইসলামে। তাহলে মূর্তি ভাঙার বিরুদ্ধে এত কথা বলা কেন?! সে যেহেতু জামাতি হিসেবে এলাকায় পরিচিত তখন সাধারনভাবে সবাই হইহই করে তাকে বেশ কিছু গালাগালি করে তাড়িয়ে দিবে । কিন্তু এটা তার আলোচ্য বিষয়টাকে মোটেও স্পর্শ করে না। অর্থাৎ তার যুক্তি তখনো ভ্যালিড।

এড হোমিনেম নিয়ে সেই মোটা দাগের প্যাঁচের প্রসঙ্গে আসি। সেটা হল একটা ভ্যালিড যুক্তির সাথে কিছু গালি যোগ করা হলে, সেটা খারাপ হতে পারে কিন্তু তা কখনো যুক্তিটাকে ইনভ্যালিড করে না। যেমন ধরুন, কোনো জামাতি যদি একাত্তরে নিজামীর ভূমিকা নিয়ে কুযুক্তি দেখাতে গেলো, আর আমি তখন তাকে একাত্তরের কিছু পত্রিকা থেকে নিজামীর নষ্টামির প্রমান দেখানোর সাথে সাথে এক ট্রাক গালিও উপহার দিলাম। তখন নিজামীর নষ্টামির বিরুদ্ধে আমার যুক্তি ঠিকই থাকবে। সেটা গালির কারনে বাতিল হয়ে যাবে না। মজার ব্যাপার না?

টু ক্যু ক্যু ফ্যালাসি(Tu Quoque Fallacy):
এটাকে সহজ ভাবে বলা যায় এই ভাবে, “তুইও তো করিস!” আলোচ্য দোষটি প্রতিপক্ষের মধ্যে থাকলেই, কাজটি বৈধ হয়ে যাবে না। প্রতিপক্ষের আঙুল তোলার বিরুদ্ধে বলা যেতে পারে। কিন্তু কাজটির বৈধতা অবৈধতার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নাই।
উধাহরনঃ
আব্বাসঃ তুই প্রতিদিন ঘুষ খাস, তুই একটা বদ লোক।
গাব্বাসঃ ঘুষ তো তুইও খাস, সুযোগ পাইলেই।
আব্বাসঃ (আমতা আমতা করে) হুম, যে খরচা! না খাইয়া উপায় নাই।

ইসলামের আলোকে নারীর অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই অনেকে খ্রিষ্টান, হিন্দু, ইহুদী ধর্মে নারীদের অবস্থান আরও বেশি নাজুক হিসেবে দেখায়। অন্য ধর্মে নারীকে কিভাবে ট্রিট করা হচ্ছে, সেটা কোনোভাবেই ইসলামের অবস্থানকে ভ্যালিড করে না। এটা একটি ধ্রুপদী টু ক্যু ক্যু ফ্যালাসি।

রেড হেড়িং ফ্যালাসি(Red Herring Fallacy):
এটি মুলত লাল রঙের একটি বিশেষ মাছের নাম। তীব্র গন্ধযুক্ত এই মাছ ব্যবহার করা হয় শিকারী কুকুর টাইপের প্রাণীদের নিবিড় ট্রেনিং এর জন্য। সেখানে এই মাছের ডিস্ট্রাকশন ব্যাবহার করা হয়, এটা এভোয়েড করে ‘কাঙ্ক্ষিত’ গন্ধের দিকে প্রানীর মনোযোগ ধরে রাখার কাজে। সেখান থেকেই যুক্তি খন্ডানোর এই ভুল পদ্ধতির নামটির আগমন। সোজা ভাষায়, এটা হচ্ছে আউলা প্যাঁচাল। কেউ কোন বক্তব্য দিলো, আমি সেটাকে আমলে নিলাম। নিয়ে প্রায় সমার্থক আউলা প্যাঁচাল ধরে ত্যেনা পেঁচাইতে থাকলাম।

উদাহরণ: এইতো, মাত্র কদিন আগেকার ঘটনা, ঢাবির এক ছাত্রীর ধর্ষনের কারণে এখনতক শাহাবাগ, পুরা ঢাকা বিক্ষিপ্ত। ছাত্র ছাত্রী সবাই মিলে বিক্ষোভ করে, ধর্ষকের গ্রেফতার আর শাস্তির ব্যাপারটা তরান্বিত করতেছে। এই সময়ে আমি অন্য অন্যায় নিয়ে মায়াকান্না শুরু করে দিলাম। আহারে! জাবি’র ডেপুটি রেজিষ্টারের ভবনে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ নিয়ে কেউ এগিয়ে এলো না! আহারে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চা বিক্রেতার প্রতিবন্ধী ধর্ষিতা মেয়েটার জন্য আমাদের বিবেক দেখবেন জাগবেনা!
যে কোন ধর্ষনের ব্যাপারই নেক্কার জনক! দেশে ধর্ষকদের বিচার হয়না বললেই চলে। সেখানে বিক্ষোভ করে একটার সুরাহা হবার চেষ্টা চলতেছে, তখনই বাকিগুলার কথা বলে, আবেগ দেখিয়ে সস্তা লাইক কুড়াচ্ছি। কিন্তু সেই চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে বা সেই প্রতিবন্ধী ধর্ষিতা মেয়েটাকে নিয়ে সময় মত আমি কোন পোস্টই করিনি।

পাঠক চাইলে আরও নানা ধরনের ফ্যালাসি নিয়ে লেখা চলবে। ভালো থাকুন, চালু থাকুন।

সূত্রঃ অন্তর্জাল, এখান থেকে সেখান থেকে টুকলিফাই।

বাঘমামা: সিডনিতে বসবাস। এটি একটি ছদ্মনাম। অবশ্য সকলে তাঁকে বাঘমামা নামেই চেনেন।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments