ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিয়েডরিখ: অসীমের সীমানা
-আসমা সুলতানা, কাজী মাহবুব হাসান

  •  
  •  
  •  
  •  

 117 views

আত্ম-প্রতিকৃতি, ১৮০০

অপ্রত্যাশিতভাবেই  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটি যা শিল্পকলা আমাদের জন্যে করতে পারে, সেটি হচ্ছে আমাদের এটি শেখাতে পারে কিভাবে দুঃখ সহ্য করতে হয়। এটি সেটি করতে পারে সেই দৃশ্যগুলো আমাদের মনে জাগিয়ে ‍তুলে, যা অন্ধকার, বিষন্ন, কষ্টকর, আর সংশয় আর বিচ্ছিন্নতায় আমরা হয়তো যে যন্ত্রণার অভিজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি সেটিকে স্বাভাবিকীকরণ ও মর্যাদা দান করে। মাহাত্ম্য আর কারিগরী দক্ষতায় তারা উন্মোচন করে, দুঃখ মানবিক এই পরিস্থিতির আবশ্যিক একটি অংশ।
মহিমান্বিত দুঃখের একজন চিত্রকর ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিয়েডরিখ ১৭৭৪ সালে বাল্টিক সাগরের তীরে উত্তর-জার্মানীর একটি প্রাচীন বাণিজ্যিক শহর, গ্রাইফসভাল্ডে জন্মগ্রহন করেছিলেন। খুবই সুন্দর একটি শহর, উত্তর জার্মানীর কঠোরতার মানদণ্ডে যা হতে পারে। এই জায়গাটি আগে পরিচিত ছিল সুইডিশ পোমেরানিয়া নামে।

ওয়ান্ডারার অ্যাবাভ দ্য সি অব ফগ , ১৮১৮

শৈশব থেকেই তিনি ভালাবাসতেন দেখতে গ্রীষ্মের দিনগুলোয় খুব সকালে গাছের প্রাচীরের উপরে কুয়াশার অস্পষ্টতায় গির্জা, টাওয়ার আর পাহাড়ের চূড়াগুলো যেভাবে আবির্ভূত হতো। তাঁর বাবা খুব স্বল্পবাক, বিষন্ন মেজাজের মাঝারী মানের দক্ষ একজন কারিগর ছিলেন। ফ্রিয়েডরিখের মা, যে মানুষটি শিল্পীর খুব কাছের ছিলেন, তাঁর শৈশবেই মারা যান। তের বছর বয়সে চোখের সামনে ছোট ভাই ইয়োহান খ্রিস্টোফারকে, বরফ জমা একটি হ্রদের পানিতে ফাটল দিয়ে পড়ে ডুবে মারা যেতে দেখেছিলেন। বিশ বছর পূর্ণ হবার আগেই তিনি তাঁর মা এবং দুই বোন ও এক ভাইকে হারিয়েছিলেন। সেই সময় থেকে বিষন্ন একটি চরিত্র হিসাবে তিনি পরিচিত ছিলেন, চরিত্রের গাম্ভীর্যতা তাঁর ক্যানভাসেও জায়গা নিয়েছিল। মিতবাক আবেগপ্রবণ আর লাজুক হয়ে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। শিল্পী হিসাবে খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর নিজের বৈশিষ্ট্যসূচক শৈলীটি ক্যানভাসে আবির্ভূত হতে বহু বছরের দারিদ্র, দুর্ভোগ আর সংগ্রামের দরকার পড়েছিল।

মিডোস নেয়ার গ্রাইফসভাল্ড, ১৮২২

গ্রাইফসভাল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭৯০ সালে তিনি শিল্পকলায় প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন, তারপর সুপরিচিত কোপেনহেগেন অ্যাকাডেমিতে বিখ্যাত ডাচ প্রতিকৃতি শিল্পী জেনস জুয়েল এর অধীনে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৭৯৮ সালে তিনি ড্রেসডেন আসেন, যেখানে তিনি বহুবার এসেছিলেন ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা খুঁজতে।
সেই যুগের রুচিতে সূর্যকরোজ্জ্বল, ধ্রুপদী ভূদৃশ্যচিত্রে চাহিদা ছিল। গ্রীষ্মের ইটালী যেমন আদর্শ ছিল। কিন্তু ফ্রিয়েডরিখ প্রকৃতির সেই দিকগুলোর দিকে আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন – সেই মুহূর্ত অবধি – যা মানুষ ভেবে এসেছে তাদের সংবেদনশীলতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আর আদৌ কৌতূহলোদ্দীপক কোনো কিছু নয়: শীতল, আর্দ্র সকাল, সাগর তীরে হিমাবাহ-শীতল রাত, সূর্য ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তের ম্লান প্রহর, শেষ বসন্তে প্লাবিত মাঠ।

ক্রস ইন দ্য মাউন্টেইন, ১৮০৮

শিল্পী হিসাবে পূর্ণতাপ্রাপ্ত  ফ্রিয়েডরিখের প্রথম কাজ – সত্যিকারভাবেই তাঁর প্রথম বড় কাজ যেখানে তিনি জীবনের প্রতি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে শুরু করেছিলেন – সমসাময়িক দর্শকদের জন্যে একটি বড় ধাক্কা ছিল। প্রথাগত দেবদূত, ক্রন্দনরত সাধু আর সৈন্যদের বদলে তিনি যীশুর ক্রশবিদ্ধ হবার দৃশ্যটি এঁকেছিলেন টিউটোনিক ফার গাছের মধ্যে রুক্ষ একটি পাথুরে পাহাড়ের উপর, যখন পেছনের সূর্যের আলো মেঘের উপর আঘাত করছে। পাহাড়ের উপর যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হবার দৃশ্য ছিল এটি, যেখানে তিনটি আলোর রশ্মি গম্ভীর মেজাজী আকাশের দিকে বিস্তৃত, কাজটি প্রস্তাব করছে, প্রকৃতি, যা যীশুর চেয়ে ফ্রেমের মধ্যে আসলে জায়গা দখল করে আছে সেটি নিজেই স্বর্গীয়। ১৮০৮ সালে তিনি এই বিতর্কিত ‘ক্রস ইন দ্য মাউন্টেইন’ এঁকেছিলেন, অলটার পিস (খ্রিস্টীয় চার্চে অলটার বা মূলবেদী পিছনের দেয়ালটি অলংকরণ করে যে শিল্পকর্ম বা ভাস্কর্য) হিসাবে। গবেষকরা মনে করেন কাজটি কমিশন ভিত্তিক । বাস্তবিকভাবেই তিনি কাজটি এঁকেছিলেন সুইডেনের রাজা চতুর্থ গুস্তাভ অ্যাডোলফের প্রতি একটি নিবেদন হিসাবে ( যে পরিকল্পনা ভেস্তে যায় যখন সম্রাট ১৮০৮ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন)। অবশেষে টেটশেন দূর্গে (বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্র) এর জায়গা হয়, টেটশেন অল্টার নামে এটি সুপরিচিত।

দ্য সি অব আইস, ১৮২৪

তিনি অনুধাবন করেছিলেন, প্রকৃতি বহু গম্ভীর মেজাজ বা মুড প্রকাশ করতে পারে, যা এর আগে খ্রিস্টীয় কাহিনীগুলোর আক্ষরিকভাবে চিত্রকর্মে উপাস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। সময়ের সাথে, তিনি সরাসরি যীশুর প্রতি তথ্যনির্দেশটি বাতিল করে দিয়েছিলেন এই কাজে, কিন্তু ট্রাজেডির সেই পরিবেশ এবং তাঁর জীবন আর মৃত্যুর সাথে সংযুক্ত দুঃখটি রেখে দিয়েছিলেন।
তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, দীর্ঘ গাছ, পাহাড়, কুয়াশা, খাঁজকাটা শৈলশ্রেণী, চন্দ্রোদয়, রাতে পানির স্থিরতা, উন্মুক্ত গুল্মাবৃত সমতল পতিত জমি, কষ্ট, ভালোবাসা, যন্ত্রণা আর পরিত্রাণ সংক্রান্ত বার্তাগুলোর অনুরুপ বহু বার্তা ধারণ করতে পারে, যা খ্রিস্টীয় ধর্মতাত্ত্বিকরা একসময় শুধু গসপেলেই খুঁজে পেতেন। তিনি এখনো সেই মানুষগুলোর জন্যে অনন্যভাবে উপযোগী একজন শিল্পী হিসাবে রয়ে গেছেন, যারা আর বিশ্বাস করেন না ঠিকই, কিন্তু বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট গভীর আবেগগুলোর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন।

উইম্যান অ্যট অ্য উইনডো, ১৮২২

১৮১০ সালে তিনি বার্লিন অ্যাকাডেমীর মেম্বার হন, এর কিছুদিন পর ড্রেসডেন অ্যাকাডেমিতেও তাঁর স্থান নির্দিষ্ট হয়। স্পষ্টতই সেই মুহূর্তে তিনি জার্মান শিল্পকলার জগতে নিজের জায়গাটি নিরাপদ করেছিলেন। তবে তাঁর সুখ্যাতি ক্রমশ কমতে শুরু করে যখন রিয়ালিজম রোমান্টসিজমকে অতিক্রমণ করেছিল।

১৮১৮ সালে, যখন তিনি ৪৪, ২৫ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ান ক্যারোলাইন বোমারকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের তিনটি সন্তান হয়েছিল, দুই কন্যা, এমা আর অ্যাগনেস অ্যাডেলহাইড এবং একটি ছেলে গুস্তাভ অ্যাডোলফ। সার্বিকভাবে আপাতদৃষ্টিতে, এটি ভালো একটি সম্পর্ক ছিল। ক্যারোলাইন তাঁর বহু চিত্রকর্মে আবির্ভূত হয়েছেন, কিন্তু সব সময়ই একাকী। একাকী নারী পুরুষের চিত্র আঁকার একটি প্রবণতা ছিল তাঁর; যেন তিনি বিশ্বাস করতেন আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই কেবলই আমাদের সচেতনতার উপরিপৃষ্ঠে আবির্ভূত হয়, যখন আমরা সভ্যতার কোলাহল থেকে দূরে নির্জনে একাকী এসে দাড়াই। তাঁর নিজেরও খুব অল্প কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল এবং একটি পর্যায়ে প্রায় কখনোই তিনি তাঁর খুব সাধারণভাবে সজ্জিত স্টুডিওর বাইরে আসেননি।

উইম্যান বিফোর দ্য রাইজিং সান, ১৮১৮-২০

নিঃসঙ্গতাকে এমন কিছু, যাকে এড়াতে হবে ( কাজ, মদ্যপান, যৌন কল্পনার দ্বারা) এমন কিছু ভাবার বদলে, তিনি প্রস্তাবনা করেছিলেন এটি আমাদের গভীরতম সম্ভাবনাগুলোর সংস্পর্শে আসার মত একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তিনি আরো বিশ্বাস করতেন প্রকৃতির রূঢ়তা, মানব জীবনের দূঃখকে দেখার একটি সান্ত্বনাদায়ক আর ক্ষতিপূরণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।

মানুষ নিষ্ঠুর হতে পারে, নিয়তি অনুকম্পাহীন হতে পারে, কিন্তু হিমশৈল বা বরফ খণ্ডের অনবক্রম্য সংঘর্ষ নিয়ে গভীর ভাবনা আমাদেরকে নিজেদের ভিতর থেকে অবমুক্ত করতে পারে, আমাদের নিপীড়ন করছে এমন কোনো বিশেষ পরশ্রীকাতরতা, ক্ষত অথবা হতাশার অতিক্রমন করে, এটি আমাদের ব্যক্তিগত যন্ত্রণাভোগের বোধটিকে হ্রাস করতে পারে।
‘মুনরাইজ ওভার দ্য সি’-এর মত কাজগুলো এই মহাবিশ্বে আমাদের গুরুত্বহীনতার প্রতি সচেতন করে তোলে, অনন্তকালের উপায়গুলোর তুলনায় সাধারণ মানুষের বিপর্যয় কতটা তুচ্ছ এমন একটি ধারনায় উজ্জীবিত করে। জীবনের  চাপিয়ে দেয়া অবোধ্য ট্রাজেডিগুলোর সামনে নতি স্বীকার করতে যা আমাদের খানিকটা বেশী প্রস্তুত করে তোলে। এখান থেকে সাধারণ বিরক্ত আর চিন্তাগুলো প্রশমিত হয়। আমাদের ভ্রান্ত গুরুত্বপূর্ণতার উপর জোর দাবী করে, আমাদের অপমানগুলোর সংশোধন করার প্রচেষ্টার পরিবর্তে আমরা – কোনো মহান শিল্পকর্মের সয়াহতায় – অপরিহার্য শূন্যতাকে বুঝতে আর মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতে পারি।

মুনরাইজ ওভার দ্য সি, ১৮২২

এখানে (রকি রিফ অন দ্য সি শোর) ফ্রিয়েডরিখ লক্ষণীয় মাত্রার অমসৃণ খাজকাটা পাথরের স্তুপের চিত্র, সমুদ্রতীরের খানিকটা অংশ, উজ্জ্বল দিগন্ত, দূরবর্তী মেঘ, ম্লান আকাশ ব্যবহার করেছিলেন আমাদের মধ্যে পরিত্রাণমূলক একটি দুঃখবোধের মেজাজ সৃষ্টি করতে। আমরা হয়তো কল্পনা করতে পারি, ভোরের হবার আগেই আমরা এখানে হেঁটে যাচ্ছি, নিদ্রাহীন রাত্রির শেষে একটি বিষণ্ন অন্তরীপে, মানব সঙ্গ বিবর্জিত, প্রকৃতির মৌলিক কিছু শক্তির সান্নিধ্যে। অপেক্ষাকৃত পাথুরে ছোট দ্বীপগুলো, যা এক সময় নাটকীয় আর দূরের ঐ বড় পাথুরে দ্বীপের মত একই রকম ছিল, যা একসময় প্রবল বেগে বের হয়ে এসেছিল সমূদ্রের ঢেউয়ের উপর। দীর্ঘ সময়ের ধীর পরিক্রমায় একদিন এটিও ক্ষয়ে যাবে। আকাশের প্রথম অংশটিতে কোনো ফর্ম নেই, শূন্য, বিশুদ্ধ রুপালী শূন্যতা, কিন্তু ঠিক এর উপরেই ভেসে আছে মেঘগুলো যারা তাদের নীচের তলে আলোকে ধরে আছে এবং তারপর এটি হাতবদল করে তাদের অর্থহীন ক্ষণস্থায়ী পথে চলে যেতে সহায়তা করতে, আমাদের সব চিন্তার প্রতি যা নির্বিকার।
আমাদের সম্পর্কগুলোর প্রতি অথবা আমাদের প্রাত্যহিক কোনো জীবনের চাপ আর সংগ্রামের প্রতি চিত্রকর্মটি সরাসরি কোনো তথ্যনির্দেশ করেনা। এটির কাজ হচ্ছে আমাদের মনের সেই অবস্থার সাথে একটি যোগসূত্র করে দেয়া, যেখানে কাল ও সময়ের বিশালতা, এবং এই আরো বড় পরিকল্পনার কাঠামোয় আমাদের পরিস্থিতির গুরুত্বহীনতার ব্যাপারে আমরা প্রবলভাবে সচেতন হই। বিষণ্নতার চেয়ে কাজটি বরং গম্ভীর, প্রশান্ত, কিন্তু হতাশাপূর্ণ নয়। এবং মনের সেই পরিস্থিতিতে – আত্মার সেই অবস্থানে, আরো রোমান্টিকভাবে বললে – যেমনটি হয় তাঁর প্রায় প্রতিটি কাজের সাথে – আমরা অনাগত দিনগুলোর তীব্র, দুর্দম, বিশেষ দুঃখগুলো মোকাবেলা করার জন্যে আরো বেশী প্রস্তুত হই।

রকি রিফ অন দ্য সি শোর, ১৮২৪

আইকনিক এবং তাঁর নামের সমার্থক ওয়ান্ডারার অ্যাবাভ দ্য সি অব ফগ (১৮১৮), চিত্রকর্মে আমরা গাঢ় সবুজ অভারকোট, পায়ে বুটসহ একজন ব্যক্তিকে থাকতে দেখি, মেঘাচ্ছন্ন কুয়াশাময় একটি ভূদৃশ্যের দিকে যিনি তাকিয়ে আছেন। কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তের মধ্যে তিনি একটি ‘রুকেনফিগুর’ (Rückenfigur Rückenfigur) এঁকেছিলেন – অর্থাৎ পেছন থেকে দেখা একটি শরীর। যিনি নিজেকে স্থির করে ধরে আছে একটি ছড়ির সাহায্যে। অন্ধকার পাথুরে চুড়ার উপর দাড়িয়ে থাকা চরিত্রটি চিত্রকর্মের ঠিক কেন্দ্রে দাড়িয়ে আছে, শিল্পকলার ইতিহাসবিদ জোসেফ কোয়েরনার মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই চিত্রকর্মটির কেন্দ্র অবস্থান করছে এই মানুষটির হৃৎপিন্ডের উপর, পুরো মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আছে এই হৃদয়’। বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে রোমান্টিক এই চিত্রকর্মটি এনলাইটেন্টমেন্ট যুগের মূল্যবোধগুলোর (যুক্তিবাদ, শৃঙ্খলার) বিরুদ্ধে নন্দনতাত্ত্বিকদের শুরু করা সেই রোমান্টিসিজম আন্দোলনের প্রতিভূ, যে মূলবোধগুলো ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের সূচনা করেছিল। ইউরোপ জুড়েই শিল্পীরা আবেগ, কল্পনা আর  মহিমান্বিত বিষয়গুলোর প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরিয়েছিলেন। ফ্রিয়েডরিখের চিত্রকর্মে বন্য, বশ না মানা প্রকৃতি বিষয় হিসাবে জায়গা নিয়েছিল।
বিশেষ করে এই পর্বটি ব্যক্তি ও তাঁর ব্যক্তিক তীব্র আবেগকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল। আর তিনি এই সব গুণই একটি মানুষের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন, যিনি সুবিশাল এবং অজ্ঞেয় একটি এলাকার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় এঁকেছিলেন, ঠিক ক্যানভাসে কেন্দ্রে।  এই কম্পোজিশনটি নির্মাণে, দক্ষিণপূর্ব ড্রেসডেনে এলবে স্যান্ডস্টোন পর্বতমালায় বেশ কয়েকবার গিয়েছিলেন, আলাদা করে প্রতিটি পাথর আর প্রাকৃতিক কাঠামো তিনি স্কেচ করেছিলেন, তারপর স্টুডিওতে তিনি এই সবগুলো একসাথে জোড়া লাগিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন একটি নতুন কল্পিত ভূদৃশ্যচিত্র। জুলিয়ান হালাডিন তাঁর ২০১৬ সালের প্রবন্ধ “Friedrich’s ‘Wanderer’: Paradox of the Modern Subject, এ লিখেছিলেন, ‘এখানে বিষয়বস্তুই দর্শকের প্রতিভূ হিসাবে দ্বায়িত্ব পালন করছে, আমরা এই মানব উপস্থিতির দিকে তাকাই, এই দৃশ্যটির সাধারণ মাত্রাটি নির্ধারণ করার লক্ষ্যে, আরো বিশেষ করে এই চিত্রিত জগতের ব্যপনস্থল স্থিতিমাপে আমাদের শরীরকে সম্পর্কিত করে’।

শিল্পীর উত্তরাধিকার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল যখন ১৯৩০ এর দশকে হিটলার এবং নাৎসীরা ফ্রিয়েডরিখকে তাদের আদর্শিক একজন পূর্বসূরি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল। আর এই সম্পর্ক তাঁকে পরবর্তী বহু গবেষকের বিস্মৃতির আড়ালে ঠেলে দিয়েছিল।  অবশেষে সত্তরের দশকে রবার্ট রোসেনব্লুম ফ্রিডরিখের কাজগুলো জড়ো করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি শিল্পী রথকোর সাথে ফ্রিয়েডরিখকে যুক্ত করেছিলেন, এই দুই শিল্পীর মহাবিশ্বের সাথে একাত্ম হবার তাড়না অনুসন্ধানের প্রচেষ্টার একটি সূত্রে। তাঁর বইটি মূলত Modern Painting and the Northern Romantic Tradition, Friedrich to Rothko তাকে আলোচনায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে ( অবশ্যই নানা সমালোচনা সহ)। এখনও ইতিহাসবিদরা জানেন না এই Rückenfigur Rückenfigur এর মডেল কে ছিলেন, তবে মনে করা হয় বনবিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্নেল ভন ব্রিনকেন হচ্ছেন এই মডেল, তাঁর পরণের  কাপড় রাজা দ্বিতীয় ফ্রিয়েডরিখ ভিলহেইম স্বেচ্ছাসেবক রেন্জার সেনাবাহিনীর একজন সদস্য হিসাবে তাকে চিহ্নিত করেছে, যারা নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে প্রুশিয়ার পক্ষে লড়েছিলেন। তিনি সম্ভবত ১৮১৩/১৪ সালে মারা যান, আর একারণে মনে করা হয় চিত্রকর্মটি দেশপ্রেমের একটি এপিটাফ, যা সূক্ষ্মভাবে ফরাসীদের পরাজয়ে উচ্ছাস আর আরো বড় একটি কাহিনী, প্রুশিয়ার একীভূত হওয়া আর জার্মান জাতীয়তাবাদের কথা বলছে।
অনেক শিল্পীর মত, তিনি খুব বেশী সফলতা পাননি। অল্প কিছু অনুরক্ত গম্ভীর মানুষ তাঁর ভক্ত ছিলেন ও তারা কিছু ছবি কিনেছিলেন ( সেই সময়ের দুইজন বিখ্যাত চিত্রকর কারস্টিং এবং ডাল, তাঁর বন্ধু ছিলেন)। ১৮৪০ সালে তিনি মারা যান, প্রায় বিস্মরিত হয়েছিলেন বলা যায়। কিন্তু তিনি জানতেন না যে, দূর ভবিষ্যতে, তাঁর কাজগুলো গভীরভাবে মানুষ ভালোবাসবে,  তাঁর চিত্রকর্ম আমাদের আনন্দ দেয় সেকারণে নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে এটি জানে সবার মধ্যে থাকা সবেচেয়ে  দুঃখের অংশটিকে কিভাবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা আর প্রকাশ করা যায়।

আসমা সুলতানা
ভিজ্যুয়াল আর্টিষ্ট, কবি, অনুবাদক, সমালোচক।
চিত্রকলা, শিল্পকলা এবং শিল্পকলার ইতিহাসে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ঢাকা, লন্ডন ও টরোন্টোতে।

কাজী মাহবুব হাসান
অনুবাদক, লেখক। আগ্রহের ক্ষেত্র বিজ্ঞান ও শিল্পকলার ইতিহাস।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments