জনগণ আবার বিএনপিকে ফিরিয়ে আনবে: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার -কামরুল ইসলাম

  •  
  •  
  •  
  •  
কামরুল ইসলাম

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৪২ বছরে পা দিল, গত রোববার ১লা জুলাই ছিলো এটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। এই ৪২ বছর সময়টা কিন্তু কম নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদে থেকে একজন সামরিক ব্যক্তির হাতে গড়া রাজনৈতিক দলের এই দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়া যেমন ছোট বিষয় নয় তেমনি গায়ে-গতরে দলটির বিশাল অবস্থানও অনেক প্রাচীন দলের কাছে খুব ঈর্ষণীয়। একটা রাজনৈতিক দলের মূল শক্তির প্যারামিটার হলো জনভিত্তি, সেখানে ক্ষমতায় টিকে থাকাটাই আসল নয়। এমনকি কতবার ক্ষমতায় যেতে পারলো বা বিরোধীদলের আসনে বসতে পারলো তাও কিন্তু মৌলিক বিষয় নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসাবে যা বুঝায় তার ঘোষিত নীতি-আদর্শ কতটুকু অনুশীলন করতে পারছে, গঠনতান্ত্রিক নীতিমালা অনুযায়ী কতটুকু চলছে, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিধি কতটুকু বজায় রাখতে পারছে, রাষ্ট্র ও জনগনের স্বার্থে ভোটাধিকারে জনগণের ভোটের কতটুকু আস্থা রাখতে পারছে সেইগুলিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

দেশের অধিকাংশ জনগণ এখনো বিশ্বাস করে বিএনপি এদেশের গণমানুষের দল, তারা সরকারী দলে নয়, সরকারের সাথে লড়াই করে টিকে আছে। রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে তাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত কষাঘাত করে যাচ্ছে। তবুও ৪২তম জন্মদিনে ফুটে উঠেছে শুধু যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। বেশ কিছু কারণও আছে, প্রথমত দলের চেয়ারপার্সনকে বিনা কারণে জামিন না দিয়ে প্রায় ৬০০দিনের মত জেলে বন্দী করে রাখা হয়েছে, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৩৭টি মামলা। ২০০৭ সালের যে মামলাতে আটকে রাখা হয়েছে তখন তার বিরুদ্ধে তখন মামলা ছিল ৭টি আর তার বিপরীতে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা ছিল ১৩টি যেখানে খুনের মামলাও ছিল। আজ সেই ১৩টি মামলা নিস্ক্রিয় করা হয়েছে ক্ষমতার দাপটে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান যেন দেশে ঢুকতে না পারে সেটাও করা হয়েছে। তারপরেও এই কর্মীদের মনোবল একটুও নড়েনি। দলটির ভাষ্য মতে ৩২ হাজার মামলা এবং কয়েক লক্ষ নেতা কর্মী প্রতিদিন দেশের কোর্ট গুলোর বারান্দায় সময় কাটায়। ২০১৪, ২০১৯ সালের নির্বাচনে যেভাবে ভোট হয়েছে ক্ষমতাশীলরা যদি ২০২৪ সালের সেই ধারা অব্যাহত রাখে তবে বিএনপি বা অন্য কোন দলের আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, এটা জেনেও বিএনপি টিকে আছে এটাই বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল।

বিএনপি দলটি দেশী, বিদেশি ষড়যন্ত্র ও স্বৈরাচারী নজিরবিহীন অগণতান্ত্রিক আচরনে এক যুগেরও বেশী সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে তারপরও নিরপেক্ষ জরিপে দলটি জনগণের কাছে জনপ্রিয়তায় রয়েছে হিমালয় অবস্থানে। ক্ষমতাশীল দল এবং সরকারের সকল এজেন্সীর প্রাণপন চেষ্টায়ও দলের ঐক্যতে কোন ত্রুটি বা ফাটল ধরাতে পারছে না। গত ১০ বছরে খুন, গুম, হামলা, মামলা ও প্রাননাশের হুমকির পরও দলটি ঘরোয়া পরিবেশে সীমিত আকারে জনগনের দাবি আদায়ের চেষ্টা করছে। নুন্যতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হলে জণগনের ভোটাধিকার প্রয়োগের কোন সুযোগ পেলে জনগণ অবশ্যই আবার বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিবে।

একটি বিষয় হলো এদেশের রাজনৈতিক ধারায় বিগত সময় রাস্ট্র শক্তির আগ্রাসী আচরনে বেশ ক’টি রাজনৈতিক দল ছিন্নভিন্ন হয়েছে, ক্ষমতার সাথে ঐক্যের রাজনীতি করতে গিয়েও বেশ ক’টি প্রগতিশীল দল ক্ষমতার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একটি রাজনৈতিক দলের মৃত্যু কোনো সুনাগরিকের জন্য শুভ হতে পারে না। কারণ যেকোন রাজনৈতিক দলের প্রথম আদর্শই থাকে সুনাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। একবাক্যে বলা যায়, বিএনপি তার ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে। তবুও টিকে আছে এবং এই অবস্থায়ও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিটির ভয়ের কারন হয়েই টিকে আছে এটা আরেক বিস্ময় বলা যেতে পারে।

বিএনপি নিয়ে লিখতে গেলে দলটির প্রতিষ্ঠাতা নিয়ে কিছু না লিখলে লেখাটি অপূর্ণ থেকে যায়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অল্প সময়ে দেশ পরিচালনায় হাজার ঘটনা তুলে ধরা যাবে। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বর্ণনা করেছিলেন, “একদিন প্রেসিডেন্ট সাহেবের জরুরী তলব পেয়ে গিয়েছি। মধ্যাহ্নভোজন হবে প্রেসিডেন্টের সাথে, মনে মনে খুব উত্তেজিত ছিলাম। খাবার টেবিলে গিয়ে খুব হতাশ হয়েছিলাম টেবিলে পরিবেশিত লাল শাক, বেগুন ভাজা আর দুটো কই মাছ দেখে।”
(সুত্রঃ রণ থেকে জন, সাবেক স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান)।

প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী বলেছেন, “সাংবাদিক হিসেবে যতবারই বঙ্গভবনে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে গিয়েছি, প্রেসিডেন্ট জিয়া আপ্যায়িত করতেন লেবু চা আর কমদামি বিস্কুট দিয়ে।”(সুত্রঃ সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর সাক্ষাতকার, মৃত্যুঞ্জয়ী জিয়া পৃ ৫৮১)।

১৯৮১ সালের ৩০শে মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাধারা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোন অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেতো না। তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র কিছু নেতার পরামর্শ এবং অনুরোধে ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসে রাজনীতিতে আসেন জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ও রাস্তায় বেশ সক্রিয় ছিলেন এই খালেদা জিয়া। ওই আন্দোলন সারা দেশব্যাপী তাঁকে ব্যাপক পরিচিতির ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করেছিল। উল্লেখ্য, বেগম খালেদা জিয়া কোনদিনই কোন আসন থেকে পরাজিত হয়নি কোন নিরপেক্ষ নির্বাচনে।

আজকে যারা বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে তার মৃত্যু কামনা করছে এমনকি প্রেসিডেন্ট জিয়ার নাম মুছে ফেলতে চাইছে তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, এদেশের রাজনীতিতে বিএনপিকে কোনও অবস্থাতেই অস্বীকার করা যাবে না। তাকে সর্বাত্মক চেষ্টায় প্রাণপণে নিভিয়ে ফেলতে চাইলেও নিভবে না বরং তার ধোঁয়া থাকবে, সে ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করবে, সেই ধোঁয়ায়ই ফের জ্বলে উঠবে।

কামরুল ইসলাম
লেখক, সিডনি।