জাতীয় সঙ্গীত বিতর্ক: আমি নয়ন জলে ভাসি – অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ও সমাজে ভারত বিরোধিতা যেমন প্রচন্ড তেমনি বাংলাদেশের অন্যতন বিনোদনের উৎস কিন্তু ভারতীয় মাধ্যম। সিনেমা,গান ,টিভি নাটক, সিরিয়াল মিলিয়ে এক জমজমাট বাজার তাদের।  এনিয়ে ঘরে সংসারে কত ঝামেলা কত ধরণের তর্ক বিতর্ক। তারপরও এগুলোর রমরমা ব্যবসা দেশে।
জী বাংলা একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল আমাদের দেশে। বিদেশেও আমরা এই চ্যানেলের দর্শক শ্রোতা। ব্যক্তিগতভাবে আমি গান পাগল মানুষ। গানের অনুষ্ঠান আমাদের দেশে এখন অস্তমিত। সেলিব্রেটি শো গুলোও জমে না আর। মানতেই হবে জী বাংলার গানের অনুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতা নি:সন্দেহে দৃষ্টিনন্দন। তাদের মঞ্চ সজ্জা যন্ত্রী যন্ত্র বা বাদন ছিলো চোখে পড়ার মত। এমন যন্ত্রী ও যন্ত্র আয়োজন থাকলে অনুষ্ঠান ভালো হতেই বাধ্য।  আমি  সা রে গা মা পা’ র নিয়মিত দর্শক ছিলাম। গোড়া থেকেই শান্তনু মৈত্র  আর মোনালী ঠাকুরের ভাঁড়ামি, অতি অভিনয় ও অজ্ঞতা নিয়ে লিখে এসেছি।

মোনালী রান্ডিশান, হরকত  আর স্পিচলেস এমন বিজাতীয় শব্দের বাইরে কোন কথাই বলতে পারতো না। যতবার গান গাইতে গিয়েছে ততবারই প্রমাণ হয়েছে প্রতিযোগিরা তার চাইতে ভালো গায়।মৈত্র তো ঝানু মাল। অায়োজনে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটিকে হাগ দিতে গিয়ে বাধা পাবার পরই অামি লিখেছিলাম ঋতি যত ভালো গান করুক বাদ পড়বেই। মেয়েটি তার দিকে দ্রুত তেড়ে অাসা মৈত্রকে ঠেকানোর জন্য হাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গি করে দাঁড়িয়েছিল। ব্যর্থ শান্তনু মৈত্র সে যাত্রায় হাই ফাইভ দিয়ে ফিরলেও তাকে বাদ দিতে কসুর করেনি।
সুমন ছেলেটির সাথে অনায্য আচরণের কারন ছিলো কর্পোরেট বানিজ্য।  টি আর পি র লোভ , কমার্শিয়ালের টাকার লোভ  আর বাংলাদেশের দর্শক ধরে রাখার জন্য এই বালকটিকে কালিকা প্রসাদ পুরষ্কার নামের সান্তনা পুরষ্কার ধরিয়ে দেয়া হয়েছে।

নোবেল কেমন গায়ক সেটা সবাই জানেন। দু একটি পপ বা ব্যান্ডের গান চড়া গলায় গাইলেই একটি প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া যায় না। এটি দাদারাও জানতেন। জ্ঞান পাপী শ্রীকান্ত আচার্য ও যেসব ভূয়া তারিফ করতেন তার মূল্য চুকালেন ফাইনালে।শ্রীকান্ত আচার্যই এ আয়োজনে সবচেয়ে বড় লুজার। শান্তনু মৈত্রের দাপটের কাছে অসহায় আচার্য বাবু মোনালীর সাথে এক চেয়ারে এক যোগ্যতায় বিচারক এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডী আর কি হতে পারে?
নোবেল কে নিয়ে এরা সবাই খেলেছেন। গোড়ারদিকে ধারণা করা হচ্ছিল নাক উঁচু দাদারা তাকে ঝেড়ে ফেলে দেবে। কিন্তু সে ভুল তারা করেনি। তারা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দুধ দেয়া গাভীর লেজের ঝাপটা এমনকি লাথিও সয়ে গেছেন। মনে আছে একটি পর্বে সবাই যখন চ্যালেন্জ পর্বে দুটি গান দিয়ে পরস্পরকে মোকাবেলা করছিল তখন একটি পারিবারিক ঘটনার জন্য নোবেলকে একটি গান গাইয়ে ওপরে তুলে দেয়াটা কি ন্যায় সঙ্গত? এটাতো প্রতিযোগিতা, প্রতিযোগিতায় কারো দাদীর মৃত্যুর জন্য কেউ কি এই ছাড় পেতে পারে? যেখানে নাতি বাংলাদেশে থাকার পরও তার ভাষায় গানের অনুষ্ঠান করার জন্য দাদীকে দেখতে যেতে পারে নি। শুধু তাই নয় দাদী মারা যাবার খবর পাবার পরও সে সকালের ফ্লাইটে কলকাতা চলে যায়। আবার অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে বলে তার মগজে নাকি তখনো এই মৃত্যু রেজিষ্টার্ড হয় নি তাই সে বুঝতে পারছে না। অথচ সে পেলো কিনা ছাড় ফাইন্যালে যাবার টিকেট। কিন্তু তারপর?

বিচারক বা নেপথ্যের কর্মীরা কি করলেন? তাকে তার মত গান করতে না দিয়ে এমন গান ধরিয়ে দিলেন যাতে সে সেখানেই থমকে যায়।
ফাইন্যালেতো সবাই সেরাটা দেয়। নোবেলের সেরা বা কম্ফোর্ট জোন কি দেশের গান? না বাংলা নিয়ে অাবেগের গান? তাকে এ গান ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল ডাউনে রাখার জন্য।
এই যুবকের তো অতি প্রাপ্তিতেই মাথা গরম হয়ে অাছে। তাই জাতীয় সঙ্গীত বদলানোর মত কথা বলার ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে সে।
এই সুযোগে পুরনো নতুন যাবতীয় রাজাকারও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক মানুষের মুখোশও খুলে পড়েছে। এর পুরোভাগে হিন্দু বামুনও  রয়েছেন।
এদের কথা শুনলে মনে হয় নতুন কোন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানছি। যার গেরুয়া অালখেল্লার তলায় লুকানো ছিলো সামপ্রদায়িক সাপ। যিনি ঢাকা বিরোধী। যিনি কখনো সাজাদপুর বা শিলাইদহে অাসেন নি। পদ্মাবক্ষে কবিতা লেখেন নি।
অথচ যিনি সাতচল্লিশে দেশ ভাগও দেখেননি তাঁর ওপর এত গোস্বার কারণ তিনি ব্রাহ্ম হবার পরও মূর্খরা মনে করে হিন্দু।

একটা দেশের জাতীয় সঙ্গীত কি ছেলেখেলার বিষয়? কি কারণে মনে করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন সৈয়দ নজরুল বা এ দেশের বুদ্ধিজীবী শিল্পী সাহিত্যকরা ছিলেন বোকা? কত অাগে বঙ্গবন্ধু ঠিক করে রেখেছিলেন এই গান।মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জানুন এই গান মুক্তিযুদ্ধে কেমন শক্তি ও প্রেরণা দিয়েছিল। এ গান গাইতে গাইতে জান বিলিয়ে দেয়া ইজ্জত লুটিয়ে ফেরা অশ্রুজলে ভেজা দেশের ইতিহাস জানুন।
অাপনাদের বালখিল্যতা অার আস্ফালন দেখে মনে হয় পঞ্চাশ বছর পর প্রিন্স মাহমুদ নামের একজন একটি গান লিখবে যাতে অমুসলিম কারো নাম অবদান থাকবে না অার নোবেল নামের কলকাতা প্রডাক্ট তা গাইবে। সেটা জাতীয় সঙ্গীত হবে বলেই লাখো শহীদ প্রাণ দিয়েছিলেন। মা বোন কন্যার সম্ভ্রম অার কোটি মানুষের অাত্মত্যাগের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল।

লজ্জাও নাই অামাদের। নাই কোন আত্ম মর্যাদা বোধ। যতদূর জানি জাতীয় সঙ্গীতের বিরুদ্ধে বললে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য একটা অাইন ও অাছে দেশে। হয়তো তারও প্রয়োগ নাই।  থাকলে জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে তর্ক করার সাহস পেতো না কেউ। কোন দেশে কোন সমাজে রক্ত দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতি এমন অবহেলা এমন অপমান দেখি না। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির কবল থেকে মুক্ত হবার সংগ্রামে গান এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। সে ইতিহাস না জানা আপনাদের অজ্ঞতা। জানলে বুঝবেন কেন আমার সোনার বাংলা শুধু জাতীয় সঙ্গীত নয়, এ এক রক্তমাখা গৌরবের ইতিহাস।

এই গানেই আছে তোমার বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি। এসব অপমানে নয়ন জলে ভাসা আমাদের একটাই প্রশ্ন কী যে হবে আমাদের?

অজয় দাশগুপ্ত
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
সিডনি,অস্ট্রেলিয়া।