ক্রান্তিকাল শেষে আসন্ন ভবিতব্য । এইচ. এ ববি

  •  
  •  
  •  
  •  

 398 views

আসছে ইংরেজি নতুন বছরের গোড়া থেকে অস্ট্রেলিয়ার সব নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের করোনা ভ্যাক্সিন দেবার সিদ্ধান্ত পাকা হলো সরকারি ভাবে। প্রাথমিকভাবে Oxford-AstraZeneca ও Pfizer Bio-teck vaccine ই আপাতত চূড়ান্ত। কোভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ২০২০ সালের একটি বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এর নিদারুণ প্রভাব ফেলেছে।বাংলাদেশও এই ভাইরাসের মরণ ছোবলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে বিভিন্ন পন্থায় শত চেষ্টা করেও জনগনের মধ্যে এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাই সর্বশেষ প্রতিকার একমাত্র প্রতিষেধক বা ভ্যাক্সিন প্রয়োগই সর্ব সম্মতিক্রমে গ্রহনযোগ্য সমাধান হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

জাতীয় ইস্যুতে সরকারি ভাবে অস্ট্রেলিয়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাদেরকে প্রথমে ভ্যাক্সিন দেয়া হবে এবং কারা এখনো পর্যন্ত খানিক সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে রয়েছেন,এবং কেন? আজকের এ লেখার মুল প্রসঙ্গ তা-ই। তবে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালি হিসেবে দুই দেশের তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি, বাস্তবিক পদক্ষেপ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও প্রসঙ্গক্রমে উঠে এসেছে স্বাভাবিক ধারায়।

অস্ট্রেলিয়া তাঁর প্রায় আড়াই’শ বছরের ইউরোপীয় আধুনিক সভ্যতা কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি পেলেও এটি মুলত ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসিত একটি দেশ। যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বহুজাতিক মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে একটি অখন্ড জাতি। যা একদিকে Commonwealth এবং Multicultural অবকাঠামোর উপর দাঁড়ানো। কিন্তু সন্মান ও মূল্যায়নের দৃষ্টিতে এই ভুখন্ডের আদিবাসী Aboriginal and Torres ilander দেরকে সর্বাগ্রে ও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাখা হয়েছে বিবেচনার শীর্ষে। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরের গাঢ় নীল, ছয়টি স্টেটস’এর প্রতীক ছয় তারা এবং সন্মান সুচক গ্রেট ব্রিটেনের জ্যাক ইউনিয়ন সম্মিলিত অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকার পাশাপাশি Aboriginal flag ও সরকারি পর্যায়ে উত্তোলন, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হয় সমান তালে।

করোনার ভ্যাক্সিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সর্ব প্রথম পাবে এদেশের আদিবাসী Aboriginal and Torres’s ilander সম্প্রদায়ের লোক।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে হঠাৎ,
ধান ভানতে, এই শীবের গীত গাওয়া কেন?
অস্ট্রেলিয়ার এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটুকু উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করা খুবই প্রাসঙ্গিক ছিল এ জন্য যে, আমার জন্মভূমি বাংলাদেশেরও একটা প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ থেকে মাত্র সাত’শ বছর আগেকার উপমহাদেশীয় এই বঙ্গভূমির ইতিহাসের পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট ছিল সম্পুর্ণ ভিন্ন।

অস্ট্রেলিয়ান সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোভিড ১৯ বা করোনার ভ্যাক্সিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সর্ব প্রথম পাবে এদেশের আদিবাসী Aboriginal and Torres’s ilander সম্প্রদায়ের লোক, স্বাস্থ কর্মী এবং পরের সারিতে রয়েছে অতি ঝুঁকিপূর্ণ বা বয়োবৃদ্ধ ও যারা ক্রনিক ডিজিজে আক্রান্ত এবং নিয়মিত অষুধ সেবনকারী অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইমিউনিটির লোক।
বারো বছরের নিচে শিশু, গর্ভবতী মা, ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী এবং উচ্চ মাত্রার এলার্জিক যারা, তারা আপাতত বাদ। এর কারণ হলো, এদের উপরে এখন পর্যন্ত কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়নি। তাই ভ্যাক্সিনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার কোন ফলাফলও নেই হাতে। তাই আপাতত আগামী ছয়মাস এদের ভ্যাক্সিন প্রোগ্রামের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ভাবছি, দু’দিন আগে পরে বাংলাদেশও ভ্যাক্সিনের আওতায় আসবে। সেখানে কি আদিবাসীদের এমন সন্মান, এতো অগ্রাধিকার দেয়া হবে? অবশ্যই না। বাংলাদেশে প্রচলিত প্রথায় আদিবাসীদেরকে বরং “উপজাতি” সম্মোধন করা হয়। অর্থাৎ যাদের পুর্ব পুরুষ ইরাক, দামেস্ক, ইয়েমেন, আর্মেনিয়া, পর্তুগিজ বা আফগানিস্তানের মতো ভিন দেশ থেকে আসেনি। তারাই নাকি জাতের উপরে উপজাতি!
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য নৃ-গোষ্ঠী ও সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকরাই মুলত এখানকার আদিবাসী। কিন্তু কালক্রমে তাদের সেই পরিচয় আজ আর সসন্মানে উচ্চারিত হয়না। অথবা বলা যায়, এ পরিচয় প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আজীবন জেনে এসেছি, গাছের শেকড়ের যত্ন না নিলে নাকি ভালো ফল ফুল আশা করা যায়না। আমরা হলাম জীবন বাস্তবতার উল্টো স্রোতে হাল বাওয়া এক জাতি। সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে বা ভুলের সাথে মিতালি করে তাল, লয়, ছন্দ, মাত্রাহীন গজলে বেসুরো গলা মেলাতে অভ্যস্ত এক গতিহীন বিভ্রান্ত গোষ্ঠী। অন্যকে সন্মান নয়, অসন্মান করাতেই যেন আমাদের আনন্দ! স্বজাতির কাউকে উপরে উঠতে সহযোগিতা নয়, বরং এমন দৃশ্য দেখাও আমাদের কাছে অসহ্য যন্ত্রণার!

দু’শো বছরের উপনিবেশিক শাসন শেষে দীর্ঘকাল অপশাসন, নির্যাতনের যাতাকল থেকে অবশেষে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা পেয়েও আমরা সেই অন্ধকারেই বিষ্ঠা ঘেটে মরছি। এখনো আমাদের জাতির পিতার অস্তিত্ব, সার্বজনীন স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিয়ে সংশয়। হাজার রকমের বাহানা টেনে ইতিহাস বিকৃতি কারণে আমরা নানান অজুহাত দাঁড় করিয়ে জাতির অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে চলেছি।
জানিনা আমাদের মাঝে, সাম্যের ডাকে শিকল ভেঙে.. কবে আরেকজন “নজরুল” আসবেন? নিঁখাদ দেশপ্রেমের আমুল সংকল্পে উদ্ধুধ্য কবে আরেকজন সুভাষ বসুর জন্ম হবে? আবার কবে নব উত্থান ঘটবে, প্রেমময় আরেকজন রবীন্দ্রনাথ কিংবা স্বাধীনতার অমর কাব্যগাঁথার আহবানের মতো একজন বলিষ্ঠ কন্ঠের “বঙ্গবন্ধু”!

আমাদের পুর্বপুরুষরা তো তাদের বুকের রক্ত দিয়ে আমাদেরকে “স্বাধীনতা” এনে দিয়েই গেছেন। আমরা সেই স্বাধীনতার মুল্যবোধটুকু কি শুধু লালন করতে পারবো না? একেবারে তৈরি জমিতে ফসল ফলানো কি খুবই কঠিন কাজ?
আমরা কি তবে অনন্তকাল এভাবে সামনে দু’পা বাড়িয়ে পাঁচ পা পিছনেই যেতে থাকবো? আমরা কি পুরোনোকে ভালোবেসে নতুনকে সমাদরে বরণ করে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়তে অক্ষম নাকি অনিচ্ছুক? নাকি অদৃশ্য শক্তিধারী অন্য কারো কু প্রভাবে আমরা সত্যিই দিকভ্রান্ত?
সময় বয়ে যায়.. সত্যকে জেনে, বাস্তবতা মেনে সামনে এগিয়ে যাবার। যায় সময়.. ফিরে না।

এইচ. এ ববি
সংস্কৃতিজন, লেখক
আ্যমবাসেডার, ইউনাইটেড ন্যাশনস ইয়ুথ
ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments