চিরমুক্তিতে আজাদ রহমান । অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  

 

পরপারে আজাদ রহমান

অনেকে হয়তো জানেন না  অনেক পিছিয়ে থাকা তখনকার সমাজ আর সময়ে আজাদ রহমান এমন একটা ছায়াছবি নির্মান করেছিলেন যা আজকের দিনেও কেউ নির্মান করতে ভাববেন।  আমাদের যৌবনের শুরুতে দেহমনে সাড়া জাগানো এই ছবির নাম ছিলো ‘গোপন কথা’। আমাদের সিনেমার ইতিহাসে প্রথম নির্মিত শরীর বিষয়ক বিজ্ঞান ভিত্তিক ছায়াছবি। যৌনতা না বলে আমি বলবো  এটি ছিলো শরীর  ও মনকে জানার  একটি বাস্তবসম্মত চলচ্চিত্র। তখন ই আমরা জানতাম তিনি আধুনিক ও ব্যতিক্রমী।

সিডনি  পুরোদমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে। তাই এখন সপ্তাহে আবার মাত্র দু দিন নিজের। যাকে বলে উইকেন্ড। শনিবার রাতে সোফায় শরীর এলিয়ে গন্ডি ছবিটা দেখছিলাম। দেখা শেষে  ও  রেশ ছিলো কিছুটা। রাতদুপুরে ঘুমাতে গিয়েই পেলাম দু:সংবাদ। আমার এক অনুজ লিখেছে ” দাদা আপনি কি আজাদ রহমানকে নিয়ে লিখবেন না”? আমি তখন ই ধরে নিয়েছি নির্ঘাৎ আরেকটি দু:সংবাদ আমার জন্য। এবং তাই হলো।  স্বপ্নে ও ভাবিনি হঠাৎ করে এমন একটা খবর পাবো।

গুণী মানুষ, দেশখ্যাত মানুষের চলে যাওয়া সবসময় বেদনার। তাঁদের স্মৃতি তাঁদের গুণ নিয়ে কর্ম নিয়ে বলার বা লেখার জন্য আছেন হাজার মানুষ। কিন্তু কিছু কিছু সম্পর্ক থেকে যায় মনের গভীরে। এই সম্পর্কগুলো হয়তো গড়ে ওঠে সে কারণেই যে একসময় তাই হবে বাঁচার প্রেরণা । হয়ে থাকবে আজীবন অনুগামী ছায়ার মতন। আমি গান জানি না। গান ভালোবাসি নিজে নিজে শৈশব থেকে গাই ও। মা আমাকে বাড়ীতে মাষ্টার রেকে গান শেখানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু  আমার মন ছিলো অন্যদিকে। আমি ভালোবাসতাম ছড়া কবিতা লিখতে। আর গান গুণগুণ করে নিজেই বাসা বেঁধে বেঁচে রইলো মনের গোপনে। কিন্তু কেন জানিনা সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা কিংবা আমার অনুরাগ সরস্বতী বোঝেন। তা না হলে কি মান্না দে’র মতো কিংবদন্তী শিল্পীকে উপস্হাপন করার সুযোগ পেতাম আমি? সুযোগ মিলতো কি জগজিৎ সিংকে কাছ থেকে দেখার? এর বাইরেও আমাদের দেশের প্রচুর গুণী শিল্পী আমার সাথে নিবিড় বন্ধনে বাঁধা। আমি বরাবর মেনেছি এগুলো  আমার শিরোধার্য কোন আর্শীবাদ।আজ যাঁর কথা লিখছি তাঁর সাথে আমার ভালোবাসা বা স্মেহাশ্রিত হবার খুব কোন কারণ ছিলো না।

সিজনিতে আজাদ রহমানের সাথে লেখক অজয় দাশগুপ্ত

অনেক বছর আগে  একুশে বইমেলা সিডনি’র উদ্যেক্তারা তাঁকে নিয়ে একটা সেমিনার করেছিলেন। সেখানে  আমাকেও  আলোচক হিসেবে রাখেন তাঁরা। মাঝে মাঝে তাদের দয়ার শরীর বলে এমনটা হয়। সে দিন খুব বেশীক্ষণ থাকতেও পারি নি। তেমন করে ছবিও তোলা হয় নি। আমি আমার কথাগুলো বলে এবং আজাদ রহমান ও সেলিনা আজাদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাড়াতাড়ি চলেও এসেছিলাম। মনে আছে আমি এটা বলতে ভুলি নি জীবনে কিংবদন্তী বা কালজয়ী হতে খুব বেশী কাজের দরকার পড়ে না। সময় উত্তীর্ণ একটি কাজ ই যথেষ্ট। তেমন কয়েকটি কাজ আছে আজাদ রহমানের আর সেলিনা আজাদ এক গানেই বাজিমাত করেছেন বাংলাদেশে।
চলে  আসার পর অনেকেই বলেছিল উনি  আমার কথার প্রশংসা করে  আমাকে খুঁজেছিলেন। ধরে নিয়েছিলাম বড় মানুষদের সৌজন্য। কিন্তু না এরপর যখনই  আসতেন  ফোনে কথা হতো নয়তো বা দেখা হয়ে গল্প  আর আড্ডা। অনেক না বলা কথা ছিলো তাঁর।  আমি জানি না তিনি সে সব লিখে রেখে যেতে পেরেছেন কি না।  না পারলে আমাদের গানের জগত বিশেষত বাংলা খেয়াল গানের জগত  মূল্যবান এক উপহার হারিয়েছে। যা আমাদের আজকের বাস্তবতায় ছিলো জরুরী। মিতাভাষী মানুষ , মুখে একটুকরো হাসি লেগেই থাকতো। আধুনিক গানের আকাল আর সর্বনাশের কথা উঠলে কখনো হৈ হৈ করে ঝাঁপিয়ে পড়তেন না। মৃদুকন্ঠে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন সর্বনাশ কোথায় হচ্ছে বা কারা করছে। তাঁর ভেতর একটা প্রচ্ছন্ন অভিমান থাকলেও তিনি নাখোশ নাদান টাইপের ছিলেন না। এখন যেমন আমার পদক চাই আমার স্বীকৃতি চাই আমার টাকা চাই সম্মান চাই বলে বড় বড় নামধারীদের আহাজারি তেমন কিছু দেখি নি কখনৌ । বরং কেমন একটা প্রসন্নতা ছিলো চোখে মুখে। তৃপ্ত মানুষের এক অসাধারণ মুখচ্ছবি ছিলেন তিনি। কতবড় মাপের সঙ্গীত পরিচালক ও সুরস্রষ্টা তা তাঁর গানগুলো শুনলেই বোঝা সম্ভব।
জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’, ‘মনেরও রঙে রাঙাব’, ‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’, ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি’সহ বহু গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আজাদ রহমান। কোনোটির সুরকার তিনি, কোনোটির সংগীত পরিচালক।রাজ্জাক পরিচালিত প্রথম ছবি ‘অনন্ত প্রেম’-এ ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’ গানটি ব্যবহৃত হয়। খুরশিদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে আজাদ রহমানের সুর করা এই গানের কথা লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীত পরিচালক আজাদ রহমান ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেয়ালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কলকাতার জনপ্রিয় বাংলা ছবি ‘মিস প্রিয়ংবদা’র সংগীত পরিচালনা দিয়ে চলচ্চিত্রের গানে তাঁর পথচলা শুরু। এই ছবিতে তাঁর পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরতি মুখোপাধ্যায়। বাংলাদেশে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ ছবিতে। এরপর ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘এপার ওপার’, ‘পাগলা রাজা’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘আমার সংসার’, ‘মায়ার সংসার’, ‘দস্যুবনহুর’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘মাসুদ রানা’সহ বহু ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি।
বাংলা একাডেমি থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে আজাদ রহমানের লেখা সংগীতবিষয়ক বই ‘বাংলা খেয়াল’। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘গোপন কথা’ নামের একটি সিনেমা বানিয়েছিলেন।  বয়সী অনেক মানুষের মতে একমুখী ট্রাফিক মানে কেবল নিজে বলতেন না। শুনতেনও।কি করে যেন তাঁর ধারণা হয়েছিল অামি ভালো লিখতে পারি। গান বাজনা বা সংস্কৃতি বিষয়ে অামার হালকা লেখা গুলো ও ভালো লাগতো তাঁর। তিনি গল্প করেছিলেন অতীতের। কি ভাবে একটা মাত্র অর্কেস্ট্রা দিয়ে ঢাকায় অাধুনিকায়নের শুরু করেছিলেন। কেমন করে জন্ম দিয়েছিলেন, মনের রঙে রাঙাবো কিংবা জন্ম আমার ধন্য হলো এমন সব গানের।
বছরও পুরোয়নি এখনো এক দুপুরে অচেনা ফোন নাম্বার থেকে ফোন এলো মোবাইলে।  ফোন ধরে অবাক হয়েছিলাম । অনেকদিন পর তিনি আমাকে ফোন করেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি যখন দেশে থাকেন তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়। গুণী মানুষ নামী মানুষ কতো কাজ তাঁর। যোগাযোগ ও স্বভাবত ই থিতিয়ে আসে। যদিও মনে থাকেন মনজুড়ে থাকেন । জানলাম  তিনি  আমাকে খুঁজছেন। পরদিন তাঁকে ঘিরে বাংলা একাডেমি নামে সিডনির প্রতিষ্ঠানটি  আয়োজন করেছিল সেমিনার ও গান শেখার  আসর। তাঁর অনুরোধ অথবা  আবদার বা আমাকে  যেতেই হবে। আমি তা আদেশ বলে ধরে নিয়েই  গিয়েছিলাম। আমার খুব একটা ইচ্ছে ছিলো না কারণ জায়গাটা দূরে আর আমি দীপা না থাকলেই রাস্তা গুলিয়ে ফেলি। সেবার ও তাই হয়েছিল। কাছাকাছি গিয়ে গাড়ী নিয়ে একবার এদিকে যাই আরেকবার ওদিকে। জিপিএ নামের  যন্ত্রের সব আদেশ মেনে  ড্রাইভারের চলা অসম্ভব। একটু বিলম্বে হলে ও পৌঁছেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে ভাগ্যিস আমি গিয়েছিলাম সেই পড়ন্ত দুপুরে। তা না হলে আজ আমার কষ্ট আর গ্লানির সীমা থাকতো না। কোনদিন কোনকালে তাঁর সান্নিধ্য পাবার ও সুযোগ নাই আর।
যাবার পর অনুষ্ঠানের ফাঁকে  আমাদের গল্প চললো  অবিরল।। যতোক্ষণ ছিলাম তাঁর পান্ডুলিপি, ওপার বাংলায় সমাদৃত তাঁর খেয়াল বিষয়ক গবেষণার কথা হলো। তারপর গান।
যেখানে সেলিনা অাজাদ গাইবেন সাথে তাঁর গুণী দুই কন্যা সেখানে  আমাদের কন্ঠ মেলানো স্পর্ধা জেনেও তাই করতে হয়েছিল। শেষ টা ওখানে হতে দিলেন না। চলে  আসার  আগে কিছু বলতেই হবে।  আমার বলার সময়  সেলিনা আজাদের হাসি মুখ  আর আজাদ রহমানের তৃপ্তিমাখা মুখ  মনে করিয়ে দেয় কতোটা ভালোবাসতেন। কথা ছিলো  আবার দেখা হবে।  আবার  আসবেন সিডনিতে। সত্যি বলছি এমন সুখী চমৎকার দম্পতি বিরল। সাধারণত শিল্পী  বা গুণী দম্পতিদের ভেতর ফারাক থাকে বেশীল কিন্তু যাতা তাঁদের চেনেন সবাই জানেন কতটা গ্যির আর মনোময় ছিলো তাঁদের বন্ধন। আজ সে বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। সেলিনা  আজাদের জন্য মনটা বিষাদে ভরে  আছে।

আজাদ রহমান বাংলাদেশে নানা কারণে পাইওনিয়ার অগ্রদূত। তাঁকে সময় মূল্যায়ন করবেই। মনে রাখবে লাখো কোটি মানুষ মনে রাখবে আগামী দিনের গায়ক গায়িকা সঙ্গীত প্রেমিকেরা। প্রয়াত সুরকার গায়ক  আজাদ রহমানকে ভোলা অসম্ভব আমার।
ভালো থাকবেন  আপনি। প্রণাম।

অজয় দাশগুপ্ত
লেখক ও কলামিস্ট
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।