খাজনা বাজনা এবং শখের তোলা

152
উল্টো পাতার গল্প কেন?
ঢাকায় টোনা-টুনির ছড়া নিয়ে একসময় ক্যাসেট বেরুলো । আমি তখন শৈশব ছেড়ে তেজি যুবক । কিন্তু ছোটবেলায় যে ছড়াগুলো শুনেছি – সেগুলো ঐ মিষ্টি সুরে শুনতে বেশ ভাল লাগতো। ছোটদের শোনাবার কথা বলে আমিও দিনভর ঐ ক্যাসেট বাজিয়েছি।
টোনা- টুনি ছড়ার দেশ, গল্পের দেশ
দেখে শুনে পড়ার দেশ , আহা টোনা – টুনি
আমার তো প্রায় পুরো ক্যাসেটই মুখস্থ ছিল । আমার মজা লাগতো যখন ক্যাসেটে বাজত, ‘পাতা উল্টাও ।’
সারাজীবন দু আঙ্গুলে থুতু দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টিয়েছি। এখন ক্যাসেট এর পাতা উল্টাবো কি ভাবে? কিন্তু বাচ্চাগুলো হাতের সামনে যে বই পেত সেটার পাতা উল্টাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত ।
বেশ কয়েক মাস ধরে প্রশান্তিকার সম্পাদক আতিক শুভ রুটিন করে আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। ওর পত্রিকায় লিখতে হবে। সম্পাদকের এমন আচরণ যুবতির প্রেম নিবেদনের মত। সারাক্ষণ কেমন ফুরফুরা লাগে । মনে হয় বাতাসে ভাসছি।
আমি জীবনের গল্প লিখতে বেশী ভালবাসি । এতো রঙ্গে ভরা আমাদের জীবন যে কোন গল্প লিখার জন্য আমাকে বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলতে হয় না । আমার নাটক, আমার ভাল লাগা, আমার ছেলে-মেয়ের বেড়ে উঠা, আমার তের ভাইবোনের কথা, পুরাণ ঢাকা, আমার স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, অভিবাসন – সব কিছুতেই আমি গল্প খুঁজে পাই। যে ঘটনাগুলো অল্প বয়সে ভাবায় নি – এখন ওগুলো দিব্যি অন্য চোখে দেখতে পারি। মনে হয়, ‘বেঁচে থাকা ভারী সুন্দর।’
‘কিন্তু আমার এই নিজস্ব গল্পগুলো অন্যেরা কেন পড়বে?’ এই কথা বলতেই আতিক শুভ একটি লম্বা ফিরিস্তি দিল, ‘সবাই তো তাদের ব্যক্তিগত কথাই বলে। যে রাজনৈতিক কলাম লিখে সে তার নিজের মতামত দেয়। কেউ নিজের ভ্রমণ কাহিনী লিখে, কবিতা লিখে। এই যে সিনেমার ক্রিটিক পড়েন ওটাও তো একজনের ব্যক্তিগত মতামত । তাহলে আপনার নিজস্ব গল্প আমরা পড়লে অসুবিধা কোথায়?’
বুঝলাম সিমেন্ট দিয়ে পাকা দেয়ালের মত যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। আমি তবুও বলি, ‘কিন্তু এগুলো তো আমার জীবন-যাপনের গল্প।’
এবার আরও শক্ত যুক্তি ছুড়ে দিল, ‘আপনি মানুষের মন নিয়ে কাজ করেন। অন্যেরা কি আপনার মনের কথাগুলো জানবে না? ওগুলো তো অনেক বেশী আগ্রহ নিয়ে পাঠক পড়বে।’

তারপরও আমার আমতা-আমতা ভাব ছাড়ে না । আতিক শুভ জোর দিয়ে বলে, ‘যার ভাল লাগবে সে পড়বে। আর যার ভাল লাগবে না সে আপনাকে বকা দিবে। এর চেয়ে বেশী তো কিছু হবে না’।

ওর কথা শুনে মনে হোল আমার টেবিল এর উপর জোরে বাতাস লাগলো। আর সাথে সাথে টোনা–টুনির সেই ক্যাসেট বেজে উঠলো, ‘পাতা উল্টাও।’ 

আমার টেবিলে রাখা পাতাগুলো উল্টে গেল আর যার পড়তে ভাল লাগলো সে পড়তে শুরু করল ।

নাটক যে শুধু অভিনয় দিয়ে হয় না সেটা টের পেয়েছি মঞ্চে কাজ করতে গিয়ে।  ‘শুধু সংলাপ বলবো আর বাড়িতে  চলে আসবো’ – এমন ‘ধান্দা’ নিয়ে গ্রুপে ঢুকেছিলাম। পরে দেখলাম – কোন কালে গান গেয়েছিলাম, আবৃতি করেছিলাম, তার হিসাব নিয়ে আমার গ্রুপ নাটকে কাজে লাগিয়ে দিলো।  ‘এই দেশে এই বেশে’ নাটকে তো রীতিমতো গান গেয়ে নাচতে হলো সারাক্ষণ।

নাচ, গান, আবৃতি , অভিনয়, লেখালেখি – সবই করা হয়েছে।  এই সবাই যেমন করে।  কিন্তু  একটি কাজ কখনো মন দিয়ে করা হয়নি।  ছবি আঁকা  হয়নি। নাটক করতে গিয়ে অশোকের কাজ দেখলাম।  ও একবার সুকান্তের কবিতার পাতা মোমবাতির আগুনে পুড়িয়ে পুড়িয়ে বিভিন্ন শেড বের করলো।  তারপর ওই পোড়া  কাগজ দিয়ে  সুকান্তের পোর্টট্রেট আঁকলো।  কোনো রঙ নেই, পেন্সিল এর দাগ নেই – কিন্তু দেখলাম সুকান্ত গালে হাত দিয়ে আমাকে দেখে হাসছে।  অশোক তখন ছাত্র।  নানাজনের বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকে পেট চালায়।  সুকান্তের ওই ছবিটি ও তেমন একটি কাজ ছিল। ও আমার পছন্দের কথা জানলো।  একদিন রিহার্সাল রুমে রোল করা একটি কাগজ দিয়ে বললো, ‘এইটা বাঁধায় রাইখেন।  আমি যখন অনেক বড়  শিল্পী হবো তখন দেখবেন এইটার কত দাম হয়। ‘

টেরাকোটা লেআউট -২
হাবিব  ছিল ভাস্কর্যে।  মাটির দলা  দিয়ে কত কিছু বানাতো।  আমাদের গনি মিয়া একদিন নাটকের সেট ছিল বিশাল এক বটগাছ।  পুরো মঞ্চটি মনে হতো হাজার বছরের পুরানো বটগাছের নিচে বসে আছে।  ছালা, কাঠ, মাটি দিয়ে হাবিব যে কি বানাল ! পুরো গাছটি  টুকরো টুকরো আবার টিএসসি তে নিয়ে আসা যেত।  আর মঞ্চে যখন সেই গাছের উপর লাইট পড়তো – আমাদের গা শির শির করতো।
কিরীটী তো একটা বাচ্চা ছেলে।  আমাদের দলে  এলো।  সবাই ভাবলাম ওকে দিয়ে বিষাদ সিন্ধুর আঁকি-ঝুঁকির কাজ বেশ ভালোই হবে।  এজিদ এর একটি দশ  মাথার মূর্তি দরকার। তাও আবার দশ  ফুট লম্বা।  ওখানেই শেষ নয়।  জামিল ভাই বললেন, ‘এই দশ মাথা উড়ে দশ দিকে যাবে।’
টেরাকোটা লেআউট
কিরীটী আমাদের সবাইকে দিয়ে কাগজ ভিজিয়ে পেপার ম্যাশ বানাল।  তারপর সেই পেপার ম্যাস দিয়ে বড় বড় মুখোশ বানাল। সেই মুখসগুলতে রং লাগাল। আমরা দেখলাম হোসেন বধে এজিদের-রাক্ষস মূর্তি ! আর ঐ যে সীমার যখন প্রথম মঞ্চে ঢুকে- মনে হয় কয়েকশ সৈন্য মঞ্চে দাড়িয়ে আছে। সেই বোর্ডে আঁকা দানব বাহিনীর ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসে সীমার। এর সবই বানিয়েছিল কিরীটী।  ওর পোর্টট্রেট আঁকার হাত অসাধারণ। এক রাতে আমাদের বাড়িতে ব্রাশ, রঙ নিয়ে হাজির।  তারপর আমাকে আর মৌসুমীকে আদেশ জারি করলো, ‘এইখানে চুপ কইরা বসেন তো।’
আমরা বসলাম – আর কিরীটি রঙ এবং ক্রেয়ন দিয়ে দুটি ছবি আঁকলো।  ছবিগুলো যত্ন করে বাঁধিয়ে রেখেছি। সুযোগ পেলেই এঁকে ওঁকে দেখাই। মাত্র ছয় বাক্সে সংসার গুটিয়ে উড়াল দিলেও কিরীটীর সেই ছবিদুটা ফেলে আসিনি।
টেরা -৫
প্রবাসে কত শিল্পীর কাজ দেখি। খেয়াল করি তাদের ব্রাশের স্ট্রোক, রঙের  খেলা আর ছবির থিম।  আমাদের চোখ পেন্টিংস এ খুঁজে গল্প আর নাটক। ছবির পিছনে কি চমৎকার গল্প।  মাঝে মাঝে ঐ সব শিল্পীর আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে।  কিন্তু বলি কি করে? ওরা তো আমাকে চিনে না।  ওদের সাথে কথা হয়।  সখ্যতা হয় না।  ওদের গল্প শুনি, কিন্তু মন ভরে  না।  ইচ্ছে করে আমাদের দেখা মানুষ, জীবন আর বেড়ে উঠার গল্পে আমাদের বাড়ী  ভরে  থাক।  আমি অশোক, ইকবাল ভাই, কিরীটীকে ফোন দেই।  রোকেয়া আপাকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করি। শম্ভু’দার নম্বর খুঁজে বের করি।  তারপর আবিস্কার করি এই গুণী মানুষগুলোর হাতের ছোঁয়ায়  একটু একটু  করে আমাদের বাড়ির দেয়ালগুলো গল্পে গল্পে ভরে  উঠছে।
প্রথমে কিরীটীর গল্প বলি।
কিরীটি আমাদের পোর্টট্রেট করেছিল সেই পঁচিশ বছর আগে। ও বলে, ‘দূর তখন তো ছাত্র ছিলাম।  এখন একবার আসেন।  আরেকটি পোর্টট্রেট করে দেই।’
আমি বলি, ‘এবার একটা টেরাকোটা বানিয়ে দাও। আমার বাড়ির দরজার সামনের দেয়ালে লাগাই। ‘
কিরীটি হিসাব নিয়ে বসলো।  দেয়ালের মাপ, টেরাকোটার মাপ, তারপর ওজন নিয়ে কথা বলতে তিনমাস চলে গেল। কিন্তু কি আঁকবে?
আমি বলি, ‘তোমার যা ইচ্ছে এঁকে  দাও। শুধু আমাদের নাটকের গল্প থাকলেই হবে। ‘
তারপর আবার গল্প, আবার কথা।  কিরীটি টেরাকোটার একটি স্কেচ পাঠালো।
আমি আর মৌসুমী ওর স্কেচ দেখে থমকে গেলাম।
-হ্যাঁ। এটাই আমাদের গল্প। মানুষ আর জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করার গল্প এখানেই শিখেছি।
কিরীটি জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার কি পছন্দ হয়েছে?’
আমি অবাক হয়ে বলি, ‘এটা তো আমার আর মৌসুমীর গল্প ।’
কিরীটি টিপ্পনী  কাটে, ‘নাটক না করতে আসলে কি আর মৌসুমী আপাকে পাইতেন?’
আমি আর কথা বাড়াই না।  পাছে  আবার আমাদের কোন অজানা গল্প নিয়ে ছবি এঁকে ফেলে !
আবার জিজ্ঞেস করি, ‘পুরো টেরাকোটার ওজন কত হবে?’
– ঐটা নিয়া  ভাইবেন না।  খুব বেশি হইলে ষাট  কিলো।
আমি হিসাব করি।  মৌসুমী আর আমি খালি হাতে প্লেনে উঠলে আসার সময় বাক্সে ভরে নিয়ে আসতে  পারি।
এবার কিরীটীকে তাড়া  দেই।  আর কিরীটি আমাদের থামিয়ে দেয়, ‘এতো তাড়াহুড়া করে তো আপনার কাজ করবো না।  একটু সময় দিন ।’
এর মধ্যে কিরীটীর হার্টের অসুখ হয়, ওর মায়ের অসুখ হয় – আর আমার আবদার ধীরে ধীরে ভয়ে বদলে যায়।  কিন্তু কিরীটীকে ফোন দিলেই বলে,  ‘আপনার কাজটা  না করতে পারলে আমার শান্তি নাই।’
তারপর শুধু অপেক্ষার পালা। প্রায় দশ  মাস পর কিরীটি আওয়াজ দেয় ,’আপনার কাজ কমপ্লিট।  কবে নিবেন?’
আমরা তো পারলে পরের দিনই উড়াল দেই।  কিন্তু কিরীটি একটু কেশে বলে, ‘যত পাতলা করে বানাইতে চাইছিলাম- তত  হালকা করে বানানো যায় নাই।  তাই ওজন কিন্তু বেশি হয়ে গেছে। ‘
আমি জিজ্ঞেস করি, ‘মোট ওজন কত?’
ও মাথায় আকাশ ভাঙা উত্তর দিলো, ‘বাক্স আর প্যাকিং মিলে  প্রায় একশ ত্রিশ কেজি তো হবেই। ‘
আমাদের প্লেনে করে আনার চিন্তা উড়ে গেল।  এবার বন্ধুদের  খোঁজা  শুরু করলাম।  ভাবলাম ভেঙে ভেঙে আনি।
মৌসুমী সাহস করে না। ‘আটাশ  পিসের টেরাকোটা তো আর একসাথে আনবে না। যদি একটা পিস হারিয়ে যায়?’
আমিও ভয় পেলাম।
এবার খোঁজ শুরু করলাম।  জাহাজে কি ভাবে আনা  যায়? ঢাকায় খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম  ট্রেড লাইসেন্স, মিনিস্ট্রির পারমিশন, ট্যাক্স, ফেউমিগেসন – সব মিলিয়ে এক মহাযজ্ঞ।  মহাকালের দিপুকে ধরলাম। ও আমার নির্দেশনায় নাটক করেছে। গার্মেন্টস ব্যবসা করে। ও এক কথায়  রাজি। দুদিন পর ও জানালো যে ওর ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু এই মিনিস্ট্রির পারমিশন আর জাহাজে উঠানোর জন্য দৌড়াদোড়ি করতে হবে। আর তার জন্য আলাদা লোক লাগবে। আমি লোক পাবো কোথায়?
আজিম ভাই বিজিএমই এর সভাপতি।  আমাদের স্কুলের ক্লাবেরও সভাপতি। আমার ভাইয়ের বন্ধু। আমার বন্ধুর চাচা। অতএব আজিম ভাইকে তো এই কাজের জন্য আবদার করাই  যেতে পারে।  সব খুলে বললাম। উনার অফিসের ক্লিয়ারিং অফিসারের সাথে যোগাযোগ হোল। কিন্তু সমস্যা হলো – উনারা কাপড় এক্সপোর্ট করেন। টেরাকোটা এক্সপোর্ট   করেনি। অতএব বিষয়টি উনাদের কাছেও তুড়ি মেরে অস্ট্রেলিয়াতে পাঠিয়ে দেয়ার মতো নয়।
ক্যালেন্ডারের পাতা ততদিনে বারো বার বদলে গেছে। আমরা ভাবছিলাম – টেরাকোটা মনে হয় আমাদের বাড়িতে আর আসবে না । বেচারা টনি টেনিস বলের মত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দৌড়াল। এক সময় ও মনে হয় ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল।
কিরীটি যত্ন করে টেরাকোটাগুলো ওর অফিসে বাক্স বন্দী করে রাখে। আটাশটি টাইলসের আর্তি আমাদের অস্থির করে ফেলে। ঢাকায় ডিএইচএল এ খোঁজ নেই। খরচের লম্বা লিস্টি দেখে চোখ কপালে উঠে। আরে টেরাকোটা বানাতেও তো আমার এতো খরচ হয়নি! একেবারে দশগুণ বেশী ? একবার মনে হয়েছিল – লাকী  ভাইয়ের সাথে কথা বলি। আমাদের নাটকের সজন। শিল্পকলার মহা পরিচালক। শিল্পকলার দেয়ালে না হয় টেরাকোটাটি লেগে থাক।  আমাদের গল্প এই ভিনদেশে না এসে সেই দেশেই থাকে – যেখানে আমরা শিখেছি সুন্দরের অ  আ  ক খ।
মৌসুমীর মন খারাপ হলো। আমি সাহস দিলাম, ‘আমরা না হয় দুপুরে ভাত  না খেয়ে মুড়ি খাই। তাহলেই তো ডিএইচএল দিয়ে ওই আটাশটি টাইল  নিয়ে আসতে  পারি ।’
ও হেসে বললো, ‘ঠিক আছে।’
টেরা -১৮
তারপর সেই টেরাকোটা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গেলো।  ওখান থেকে জাহাজে উঠলো। জাহাজ সিঙ্গাপুর আসলো। সিডনিতে এসে কড়া  নাড়লো ২৮ দিন পর । আমাদের উত্তেজনা বেড়ে গেলো। কিন্তু ওগুলো বাড়িতে আনবো  কি ভাবে।  সিডনির ক্লিয়ারিং এজেন্ট আবার খরচের লম্বা লিস্টি দিলো। তীরে এসে কি আর ডুবানো যায়? আমাদের মুড়ি খেয়ে দিন কাটানোর সময় আরো বেড়ে গেলো।
তারপর দেড় বছর অপেক্ষার পর একদিন বিকেল বেলা ঘরের কলিং বেল বেজে উঠলো। কলিং বেলের শব্দ এতো মধুর হয় ? ওরা একশো আশি কেজি’র এক বাক্স ক্রেন  দিয়ে নামিয়ে গ্যারেজে রেখে গেল।  আহারে কি আদর করেই না টাইলসগুলো কাগজ দিয়ে মুড়িয়েছে। মনে হচ্ছে মা-পাখী  ডিমে তা দিচ্ছে!
কিন্তু এতো ওজনের টেরাকোটা দেয়ালে লাগাবো কি করে? খোঁজ খোঁজ খোঁজ।
সিডনী  শহর খুঁজে বের করলাম সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, বিল্ডার, আর একজন আর্কিটেক্ট।  ভাগ্যিস সাদেক আর সূচি একই ছাদের নীচে থাকে।  এক ঢিলে দুজনের বুদ্ধি বের করা গেল। ওরা  দুজন বুদ্ধি দিল কি ভাবে ওটা দেয়ালে ঝুলানো যাবে।  সূচি তো বলেই ফেলল, ‘মামা, জিনিসটা কিন্তু অসাধারণ।’
সেই গল্পের ক্যানভাস এখন শুধু দেয়ালে লাগানোর পালা।  প্রবাসে আমাদের নাটকের  গল্প দেয়াল জুড়ে আঁকা  হবে।
ভিন দেশের এই অচেনা আলো বাতাস জিজ্ঞেস করবে, ‘এটা  কি ?’
আমরা বলবো, ‘এটা আমাদের নাটক। আমাদের একসাথে বেড়ে উঠা আর বড়ো  হয়ে উঠার গল্প। এটা আমার দেশের গল্প। অভিমানে মন ভারী হয়ে যাওয়া কোন এক অলস বিকেলে আলতো করে এই মাটি ছুঁয়ে দিলে-মনের আকাশ একটু বেশী নীল হয়ে উঠবে। ‘
অচেনা দেশ মিষ্টি হেসে বলবে, ‘শুধু গল্প বলবে? নাটক দেখাবে না ?’
নামঃ যাত্রা – নাটক এবং জীবন
মাধ্যমঃ টেরাকোটা
শিল্পীঃ কিরীটী রঞ্জন বিশ্বাস, ২০১৭
আয়তনঃ ৭ ফুট X ৪ ফুট
ওজনঃ ১৫০ কেজি
পুনশ্চ: বাকি ছবির গল্পের জন্য চোখ রাখতে পারেন।  তবে লেখাগুলো পড়তেই হবে এমন নয়।
জন মার্টিন 
অভিনেতা, নাট্যকার, 
নির্দেশক, মনোবিজ্ঞানী 
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
২০১৮।