জগতের সকল পুরুষ ভালো থাকুক । কাজী সুলতানা শিমি

  •  
  •  
  •  
  •  
কাজী সুলতানা শিমি

১৯শে নভেম্বর আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস। ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশী দেশে এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। অথচ এ নিয়ে তেমন কোন মাতামাতি নেই কোথাও। বলাবাহুল্য নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। উভয়ের উপস্থিতি ছাড়া এ জগত সংসার অচল। প্রসঙ্গত বলি, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিক ড. আকিমুন রহমান পুরস্কার গ্রহণের সময় তার বক্তব্যে বলেছিলেন, প্রকৃতি বা রাজনৈতিক উত্থানপতনকে পড়ার পাশাপাশি পুরুষকেও পড়তে হবে কারণ, পুরুষ খুব ইন্টারেস্টিং বিষয় কেননা, মনঃস্তাত্তিক জটিলতা নারীদের চেয়েও পুরুষদের অনেক বেশী”। সত্যিই তো পুরুষদের মনঃস্তাত্তিক ব্যাপারটা নিয়ে নিরপেক্ষভাবে আমরা আসলেই কি তেমন ভেবেছি! হয়তো না। তবে আমার মাঝে মাঝে খুব কৌতুহল হয়। এই যে নানা ঘটনায় বা জটিলতায় আমরা প্রায়শই সরাসরি পুরুষকে দোষারোপ করে বসি তার আগে তার মনঃস্তাত্তিক অবস্থাটা কি আমরা জানতে চেষ্টা করি কখনো! মেয়েরা তাদের অনুভূতি গুলো যতো সহজে অন্যর কাছে ভাগাভাগি করতে পারে কিংবা কেঁদেকেটে বুক হাল্কা করতে পারে, পুরুষদের কি তেমন কোন জায়গা আছে? তারাও তো স্বাভাবিক অনুভূতির একজন মানুষ এবং নানা প্রতিকূলতার ভিতর, সমস্যার ভিতর সময় পার করে। কিন্তু সে সময়টুকু তারা কিভাবে মানিয়ে নেয় সেটা জানার প্রতি আমরা খুব একটা মনযোগী হইনা।

প্রকৃতির মাঝে ফুল, পাখী, লতাপাতার মতো অকারণ ভালোলাগার অনেক কিছুই আছে। সেভাবেই বৈপরীত্য নয় বরং ভালোলাগারই বহুরৈখিকতায় নারী-পুরুষের সম্পর্কের নানা বিন্যাস আছে। দৃষ্টিভঙ্গীর সমতা আর চিন্তা-ভাবনার মিল হলে এই  সম্পর্কগুলোর স্বতঃস্ফুর্ত বিকাশ ঘটে। তবে সব সম্পর্কেই যে নাম থাকে তাও নয়। আজকের নারীদের কাছে পুরুষদের আবেদন অনেকটা সেরকমই। তাই শুধু বাহ্যিক রূপ লাবন্যের পাশাপাশি মেয়েদের বা সঙ্গিনীর এই মানসিক উৎকর্ষতাও অনেক পুরুষ চায়। সেটা অনেক মেয়েই গুরত্ব দিয়ে ভাবেনা। সেকারনেও হয়তো অনেক সময় দুরত্ব সৃষ্টি হয়। মনের কাছাকাছি থাকবে, যে কোন কিছুই প্রান খুলে বলতে পারবে এমন সঙ্গীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ আজ স্বাভাবিক। বলা যায় যুগের চাহিদা। পাশ্চাত্য সভ্যতায় নারীর শাররীক শুচিতাই পুরুষদের একমাত্র আগ্রহ নয়। সেভাবেই  গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে মেয়েদেরও কিছু ভুমিকা আছে বৈকি।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মনঃস্তাত্তিক বিষয়ে অনেক পার্থক্য।  এদেশে এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের আলাদা বরাদ্দ থাকে কিভাবে সেক্স বিষয়ে, প্রজনন পদ্ধতি ও প্রজন্ম সৃষ্টিতে শিক্ষা দেয়া হবে। এটা হেলথ ক্লাসের একটা অংশ। প্রাইমারী স্কুলেই প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয় আর বিস্তারিত পড়ানো হয় হাইস্কুল থেকেই। ছেলে ও মেয়েদের শাররীক পরিবর্তন, বয়ঃসন্ধি কাল, প্রজনন, গর্ভ নিরোধন করার কৌশল ইত্যাদি ইত্যাদি শেখানো হয়। যার ফলে এদেশে বড়ো হওয়া ছেলেরা মেয়েদের প্রতি অহেতুক কৌতুহল, অসম্মানিত মন্তব্য কিংবা অযথা উত্যক্ত করা থেকে বিরত থাকে তারা। বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা দেখা যায় তাদের আচরণে। তাদের কাছে মেয়েদের দৈহিক সৌন্দর্যই একমাত্র বিষয় নয়।
কিছুদিন আগে দেখলাম বিশ বছর বয়সী ক্যাথরিন স্টোন তার কুমারীত্ব বিক্রি করার ঘোষণা দিতে তার দাম উঠেছে ৪ লাখ ডলার। নাভাদার নিষিদ্ধ পল্লী বা পতিতালয়ে অবস্থানরত ক্যাথরিন তার এই শরীর বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার পরিবারের প্রতি ভালোবাসার কারণে। ইনস্যুরেন্স না থাকায় আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়িটির কোন ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার কারনে তিনি নতুন একটি বাড়ি বানানোর প্রয়োজনে এই সিধান্ত নিয়েছেন। এই যে কুমারীত্বের ব্যাপারগুলো তা পাশ্চাত্যের পুরুষদের কাছে কোন বিষয়ই নয়। মেয়েদের মূল্য যে শুধু শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের উপর নির্ভর করেনা এই মানসিক সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করতে পাশ্চাত্য সভ্যতায় পুরুষেরা দৃষ্টিভঙ্গী অনেক এগিয়েছে। ধীরে ধীরে হয়তো সব পুরুষরাই পালটাবে।

কোন ঘটনা বা কারণে কোন পুরুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া হলে সেটা ঐ ব্যক্তিবিশেষ বা পুরুষের একক আচরণের ভিত্তিতে নেয়াই উচিৎ। কেননা একজন পুরুষ মানেই কিন্তু পুরুষ জাতি নয় তাই একজনের আচরণের ভিত্তিতে পুরো পুরুষ জাতিকে ঢালাও ভাবে দোষারোপ করা ঠিক নয়। পুরুষরা মূলতঃ সম্পর্কের ভিত্তিতে একেকজনের প্রতি একেকর কম আচরণ করে। কেননা সবপুরুষ সবার কাছে সমানভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেনা। সেকারণে কোনকিছু নিয়ে সমালোচনা করার আগে তাদের মনঃস্তাত্তিক ও সামাজিক অবস্থাটা বুঝে নিয়ে করতে হবে। বেশীর ভাগ সাহিত্য, গল্প, কবিতা মেয়েদের নিয়ে লিখা কিন্তু পুরুষদের নিয়ে লিখা খুব কমই দেখতে পাই। তখন মনেহয় পুরুষদের বোঝার ব্যাপারটা বোধহয় একেবারে আমলেই নিচ্ছিনা কেউ।
পরিবেশ অনেক কিছু নির্ধারণ করে। আসলে কে কোন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠে সেটার উপর ভিত্তি করেই তার আচরণ পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশে বড়ো হওয়া ছেলেরা একটা আধিপাত্যবোধ নিয়ে জন্মায়। তারা মেয়েদের অধঃস্তন ভাবতেই পছন্দ করে। সংস্কৃতি ও পরিবেশের কারণে খুব কমই বদলাতে পারে এ ভাবনাটুকু। আসলে সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই পুরুষদের আধিপাত্য নিয়ে যে সভ্যতা গড়িয়ে যাচ্ছে সেটাও একটা ব্যাপার। এই পৃথিবীর কেউই চায়না কারো কাছে হেরে যেতে তাই পুরুষই বা চাইবে কেন? তাদেরকে আত্নসমর্পন করাতে মেয়েদেরই কৌশল খুঁজে নিয়ে হবে। সে কারণেই তাদের মনঃস্তাত্তিক জটিলতা ও অবস্থান বুঝা খুব দরকার। আজকের বুদ্ধিদীপ্ত মেয়েদের সেটা না জানার কথা নয়! হয়তোবা জানেও! তাই ঘটা করে না হলেও মনে মনে ঠিকই চায় জগতের সকল পুরুষ ভালো থাকুক। অন্ততঃ আজকের দিনে।

কাজী সুলতানা শিমি
লেখক, কবি ও কলামিস্ট
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments