জলসা : উষ্ণ আনন্দে অবগাহন । অজয় দাশগুপ্ত

  
    

[ সিডনিতে জলসা নামের অনুষ্ঠানটির এক দুই করে তিনটি সিজন শেষ হয়েছে। প্রবাসে শিল্পীদের এটি একটি নির্ভরযোগ্য প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। আয়োজক পথ প্রোডাকশন্স সেই কৃতিত্বের অংশীদার। গত ১২ জুন ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস’র দ্য রাউন্ডহাউজে অনুষ্ঠিত হয় জলসা ৩ সিরিজটি। কানায় কানায় দর্শকপূর্ণ বিশাল অডিটোরিয়ামে সেই সন্ধ্যায় গান পরিবেশন করেন নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বল, নাহিদ রূপসা, পলাশ বসাক, তামিমা শাহরিন, তমালিকা তামান্না জয়া, জিউ বিশ্বাস, নাবিলা স্রোতস্বিনী, লামিয়া এবং নিশা। নাহিদ রূপসা’র কন্ঠে ‘এ শুধু গানের দিন এ লগন গান শোনাবার’ দিয়ে শুরু হয় আসর। আর নিজাম উদ্দিন উজ্জ্বলের কন্ঠে ‘ মানুষ ধর, মানুষ ভজ’ দিয়ে শেষ হয় মনোজ্ঞ এই আসর।

গানগুলো ছিলো – এ শুধু গানের দিন; আমি চিনি গো চিনি; সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে; আমি বনফুল গো; রঙ্গিনী কতো মন; হারানো দিনের কথা; মুঝে তুম নাজার সে; চঞ্চল ময়ূরী এ রাত; ময়না গো; জানে কেয়া বাৎ হ্যায়; জীবনানন্দ হয়ে সংসারে; এই ঝিনুক ফোটা; শেষ কোরোনা শুরুতে খেলা; কিছু কিছু কথা; চিরদিনই তুমি যে আমার; পেহলা নাশা; তাড়াপ তাড়াপ কে; মেরে ঢোলনা; হার কিসিকো নেহি মিলতা; স্টিল লাভিং ইউ; পৃথিবীর যতো সুখ; চন্দনা গো; এই মন তোমাকে দিলাম; হায়রে আমার মন মাতানো দেশ; মানুষ ধর, মানুষ ভজ।

বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন – তপন ডি’কস্টা, সোহেল খান, সুবীর গুহ, জিমি জোনাথন, নীলাদ্রি চক্রবর্তী, আসাদুজ্জামান খালিদ, ওয়াজিরা, জেস, মারিয়া এবং জেনিথ।

জলসা অনুষ্ঠান দেখে তারুণ্যের জয়গান করে লেখাটি লিখেছেন অজয় দাশগুপ্ত।]


একটু বিলম্বিত হলেও এই আলোচনা এখনো প্রাসঙ্গিক। তারুণ্যের জয় সবসময় এক অনুপম অভিজ্ঞতা । তা ছাড়া সন্তানের সাফল্য তাদের সীমাবদ্ধতার ওপরে ওঠা চেষ্টা সবসময়ই আনন্দের।

দুনিয়ায় যখন গরমকাল বা বর্ষাকাল আমরা তখন মজে আছি প্রচন্ড শীতে । ঠান্ডায় কাবু হওয়া সিডনি যে একটি মনোরম নগরী তা টের পাওয়ার জন্য বাইরে বেরুনোও কঠিন। অথচ এই শীতকালেই সিডনি হার্বার ও অপেরা হাউজের বিশ্বনন্দিত জায়গা জুড়ে আয়োজন করা হয় ভিভিড সিডনি’র । কি এই ভিভিড সিডনি ? এটি মূলত আলোকসজ্জার খেলা। করোনার জন্য বিরতি বা অনিচ্ছাপূর্বক বন্ধ থাকার পর জমজমাট ভিভিড চলছে প্রাণকেন্দ্রে । দু’ একবার গেলেও এবার শীতের জন্য যাওয়া হয়নি। কিন্তু গেল সপ্তায় কোন আবহাওয়াই বৈরী হতে পারে নি। আমরা গিয়েছিলাম তারুণ্যের ডাকে। বাংলাদেশের এই তারুণ্য দুনিয়ার সবদেশে সব শহরেই আনন্দ আর ভালোবাসার উৎস। পথ প্রোডাকশন নামে সংঘবদ্ধ তরুণ তরুণীরা এর আগেও চমকে দিয়েছিল আমাদের । এবার তারা কি করে কিভাবে করে সেটা দেখা ও জানার অদম্য আগ্রহ টেনে নিয়ে গেছিল অনুষ্ঠানে । কনকনে শীত হাঁড় জমানো ঠান্ডায় ও মিলনায়তন ভরা দর্শক শ্রোতা বুঝিয়ে দিয়েছিল ভালো কিছু দেখার জন্য শোনার আগ্রহেই সমবেত হয়েছেন সকলে।

ঢোকার পরপরই আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন এক ভদ্রমহিলা। তাঁর খালার সাথে কথা বলার জন্য। দেখি বাংলা গানের বিশেষত আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের গানের অন্যতম সুরকার বাংলা খেয়ালের জনক প্রয়াত আজাদ রহমানের স্ত্রী সেলিনা আজাদ। আজাদ রহমান আর কোনদিন সিডনি আসবেন না । তাঁর সাথে আর কোনকালে আড্ডা হবে না । কিন্তু তাঁর সহধর্মিনী যিনি এখন সিডনিতে তিনি তো আছেন। পরিমিত গানেও যে কিংবদন্তী হওয়া সম্ভব সেটা তো তাঁকে দেখেই বোঝা সম্ভব । মনের রঙে রাঙাবো গানটি জানে না বা গায়নি এমন বাংলাদেশী আছেন ? সে যাই হোক সেলিনা আজাদের সাথে কুশল বিনিময় করে আসনে ফিরলাম অনুষ্ঠান দেখার জন্য। বলাবাহুল্য তখন জানা হয়ে গেছে এই আয়োজনটি উপভোগ করবেন বেশ কিছু বোদ্ধা ও গুণী মানুষ।

সিডনির তারুণ্য জানে অনুষ্ঠান কিভাবে শুরু করতে হয় । বাংলা গান বা সঙ্গীতের যে কোন দেয়াল নাই সেটাও তাঁদের জানা। শুরুটা হলো প্রয়াত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান দিয়ে। নাহিদ রূপসা এর আগেও আমাকে চমকে দিয়েছিল মধুমালতী ডাকে আয় গেয়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয় নি। একসময় আমরা ভাবতাম কি হবে বাংলা সংস্কৃতির ? আমরা বয়সী হয়ে যাচ্ছি সামনে কে ধরিবে হাল কে তুলিবে পাল ? কিন্তু সিডনির তারুণ্য আমাকে আমার মতো অনেককে বুঝিয়ে দিয়েছে এটা কোন ব্যাপার না। বাংলাদেশ বাংলা সংস্কৃতি প্রবহমান দেশ থেকে দেশে । এবং তা চলবে আজীবন । নিজাম উদ্দীন উজ্জ্বল নামের তরুণটি আমার ফেভারিট। শুদ্ধ গান ও রাগের প্রতি তার মনোযোগ অনায়াসে তাকে লিডার করে তুলেছে । যে শহরে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে টিউশন ফি থাকার ডলার খাবার যোগাড় করতে হয় যে দেশে ঘরে বাইরে বাংলা না বলার রীতি সে শহরে এমন চর্চা আমাকে মুগ্ধ করে। নাবিলা নামের তরুণী নিলাদ্রী নামের তরুন কিংবা জিউ নামের যে যুবক আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছিল তার আসল কারন কি ? ঐ যে রুটস বা মূলের টান শেকড়ের সন্ধান সেটাই তো মূল কথা । উপস্থাপক শুভজিৎ এর বাচন ভঙ্গি আর বলার সাবলীলতা মন টানেনি এমন মানুষ ক’জন ছিলেন সে রাতে !

মূল কথা বা বিষয় এই মনযোগ ও সন্ধ্যা উজ্জ্বল করা আনন্দের উৎস আমাদের দেশ বা সঙ্গীতের প্রতি তারুণ্যের দায় বোধ। রাজনৈতিক কলহ আর রেষারেষিই মূল কথা না । এর বাইরে যে আনন্দময় জগত তার ভেতরেই আছে বাঁচার প্রেরণা। সে সন্ধ্যায় যে সব অজি তরুণ তরুণী যন্ত্রনাষঙ্গে সহায়তা করেছিল তাদের দেখে তাদের বেহালা ভায়োলিন সেক্সাফোন শুনে কে বলবে তারা ভিনদেশী ? এই যে সম্মিলন এই যে আদান প্রদান এটাই বিদেশের সাথে দেশের যোগসূত্র তৈরী করে দেয় । খুলে যায় মন ও মননের মুক্ত আকাশ ।

বাংলাদেশের বলে নয় সব দেশেরই একজন দূত থাকেন বিদেশে। দূতাবাস প্রধান । আমি জানি না কেন তাঁদের রাষ্ট্রদূত বলা হয়। আমার মতে তাঁরা রাজদূত। রাষ্ট্রদূত মূলত সে সব প্রবাসীরা যারা হাঁড় ভাঙ্গা খাটুনির টাকা পাঠিয়ে দেশ ও সমাজকে সমৃদ্ধ করেন । রাষ্ট্রদূত তারা যারা শিল্প সংস্কৃতিতে দেশের সাথে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন । সে নেটওয়ার্ক যে কতভাবে হতে পারে তারই নুমনা দেখালো ফয়সাল শাওন সাকিবদের মতো তারুণ্য । এরাই আসল দূত । যারা আমাদের গর্ব ও অহংকারের জায়গাটুকু বড় করে । এদের স্যালুট জানাতেই হয় ।

বাংলাদেশ এক সময় অচেনা দেশ ছিল এখানে । আমি যখন অভিবাসী হয়ে আসি আমাদের ক্রিকেট মশলা আনাজ রেঁস্তরা বা সংস্কৃতি কিছুই তেমন পরিচিতি লাভ করে নি। আজকাল বাজারে গিয়ে যে পোশাকেই হাত দেই অহংকারে চোখ ভিজে আসে । মেইড ইন বাংলাদেশ এখন পপুলার আর স্বনামধন্য এক ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে । যেমন আমাদের রেঁস্তরার সাইনবোর্ডে ইন্ডিয়ান কুইজিন লেখার দরকার পড়ে না আর। আমাদের ক্রিকেট কতোটা পরিচিত সেটা ক্রিকেট প্রেমী যে কাউকে সাকিব আল হাসানের কথা জিজ্ঞেস করলেই বুঝে যাবেন । ধীরে ধীরে এই পরিচয়ের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে সংস্কৃতি । যে তারুণ্য পথ প্রডাকশনের নামে পথ তৈরী করছে তারা যে একদিন অষ্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে আকাশবাহি সেতু গড়ে তুলবেন এটা নিশ্চিত । তাদের দরকার পরিচর্যা আর অভিজ্ঞতা।

আমাদের দেশও এগিয়ে চলেছে আপন গতিতে। তার ঝুলিতে জমা পড়ছে নতুন নতুন অর্জন। এ কথা বলতেই হবে বাংলাদেশের মানুষজন দুনিয়ার যে দেশে যে শহরে বসবাস করুক আর সংখ্যায় যাই হোক তার সাথে থাকে একটি মিনি বাংলাদেশ। সেদিন শীতের রাত উষ্ণ করা সিডনিকে সেটাই আবার দেখিয়েছিল পথ প্রডাকশন।

অজয় দাশগুপ্ত
কলামিস্ট, ছড়াকার
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments