গান আমার জীবনাচরণের অংশ: নিরুপমা রহমান, প্রশান্তিকার সাথে সাক্ষাৎকারে

  •  
  •  
  •  
  •  

[ পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষই বৃত্তের ভেতরে বাস করেন। খুব কম সংখ্যক মানুষই আবার বৃত্তের বাইরে নিজের অজান্তেই আরেকটি বৃত্তে আবিষ্ট হচ্ছেন। আপনি আপনার পরিধির ব্যাপ্তি ঘটাচ্ছেন এবং সেই বর্ধিত গোলকে সকলের সাথে ভাগাভাগি করছেন আপনার সুস্থতা, সৌখিনতা এবং ভিন্নতা। আপনি এভাবেই বৃত্তের বাইরের একজন।]

নিরুপমা রহমান। বাবা-মায়ের নাম মিলিয়ে রাখা ‘নীরা’ নামে সবাই তাঁকে ডাকে। তিনি মেলবোর্ন প্রবাসী আলোকিত এক বাঙালী মুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত গানের চর্চা বজায় রেখেছেন পুরোদস্তুর। তিন বছর বয়সে তাঁর গানের হাতেখড়ি। দেশ ও দেশের বাইরে নামকরা সব গুরুর কাছে তিনি তালিম নিয়েছেন। স্কুলে যাবারও আগে, বাবা মায়ের উৎসাহে সুরের সাথে, গানের সাথে সেই যে পথচলা, দীর্ঘ প্রবাস জীবনেও সেই বাঁধন বরং শক্তই হয়েছে, আলগা হয়নি এক মুহূর্তের জন্য। বাংলা ভাষা, বাংলা গান, বাঙ্গালিয়ানায় মোড়া সাংস্কৃতিক আবহে থাকা আলোকিত এই মানুষের সঙ্গে এবারের প্রশান্তিকার ‘বৃত্তের বাইরে’র আয়োজন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রশান্তিকার সম্পাদক আতিকুর রহমান শুভ।

প্রশান্তিকা: আপনার গানের হাতেখড়ি, মা বাবাসহ পবিবারের ভুমিকা- সংক্ষেপে জানতে চাই।
নীরা: তিন বছর বয়সে আমার গানের হাতেখড়ি- বুঝতেই পারছেন স্কুলে যাবার আগেই গান শেখা শুরু। আসলে আমার বাবা ও মায়ের দেখা স্বপ্নের হাত ধরেই আমার গান শেখার শুরু। আমার জন্মেরও আগে তাঁদের স্বপ্ন ছিল তাঁদের প্রথম সন্তান মেয়ে হবে আর সেই মেয়েকে তাঁরা গান শেখাবেন। এমনকি বিয়ের পরে বেড়াতে গিয়ে তাঁরা তাঁদের সেই অনাগত সন্তানের জন্য একটা ছোট হালকা   কার্পেট কিনেছিলেন আর ভেবে রেখেছিলেন কোন একদিন তাঁদের সেই অনাগত মেয়েটি ঐ কার্পেটে বসে গান করবে। আমার তিন বছরের জন্মদিনের উপহার ছিলো একটা হারমোনিয়াম। এবং চার বছরের জন্মদিনের উপহার ছিলো তানপুরা।
সেই তানপুরা আমার চেয়ে লম্বা তখন, আমি সেটা ঠিকমতো ওঠাতেও পারতাম না। আমি বসার পরে আমার বাবা বা মা তানপুরাটাকে আমার সামনে শুইয়ে দিতো, কারণ তখন কিছুতেই দাঁড় করিয়ে বাজাতে পারতাম না। সেই তানপুরা এখনও আমার সাথী। আমার ছোটবেলার আনন্দের সাথী বা খেলার সাথী যাই বলুন ছিলো তিনটি জিনিস -তানপুরা, হারমোনিয়াম এবং বই।
আমাদের তিন ভাইবোনের ছোটবেলার অধিকাংশ আনন্দের স্মৃতিই গানকে নিয়ে, গানকে ঘিরে।

মা ও বাবার সঙ্গে নিরুপমা।

আমাদের প্রথম সারা রাত জাগবার অভিজ্ঞতাও কিন্তু সারা রাত ব্যাপী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সম্মেলনে গান শুনতে গিয়ে। তখন শুদ্ধ সঙ্গীত প্রসার গোষ্ঠীর আয়োজনে সারা বাংলাদেশ থেকে শিল্পীরা এসে গাইতেন। আমাদের কাছে ডিসেম্বর মাস মানেই ঐ সম্মেলনের জন্য দিন গোণা। কত শিল্পীরা এসে থাকতেন আমাদের বাড়ি ঐ সময়। এখন খুব বুঝি, আমার চাকুরীজীবী মা বাবা তাঁদের ব্যস্ততার মাঝে, হিসাবের সংসারে সানন্দে ঐ ভার নিতেন, শুধুমাত্র আমাদেরকে গান শোনবার, শেখবার, গুণী শিল্পীদের কাছ থেকে দেখবার সুযোগ করে দিতে। বাংলাদেশের যত জায়গায় আমরা ছোট বেলায় ঘুরতে গেছি তা হয় গান শুনতে বা গান গাইতে। আমার বাবা মা কেউ গান গাইতেন না, কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি তাঁদের এই ভালবাসা, গুণী শিল্পীদের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। আমাদের ছোট পাঁচজনের পরিবারের প্রাণ যেন এক ‘সুরের বাঁধনে’ বাঁধা ছিল।
এখন আমার বর আর মেয়ে আমার অনুপ্রেরণার বিরাট উৎস। বাবা আজ আমাদের মাঝে নেই, আমার মা, আমার মেয়ে আর বর আমার সবচেয়ে বড় সমালোচক। আর বোন নবনীতার সাথেও প্রচুর আদানপ্রদান হয় গান বিষয়ে সবসময়।

প্রশান্তিকা: আপনার গানের গুরুদের কথাও শুনতে চাই।
নীরা: আমার একদম ছোটবেলায় হাতেখড়ি হয়েছে শ্রীমতি স্বপ্না রায়ের কাছে। তখন আমার বয়স তিন। আমার মা তাঁর জন্য একটা শাড়ি রাখতেন। কেননা আমি তাঁর কোলে বসে গান শিখতাম বলে তাঁর শাড়িটা কুঁকড়ে যেত । বাবা – মায়ের কাছে পরে শুনেছি প্রায় দিনই আমাকে গান শেখানোর পর মায়ের তুলে রাখা পাট ভাঙ্গা শাড়ি পরে তিনি বাড়ি ফিরতেন। তারপর আমি গুরু কৃঞ্চকান্ত আচার্যের কাছে শেখা শুরু করি। এরপর যখন আমার বয়স ৬, তখন আমি পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের কাছে শেখার সুযোগ পাই। ওস্তাদজী সাধারণত অত ছোট বয়সী কাউকে শেখাতেন না। কিন্তু আমাকে পরখ করে কি ভেবে রাজি হয়েছিলেন। সে আমার পরম সৌভাগ্য। এরপর টানা ১১/১২ বছর আমি ওস্তাদজীর কাছে শিখেছি। প্রথম আড়াই বছর ওস্তাদজী কেবল ইমন রাগই শিখিয়েছিলেন।
ইন্টারমিডিয়েটে পাশ করার পরে আই সি সি আর স্কলারশিপ নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়বার সুযোগ পেলাম। আবার অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। পরে ঢাকা ছেড়ে যাদবপুরেই ইংরেজী সাহিত্যে পড়েছি। দেখুন কলকাতা হল সমগ্র ভারতের সঙ্গীতের এক অনন্য পীঠস্থান আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতাতেই। তাই গান শেখার সুযোগের ভাবনা আর সম্ভাবনা এই সিদ্ধান্ত নেবার পেছনে একটা বড় কারণ ছিল বৈকি।
তখন ওস্তাদজী পণ্ডিত বারীণ মজুমদার যোগাযোগ করে দিলেন তাঁর গুরুবোন উপমহাদেশ প্রখ্যাত বিদুষী শ্রীমতী দিপালী নাগের সাথে। তাঁরা দুজনেই আগ্রা ঘরানার কিংবদন্তীসম উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর শিষ্য ছিলেন।
ওস্তাদজী যোগাযোগ করিয়ে দিলেও বিদুষী শ্রীমতী দিপালী নাগ পুরোদস্তুর পরীক্ষা নিয়ে শেখাতে রাজি হলেন। প্রায় ২০মিনিট ধরে আমার কাছে একটি খেয়াল শুনলেন। তারপর নিজে গাইলেন এবং আমাকেও তাঁর সাথে গাইতে বললেন। সবশেষে আমাকে জড়িয়ে ধরে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার মেয়েকে নিয়ে নিলাম। ওকে আমি নিজে যত্ন করে শেখাবো।’ তিনি আমাকে অনেক বছর শিখিয়েছেন। একটা কানাকড়িও নেননি তার বিনিময়ে। মা কিছু দিতে চাইলে বলতেন, ‘আমি তো ওকে নিয়ে নিয়েছি।’
তিনি শুধু আমাকে গানই শেখাননি, তিনি আমাকে সঙ্গীতকে নিজের মাঝে ধারন করতে শিখিয়েছেন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে অনুভব করতে শিখিয়েছেন, অনুভূতি কিভাবে প্রতিটি রাগের প্রকাশে কিভাবে তুলে আনতে হয়, তাও শিখিয়েছেন। অনার্সের পর যখন এম এ করতে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত আসি, তখনও নিয়মিত কলকাতা গেছি মাসীমার কাছে শেখবার জন্য। আমি তাঁর বাড়িতে থেকেই শিখেছি এবং তাঁর সাথে বিভিন্ন বড় বড় অনুষ্ঠানে গিয়েছি, তাবড় তাবড় শিল্পীদের কাছে থেকে দেখবার, জানবার সুযোগ হয়েছে। দূরদর্শন সহ অনেক জায়গায় তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গান করেছেন বা আমাকে গান গাইবার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমার জীবনে অন্যতম সৌভাগ্যের অধ্যায় হলো এই গুরুমাকে আমার জীবনে পাওয়া। তিনি আমাকে আদর করে ‘নূরজাহান’ ডাকতেন।

গান গাইছেন নিরুপমা

আমি ররীন্দ্রসঙ্গীত কম গাই। কিন্তু অন্য অনেক বাঙ্গালীর মত রবীন্দ্রনাথই আমার ভরসা আর আশ্রয়ের জায়গা। রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের গান আমাকে এবং আমার বোনকে গভীর ভাবে চিনতে, বুঝতে, জীবনে ধারণ করতে শিখিয়েছিলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল হক। খুব ছোট থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি ওয়াহিদুল হক কাকার কাছে তালিম আমাকে বাণীপ্রধান বাংলা গানকে , গানের বাণীকে, বাণীর সাথে সুরের মেলবন্ধনকে খুঁজতে, চিনতে আর ধারণ করতে শিখিয়েছিলেন।
দীপালি নাগ আর ওয়াহিদুল হক এই দুইজন মানুষ আমার সঙ্গীত জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলেছেন। এছাড়াও সেই ছোট বেলাতেই প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাদী মহম্মদের কাছেও আমরা দুই বোনই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছি। আর নীলোৎপল সাধ্য, সালমা আকবরের মত গুণীজনদের কাছেও তালিম নেবার সুযোগ হয়েছে।

প্রশান্তিকা: ঘরানায় ফেললে আপনাকে কোন শ্রেনীর শিল্পী বলব-রবীন্দ্র, নজরুল নাকি পঞ্চ কবির গানের শিল্পী?
নীরা: নজরুল এবং রাগপ্রধান গানই আমি বেশি করে থাকি যেহেতু আমার শিক্ষার ভিত্তিটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। আজীবন আমি এরই চর্চা করে চলেছি। নজরুলের গান আমাকে সুযোগ দেয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অভূতপূর্ব সৌন্দর্যের সাথে বাণীপ্রধান বাংলা গানের জাদুকরী অনুভূতির মেলবন্ধন ঘটানোর । এ এক ভীষণ আনন্দময় প্রাণের খেলা আমার।

প্রশান্তিকা: বলতে গেলে-কোন সাধারণ গান নয়, সব সময় শুনি ক্লাসিকাল বা ধ্রুপদী গানগুলোই আপনার কন্ঠে। মানুষ সচরাচর জনপ্রিয় গান গাইতে পছন্দ করেন। আপনি ব্যতিক্রম।
নীরা: আসলে ঐ যে বললাম আমার তালিমটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে। আপনি যে ক্লাসিকাল কথাটা বললেন, সেটা বলতে আমি বুঝি সেই সঙ্গীত যেটা চিরায়ত। চিরায়ত গানে আমি নিজেকে বেশি খুঁজে পাই কেননা আমার শিক্ষা এবং চর্চাটাও তাকে ঘিরেই। আর ঐ যে বললাম শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক্সপ্রেশনের সাথে বাংলা গানের অনুভুতিকে মেলাতে আমার দারুণ লাগে। আর একটা ব্যাপার হল আমরা শিল্পীরা গাইলে তবেই না শ্রোতার পরিচয় ঘটবে তার সাথে । গান  প্রচলিত হয়, কিংবা গান জনপ্রিয় হয় কিভাবে? শিল্পী তা শ্রোতার কাছে দারুণ ভাবে উপস্থাপন করেছেন বলেই তো, তাইনা? শিল্পী ওই গান দিয়ে শ্রোতার মন জয় করেছেন বলেই তো তা শ্রোতা চিনে নেয়, মনে রাখে। অপ্রচলিত গান না গাইলে শ্রোতার কাছে তা পৌঁছুবে কি করে ? এগুলির চর্চা করা, এগুলিকে সবার কাছে পৌঁছে দেবার মাঝে আমি খুঁজে পাওয়া গুপ্তধন সবার সাথে ভাগ করে নেবার আনন্দ খুঁজে পাই।
ছোটবেলায় বাবা খুব বলতেন, ‘যেহেতু তুমি গান শিখে বড় হচ্ছো, তোমাকে মনে রাখতে হবে শ্রোতাদের মন জয় করা শিল্পীর লক্ষ্য, কিন্তু একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। শ্রোতাদের মাঝে নতুন অনুভব, নতুন সৃষ্টির আনন্দ ছড়িয়ে দেয়া শিল্পীর দায়িত্ব। আমি খুবই নগন্য শিল্পী তবুও চেষ্টা করি শ্রোতাকে আমার ভাবনা, আমার সৃষ্টির আনন্দের অংশীদার করে নিতে।

পণ্ডিত যশরাজ’র সঙ্গে ছোট্ট নিরুপমা

প্রশান্তিকা: গানকে আপনি কিভাবে অনুভব করেন?
নীরা: গানটা আমার জীবনাচারণের অংশ। শত ব্যস্ততায় কিংবা অবসরে, আনন্দে, সুখে, শোকে, দুঃখে জীবনের প্রতি মুহূর্তে গান আমার সঙ্গী, আমার সব পারাণীর কড়ি। আমি কাজ করতে করতে, রান্না করতে করতে গান গাই। কিংবা ক্লাসের ফাঁকে ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে বা ড্রাইভ করতে করতে গান গাই। যেহেতু আমার বড় হয়ে ওঠা গানের সঙ্গে, গানকে ঘিরে, কোন সময় গান যে আমার অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে জানতেও পারিনি। আসলে কি জানেন, আমি আসলে গান গাইনা, গান আমি যাপন করি। প্রচুর গান শুনি, আর গান ততোটা পড়িও। আমি সাহিত্যের ছাত্রী ছিলাম, আমার অনার্সে ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়তে গিয়ে তুলনামূলক সাহিত্যও পড়েছি। আমি দেখেছি সাহিত্যের একেকটি সৃষ্টি একেক বয়সে একেক রকম অর্থ, রস, একেক রকম গভীরতা নিয়ে আমাদের কাছে ধরা দেয়। একটি লেখা আগে পড়ে যে অনুভূতি হয়েছে বিশ বছর পরে কিন্তু আপনার অনুভূতির পরিবর্তন হবে। ভিন্ন ভিন্ন বয়সে কবিতা, গল্প বা নিবন্ধ যেমন ভিন্ন অর্থ বহন করে গানের বাণীও সেরকম ভিন্ন ভাবে সামনে ধরা দেয়। তার রূপ বদলে যায়। এ এক অন্যরকম আবিষ্কারের আনন্দ। সুর আর গান এমন এক বন্ধু যে শত রূপে শত বার ধরা দিয়েও কখনও পুরনো আটপৌরে হয়না। আমার মনে হয়, আমার বাবা মায়ের আমাকে দেয়া অন্যতম সেরা উপহার হল সুরের সাথে আমার পরিচয়, আমার বন্ধুতা।

প্রশান্তিকা: আমিও দেখেছি পড়লে গানটা বেশি করে অর্থবহ হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে ওপার বাংলার অভিনেতা অনির্বাণ চট্টোপাধ্যয় এক সাক্ষাৎকারে বললেন, পড়ার মাধ্যমে যে লেয়ার অব ইমোশন্স সৃষ্টি হয় অন্য মাধ্যমে ততোটা হয়না।
নীরা: একদম সত্যি কথা। জেনে খুব ভালো লাগলো যে আমার অসম্ভব প্রিয় তরুণ এই অভিনেতা এতো সুন্দর করে আমার মনের কথাটি বলেছেন। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ব পড়াতে গিয়ে বা গবেষণার প্রসঙ্গে প্রায়ই বলি ভাষা আসলে শুধু শব্দ গুচ্ছ নয় , এর পরিপ্রেক্ষিতটা জানা বা বোঝাও খুব জরুরী। লেয়ার অব ইমোশন্স আসলে অনেকটা পেঁয়াজের মতো। আপনি একেকটা লেয়ার ছাড়াচ্ছেন, ততো চোখ জ্বলছে। তাই যতো এর ভেতরে ঢুকবেন, ততো অনুভব গভীর থেকে গভীরতর হবে। তাই শুধু সুরে গাইলেই হবে না গানের সাথে প্রাণ মিশালে তবেই অনুভূতিটা প্রকাশ পাবে। আর বাংলা গান যেহেতু বাণী প্রধান, এই ব্যাপারটা তাই ভীষণ জরুরি বাংলা গানে।

প্রশান্তিকা: শুদ্ধ সঙ্গীত বলতে কিছু কি আছে?
নীরা: এটা খুব ইন্টারেস্টিং একটা প্রশ্ন। আসলে শুদ্ধ সঙ্গীত কি? এটা নিয়ে অনেক অভিমত রয়েছে হয়তো। তবে আমি মনে করি শুদ্ধ সঙ্গীত না বলে সঙ্গীতের শুদ্ধতা বললে আমার কাছে অনেক বেশি অর্থবহ হয়। কারণ শুদ্ধ সঙ্গীতের সংজ্ঞাটা আমার কাছে যেমন, অন্যের কাছে হয়তো অন্যরকম। সঙ্গীতের শিক্ষার্থী, শ্রোতা বা শিল্পী হিসেবে আমরা সততার জায়গায় থেকে এবং আমাদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ধরে রেখে আমরা যদি সঙ্গীতকে ধারণ করি, পরিবেশন করি তাহলে এর শুদ্ধতাটাও নিশ্চিত হবে। আমার আরও মনে হয় আপনি নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, লোকগান, পপগান, ব্যান্ডের গান যা -ই করেন না কেনো, সুরটা যদি ঠিকমতো আরোপ না হয়, সুরের জায়গায় যদি সততা না থাকে, তাহলে তো তা সঙ্গীত হয়েই ওঠেনা। সুর ছাড়া তো সঙ্গীত হয়না, এর শুদ্ধতাও থাকেনা, তখন তা কোলাহল হয় মাত্র।
আরেকটি হচ্ছে বাণী। কারণ বাংলাগান বাণীপ্রধান গান। গীতিকার যেভাবে লিখেছেন প্রমিত উচ্চারণে সেভাবেই গানটার বাণী শুদ্ধভাবে গাইতে হবে। সুতরাং বাণী ও সুরের প্রতি সৎ থেকে স্বরক্ষেপণই আমার কাছে সঙ্গীতের শুদ্ধতা। আর এসবের ব্যত্যয় হলেই সেটা অশুদ্ধ হয়ে যায় বলে আমি মনে করি।

সামনে বসে ডাগর ব্রাদার্সের গান শুনছেন ছোট্ট নিরুপমা

প্রশান্তিকা: গান নিয়ে আপনার মধুর স্মৃতি শুনতে চাইছি।
নীরা: গান নিয়ে আমার অজস্র মধুর স্মৃতি। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি?
গান গেয়ে অনেক পুরষ্কার, অনেক ভালবাসা মিলেছে। গানের সুবাদে তাবড় তাবড় শিল্পীদের কাছে থেকে দেখবার, শোনবার সুযোগ মিলেছে। এ সবই মধুর স্মৃতি।
আমার মনে আছে ডাগর ব্রাদার্স যখন প্রথম বাংলাদেশে এলেন, তখন আমি কেবল ক্লাস ওয়ানে পড়ি। আমরা গান শুনতে গেছি। আমি, বোন ও বাবা মা, সামনের সারিতেই বসেছি। আমি কি গান শুনছিলাম জানিনা। অনুষ্ঠান শেষে ডাগর ব্রাদার্স ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি নাকি ঠিক যেখানে মাথা বা হাত নাড়াতে হয় সেরকম তালে তালে নাড়াচ্ছিলাম। ওরা স্টেজে থেকে ওটা খেয়াল করেছিলেন, ওঁদের মনে হয়েছিলো আমার মধ্যে গান আছে । ওঁরা খুব আদর করে আমায় ওঁদের স্নেহাশীর্বাদ দিয়েছিলেন। এ আমার পরম পাওয়া ।
একই রকমের স্মৃতি রয়েছে পণ্ডিত যশরাজের সঙ্গে। তখন আমার বয়স নয় বছর। হঠাৎ শুনি অনুষ্ঠান শেষে পণ্ডিত যশরাজ মাইকে “সামনে বসা টপ ও স্কার্ট পরা ছোট্ট মেয়েটা” বলে আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি পরেরদিন তাঁর সাথে আমাদের দেখা করতে বললেন। আমরা ধানমন্ডির একটি রেস্টহাউজে দেখা করলাম। তিনি আমার মায়ের হাত ধরে বললেন, “কাল সারা অনুষ্ঠানে তোমার মেয়ের দিকে তাকিয়েছিলাম কারণ ও গান বা সুরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো এবং ঠিক ঠিক হাত বা মাথা নাড়াচ্ছিলো।” তিনি মা কে অবাক করে দিয়ে বললেন, “আমি বুঝতে পারছি ও শরীর ও মন দিয়ে গানকে অনুভব করে। তুমি মেয়েটাকে আমায় দিয়ে দাও। আমি ওকে নিয়ে যাই। আমার মতো করে পুরো সময় ওকে গান শেখাবো।”

মা বাবা ও ভাইবোনের সঙ্গে নিরুপমা

প্রশান্তিকা: মা কি দিয়েছিলেন আপনাকে?
নীরা: মা সেই প্রস্তাবে খুব আপ্লূত হয়েছিলেন স্বভাবতই। কিন্তু আমাদের পরিবারে গান যেমন জীবনাচরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, গবেষক বাবা আর শিক্ষয়িত্রী মায়ের কাছে পড়াশুনাও সমান ভাবে প্রাধান্য পেত। ছোট থেকে আমরা জানতাম পড়াশুনা করে ক্যারিয়ার গড়তে হবে, সেই সাথে গান বা সংস্কৃতি চর্চা থাকবে সমানতালে। মা পণ্ডিতজিকে বিনয়ের সাথে সেই ব্যাপারটাই বুঝিয়েছিলেন, আর তিনি তা সম্মানও করেছেন। পণ্ডিতজি সেদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করেছিলেন। তিনবছর পরেও যখন আবার বাংলাদেশে এসে আমার খোঁজ করছিলেন, আমাকে মনে রেখেছিলেন। এ আমার পরম পাওয়া ।

প্রশান্তিকা:  পড়াশুনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে তাহলে কিছু বলুন।
নীরা: ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনার্স করবার পর ইংরেজি ভাষাতত্ত্ব নিয়ে এম এ করে আমি শিক্ষকতা শুরু করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর অস্ট্রেলিয়া এসে মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ মাস্টার্স করবার পর মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি থেকে পি এইচ ডি করি। পি এইচ ডি করতে করতেই আমি মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে শুরু করি। দীর্ঘ দিন মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর পর বর্তমানে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদে শিক্ষকতা করছি, উচ্চতর ও বৈশ্বিক শিক্ষাপদ্ধতি গবেষণায় রত আছি।

প্রশান্তিকা: প্রিয় শিল্পীর তালিকা শুনতে চাই।
নীরা: এটা অনেক কঠিন একটা প্রশ্ন। আমি প্রচুর গান শুনি, সব ধরণের গান শুনি। শিল্পীর তালিকাও তাই বিরাট।
গিরীজা দেবী, শোভা গুরতু, কিশোরী আমানকর, প্রভা আত্রে, উস্তাদ রশিদ খান আমার দারুণ প্রিয়। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, কৌশিকি চক্রবর্তীও আমার ভীষণ প্রিয়। নীলুফার ইয়াসমিন আমার পরমতম শ্রদ্ধার জায়গায় রয়েছেন। পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, বিসমিল্লাহ খান, আমজাদ আলি খান, বিলায়েত হুসেন খান, আলি আকবর খান, নিখিল ব্যানার্জি সহ অনেকেরই প্রচুর ইন্সট্রুমেন্ট শুনি। এ ক’জনের নাম বললাম মাত্র কারণ এঁরা শুধুমাত্র আমার প্রিয় শিল্পীই নন, এঁদের আমি পরোক্ষ গুরু বলে মানি। প্রতিনিয়ত শুনি এঁদের থেকে নতুন কিছু শেখবার আশায়।

স্বামী ও মেয়ের সাথে নিরুপমা রহমান

প্রশান্তিকা: এবার জীবনসঙ্গীর কথা শুনতে চাই।
নীরা: আতিকের সঙ্গে আমার পরিচয় কৈশোরে, বলা যায় আমরা একসাথে বয়সে, মননে, মানসিকতায় বেড়ে উঠেছি পরষ্পরের সাথে, পরষ্পরের জন্য। ও তাই আমার শুধু হাজবেন্ডই নয় আমার পরম বন্ধুও। আমার পড়াশুনা, ক্যারিয়ার, গান সবকিছুতেই ওর সহযোগিতা বন্ধুর মত, সহযোদ্ধার মত। ও কিন্তু গান শেখেনি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুনেও বড় হয়নি, কিন্তু এই যে ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে ভালবাসতে শিখেছে, উপভোগ করে এর শুরুটা কিন্তু হয়েছে স্রেফ আমার প্রতি ওর ভালবাসা থেকে। এ ব্যাপারটা আমি ভীষণ সম্মান করি। আমার সব চেষ্টাতে, সব কাজে ও আমার পাশে আছে এই বিশ্বাস, এই ভাবনা আমাকে পরম স্বস্তি দেয়।

প্রশান্তিকা: সবশেষে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেবার জন্য।
নীরা: প্রশান্তিকা এবং আপনাকেও ধন্যবাদ আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। অত্যন্ত মননশীলতার সাথে এমন একটি পত্রিকা বের করে যাচ্ছেন-এটা তো চাট্টিখানি কথা নয়। আপনাদের পুরো টিমকে আমার অভিনন্দন আর অভিবাদন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments