কোয়ারেন্টাইনের দিন । শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

 184 views

আসবার সময় প্লেনে কোন ঝামেলা হয়নি, চেক ইনের সময় মাস্কের ওপরে একটা শিল্ড ওরাই দিয়ে দিয়েছিল পরার জন্য। প্লেনে আমাদের দুজনের একটা আলাদা কিউবিক্যাল ছিল, সেটার দরজা বন্ধ করে দেবার পর আমরা সেই শিল্ড খুলে ফেলেছিলাম, ওদের অনুমুতি নিয়েই। ভুল কিছু করতে চাইনা বলে সবকিছু জিজ্ঞেস করেই করেছি। পুরো সময়টা মাস্ক পড়ে ছিলাম, এমনকি ঘুমের সময়ও ।
ব্রিসবেনে নেমে প্রথমেই আমাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হলো ৫ পাতার একটি ফর্ম, তার মধ্যে ৩ পৃষ্ঠাই ছিল কি কি করতে হবে তাঁর বৃত্তান্ত । আর বাকি দু’পৃষ্ঠা আমাদের বৃত্তান্ত এবং কোথায় থাকবো সেই জায়গার নাম। সেই ফর্ম পূরণ করে চলে গেলাম আমরা লাইন ধরে বসে থাকা কয়েকজন অফিসারের সামনে, উনারা আমাদের ফর্ম দেখে বলে দিলেন কি করতে হবে। আমাদের ডায়েটেরি রিকোয়ারমেন্টও জেনে নিলেন ওখানেই।

“খাবার কিন্তু খারাপ ছিল না, কিন্তু বাবুর পছন্দের নয়।”

আমরা ব্রিসবেনের মানুষ, কিন্তু আমাদের ব্রিসবেনে না রেখে, দেড় ঘণ্টা দূরে বাসে করে নিয়ে এলো সানশাইন কোস্টের ‘ওক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে’। আগেই বলে রাখি আমি মনে মনে যেকোনো পরিস্থিতির জন্যেই তৈরি ছিলাম। তাই কোনোকিছুই আমাকে অবাক করেনি। তবুও “সানশাইন কোস্ট “ বা “ রিসোর্ট” শুনলেই মনের মধ্যে সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। মনে হলো আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দে ঘুম ভাঙবে প্রতিদিন, শান্ত সমুদ্রের কোলে সূর্য ডোবা দেখবো কিন্তু এই সব কিছুর সম্ভাবনাকে মিথ্যে প্রমাণিত করে পৌঁছে গেলাম রিসোর্টে। বাস থেকে হুড়মুড় করে নামতে পারলো না কেউ। একজন একজন করে নামিয়ে নিয়ে গেলো আমাদের। এয়ারপোর্ট থেকে বাসে ওঠার সময় সুটকেসগুলো তুলে দিয়েছিলো দুজন আর্মির মানুষ। হোটেলে এসে সেই সুটকেস নামালো পুলিশের মানুষ।
রুম পর্যন্ত এনে সব নামিয়ে দিয়ে নিয়ম কানুন বলে দিয়ে চলে গেলো ওরা। আমার দৃষ্টিতে রুমটা ঠিকই আছে, কিন্তু বাবুর প্রত্যাশা একটু ভিন্ন হওয়াতে ধাক্কা খেলো। মাইক্রোওয়েভ বা কিচেন নেই বলে আবার হতাশা, ভাগ্যিস চা খাবার জন্য কেটল আছে এখানে। রুমের সাইজও ঠিকঠাক কিন্তু বাবুর প্রত্যাশা ছিল আরেকটু বড় হবে, রুমের ভেতরে হাঁটাহাঁটি করবে, এক্সারসাইজ করবে, একটা ব্যালকনি থাকবে (ব্যালকনির স্বপ্ন অবশ্য আমিও দেখেছিলাম), কিন্তু সেসব এই রুমে নেই ভেবে হালকা মন খারাপ করলো বাবু। সৌভাগ্যের বিষয় হলো একটা জানালা আছে। বাবুকে বললাম এই জানালাটাকেই আমাদের ব্যালকনি ভেবে নিতে হবে।
তাই করলাম আমরা, দুটো সোফাকে জানালার নীচ থেকে সরিয়ে দিয়ে খাবার টেবিলটা জানালার পাশে এনে সারাক্ষণ বাইরের দৃশ্য দেখবার সুযোগ করে নিলাম। দরজা দিয়ে বের হলেই করিডোর, সেখানে বসে আছেন পুলিশ । ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিচ্ছেন আমাদের। দরজা খুলে মাথা বের করলেই এসে হাজির, কি চাই জানবার জন্য। তবে অত্যন্ত সুন্দর ব্যবহার এদের সবার এবং কিভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারবে তার জন্য তৎপর সবসময়।


সকালে নাস্তা দেখেই বাবুর মাথা গরম, এসব আমি খাবো না, আমি টাকা দিয়ে থাকছি এখানে কেন এসব খাবো ? খাবার কিন্তু খারাপ ছিল না, কিন্তু বাবুর পছন্দের নয় তাই এই হতাশা। আমরা স্বাধীনতা খুব বেশী ভালোবাসি। নিজের মতো একটা রুটি কলা খেলেও খুশী, কিন্তু অন্যের পছন্দে বিরিয়ানিও ভালো লাগে না। অন্যে সিদ্ধান্ত নেবে আমি কি খাবো এটা মেনে নেয়া কঠিন হয়ে গেলো বাবুর জন্য। পটেটো ফ্রিটারের ওপরে স্ক্রাম্বলড এগ, গ্রিল্ড আসপ্যারাগাস এবং পেস্তো মাশরুম । সাথে চকোলেট মাফিন, হেলদি স্লাইস এবং একটা আপেল। খুব ভালো খাবার কিন্তু নিজের মতো নয়। দুপুরেও ‘শেফস চয়েস’, ফিশ অ্যান্ড চিপস, সাথে সালাদ এবং কেক। দেখেই মেজাজ খারাপ, “এইসব খেলে আমার অ্যাসিডিটি বাড়বে, খাবো না আমি, কি পেয়েছে এরা ! “ বললাম, মাছের ওপরের ভাজা অংশটা ফেলে ভেতরের মাছটা খাও, আর সালাদ, তাহলে খারাপ লাগবে না। খেলোও তাই কিন্তু খুশী না।

বাবু পুলিশদের ডেকে বলেছে, ওর প্রতিদিন না হাঁটলে চলবে না, অসুস্থ হয়ে যাবে। ওরা বলল প্রতিদিন বাইরে বের হবার সুযোগ রয়েছে আমাদের। নিয়েও গেল হাঁটতে আমাদের, তবে জানালা দিয়ে যেই সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে সেই জায়গাটায় নয়, তার থেকে আরেকটু দূরে একটা জায়গায়। ওখানে ৪ জন পুলিশ পাহারা দিয়ে আমাদের মতো আরও দুয়েকজন মানুষকে বাইরে বের হবার সুযোগ করে দিয়েছে। কেউ রোদ পোহাচ্ছে, কেউ হাঁটছে, কেউ দৌড়াচ্ছে। আমরা দুজন হাঁটলাম, হালকা এক্সারসাইজ করলাম। ওখানে পুলিশের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, ব্রিসবেনের সব কোয়ারাইন্টিন হোটেল ভরে গেছে বলেই আমাদের এতদুরে নিয়ে এসেছে। হঠাৎ করে এরাও তৈরি ছিলোনা বলে খাবারের তালিকা সীমিত। রাতের ডিনার থেকেই আমরা আমাদের পছন্দ মতো খাবার খেতে পারবো।
অনলাইনে টুকটাক কিছু প্রয়োজনীয় দব্যাদি অর্ডার করলাম আমরা। সিম কেনা হয়নি এখনো। আমার ছেলে মেয়েরা সোমবার সেটা নিয়ে আসবে। ওদের সাথে দেখা হবে না কিন্তু ওরা রিসেপশনে দিয়ে যাবে।

আমার ধারণা ১৪ দিনের মধ্যে এই গল্পের খুব একটা পরিবর্তন হবে না। জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যের ছবি প্রথমদিন যতগুলো তুলেছি তাও হয়তো ধীরে ধীরে কমে যাবে। সামনের পুকুরে ৪/৫ টা হাস শাপলার পাতা সরিয়ে ক্লান্তিহীন সাঁতার কাটবে। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওদের গায়ের রঙের পার্থক্য খুঁজে বের করবো একদিন, হয়তো নামও দেবো ওদের। মালীদের কাজ দেখবো, ওদের সাথে হয়তো একসময় কথাও হবে আমার। লক্ষ্য করবো কোন গাছের পাতা শুকিয়ে গেছে, সেটা ওরা পরিষ্কার করলো কিনা, ঘাসটা কোথাও একটু ছোট কিংবা বড় রয়ে গেলো কিনা।
এখানে সমুদ্রের গর্জন নেই ঠিকই কিন্তু পাখীদের কিচিরমিচির তো রয়েছে। আমি এখানেই ১৪ দিনের জন্য নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারবো। দৈনিক রুটিনও তৈরি হয়ে যাবে একটা। কাউন্সেলিং তো আছেই, বাইরে হাঁটতে যাওয়া, রাতে টিভি দেখা, বই পড়া, বাবুর সঙ্গে কোন বিষয় নিয়ে তর্ক করা কিংবা ভালোবাসার কথা বলা। ১ দিন তো শেষ, আর ১৩ দিন এভাবেই চলে যাবে।

যে পাশে আমাদের জানালা নেই সেই পাশেই রয়েছে সমুদ্র, কেউ বলেনি আমাকে। আমার ভাবতে ভালো লাগছে, এ সত্য খুঁজে দেখবার উপায় নেই, আমার এতে অন্য সমস্যাও নেই। আমি বলবো, এই একটা জানালা, একটু হাঁটতে যাবার সুবিধা কোয়ারাইন্টিনের সময় অনেক বেশী পাওয়া। আমরা ভালো আছি। আলহামদুলিল্লাহ্‌।

শিল্পী রহমান: 
গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। 
প্রকাশিত গ্রন্থসমুহ: ধর্ষণ ধর্ষক ও প্রতিকার; উৎকণ্ঠাহীন নতুন জীবন; মনের ওজন; সম্ভাবনার প্রতিচ্ছায়ায়; যুদ্ধ শেষে যুদ্ধের গল্প; পথের অপেক্ষা; পাহাড় হবো ইত্যাদি।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments