জীবনের গল্প, গল্পের জীবনঃ প্রোগ্রাম রিভিউ – শুভজিৎ ভৌমিক

  •  
  •  
  •  
  •  

প্রবাসে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ভিত্তিক কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে আমাদের মাথার মধ্যে বেশ কিছু লাভ-ক্ষতির হিসাব সেরে নিতে হয়।

উইকেন্ডে সবারই বিভিন্ন নিমন্ত্রণ থাকে কোথাও না কোথাও। বিনামূল্যে সুস্বাদু খাবার দিয়ে পেট ভরানোর তৃপ্তির জায়গায় যখন চলে আসে কিছু অর্থের বিনিময়ে শিল্প দিয়ে মন ভরানোর চ্যালেঞ্জ, তখন সেটা খুব কঠিন কাজ হয়ে যায়।

সেজন্য, খুব প্রতিশ্রুতিশীল কোনো অনুষ্ঠান না হলে, মোটাদাগে প্রবাসী বাঙালি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে পা রাখেনা, এই নির্মম সত্যিটা আমাদের সবার মেনে নেয়ার সময় এসেছে। প্রশান্তিকা এবং মুক্তমঞ্চের আয়োজকদের অভিনন্দন প্রাপ্য, তারা সেই ভরসার জায়গাটা তৈরি করতে পেরেছেন। প্রচুর দর্শকের সমাগম হয়েছিলো ১৬ মার্চ শনিবার, হার্স্টভিলের সিভিক সেন্টারে। এসেছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় তরুণ লেখক সাদাত হোসাইন।

অনুষ্ঠানের প্রথমার্ধে গীতিআলেখ্য, আয়েশা কলি ও ফাহাদ আসমার।

কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা আমাদের সবার মাথায় এইধরনের লিটারেরি মিটাপ সম্পর্কে একটা ধারণা পেরেক মেরে গেঁথে দিয়েছেন। এই ধরনের অনুষ্ঠানে আসতে হলে হতে হবে কঠিন পড়ুয়া ইন্টেলেকচুয়াল। একেবারে লাল কিতাবের পাণ্ডুলিপি থেকে রবীন্দ্র, জীবন, তিরিশের পঞ্চপাণ্ডব, তারাশংকর, কন্টেম্পোরারি, ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার সাহিত্যপাঠ এখানে আসার প্রধান যোগ্যতা। বলতে হবে রাশভারী গুরুগম্ভীর কথাবার্তা, যার অর্ধেকের অর্থই দর্শক বুঝবেন না।

ফাইনালি, এমন জঘন্য ড্রাই কনসেপ্ট সম্ভবত দুনিয়াতে একেবারেই নেই, যেখানে একটা অনুষ্ঠান কতোখানি দুর্বোধ্য হলো, তার মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের সার্থকতা পরিমাপ করা হয়।

মঞ্চে উপবিস্ট শীর্ষেন্দু নন্দী, জন মার্টিন, সাদাত হোসাইন, অজয় দাশগুপ্ত এবং নেহাল নেয়ামুল বারী।

এই কনসেপ্টে আক্রান্ত হয়ে খুব সীমিত আশা নিয়ে গিয়েছিলাম এই অনুষ্ঠান দেখতে। ভেবেছিলাম আড্ডা-ফাড্ডা হবে। গদগদ গলায় উপস্থাপিকা প্রশ্ন করবেনঃ এতো ভালো কীভাবে লেখেন আপনি? লেখক ততোধিক গদগদ হয়ে উত্তর দেবেন, তা ওই একটু আধটু লিখি বইকী, সবে তো শুরু।

খুব ভালো লেগেছে, আমাদের তরুণ প্রজন্মের লিটারেরি মিটাপের স্ট্রাকচার একেবারেই এমন নয়। এগুলো যথেষ্ট এন্টারটেইনিং, এবং ভারী ভারী কথাবার্তার বাইরে এখানে খুব সরল ভাষায় বিভিন্ন আলোচনা হচ্ছে, গল্প হচ্ছে, গান হচ্ছে, কবিতা হচ্ছে – সব মিলিয়ে প্রশান্তিকা আর মুক্তমঞ্চ একটা প্যাকেজ উপস্থাপন করেছে, যেটা শুধুমাত্র সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, গিয়েছে আরও বেশ কিছুটা দূর।

সেজন্য এই আলোচনাটা বেশ দীর্ঘ হবে, কেননা সমধর্মী অনুষ্ঠান সিডনিতে হয় খুবই কম। একটু ভেঙে ভেঙে বোঝাতে হবে জিনিসগুলো। “জীবনের গল্প, গল্পের জীবন” শিরোনামের অনুষ্ঠানটি সাতটায় শুরু হওয়ার কথা ছিলো, শুরু হলো আটটারও পরে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ছিলো সাদাতকে মধ্যমণি রেখে তার রচনা থেকে পাঠ এবং তাতে সংগীত সংযোজন। থিয়েট্রিক্যাল কনসেপ্ট, ফাহাদ আসমারের পাঠ এর আগে শোনা হয়নি। ভালোই করলেন। সাথে কণ্ঠসংগীতে সংগত করলেন আয়েশা কলি, ভালোই গাইলেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে করতালের মেট্রোনোম প্রয়োজন ছিলোনা। খালি গলায় গান শুনতে খারাপ লাগেনি একেবারেই।

সরোদ বাজাচ্ছেন তানিম হায়াত খান রাজিত, তবলায় অভিজিৎ দান।

পরের পর্বে সিডনির শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির পুরোধা ব্যক্তিত্বরা মঞ্চে এলেন, সাথে সাদাতও ছিলেন। কথা বললেন অজয় দাশগুপ্ত, জন মার্টিন, শীর্ষেন্দু নন্দী এবং নেহাল নেয়ামুল বারী।

এই পর্যন্ত ঠিকঠাক। অগোছালো হওয়া শুরু হলো এরপর থেকে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কথাবার্তা এই ধরণের অনুষ্ঠানে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। যদি বলতেই হয়, তো তারা অতি সংক্ষেপে কাজটি করতে পারেন। নাজমুল হুদা সাহেবের বক্তব্য তারপরেও প্রসঙ্গের মধ্যেই ছিলো। ফেডারেল ইলেকশনের প্রার্থী ভদ্রলোক দীর্ঘ বক্তৃতায় একেবারেই অপ্রসঙ্গে চলে গেলেন, এবং দর্শকের আগ্রহে ভাটা পড়া শুরু করলো ঠিক সেই পয়েন্ট থেকেই।

আমরা সবাই ছটফট করছিলাম অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ সাদাতের কথা শোনার জন্য। তানিম হায়াত খান রাজিতের বাজনা সেখানে সোনায় সোহাগা হতে পারতো। দুইজন মিলে সিম্পলি ফাটিয়ে দিতেন যুগলবন্দীতে।

যে পয়েন্টে সাদাতের হিট করার কথা, সেই তীব্র আগ্রহের স্যাচুরেশন পয়েন্ট পর্যন্ত তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেননি। এইরকম সময়ে স্টেজে আসেন দুর্ভাগা রাজিত।

খুবই রঙ টাইমিং। একজন শ্রোতা বলে উঠলেন, “বাজনা কতোক্ষণ চলবে? আমরা তো সাদাতের কথা শুনতে এসেছি।”

কথাটি যিনি বলেছেন, ভদ্র সমাজের কোনো অনুষ্ঠানে সম্ভবত তিনি এই প্রথম এলেন। সেজন্য ঠিক বুঝতে পারেননি যে, ভদ্র লোকেরা কী ভাষায় কথা বলে। অনুষ্ঠান আপনাকে যতোই বিরক্ত করুক, সেটার সমালোচনার আলাদা জায়গা এবং আলাদা ভাষা আছে। সেই ভাষাটি ভদ্রলোকেদের সাথে মিশে আত্মস্থ করতে হয়। অনুষ্ঠানের মাঝখানে চিৎকার করে বলতে হয়না।

এমন অভদ্র এবং অমার্জিত উচ্চারণের পর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একজন শিল্পীর পক্ষে আহত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। রাজিত না বাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন প্রায়। আয়োজকদের ধন্যবাদ, তারা রাজিতকে অনুরোধ করে কিছুটা সময় বাজানোর জন্য সম্মত করেন। রাজিতেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য, গোঁ ধরে বসে না থেকে, আবার স্টেজে চলে এসে প্রকৃত শিল্পীসুলভ আচরণই তিনি করেছেন।

বোধহয় একটু ক্ষোভের জায়গা থেকেই, সরোদের তারের ঝংকারে কর্ণাটকের রাগ কিরাভানিতে রীতিমত আগুন ধরিয়ে দিলেন শিল্পী। আলাপের স্ট্রোকে তার মন খারাপটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিলো, দুই-তিনটা নোট বেশ সরে গেছে জায়গা থেকে। তবে ক্লাইম্যাক্স পয়েন্টে তিনি যে ঝড় তুললেন, সেটা দেখলে সম্ভবত পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারও মুগ্ধ হয়ে তার পিঠ চাপড়ে দিতেন। তবলা সংগতে অভিজিৎ দান – ঠিকঠাক। শিল্পীদের দু’জন সামান্য সচেতন হয়ে যদি ফাইনাল টিউনিংটা আগেভাগেই সেরে রাখতেন, তাহলে একেবারে জমে যেতো, যেহেতু সময় স্বল্পতার জন্য পরিস্থিতি একেবারেই পক্ষে ছিলোনা।

এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বে আসেন মেলবোর্ন রেডিওর উপস্থাপিকা এবং প্রশান্তিকার সহযোগী সম্পাদক নাদিরা সুলতানা নদী এবং তার সাথে সাদাত। এই প্রথম সাদাত কথা বলার সুযোগ পেলেন। সাদাতের রচনা থেকে কিছুটা পাঠও করলেন উপস্থাপিকা। দর্শক হালে কিছুটা পানি পেলো, অবশেষে সাদাত কথা বলা শুরু করেছেন।

বাকী সময়টা ছিলো স্বপ্নের মতো। প্রবাসে আছি দীর্ঘদিন, সাদাতের লেখালেখির সাথে পরিচয় ফেসবুক পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। দেশ থেকে বই আনিয়ে পড়ার পরিশ্রমটা করার মতো দায়বদ্ধতা অর্জন করতে পারিনি জন্য লজ্জাই লাগছিলো বেশ।

লজ্জা আরও বেড়ে গেলো যখন উপস্থাপিকা মঞ্চ ছেড়ে দিয়ে এক্সক্লুসিভলি সাদাতকে মাইক দিয়ে দিলেন। তরুণ তুর্কী সাদাত লেখেন কেমন তা জানিনা, তবে কথা বলেন দুর্দান্ত। অনুষ্ঠানের নাম “জীবনের গল্প, গল্পের জীবন” – এটা একদম পারফেক্ট নাম।

জীবনের গল্পই বললেন সাদাত। একদম সরল ভাষায়, প্রাঞ্জল উপস্থাপনায়। কীভাবে মাদারীপুরের ছোট্ট গ্রামের নিম্নবিত্ত গাড়িচালকের ছেলে, যাদের পরিবারে লেখার কাগজ কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সংগতি ছিলোনা, সেই ছেলেটি কীভাবে আজকের জনপ্রিয় সাহিত্যিক হয়ে উঠলেন, সেই গল্প।

একদম ছোটবেলা থেকে গল্প শুরু হলো, একে একে উঠে এলো তার শৈশব, তার গ্রাম, তার কৈশোর, তার মায়ের গল্প। গল্পের মতো জীবন তার, তিনি জীবনকে পাঠ করতে করতে গল্পকার হয়ে উঠেছেন। জীবন তাকে গল্প বলতে শিখিয়েছে। সেই গল্পই তিনি উঠিয়ে নিয়ে এলেন, এবং কথাবার্তার সিচুয়েশনের সাথে খুব চমৎকারভাবে রিলেট করে দেখিয়ে দিলেন তার পরিচালিত শর্টফিল্ম, “বোধ”।

এমন নয় যে এই ঘরানার শর্টফিল্ম আমরা দেখিনি। থাইল্যান্ড-কোরিয়াতে এরকম ইমোশনাল শর্টফিল্ম হাজারে বিজারে তৈরি হয়, ইউটিউবেই পাওয়া যায়। ঠিক সেরকম একটা গল্পই শুধু উপস্থাপনার গুণে হয়ে উঠলো প্রাসঙ্গিক, এবং ভালোই লাগলো সেটা দেখতে।

আয়োজক মুক্তমঞ্চ ও প্রশান্তিকা টিম, সঙ্গে লেখক শাখাওয়াৎ নয়ন।

আবার শুরু হলো সাদাতের কথা, এবং চলতে থাকলো। এবার এলো তার দাদীর গল্প, গ্রামের নিঃসঙ্গ এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধা, যিনি অসম্ভব ক্লান্তিকর এক বিষণ্ণ একাকীত্বে ভুগছেন – তার তার কুঁচকে যাওয়া চামড়ার ভাঁজ থেকে সময়কে তুলে নিয়ে এলেন সাদাত, এবং দেখালেন তার আরও একটি শর্টফিল্ম, “প্রযত্নে”।

দুটি শর্টফিল্মই দর্শনীয় হয়ে উঠেছিলো সাদাতের জীবনের কথার সাথে সিচুয়েশনের সংমিশ্রণের কারণে। স্ট্যান্ড এলোন ফিল্ম হিসাবে এগুলো কতোখানি সার্থক, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ আছে। সমালোচকের শকুনের চোখ দিয়ে যদি দেখি, তাহলে সাদাতের জন্য সাজেশন হবেঃ

১- ফিল্মে প্রপস কন্টিনিউইটি একটু সাবধানে মেইনটেইন করতে হয়। “বোধ” ফিল্মে মাটিতে পড়ে যাওয়া জিলাপির টুকরা, আর পরের দৃশ্যগুলোতে দেখানো জিলাপির শেইপ যে আলাদা, সেটা সহজেই ধরা গেছে।

২- “প্রযত্নে” ফিল্মে দিলারা জামানের দাঁত ঝকঝকে সাদা। একজন পান খাওয়া বৃদ্ধার দাঁত এতো সাদা হয়না। আগামীতে এই ছোট্ট বিষয়গুলো খেয়াল করলে কাজের ডিটেইলিং আরও ভালো হবে।

এগোতে থাকলো আলাপ। দর্শকদের মধ্য থেকে প্রশ্নও নেয়া হচ্ছিলো নিয়মিত। গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রশ্ন করেছেন কমিউনিটির সিনিয়র আনিসুর রহমান সাহেব এবং কায়সার আহমেদ সাহেব।

১- সাদাত জীবনকে পাঠ করেন কীভাবে?

২- সাদাতের উপন্যাসগুলিতে মায়াময় চরিত্রগুলোকে মেরে ফেলা হয়। শোক ছাড়া কি আনন্দময় কোনো উপায়ে চরিত্রের পরিসমাপ্তি টানা যায়না?

সুন্দর গুছিয়ে উত্তর দিলেন সাদাত।

সমস্যাটা যেখানে হয়ে গেছিলো, সেটা হচ্ছে সময়। অনুষ্ঠান এগারোটায় শেষ করতে হবে, সেজন্য তিনি কথার স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে প্রায় দৌড়াচ্ছিলেন। এজন্য, আলোচনা বা জীবনের গল্প অসমাপ্ত রেখেই তাকে বক্তব্য শেষ করতে হয়। দর্শকের আরও অনেক প্রশ্ন তাকে এটেন্ড করতে হতো। সেই সময়টাই পাওয়া যায়নি।

নোমান শামীমের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। সেখানেও প্রশ্ন ওঠে, সাদাতের লেখার মধ্যে হুমায়ুন আহমেদের প্রভাব প্রসঙ্গে।

এই ব্যাপারটি তো অস্বীকার করার কোনোই উপায় নেই যে, অনলাইনের লেখালেখির মাধ্যমে মেইনস্ট্রিম সাহিত্যের স্পটলাইটে উঠে আসা লেখকদের অনেকের মধ্যেই হুমায়ুন আহমেদের তীব্র ছায়া আছে। কাসাফাদ্দৌজা নোমান, রাসয়াত রহমান জিকো, মাজহার মিথুন, শুভ্র সৈকত বিশ্বাস, আপেল মাহমুদ, সালেহ তিয়াস, সোহাইল রহমান – কার মধ্যে হুমায়ুনের ছায়া একেবারেই ছিলো না? বটগাছের সতীর্থে বেড়ে ওঠা ছোট ছোট গাছেদের ওপর বটের ছায়া তো পড়বেই, সে রবীন্দ্র পরবর্তী যুগেও পড়েছিলো, হুমায়ুন পরবর্তী সময়েও পড়ছে।

সাদাত চেয়েছেন এই ধারাটিকে অস্বীকার না করে সময়ের সাথে নিজেকে ডেভেলপ করতে করতে একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছাতে। এই বিনীত স্বীকারোক্তি সত্যিই ভালোলাগা তৈরি করে।

লেখা শুরু করেছিলাম লাভ ক্ষতির হিসাব দিয়ে। উপরের এই আলোচনার সাপেক্ষে এইবার এই অনুষ্ঠান থেকে আমি আমার লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাবো।

লাভঃ
– টোটাল প্যাকেজ অনুষ্ঠান। আবৃত্তি, রচনাপাঠ, সাহিত্য আলোচনা, জীবনের গল্প, গান, ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিকে রাজিত, শর্টফিল্ম, খাবার, বই কেনার ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি সাদাত – সবকিছু নিয়ে অনুষ্ঠানটি অন্তত পাঁচ-ছয় ঘন্টার একটি অনুষ্ঠান হওয়া উচিত ছিলো। এই কাজটা করতে পারলে আমি হিমালয়ের সমান তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরতাম।

ক্ষতিঃ
– সময়ের লাগাম টেনে ধরতে না পারার কারণে এতো বড় অনুষ্ঠানটির সময় গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুই আড়াই ঘন্টাতে, যেটি একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।

– এই সীমিত সময়ের সদ্ব্যবহার করাটা খুব জরুরী ছিলো। বিশেষ করে সাদাতকে প্রাধান্য দিয়ে আরও কথা বলার সময় দিতে হতো। এই পারফরমেন্সটা দিতে না পারার কারণে ফার্স্ট হাফটা বেশ ঝুলে গেছে।

– সাউন্ড এবং লাইট রীতিমত বিরক্ত করেছে। আরেকটু প্রশিক্ষিত কাউকে এই দায়িত্বটি দেয়া দরকার ছিলো।

মোদ্দা কথা, যার জন্য গেছিলাম, সেই সাদাত ফ্লোর পেয়েছেন খুব কম। শুনেছি এই একই অনুষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার মেজর শহরগুলোতেও হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুষ্ঠানের কনটেন্টে যে পরিমাণ ইন্টারেস্ট পেয়েছি, তাতে এসবের মধ্যে একটাতে প্লেনের টিকেট কেটে হলেও যাওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করছি।

সিডনিতে যে অনুষ্ঠান হলো, সেটা পারফেক্ট বুলস আই হিট করতে না পারলেও, প্রশান্তিকা এবং মুক্তমঞ্চ যৌথভাবে লিটারেরি মিটাপের যে কনসেপ্টটা তৈরি করে দেখালেন, আমি মনে করি এটাই যথেষ্ট একটা আগ্রহের উদ্দীপনা তৈরি করে দেয়ার জন্য।

সামনের বছর শুনলাম যে তারা মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে আনার ব্যাপারে ভাবছেন। এই বিষয়টি যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটা হবে সিডনিবাসী বাঙালির সমধর্মী অনুষ্ঠানে সিডনির সবচেয়ে বড় অর্জন।

অনুষ্ঠান শুরু করতে প্রায় এক ঘন্টা দেরি হয়েছে, কারণ অডিয়েন্স এখনও এসে পৌঁছায়নি। বাঙালির এই মহামারী রোগটিকে আমাদের দূর করতে হবে, যেভাবেই হোক। সবাই ধরেই নেন যে, বাঙালির অনুষ্ঠান, দেরি তো হবেই। তাই দেরিতেই যাই।

এই পয়েন্টে আমাদের বাঙালিদের স্ট্রংলি একটা অবস্থান নিতেই হবে। অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর নয়। সাতটা মানে সাতটাতেই আমরা অনুষ্ঠান শুরু করবো, সে পরিস্থিতি যাই থাকুক না কেন, কেউ আসুক বা না আসুক৷ এই অচলায়তন ভাংতেই হবে। শুরু করার দায়িত্ব কেউ নিয়ে দেখান, আমরা কথা দিচ্ছি আমরা সময় মতোই পৌঁছাবো।

আক্ষেপ একটাইঃ জীবনের গল্পের সেই আক্ষেপটা বুড়ো জমিদার বহু আগে লিখে গেছেন।

“ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা
ছোট ছোট দুঃখকথা
নিতান্তই সহজ সরল,

সহস্র বিস্মৃতিরাশি
প্রত্যহ যেতেছে ভাসি;
তারি দু’চারিটি অশ্রুজল।

নাহি বর্ণনার ছটা
ঘটনার ঘন ঘটা
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ,

অন্তরে অতৃপ্তি রবে,
সাঙ্গ করি মনে হবে-
শেষ হইয়াও হইলো না শেষ…”

শুভজিৎ ভৌমিক, সংস্কৃতিকর্মী
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।