জ্ঞান ও সুখ । ফয়সল সাইফ

  •  
  •  
  •  
  •  

জ্ঞান হচ্ছে নিজের অজ্ঞতাকে আবিষ্কার করা। যখন থেকে কেউ বুঝতে শুরু করে যে জগতে এমন জিনিসের সংখ্যাই বেশি যা সম্পর্কে সে কিছুই জানে না তখন থেকেই জ্ঞানের পথে তার হাঁটা শুরু হয়। জ্ঞান গন্তব্যহীন একটি পথ। কোনো পথিকই এর শেষ ছুঁতে পারে না। মানুষের ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জ্ঞানের অনিঃশেষ পথটি ধরে কেউ হেঁটে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত, কেউ ফেলেনি একটি পা-ও। যদি এমন হয় যে সকলের সম্মিলিত পদযাত্রার পরিমাণকে একটিমাত্র রেখা টেনে দেখানো হবে, তাহলেও দেখা যাবে মানুষ জ্ঞানের জগতের কণা পরিমাণ পথও হেঁটে শেষ করতে পারেনি। সামর্থ্যের এই ক্ষুদ্র আকারটি আবিষ্কার করতে পারার জন্যই জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে তুলে। আর বিনয়ীমাত্রই জ্ঞানী।

জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষা এক পীড়াদায়ক তৃষ্ণা। এ তৃষ্ণা মানুষকে অতৃপ্ত করে রাখে। অনেকে বিশ্বাস করেন কেবল একারণেই একজন অজ্ঞ মানুষের সামনে তুলনামূলক অধিক সুখময় জীবনযাপনের সুযোগ থাকে। যিনি মনে করেন তার বাসভূমি-পৃথিবী গোটা জগতের কেন্দ্র, এবং চাঁদটিকে ক্ষুদ্র দেখালেও আকারে সেটা আসলে সূর্যের চেয়েও বড়; তিনি কোনোরূপ অজ্ঞতার পীড়ন বোধ করেন না। যদিও তিনি পীড়নযন্ত্রনা ভোগ করেন তার অজ্ঞতার মাপ অনুযায়ী ভিন্ন কারণে। তবে তার বিদঘুটে বিশ্বাসের জন্য যেহেতু মহাজগতের নিয়মে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না সেহেতু বিশ্বাসের ভ্রান্তির জন্য তার ভেতর কোনো খেদ কাজ করে না। জগত কারো বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল নয় বলে তার যে সত্যটির প্রকৃতি যেমন তা সবসময় তেমনই থাকে। জ্ঞানীরা কেবল সত্যকে আবিষ্কার করতে পারেন। সত্যের রূপ বদলে দেওয়া তাদের কাজ নয়, সেই সক্ষমতাও তাদের নেই। অজ্ঞ তাই নিজের অজ্ঞতার ব্যাপারে অজ্ঞ রয়ে যেতে পারেন গর্বভরেই। যে গর্ব আসলে মিথ্যা।

আমার এক পরিচিতজন ছিলেন। তিনি একবার বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে, আমি কেন চাঁদটিকে পৃথিবীর চেয়ে ছোট ভাবছি! যদিও আমার ভাবনায় কিছুই যায়-আসে না। মহাবিশ্ব যে নিয়মে চলে তা কারো ত্রুটিপূর্ণ ভাবনায় বদলায় না। কল্পনার অধিক এই জগতটিতে একজন মানুষ কেবল মানুষের স্মৃতিতে রোমন্থিত হওয়া ছাড়া আর কোনোরকম আলাদা গুরুত্ব পান না, তা তাকে আমরা যত বড় বীর কিংবা ঝড়ের সমতুল্য বর্ণনা করে আপ্লুত হই না কেন। মহাবিশ্বের কোনো নিয়ম বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। বরং আমরা সবাই একই জাগতিক নিয়মেরই অধীনস্থ। আয়ু শেষে আমরা সবাই মরে গিয়ে মাটিতে মিশে যাই। যদিও আমার পরিচিতজনটি পৃথিবী নামক গ্রহটির অন্যতম দরিদ্র একটা অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ছোট এক অংশের উপর আংশিক কর্তৃত্ব খাটাতে পেরে নিজেকে মহাবীর আলেকজান্ডারের মতো দিগ্বিজয়ী দাপটের অধিকারী ভেবে সুখ অনুভব করতেন। তবে অবশ্যই তিনি জানতেন না আলেকজান্ডার আসলে কে।

কোনো এলাকার মোড়লিপনার অংশ এমন একজনের জন্য আলেকজান্ডারকে না জানা কোনো অসুখের কারণ নয়। তবে এই না জানা তার মধ্যে নিজের হীনতাকে চেপে রেখে যে দম্ভের বোধ জাগ্রত করে তা অনেক মানুষের অসুখের কারণ। আকারে ছোট হলেও তা আলেকজান্ডারের ছড়িয়ে দেওয়া অশান্তির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আর অন্যসব কারণ বাদ দিলেও কেবলমাত্র এ জন্যই মানুষের মধ্যে জানাশোনার চর্চা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তাতে অন্তর বিনয়ের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠে। যা অন্যদের বাসকে নির্বিঘ্ন রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। হয়তো তা ব্যাতীত জ্ঞানের পেছনে মানুষের না ছুটোছুটি করলেও চলে। যদি কেবল সুখের কথা বলি তাহলে অরণ্য কিংবা প্রাসাদে জীবনযাপন করায় তেমন কোনো পার্থক্যই আসলে নেই। প্রাসাদবাসীটির যেমন প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার পীড়া থাকতে পারে, অরণ্যবাসীটির তা নাও থাকতে পারে। ফলে কেবলই সুখের প্রশ্ন তুললে অরণ্যের বাসিন্দাটির জীবনযাপনের সুখ প্রাসাদের আভিজাত্যকে ছাপিয়ে যেতে পারে। আবার উল্টোটাও হতে পারে। তবে দুটোই বিনয়ের উপর নির্ভরশীল। বিনয়ের পরিমাণই সুখের নির্ধারক। আর জ্ঞান চর্চা মানুষকে বিনয়ী করে বলেই জ্ঞানের পথটি ধরে হাঁটা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিগত জীবনে একজন পীর কতটুকু সুখী তা বাইরে থেকে বলা কঠিন। তবে তার সান্নিধ্যে মুরিদগণ নিরাপদ ও সুখী বোধ করেন; অন্তত যতদিন পর্যন্ত পীরের কেরামতির প্রকৃত সত্যটি তাদের কাছে অজানা থাকে। সত্য আশাব্যঞ্জক ও হতাশাব্যঞ্জক—দুই-ই হতে পারে। অন্ধকারের প্রতি একধরনের স্বভাবজাত ভীতি থাকলেও কেবলমাত্র বিশ্বাসের প্রশ্নে মানুষ অন্ধকারে থাকতেই অধিক পছন্দ করে। ফলে যে সাধকের অধীনে একটাও জ্বীন নেই তাকে লোকজন একাধিক জ্বীনের প্রভু হিসেবে সমীহ করে। নির্জনতায় সন্ত্রস্ত থাকে অভিশপ্ত আত্মা ও অশুভ ভুতের ভয়ে। একই কারণে ভণ্ডেরা হয়ে উঠেন তাদের আশ্রয়স্থল। যে আশ্রয়স্থল মিথ্যা ও ভঙ্গুর তা থেকে প্রাপ্ত প্রশান্তিও কি তেমনই? মোহ কাটিয়ে উঠতে পারলে শেষ পর্যন্ত আসলে তা-ই। এ জন্যই মানুষ আলোর পথে হাঁটবে।

আলোর সবটুকু আমাদের ধারণাকৃত পথে থাকে না। কিছু আলো থাকে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিতে। মানুষ তার পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র থেকে যা যা শিখে—অর্জিত সেই শিক্ষার আলোকে সিদ্ধান্ত নেয় প্রবৃত্তির অনুসরণে। মানুষটি গোঁড়া হবে নাকি উদার, জেনেও গর্দভ থাকবে নাকি বদলাবে তা তার সহজাত প্রবৃত্তিই ঠিক করে দেয়। প্রবৃত্তিই মানুষকে ভালমন্দে প্ররোচিত করে।

আমার আরেকজন পরিচিত মানুষ ছিলেন যিনি নিয়ম করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। আমি তার শেষ জীবনের কিছু অংশ পেয়েছিলাম। জীবনভর তিনি কেমন মানুষ ছিলেন আমি তা সংগত কারণেই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাইনি। তবে আমার মনে পড়ে অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষটি দৃষ্টিভঙ্গিতে উদারই ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে দুরুদ পড়া দলটির অংশ হলেও বসে দুরুদ পড়া দলটির তাফসীরেও উৎসাহের সাথে অংশ নিতেন। সাধারণত দুইপক্ষের মুসলমানদের কেউ কেউ পরষ্পরের ধ্যানধারণাগুলোর প্রতি এতোই বিরূপ যে এক পক্ষ আরেক পক্ষের মসজিদে নামাজ পর্যন্ত পড়তে অনিচ্ছুক। ভিন্ন ধর্মের কামাররা তাকে পছন্দ করতো। আমি এমন অনেক মানুষ সম্পর্কে জানি যারা জোরজবরদস্তি করে কামারদের জমি দখল করতেন। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সমাজে নিরীহদের নিগ্রহের এমন অনেক গল্প আছে। এলাকায় নিজের গোষ্ঠীর দাপট থাকলেও তিনি এমন করেননি বলেই শুনেছি। আর তিনি তার এই গুণটি কোনোরূপ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে অর্জন করেননি, সহজাতভা‌বেই পেয়েছিলেন।

একই মানুষটির প্রতি মাঝেমধ্যে বিরক্তিও বোধ হতো; কারণ তিনি তার ছেলের সন্তানসন্ততিদের তার মেয়ের সন্তানসন্ততিদের তুলনায় কম স্নেহ করতেন। তিনি তার ছেলের শিক্ষার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকলেও মেয়ের শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। এসব নির্ধারিত হয় সমাজের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী। খুব কম মানুষই সেই স্ট্যান্ডার্ড অতিক্রম করে যেতে পারে। সমাজ তার অধীনস্থ মানুষের সামনে একটা সীমারেখা টেনে রাখে। মানুষ তা চাইলেই অতিক্রম করতে পারে না যদি না জ্ঞানে সে সমাজকে অতিক্রম করে যেতে পারে। মানুষ যে কালচারে বেড়ে উঠে, যে কালচার চর্চা করে সেই কালচারের মন্দগুলোকে কেবল প্রবৃত্তির শক্তি দিয়ে অগ্রাহ্য করা সহজ ব্যাপার নয়। আর কালচারের মন্দ দিকগুলোকে অগ্রাহ্য করতে না পারলে একজনের চর্চা তার অজান্তেই অন্যের জীবনের জন্য অভিশাপ হয়ে উঠে।

সঠিক সময়ে গ্রহণ করতে না পারা আশীর্বাদই একটা সময়ে গিয়ে অভিশাপে পরিণত হয়। অজ্ঞতা মানুষকে অতিমাত্রায় রক্ষণশীল ও ভীতু করে রাখে। ফলে সবসময় সুযোগ কাজে লাগানো হয়ে উঠে না। আমি এমনও দেখেছি যে প্রাপ্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারায় গোষ্ঠীর সবার জন্য কল্যাণকর কোনো সুযোগ কেবল কয়েকজনের ত্যাগের পরিমাণ একটু বেশি হওয়ায় শেষপর্যন্ত অগ্রাহ্য হয়েছে। গণ-অজ্ঞতা এমনই এক অভিশাপ।

অনেকের দৃঢ় ধারণা কিছুই না জানা কারো কারো জীবনও বেশ নির্বিঘ্ন ও সুখময়। আবার অনেক-জানা কারো কারো জীবন নরকতুল্য। জীবন যাদের নরকতুল্য তাদের জানাশোনার পরিধি ছোট। যারা অল্প জানেন তারা অধিক বলেন, অধিক প্রতিষ্ঠা কামনা করেন। দুঃখের বোধ তখনই বেশি হয় যখন প্রত্যাশা ও অপ্রাপ্তির পার্থক্যটি বিশাল হয়ে দাঁড়ায়। যিনি যত বেশি জানেন ব্যাক্তিজীবনে তিনি তত নির্মোহ থাকতে পারেন। যিনি কিছুই জানেন না, জানতে চানও না মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা তার মনে লুপ্ত হয়ে যায়। মর্যাদার সাথে সুখ শব্দটির এক বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। মর্যাদাবিহীন সুখ অলঙ্কারবিহীন সাজের মতোই আকর্ষণহীন।

মানুষের জীবনে আর্থিক সাফল্যের সাথে জ্ঞান ও অজ্ঞতার সম্পর্কটি গভীর নয়। একজন অজ্ঞ মানুষও আর্থিকভাবে সফল জীবন কাটাতে পারেন, বিপরীতে একজন জ্ঞানী কাটাতে পারেন দারিদ্র্যে জর্জরিত জীবন। তবে মর্যাদার প্রশ্নে জ্ঞান আবশ্যক। যে গৃহস্থের অভাবজনিত সমস্যা নেই জীবন উপভোগের উপকরণ তার সামনে কম নয়। মৌসুমের প্রারম্ভে ধান রোপণ করা, খরার দিনে কয়েক কিলোমিটার দূরের গাঙে আট-দশটি গরুকে নিয়ে গা ভিজিয়ে আনা, বৃষ্টির দিনে জল বেড়ে গেলে ডিঙিতে বসে হাওরের স্বাদ নেওয়া, কালভার্টের উপর দাঁড়িয়ে মাছ ধরা, পুকুরপাড়ে বসে বড়শি ফেলা, রাতে হাতপাখা হাতে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে তারা দেখা, চাঁদ নিয়ে লোকগাঁথা অনুযায়ী রহস্যময় কল্পনা করা, তারা খসে পড়তে দেখে অবাক হওয়া—সবকিছুই সুখের। কিন্তু সুখের মহাত্ম ম্লান হয় যখন এসবের পরেও নিছক বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, বরং অজ্ঞতার বশে মানুষ প্রতাপের সামনে হাত কচলাতে নিজেকে প্ররোচিত করে। কাউকে লাথি মারা ও কারো পায়ে পড়ায় অর্জনের চেয়ে হানিই বেশি থাকে। অজ্ঞতা অন্ধকার ডেকে আনা চাদর দিয়ে মর্যাদাহীনতার গ্লানিকে আড়াল করে রেখে এক মিথ্যা সুখের তৃপ্তি দান করে। যা আসলে সত্য নয়।

ফয়সল সাইফ: কথাসাহিত্যিক

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments