ক্ষমা চাইছি মুনিয়া-নি:শর্তে । রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

 229 views

না। মুনিয়াকে চিনি না। চিনতামও না। এমন কি ঐ নামের কোন মেয়েকে কোনদিন চিনিনি। কিন্তু একজন মুনিয়াকে চিনলাম বিগত ২৮ এপ্রিলের কয়েকটি পত্রিকায়। এই চেনা-এই পরিচয় হৃদয় বিদারক।
লেখাটির শিরোনামে মুনিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি-নি:শর্ত ক্ষমা। এই মুনিয়া কিন্তু একা নন-লাখো লাখো মুনিয়াকে খুঁজলে পাওয়া যাবে যাঁদের জীবনের এমন মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে। ক্ষমা চাইছি তাঁদের কাছেও।

প্রকাশিত প্রতিবেদন গুলি থেকে জানা গেল রাজধানী গুলশানে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে ইন্টার মিডিয়েট পরীক্ষার্থী এক তরুণীর মৃত্যু ঘটেছে। সোমবার গভীর রাতে পুলিশ গুলশান ২নং এভিনিউয়ের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লটের বি/৩ নং ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামে এই তরুণীর (২২) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, গুলশান ২নং এভিনিউটির ১২০ নম্বর সড়কের প্লটের বি/৩ ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন মুনিয়া। চলতি বছরের মার্চ মাসে এক লাখ টাকা মাসিক ভাড়ায় তিনি ঐ ফ্ল্যাটে ওঠেন। মুনিয়া মীরপুরের ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের উচ্চ মাধ্যমিক ফাইন্যাল পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাবা মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা সদরের দক্ষিণপাড়া উজিয়াদিঘী এলাকায়।
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, মেয়েটি কেন আত্মহত্যা করেছে এর পেছনে কারও ইন্ধন রয়েছে কি না, ওই বাসায় তার যাতায়াত ছিল তা জানার চেষ্টা চলছে। ওই বাসা থেকে পুলিশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করেছে।
পুলিশের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান বাদী হয়ে গুলশান থানায় একট মামলা দায়ের করেছেন।

বসুন্ধরা গ্রুপের এমডির বিরুদ্ধে মামলা দেশ বিভাগে নিষেধাজ্ঞা” শিরোনামে প্রকাশিত খবরটিতে আরও বলা হয়:
স্বজন ও পুলিশ জানিয়েছে, মুনিয়া দুই মাস ধরে ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন। ফ্ল্যাটটির কড়া ও সার্ভিস চার্জ বহন করতেন বসুন্ধরা গ্রুপের এম.ডি সায়েম সোহান আনভীর বহন করতেন। সেখানে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল এমন তথ্যও মিলেছে।
পুলিশের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী সাংবাদিকদেরকে বলেন, লাশ উদ্ধারের পর আলামত হিসেবে দুটি মোবাইল ফোন দুটি ফটো ফ্রেম, সিসিটিভি ফুটেজ ও ছয়টি ডায়েরী জব্দ করা হয়েছে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে মুনিয়াকে বিয়ের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। তাকে বিয়ে করে বিদেশে বসবাসের স্বপ্নও দেখানো হয়েছিল।
ঢাকা মহানগর বিভাগের প্রসিকিউশন উপকমিশনার জাফর হোসেন বলেন, আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আসামী সায়েম সোবহান আনভীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন।

মুনিয়া

পুলিশের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, তানভীরের দুটি পাসপোর্ট রয়েছে। ওই দুই পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশত্যাগের কোন তথ্য ইমিগ্রেশনের কাছে নেই। অবৈধভাবে দেশ ছাড়লে ইমিগ্রেশনের কাছে তা থাকারও কথা নয়।
অবশ্য তরুণীর লাশ উদ্ধারের পরপরই গুঞ্জন ছড়ায় আনভীর সোমবার সন্ধ্যাতেই একটি কার্গো বিমানে করে দুবাই চলে গেছেন। পুলিশের গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নামজুল হাসান ফিরোজ বলেন, জব্দ ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার পর আসামীর সঙ্গে মুনিয়ার সম্পর্কে আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে। মুনিয়ার বোন ও মামলার বাদী নূসরাত জাহান সাংবাদিকদের বলেন, তার বোনের আত্মহত্যা করার কোন কারণ নেই। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ডায়েরীতে মুনিয়ার লিখিত অনেক তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানান।

গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে নুসরাত জাহান বলেন, দুই বছর আগে মামলার আসামী সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে মুনিয়ার পরিচয় হয়। এরপর তারা বিভিন্ন রেষ্টুরেন্টে দেখা করতেন এবং মোবাইলে কথা বলতেন। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আসামী বনানীতে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ২০২০ সালে আসামীর পরিবার এক নারীর মাধ্যমে এই সম্পর্কের বিষয়ে জানতে পারে। এরপর তারা মুনিয়াকে ডেকে ভয়ভীতি দেখায় এবং মুনিয়াকে ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে বলে। এরপর আসামী কৌশলে মুনিয়াকে তার গ্রামের বাড়ী কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেন এবং পরে বিয়ে করবেন বলে আস্বাস দেন। গত ১ মার্চ মুনিয়াকে আবার ঢাকায় আনেন।
নুসরাত জানান, বোনের মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছিলেন, আসামী তাকে বিয়ে করে বিদেশে স্থায়ী হবেন। ২৩ এপ্রিল মুনিয়া তার বড় বোনকে ফোন করে বলেন, আনভীর তাকে বকা দিয়েছেন। বলেছেন, কেন তিনি ফ্ল্যাটের মালিকের বাসায় গিয়ে ইফতার করেছেন, ছবি তুলেছেন। ফ্ল্যাটের মালিকের স্ত্রী ফেসবুকে ছবি পোষ্ট করেছেন। এ ছবি ফ্ল্যাট মালিকের স্ত্রীর বান্ধবী পিয়াসা দেখেছেন। তিনি আসামীর স্বজনদের সব কিছু জানিয়ে দেবেন। আসামী মুনিয়াকে বলেন, তিনি দুবাই চলে যাচ্ছেন মুনিয়া যেন কুমিল্লা চলে যায়। আসামীর স্বজনরা জানতে পারলে তাকে মেরে ফেলবে।
এজাহারে নুসরাত আরও বলেন, ২৫ এপ্রিল মুনিয়া ফোনে কান্নাকাটি করে বলেন, তাকে ধোকা দেওয়া হয়েছে। যে কোন সময় তার দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তারা (নুসরাতের) পরিবার যেন দ্রুত ঢাকায় আসেন।

মোকর্দমাটি এখনও তদন্তাধীন এবং বসুন্ধরার এম ডি যে গুরুর অপরাধে অপরাধী তাও প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত। সায়েম সোবহান আনভীর অপরাধী বলেই তাঁরা দুই দুইটি পাসপোর্ট থাকা সত্বেও তার কোনটারই ব্যবহার না করে, যাত্রী বিমানে না চড়ে কার্গো বিমানে কেন বিদেশে চলে যাবেন?

একটি প্রশ্ন নুসরাত জাহানের এজাহার থেকে বিশেষ ভাবনার উদ্রেক করে। তিনি বলেছেন, মুনিয়ার আত্মহত্যার কোন কারণ নেই। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবী রাখে। আবার গলায় ফাঁস নিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় রুমের তালা ভেঙ্গে পুলিশ উদ্ধার করায়, ভেতরে থেকে দরজা বন্ধ থাকায় এবং ঐ কক্ষে আর কোন দ্বিতীয় ব্যক্তি না থাকায় খুনের অভিযোগটি দৃশ্যত: দুর্বল হয়ে পড়লেও, মেয়েটি ভয়ানক বিপদগ্রস্ত বলে বড় বোনকে টেলিফোনে বলল কেন-কোন অবস্থায় তাও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি আত্মহত্যা হয়ও-তা কোন বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েটিকে করতে হলো এভং আসামী ঐ কথিত ফাঁসির আগে না পরে দেশত্যাগ করলেন যদি প্রকৃতই দেশত্যাগ করেই থাকেন-তাও গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখতে হবে।

সবার কামনা-তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয়। আসামীর টাকার চাপে, পুলিশী তদন্ত যেন ভিন্নপথে পরিচালিত না হয়, ঠিকমত এবং উপযুক্ত ধারায় যেন চার্জশীট দাখিল হয় সরকার পক্ষের (বাদীপক্ষের) আইনজীবী ও আদালত যেন বসুন্ধরার টাকার কাছে নিজেদেরকে বিকিয়ে না দেন, আইনের অপব্যবহার না করেন-এগুলিই জনগণের ঐকান্তিক আকাংখা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আসামী যেই হোক না কেন, আইন মোতাবেক তার উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা হবে। মন্ত্রী মহোদয় এবং তাঁর দফতর ও অধ:স্তন পুলিশ কর্মকর্তারা ঐ প্রতিশ্রুতি যথার্থভাবে বাস্তবায়নকরবেন-এটাই প্রত্যাশা।

এবারে আসি মুনিয়া এবং মুনিয়াদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা প্রসঙ্গে। মুনিয়া এক বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্যা। বসুন্ধরা, বা তার এম.ডির টাকা নিশ্চয়ই মুক্তিযোদ্ধার চাইতে বড় নয়। মুনিয়ার বাবা এবং আমরা ও লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা দেশটাকে স্বাধীন করেছিলাম যে যে মহান লক্ষ্য নিয়ে তার মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য ছিল নারীর মর্যাদা এবং তার জীবন জীবিকারনিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান। যেভাবেই হোক, নিজের জীবন দিয়ে মুনিয়া এবং মুনিয়ারা প্রমাণ করলেন আমরা সেই মহান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পরিনি। এটা আমাদের ক্ষমার অযোগ্য ব্যর্থতা। অকপটে এই ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়ে পুনর্বার ক্ষমা চাই মুনিয়াদের কাছে নি:শর্তভাবে।
ক্ষমতাসীন দলটি মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তম দল। চলছে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী। এই বছরের বিত্তশালী এক চরিত্রহীন যুবকের দ্বারা মুনিয়ার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হন্তা যেন উপেক্ষিত বা অবহেলিত বিষয়ে পরিণত না হয়-এটুকুই কামনা।

রণেশ মৈত্র
লেখক ও কলামিস্ট
সাংবাদিকতায় একুশে পদক প্রাপ্ত।
বাংলাদেশ।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments