ডাকসু ভিপি নুরুঃ একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের নাম – শাখাওয়াৎ নয়ন

  •  
  •  
  •  
  •  

ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলে কাউকে হতাশ, কাউকে হতবাক এবং কাউকে করেছে চিন্তিত। অল্প কথায় ডাকসু’র ২৫টি পদের মধ্যে ভিপি এবং সমাজসেবা সম্পাদক ব্যতীত বাকী ২৩টিতেই জিতেছে ছাত্রলীগ। ছেলেদের ১২টি হলের মধ্যে ১০টিতে ছাত্রলীগ বাকী দুটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে। মেয়েদের হলগুলিতে রোকেয়া হল ছাড়া বাকিগুলিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছে ব্যাপকভাবে। ১২ মার্চ ২০১৯ নব নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরু ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল শেষে ভিপি এবং সমাজসেবা পদ ব্যতীত অন্য সব পদে পুনঃনির্বাচন দাবি করেছেন। উল্লেখ্য, ১২ মার্চ নির্বাচন চলাকালীন হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি সারাদিন এমনকি ফলাফল ঘোষনা না হওয়া পর্যন্ত (রাত সাড়ে তিনটা) উক্ত হাসপাতালেই অবস্থান করেছেন। ছাত্রলীগ ‘ভিপি’ এবং ‘সমাজসেবা সম্পাদক’ পদে পুনঃনির্বাচন দাবি করেছে। এবার আসুন ডাকসু নির্বাচন, ফলাফল এবং পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক।
কিছু প্রশ্ন খুব ঘুরপাক খাচ্ছেঃ (এক) ছাত্রলীগ মোট ২৫টি পদের মধ্যে ২৩ পদে জিততে পারলেও কেন ভিপি এবং সমাজসেবা পদে জিততে পারলো না? কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন- নিজেদের দলীয় কোন্দলের কারণে ছাত্রলীগ ভিপি পদে জিততে পারেনি। তাই যদি হবে, তাহলে সমাজসেবা সম্পাদক? অন্যরা বলছেন-ক্যাম্পাসে ছাত্রদল কিংবা বামজোটের ছাত্রনেতাদের অনুপস্থিতির কারনে নুরু জিতে গেছে। কেউ কেউ তাকে ছাত্রশিবির আখ্যা দিচ্ছেন। তারা ডাকসুতে শিবিরের নেতৃত্ব কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। কারণ এটাকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরাজয় হিসেবে দেখছেন। (দুই) মেয়েদের হলগুলিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এত ব্যাপকহারে জয়লাভ করলো কেন? (তিন) নুরুল হক নুরু রোকেয়া হলে গিয়ে কেন মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন? অন্য কোথাও কেন পড়লেন না? এটা যে পুর্ব-পরিকল্পিত, তা কি সহজেই অনুমেয় নয়? তিনি কেন ফলাফল ঘোষনা না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালেই অবস্থান করলেন? নাকি বাজিরঘোড়া যাতে কোনোভাবে হাতছাড়া হয়ে না যায়, সেজন্য তাকে সেইফ কাস্টোডিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? (চার) কোনো হলেই কেন বামজোটের কিংবা ছাত্রদলের কেউই জয়ী হলো না? এটা কি সম্ভব কোনো হলেই বামজোটের কিংবা ছাত্রদলের কোনো যোগ্য কিংবা জনপ্রিয় প্রার্থী ছিল না? (পাঁচ) রাত ১২টা’র সময় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোতে কেন শোভন এবং রাব্বানী’র ‘ভিপি-জিএস’ হিসেবে নির্বাচিত হবার হেডলাইন প্রকাশিত হলো? রাত সাড়ে তিনটায় সেই ফলাফল কিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেল? (সাত) আরো মোটাদাগের প্রশ্ন হচ্ছে-এসব ছাত্রনেতারা কি আদৌ নির্বাচিত হলেন? নাকি মনোনীত হয়েছেন? যদি মনোনীতই হবে, তাহলে এই নির্বাচন নাটকের দরকার কি ছিল? এমন হাজারো প্রশ্ন করা যেতে পারে; বিভিন্ন রকম উত্তরও পাওয়া যেতে পারে। তবে এই ফলাফল সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিকে কোন পথে ধাবিত করবে? সেটাই মুখ্য আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিৎ।
বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতেও কি একই মডেল অনুসরণ করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হবার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। কারণ একজন নুরুকে ভিপি পদটি ছেড়ে দিয়ে এবং অধিকাংশ মেয়েদের হলসহ ছেলেদের দুটি হলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের স্বাভাবিক জয়লাভে বাঁধা না দেয়ার মাধ্যমে, ছাত্রলীগ মূলতঃ ডাকসু’র গ্রহনযোগ্যতা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। অন্য কথায় কোটাবিরোধী আন্দোলনের ন্যায় আবারো কোনো ছাত্র আন্দোলনের মুখোমুখি তারা হতে চায় নি। অথবা ৩০ মার্চের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো একচেটিয়া ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চায়নি।
এছাড়াও আরো কারণ থাকতে পারে। সাধারন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে নুরু-রাশেদ নেতৃত্বাধীন একটি ছাত্র-রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গড়ে উঠেছে কিংবা গড়ে তুলেছে; যাদের ব্যাপক জনসমর্থন আছে। দেশব্যাপী তাদের পরিচিতি তৈরি হয়েছে। সুতরাং ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই প্লাটফর্মকে গুরত্ব না দিলে সরকারের জন্য হুমকি হয়ে যেতে পারে। যেমনটা দেখা গিয়েছিল কোটা বিরোধী আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে। এমন একটি সদ্য গড়ে ওঠা ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম আয়োজিত (৫মে, ২০১৩) মতিঝিলের সমাবেশ আওয়ামীলীগের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। আওয়ামীলীগ কিংবা ছাত্রলীগের তা ভুলে যাবার কথা নয়।
সুতরাং আওয়ামীলীগ সম্ভবতঃ আবারো রাজনীতিতে ট্রাম্প কার্ড খেলেছে। নুরুকে ভিপি পদটি ছেড়ে দিয়ে মূলতঃ মাওলানা শফি’র মতো তাকেও কিনে নিয়েছে। শফিকে দিয়েই যেভাবে হেফাজত ইসলামকে নিয়ন্ত্রন করেছে; একইভাবে নুরু এবং তাঁর কিছু সঙ্গী-সাথীদেরকে দিয়েই সাধারন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সরকার বিরোধী মনোভাবকে দুর্বল করে দেয়া হবে। নুরুকে শুধু ভিপি পদই নয়, প্রয়োজনে আরো অনেক কিছুরই প্রলোভন দেখানো হবে। নুরু যদি কথা না শোনে? তাহলে নুরুর নামে ইতোমধ্যে মামলা দেয়া আছে, সময় মতো ‘সাইজ/সিস্টেম’ করে দেয়া হবে। কারণ নুরু একটি রাজনৈতিক প্রকল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। যেভাবে ইমরান এইচ সরকারকে এক সময় হিরো বানানো হয়েছিল; অতঃপর তাঁর বাকি ইতিহাস কেউ এখনো ভুলে যায়নি, নিশ্চয়।

শাখাওয়াৎ নয়ন: কথাসাহিত্যিক, একাডেমিক, ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।