গুড বাই ২০২০ স্বাগত ২০২১ । রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

চিরাচরিত প্রথা, প্রচলিত প্রথা হলো আগে নতুনকে স্বাগত জানানো, পরে পুরাতন বা বিদায়ীকে বিদায় জানানো। সে প্রথা কতটা বিজ্ঞান সম্মত সে বিতর্কে না গিয়েও বলছি- ঘটন-অঘটন-পটিয়সী এই ২০২০ কে আগে গুডবাই জানানো বিদেয় জানানো মানবসভ্যতাকে বাঁচানোর স্বার্থেই প্রয়োজন। ২০২০ এ এসে মানব সভ্যতার যে হাল বিশ্ববাসীকে অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করতে হলো সারাটি বছর ধরে তা অতীতে কোন দিন কোন জাতিকেই প্রত্যক্ষ করতে হয় নি। তাই ২০২০ এর বিদায় একান্তই আকাঙ্খিত।

মানুষের বা যে কোন প্রাণীর কাছে তাঁর জীবনই হলো সর্বাধিক মূল্যবান। জীবনকে বাঁচাতে, জীবনকে সাজাতে, জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে শৈশব থেকেই তরুণ-তরুণীদের অসীম উদ্যোগ নিয়ে তৎপর হতে দেখা যায় সর্বত্রই। মানুষের জীবন বাঁচাতে পরিবেশ বাঁচানো, নদী-বাঁচানো, চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিক্ষক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, বৈজ্ঞানিক গড়ে তোলা, শহরে নগরে হাসপাতাল নির্মাণ, ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তোলা। হাজারে হাজারে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা-ইত্যকার কত কিছুই না সৃষ্টি করে তুলেছে মানুষ।
সেই মানুষ কোন আদিমকালে প্রথম এই পৃথিবীতে এসে তিলে তিলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে তুলেছে সভ্যতা ও তার বহু চিন্তাধারার ক্ষেত্র। সৃষ্টি করে সঙ্গীত, নৃত্যু, নাটক ও নানাবিধ মাধ্যমে এগুলি গড়ে তুলতে। তার বিকাশ ঘটাতে, সর্বত্র তার বিস্তার ঘটাতে লেগেছে বহু বছর-বহু শতাব্দী।
মানুষই সকল কিছুর স্রষ্টা। মানুষ তার ক্রিয়াকলাপের মধ্যে দিয়ে, বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে তা দিনের পর দিন প্রতিষ্ঠিত করেও চলেছে।
সেই মানুষকে, মানুষের জীবনকে, মানুষের পৃথিবীকে, তার জীবনকে চুরমার করে দিয়েছে ২০২০। একটি মাত্র বছরেই কোটি কোটি মানুষ করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন পৃথিবীব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুও ঘটেছে সর্বত্র। আজ ডিসেম্বরের শেষে বা নুতন বছরের জানুয়ারিতে এসেও দেখা যাচ্ছে প্রতিটি দেশেই প্রতি দিনই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন-মৃত্যু বরণ করেছেন তার একটি অংশ। এ যেন এক বিরামহীন প্রক্রিয়া-সমাপ্তিহীন প্রক্রিয়া।

আমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, সমাজ বিজ্ঞানী, শিল্পী, প্রকৌশলী, সাংবাদিককে হারিয়েছি-হারানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭১ এ যেমন বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবীহীন করার এক বিভীষিকাময় প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছিলাম-তার ৪৯ বছর পর আবার করোনা নামক আর এক বিভীষিকার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
শুধুমাত্র বাংলাদেশে এমনটি ঘটেছে এমন নয়। প্রতিদিনই মিডিয়ার হেড লাইনে আসছে পৃথিবীর সকল দিক থেকে অসংখ্য মৃত্যুর খবর। এই মৃতের তালিকায় কে কে বা কারা কারা আছেন-তা জানা যায়নি। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে যে সকল দেশেই করোনার আঘাতে হারিয়েছে বহু বিজ্ঞানী, বহু শিক্ষক, বহু সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, ক্রীড়াবিদ, রাজনীতিক সহ সমাজের নানা স্তরের অজশ্র জ্ঞানীগুনীজনকে।

এই মৃত্যুতেই থেমে থাকে নি করোনার আঘাত। মাঠে মাঠে কৃষক কল-কারখানায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি বেকার, বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত, ম্যধবিত্ত-সবাই আছেন লাখে লাখে এই মৃত্যুর সারিতে। পৃথিবীটাই যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ভয়াল মৃত্যুপুরী।
কত স্বামী হারিয়েছেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীকে, কত স্ত্রী হারিয়েছেন তাঁর প্রিয়তম স্বামীকে, কত ছেলে মেয়ে তার মা ও বাবাকে, কত ভাই-বোন তাদের ভাইকে বা বোনকে, কত বন্ধু হারিয়েছে তার বন্ধু বা বান্ধবীকে, কত ছাত্র-ছাত্রী হারিয়েছেন তাদের কত প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকাকে, কত হাসপাতাল হারিয়েছে তার অসংখ্য ডাক্তার, নার্স ও অপরাপর স্বাস্থ্যকর্মীকে-তার কোন ইয়ত্তা বা কোন হিসেব-নিকেস নেই।

বস্তুত: গোটা পৃথিবী জুড়ে এই একটি বছর (২০২০) জুড়ে চলছে এক ভয়াবহ গণহত্যা যার কোন নজির এতকাল পৃথিবীতে ছিল না।
এই গণহত্যা প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছেন বিশ্বের খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিকেরা। তাঁরা নানা দেশেই আবিস্কার করে সদ্য পৃথিবীর বাজারে ছেড়েছেন করোনার ভ্যাকসিন। ইউরোপ-আমেরিকা ও প্রাচ্যের বেশ কিছু দেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগও শুরু হয়েছে। ভ্যাকসিন আবিস্কারক বিজ্ঞানীরা প্রকৃতই যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন করোনা ভাইরাসকে নির্মুল করতে, কোটি কোটি মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে।
অন্তত: আরও তিন মাস ধরে বিশ্বের দেশগুলিতে নানা বয়সী সুস্থ-অসুস্থ মানুষের মধ্যে-নারী ও পুরুষদের মধ্যে প্রয়োগের মাধ্যমেই সঠিকভাবে জানা সম্ভব হবে ভ্যাকসিনগুলি কতটা করোনা প্রতিরোধে সক্ষম।
আবার শীতকালকে সামনে রেখে করোনার দ্বিতীয় দফার আক্রমণ নতুন করে শংকিত করে তুলেছে বিশ্ববাসীকে। এই দ্বিতীয় ঢেউ এর আঘাত যত মৃত্যু হয় ততই মঙ্গল।

এই করোনার যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে তাতে সর্বত্র ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির কবলে পৃথিবীর সকল খাত। বিমান পরিবহন, ট্রেন সার্ভিস, জাহাজ চলাচল খাতগুলি সীমাহীন লোকসানের কবলে পড়েছে। অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকারত্বের শিকার। দ্রব্যমুল্যের ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বল্প ও মানুষ নিত্য সাংসারিক ব্যয় নির্বাহে বিপর্য্যস্ত। অভূক্ত-অর্ধভূক্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। সকল দেশের সরকার যদিও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছেন তা প্রয়োজনের তুলনায় নেহায়েতই অনুল্লেখযোগ্য।
২০২০ এর করোনায় সাংস্কৃতিক খাতের ক্ষতি অপূরণীয়। সঙ্গীত বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়গুলি বন্ধ, সঙ্গীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, নাট্যানুষ্ঠান, সিনেমাহলগুলি বন্ধ। বন্ধ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শুটিং। বিনোদনের সকল পথই বন্ধ করে দিয়েছে করোনা।

এত কিছু সংবাদের মধ্যে দুটি বড় মাত্রার সুসংবাদ হলো-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাজুড়ে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু প্রতিরোধে ইচ্ছাকৃতভাবে নিস্পৃহ থেকে অসংখ্য মানুষকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর শিকারে পরিণত করেছেন। চীনকে এই ভাইরাস সৃষ্টি ও বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার এবং এ কাজে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা চীনের সহযোগি বলে উত্থাপন করে নিজ দেশের ক্ষেত্রে তাঁর দায়িত্বে ইচ্ছাকৃত অবহেলা করে মারাত্মক অপরাধের ও বর্ণবাদ বৈষম্য সৃষ্টির প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তাই তাঁর পরাজয় বিদায়ী বছরের উৎকৃষ্টতম ঘটনা। আমেরিকাবাসীরা এই অহমিকায় ভরা, দায়িত্বহীন, বর্ণবাদের ও সাম্প্রদায়িকতার রক্ষককে ভোটে হারিয়ে গোটা গণতান্ত্রিক বিশ্বের ধন্যবাদের সার্থে পরিণত হতে পেরেছেন।
অপরটি হলো এত বিপুল সংখ্যায় সকল দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বিশ্বব্যাপী ঘটলেও সমাজতান্ত্রিক কিউবায় আক্রান্তের সংখ্যা ১১,২০৫ এবং মৃত্যু মাত্র ১৪২ (২৮ ডিসেম্বর, ২০২০ পর্য্যন্ত) এ রাখতে পেরে গৌরবের দাবী করতে পারে। অনুরূপভাবে চীনের নিকটবর্তী সমাজতান্ত্রিক দেশসভিয়েতনামে আজতক সংক্রমিত হয়েছেন ১,৪৪১ জন এবং মৃত্যু ঘটেছে মাত্র ৩৫ জনের, ভারতে ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যু ঘটা সত্বেও কমিউনিষ্ট শাসিত রাজ্য কেরালা ২,৯৭৬ এ করোনা মৃত্যু সীমিত রাখতে পেরেছে। অষ্ট্রেলিয়ায় এ যাবত ২৮,৩১২ জন সংক্রমিত এবং মৃত মাত্র ৯০৮ নিউজিল্যান্ডে আক্রান্ত ২,১৪৪ এবং মৃত মাত্র ২৫।
এবারে চীনে প্রায় দেড়শত কোটি মানুষের মধ্যে এযাবত আক্রান্ত ৮৬,৯৭৬ এবং মৃত মাত্র ৪,৬৩৪। উল্লেখ্য, এই চীনেই করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি।
এই কম মৃত্যুর দেশগুলি প্রমাণ করেছে, নিয়মকানুন কড়াকড়িভাবে মানলে করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। (গুগল্স্ থেকে সংগৃহীত)

নববর্ষ-২০২১
স্বাগত বিপুল আশাবাদের নতুন বছর ২০২১। উপরের বর্ণনাগুলি থেকেই মূর্ত হয়ে উঠেছে নতুন বছরে বিশ্ববাসীর আকাংখা কি? করোনা ভাইরাসের হাত থেকে তার দ্বারা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বন্ধ করাই হলো এ বছরের কাছে সকলের প্রত্যাশা। আসলে ব্যাপকভাবে পৃথিবীব্যাপী প্রয়োগের বছর হবে ২০২১। এই ব্যাপক মানে আসলে কতটা তা আজও অনুমান করা যাচ্ছে না। তবে পৃথিবীর ২৫ ভাগ মানুষ যদি ভ্যাকসিনটি ২০২১ এর মধ্যে পেয়ে যান তবে সম্ভবত: দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করবে এর সুফল।
২০২১ এ তা হলে বাদবাকী সবাই ভ্যাকসিন পেয়ে যাবেন-নিশ্চিত করেই বলা যায় কারণ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থাগুলি ব্যাপক সংখ্যক ভ্যাকসিন উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করবেন তাঁদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই।

তবে আমাদের মত গরীব দেশগুলিতে কি হারে ভ্যাকসিন দেওয়া কখন (কোন মাস) থেকে শুরু হবে তা এখনও অনিশ্চিত। প্রত্যাশা এই সকল প্রতিবন্ধকতা সফলভাবে মোকাবিলা করে দ্রুত ভ্যাকসিনেশন শুরু এবং শেষ হোক। মানুষ বাঁচুক। মানুষের হতাশা কাটুক।
অর্থনীতি সচল হয়ে উঠুক পৃথিবীব্যাপী। কলকারখানা-কৃষি উৎপাদন চালু হোক ব্যাপক হারে। বেকারত্ব দূর হোক। শিক্ষার অচলাবস্থা কাটুক। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পুনরুজ্জীবিত হোক।
আমেরিকার ট্রাম্পের মতো পৃথিবীর সকল সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনায়কের পতন ঘটুক।
বাইডেন আমেরিকার মানুষকে করোনামুক্ত, বর্ণবাদ মুক্ত, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করে গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছেন তা পরিপূর্ণভাবে প্রতিপালন করুন।
বেশী প্রত্যাশা নয়-এটুকুই হোক অন্তত।
স্বাগত ২০২১।

রণেশ মৈত্র
সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ
সাংবাদিকতায় একুশে পদক প্রাপ্ত।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments