চোখ বুজলেই হুড়মুড় ভেঙ্গে পড়ে শিরিষের ডাল । প্রতীক ইজাজ

  •  
  •  
  •  
  •  
প্রতীক ইজাজ

আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, অনুগ্রহ করে লিদিয়ার বাদামী চোখ থেকে কেউ চোখ ফেরাবেন না। ওখানে কতকগুলো শুভ্র জোনাক পুর্ণিমা রাতের মতো দুধসাদা আলো ছড়াচ্ছে। সে আলোয় সোনাঝরা রোদ হয়ে মুক্তোর মতো নাচছে উঠোন। পেখম মেলে ধরেছে ময়ূর। এমন মায়াকাড়া আলো শতসহস্র বছর পর কদাচিৎ দেখা মেলে।
এই যে আপনি কপালে টিপ পড়েছেন, চোখে কাজল, মুছে ফেলতে পারেন। চুলে বিনুনির দরকার নেই। কেননা নিশা এখন লড়ছে নিস্তব্ধ হীমশীতল ঘরে। ওখানে ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো টিক টিক বাজছে মানুষের শ্বাস। অক্সিজেন যাচ্ছে, আসছে, আয়ুর রেখাগুলো কেবলই ওলটপালট হচ্ছে শিশুর হাতের পেন্সিলের মতো। কে জানে, কখন কোন সন্ধ্যায়, জানালাটা বন্ধ হয়ে যায়- নিশা এখন সেদিকেই তাকিয়ে। ওর চোখ লাল, জল বাঁধ মানে না। তবুও শক্তপিঠ, বুকের ভেতর দুদ্দাম বাজে তীরধনুকের টান।
আমাদের মঈন উদ্দিনকে মনে আছে নিশ্চয়। বীর যোদ্ধা, লালপথ মিছিলের সাহসী মানুষ। সাদা অ্যাপ্রনে জড়ানো আইসিইউ কক্ষে স্থির তাকিয়ে থাকতো শীতল হয়ে আসা চোখগুলোর দিকে। স্বজনরা কাঁদছে। অনিশ্চিত যাত্রাপথের সময় গুণছে কেউ কেউ। মঈন উদ্দিন কিছুই ভাবতো না। শক্ত হতো চোয়াল, পিঠ, পেশী। এক হলুদ দুপুরে সেও চোখ বুজলো। ঘরে ফেরা হলো না আর।

লিদিয়া ঘুমিয়ে পড়েছেন। প্রিয় মাতৃভুমি সিসিলি দ্বীপে শেষবারের জন্য যাওয়া হয়নি। ভিল্লা সেরেনা বৃদ্ধাশ্রম, চেনা প্রেদোরে, প্রাচীন মন্দির- ছাড়েনি লিদিয়াকে। চোখে জোস্না নিয়ে চিরঘুমঘোরে লিদিয়া এখন গীর্জার ধ্বনি শোনে।
এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে শেষতক নিশার ঘর জুটেছে কি না, জানি না। সাদা অ্যাপ্রুন, স্টেথিস্কোপ, নিত্যনতুন ভয়- এখনো তাড়া করে ফেরে কি না, তাও জানি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, নিশারা শেষ হয় না। অন্ধকার সুড়ঙ্গে শেষ আলোর মতো নিশা, লিদিয়া, কিংবা মঈন উদ্দীনরা জেগে থাকে অসীম শক্তি হয়ে।
জেগে আছি আমরাও। মৃতন্ময় জেগে থাকা। রাত যায়। সকাল হয়। দুপুর গড়ায়। বিকেলের আলো এসে নামে জানালার কার্ণিশে। নির্ঘুম। চোখের নিচে কালি। কারো মাথা ন্যাড়া। মুখভর্তি দাড়ি। যে ছেলেটার গোফের রেখা উঠেছিল সবে, সেও এখন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো নখে-চুলে আউলাবাউল। যে লোকটা অবিরত গান গাইতো, মুখর করে রাখতো আড্ডা, চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যেতো পা, নির্বুদ্ধ মানুষের মতো ও এখন ছেড়ামেঘ। কথা বলে না, গান হয় না, সুরগুলো আর্তনাদ হয়ে বেরুই। গলার কাছে কুন্ডলি হয়ে থাকা অনুচ্চারিত শব্দগুলো, কবে কোন বাতাসে মেঘমালা হয়ে আচমকা টান দেবে, সেদিকে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ। কেবলই শীতল পাতা ঝরা মায়াবী সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করে!
বলুন তো, লাল জবাফুল খোপার মেয়েটি এখন কি করছে? ও কি এখনো রোজ দুধ দিতে যায় সবুজ ফ্ল্যাটে? এখনো কি জানালার ফাঁক গলে বাড়ির কিশোর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার কাজল চোখের দিকে? নিচের গ্যারেজে ব্যাট হাতে যে শিশুটি শুন্যে ছক্কা হাকাতো, প্রায় তার বল হারিয়ে যেতো জঙ্গলে; সে এখন ঘরবন্দি বিকেল বা দুপুরে পায়ে বল নিয়ে মুখভার বারান্দায় গোমড়া হয়ে দাঁড়িয়ে রয় কিনা? যে ছেলেটা রোজ ময়লা নিতে কলিং বেল টিপতো জোরে জোরে, সে এখন কি করছে? কিংবা রাস্তায় বেরুলেই যে বৃদ্ধ ‘কলা নিবেন না’ বলেই হেসে দিত; ওকি কি এখনো বেঁচে আছে? নাকি বস্তাসমেত কলা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে দমবন্ধ কোনো ঘরে!
এসব গল্পে বুদ বসে থাকা লোকটার পিঠে ব্যথা জমে গেছে। চুলে জট আসছে, চোখগুলো এখন আর বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না, ঝাপসা লাগে। হাসি নেই। প্রিয়শব্দগুলো কোন নিরুদ্দেশে, কে জানে। ঘরে এতগুলো মানুষ, তবুও গো গো করে পুরনো সিলিং ফ্যানটাই কেবল কথা বলে যায়। কথা, নাকি উপহাস? টান করা শিরদাঁড়া বেয়ে এখন কেবলই রক্ত ঝরে, ক্ষোভ বেদনা জমে। তবুও সময় ফুরোয় না। সময়গুলো বদমেজাজী হয়ে মাথায় চেপে বসে।

ছবিটি এঁকেছে- অমর্ত্য আরিয়ান রূপাই। চতুর্থ শ্রেণি। উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল। কাকরাইল। ঢাকা। মাধ্যম- মোমরঙ।

জানালার ফাঁক গলে মাঝে মধ্যেই চোখ চলে যায় সুনসান রাস্তায়। ওখানে কিছু মৃত ছায়া নড়ছে। ছায়াগুলো মানুষের, নাকি শুকনো ঝরাপাতার মতো রুগ্ন জীর্ণ কিছু সময়ের এপিটাফ- কে তার খোঁজ রাখে। এ পথ ধরেই রোজ অ্যাম্বুলেন্স যায়, আলখাল্লা গায় মানুষ যায়। ভেতরে মানুষ, নাকি কিছু কলকব্জা, দেখি না। চোখে ভাসে অক্সিজেনেটর, মনিটর, মুখোশমুখ।
রমনাটা কেমন আছে? সড়কদ্বীপের চারাগুলো নিশ্চয় এতদিনে বৃক্ষ হয়েছে। যে বৃক্ষে সবুজ বল্কল এসেছিল, তার পাতায় ফুল ফুটেছে হয়তো। একটা গাছ ছিল, লিকলিকে, রোগা। রোজ দেখতাম লোকটা গোড়ায় পানি ঢালছে, গোবর দিচ্ছে, আলগা করছে মাটি। ও কি বেঁচে আছে, নাকি জলকাদাহীন পোড়ো মানুষের কথা ভাবতে ভাবতে একখন্ড পোড়ো কাঠ হয়েছে!
কাল ঘুম হয়নি। চোখ বুজলেই হুড়মুড় ভেঙ্গে পড়ে শিরিষের ডাল। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ভীড় করে মুখ, সুখ, আধপড়া উপন্যাস। ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে পাংশুটে ধুলোজমা হলুদ চোখ। বারান্দার তুলসি গাছ, জবার টব, পাখিদের খড়বিচুলি রাখা ঝুলন্ত মাটির পাত্র, অন্ধকার কাকতাড়ুয়ার মতো দোলে।
আমাদের কোনো গল্প নেই। তর্ক নেই। পায়ের নিচে শবদেহের মতো মটকা মেরে পড়ে থাকে তুখোড় মুখর আড্ডা। এখন শরীরে বাতাস এসে লাগলেই আর্তস্বর বেরুয়। বাজখাই পাখির মতো কর্কশ গলা নিয়ে কে যেন বলে- সাবধান! বাতাসে ছেড়া মেঘ, রক্তবমি, মৃত মানুষের কঙ্কাল। চোখ ভিজে যায় জলে। ভয়ে শোকে কুকড়ে আসা শরীর কেবলই কাঁদে।
অলস ড্রয়িং রুমে লাল সংকেত নিয়ে টিভি চলে। গান শুনি। নাচ দেখি। সব মুখ ভাসা ভাসা। জল ভাসে, শ্যাওলা, কচুরিপানা ভাসে। আমরা কেবলই আক্রান্তের খবর পাই। মৃত্যুর রেখাগুলো ক্রমাগত বাড়ে। আমরা নিজেদের সঁপে দেই মন খারাপের ঘরে ঘরে, বেদনার হাতে।
ঘরে খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে। শিশুর দুধ, ফ্রক, আদর কমছে। ছেলেটা কাছে আসতে পারে না। ছায়া ঘিরে বৃত্ত হয়ে নাচে। নাচগুলোর মুদ্রা নেই, হাত পা নড়ে, দোলে। এ ঘর থেকে ও ঘর, একচিলতে বারান্দা, জানালার কার্ণিশ, কোথাও বাতাস নেই। বাতাসগুলো হাওয়া হয়ে গেছে। ডানায় কান্না নিয়ে বাতাসেরাও এখন ঘরছাড়া।
বহুদিন কাজ না পেয়ে আধপেটা মানুষের ঘরে মন টিকে না। ইতিউতি করে, বাইরে বেরুবার ফাঁক খোঁজে। চুলোর আগুনে তেজ কমে আসছে। থালার পাতে কমছে সব্জি, ডাল, লালমরিচের বাটা। মাঝরাতে পেটে খিদের মোচড় নিয়ে হঠাৎ ছেলেটা জেগে উঠলে, হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে মা।
লোকগুলো মারা যাচ্ছে। সংক্রমন বাড়ছে। কে কোথায় কখন হারিয়ে যাচ্ছে, কার সঙ্গে কার শেষ দেখা কখন, ঘুম থেকে কে আর জাগছে না, পাশ ফিরলো না কে, আমরা তার খবর রাখি না। কেবলই পানির শব্দ পাই, পাড় ভাঙ্গার শব্দ। জলের তোড়ে ভেসে যায় ঘর সংসার, হাতের মেহেদি, আমাদের শখের জীবন!
আহা, কাল সকালে উঠে যদি দেখি, শহরে বৃষ্টি নেমেছে, বৃক্ষের বল্ককে সবুজ ধরেছে আবার, উধাও কাক দুটি শিরিষের ডালে এসে বসেছে; যদি দেখি মানুষের মৃত্যু থেমেছে, যন্ত্রণায় কাতর মুখ শ্বাস নিতে পারছে কচি সবুজ পাতার মতো, মেয়েটার মুখের ফোস্কা সেরে গেছে, মা উদোম পিঠ মেলে ধরেছে রোদে; যদি দেখি হাট-বাজার ভরে গেছে মাছে লাউ কুমরোয়, দোকানপাট খুলেছে, হাসিমুখ নিয়ে পাড়ার অর্বাচিন বৃদ্ধ পানের পিক ফেলছে যেখানে সেখানে, রিকসা যাচ্ছে, বাতাস হাসছে, রোদ উঠছে, জল কল কল ধ্বনি তুলে নাচছে কিশোর-কিশোরীরা; যদি দেখি ঘুমঘোর সকালে চোখের সামনে ছেলেটি মেলে ধরেছে মোমরঙে আঁকা দোচালা ঘর, সবুজ বৃক্ষ, পালতোলা নৌকা –
দিব্যি দিয়ে বলছি, আমি তোমাদের জন্য উজার করে দেবো আমার সবটুকু ভালবাসা, প্রিয় গান, কবিতার খাতা। টান করে শিরদাঁড়া আমি আবার দাঁড়াবো কৃষ্ণচূড়ার নিচে, লাল পতাকা হাতে আগুনের মিছিলে নামবো, জলে মুখ ধুয়ে ফর্সা চোখে গাইবো আমার সবচেয়ে প্রিয় গানটি। আমরা বৃত্তাকারে নাচবো, হুল্লোড় জুড়বো, শহরের সমস্ত চায়ের দোকানগুলো উন্মুক্ত হবে তোমাদের জন্য। সত্যি করে বলছি, আমি তোমাদের পায়ের নিচে জারুল ফুল হয়ে বিছিয়ে দেব ভালবাসার অর্ঘ্য। আমি তোমাদের জন্য রচণা করবো এক বুক পদ্মপুকুর।
আহা, এমন নির্মল হাসিমুখ দিনের জন্য কতকাল অপেক্ষা আমাদের, কতদিন!

(১. ইতালির বেরগামো প্রভিন্সের প্রেদোরে পৌর এলাকার ভিল্লা সেরেনা বৃদ্ধাশ্রমের প্রধান নার্স লিদিয়া লিয়ত্তা (৫৫)। বৃদ্ধাশ্রমের অবসরের পর মাতৃভূমি সিসিলি দ্বীপে ফিরে যাবার ইচ্ছে ছিলো লিদিয়ার। করোনা মহামারিতে টানা একমাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে ১৬ এপ্রিল বৃহষ্পতিবার সবাইকে কাঁদিয়ে ‘না ফেরার দেশে’ পাড়ি জমান ইতালির এই জাতীয় বীর। ২. নিশা সমাদ্দার। পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরের নারী চিকিৎসক। করোনা রোগীর চিকিৎসায় নিবেদিত মেয়েটির সেই ‘হোমলেস’ সময়ের গল্প, চোখে জল ঝরিয়েছিল। কাল দেখলাম সাদা পিপিই পরিহিত রোদ্দুরকরোজ্জ্বল ছবি তার ফেসবুকে। ৩. মঈন উদ্দিন বাংলাদেশের সিলেটের এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। লোকে বলতো গরীবের ডাক্তার। করোনা রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে সদাহাসিমুখ মানুষটি নিজে করোনায় আক্রান্ত হন। ১৫ এপ্রিল ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মারা যান। দেশে সম্মুখসারির যোদ্ধা চিকিৎসকদের মধ্যে তিনিই প্রথম উৎসর্গ করেন নিজেকে )

৬ মে ২০২০
পশ্চিম মালিবাগ, ঢাকা।