ডানপন্থীদের অনুচ্চারিত বাকি কথা । নিঝুম মজুমদার

  •  
  •  
  •  
  •  

বলা হয় প্রাণী হিসেবে গাধা আর শেয়ালের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে একটাই। শেয়াল যা করবার দ্রুত ছোঁ মেরে করে। যা করতে চায় সেখানে সরাসরি করবার একটা তাড়না শেয়ালের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু গাধা নামের প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। গাধা একটি কাজ করবে ঠিক কিন্তু সেটি সে পানি ঘোলা করে নানান সমস্ত হাস্যকর কান্ডের পর করবে। গাধা আর শেয়ালের এই সুনির্দিষ্ট পার্থক্য সামনে আনাটা জরুরী ছিলো এই লেখার জন্য।
আলোচনার কেন্দ্রে যাবার জন্য কিছু ছোট ছোট উদাহরণ আর ঘটনার জের টানতে চাইছি যেগুলো এই লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক এবং চিন্তার প্যাটার্নে কিছুটা হলেও নাড়া দিতে সক্ষম। আমি বরং আলোচনা শুরু করতে চাই ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালের ঢাকা জজ কোর্টের ৪ তলার (সাবেক) সাইবার ট্রাইবুনালের একটি মামলার পিটিশন সময়ের ঘটনা দিয়ে। এই সুনির্দিষ্ট দিনে আমি ঢাকা সাইবার ট্রাইবুনালের ভেতরে উপস্থিত ছিলাম। দুপুরের দিকে ইব্রাহিম খলিল নামে এক লোক উইটনেস স্ট্যান্ডে দাঁড়ান।

ট্রাইবুনালের বিচারক আস শামস জগলুল হোসেন সাহেব ইব্রাহিম খলিলের কাছে জানতে চাইলেন যে কেন তিনি মুফতি গিয়াসুদ্দিন আত তাহেরির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা (ধারা-২৮) ও আইন শৃংখলার অবনতি ঘটিয়েছেন (ধারা-৩১) মর্মে অভিযোগ এনেছেন?
ইব্রাহিম খলিল গলা কাঁপিয়ে বিচারক সাহেবকে বললেন ( যতদূর মনে রয়েছে, সেটিকে অনুলিখন করছি),
-স্যার, এই গিয়াস উদ্দিন আত তাহেরি ওয়াজের মধ্যে উলটা পালটা কথা বলে।
-কি উলটা পালটা কথা বলে?
– স্যার, বিড়ি খাওনের দোয়া বলে আর মানুষজনকে শেখায়
(কোর্টের সবাই হা হা হা করে হাসা শুরু করলো)
-আর কি বলে?
-স্যার, উনি ওয়াজের মধ্যে চা ঢেলে দিতে বলেন।
(আবারো কোর্টে হাসির রোল পড়ে যায়)
বিচারক আস শামস জগলুল সাহেব এইবার মোটামুটি রেগে ওঠেন। তিনি বিচার প্রার্থীকে বলেন-
-আপনার খাইয়া দাইয়া আর কাম কাজ নাই?
(কোর্টে হাসির রোল ওঠে)
ইব্রাহিম খলিল কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। বিচারক তাকে থামিয়ে দেন।
– শোনেন, আপনি এই মামলা ফাইল করসেন সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে। আমি তারপর এইসব ওয়াজ গিয়ে শুনেছি ও দেখেছি। ওয়াজের মধ্যে তিনি বিড়ি খাবার দোয়া বলেন নাই বরং অন্য এক ব্যক্তি এই বিড়ি খাবার দোয়া তাহেরি সাহেবকে বলেছেন এবং তাহেরি সাহেব সেটা ওয়াজে জনতার উদ্দেশ্যে হাস্যরসাত্নক ভাবে সেই গল্প বলেছেন। এই গল্প তিনি বানিয়েছেন এমন কিছুই আমি ওয়াজে পাই নাই। আর ওয়াজে যদি একজন মানুষ তাঁর ভক্তদের উদ্দেশ্যে চা ঢেলে দিতে বলেন, তাহলে আপনার সমস্যা কি?
ইব্রাহিম খলিল সাহেব চুপ করে উইটনেস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। বিচারক যে রেগে গেছেন এটা স্পস্ট বুঝতে পারা যায়।
– আপনার খাইয়া দাইয়া কোনো কাম কাজ নাই। আপনি আছেন গ্যাঞ্জাম লাগানোর তালে। ওয়াজের মধ্যে কে চা ঢাইলা দিতে বলসে আর কে বিড়ির দোয়া বলসে সেইটা নিয়া আসছেন কোর্টের ভ্যালুয়েবল সময় নষ্ট করতে। আপনে বলতেসেন তাহেরি আইন শৃংখলার অবনতি ঘটাইসে। কোথায় ঘটাইলো? এই ওয়াজে আইন শৃংখলার অবনতি কেমনে হইসে আমারে বুঝান।
বিচারক এইবার তাকায় ইব্রাহিম খলিলের (বাদীর) আইনজীবির দিকে। আইনজীবি কাঁচু মাচু হয়ে দিশেহারা অবস্থা।
-এই মামলা আপনি সাজাইসেন? কি দেইখা এই ৩১ ধারা যোগ করসেন?
বিচারক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন আইনজীবির দিকে। আর কিছু না বলে গম্ভীর মুখে এরপর তিনি মামলা খারিজ করে দেন। অভিযোগ আমলে নেন না।
কোর্ট থেকে বের হয়েই বাদী ইব্রাহিম খলিল সাংবাদিকদের ফাঁপর দেয়া শুরু করেন।
“আমি উচ্চ আদালতে যাবো, রিভিউ করবো” আরো কত হ্যান ত্যান। যদিও আজ পর্যন্ত এই মামলা নিয়ে খলিল উচ্চ আদালতে যায়নি বলেই জানি। যাবার কথাও না।

এই সাইবার ট্রাইবুনালের গল্পটা একটা উদ্দেশ্য নিয়ে বলেছি আর সেটা হচ্ছে আমি যাকে দেখতে পারি না বা যাকে আমার ভালো লাগেনা ইচ্ছে করলে তার লক্ষ লক্ষ খুঁত আমি বের করে ফেলতে পারবো। বোধকরি এটাই হিউম্যান সাইকোলজি। এই মনস্তত্ব এত গভীর আর এত অন্ধকার যে এটি নিয়ে এই স্বল্প পরিসরে কথা বলাটা হবে বোকামি।
বিচারক জগলুল সাহেব গিয়াসুদ্দিন আত তাহেরির ওয়াজ শুনে যা বুঝেছেন সেই একই ওয়াজ শুনে বাদী ইব্রাহিম খলিল সেই একই কথাা বুঝতে পারেনি?
উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই পেরেছে। কেন পারবে না? স্পস্ট করেই সে ওয়াজ করেছে।
কিন্তু তারপরেও সে মামলা করেছে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এসে আমি থেমে যাচ্ছি। উত্তর আমি দেব, তবে এখন নয়। এই লেখার শেষে। আমি এইবার আমার মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

খুব মন দিয়ে একাত্তর টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক ফারজানা রূপা এবং মিথিলা ফারজানা এই দুইজনের দুটো সুনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান দেখলাম। যার একটি ফারজানা রূপার কোভিড ও মানুষ পুড়িয়ে ফেলা সংক্রান্ত এবং আরেকটি হচ্ছে মিথিলা ফারজানা’র মসজিদ ব্যবহার করে জমি দখল সংক্রান্ত।
কেন এই দুইটি অনুষ্ঠান খুব মন দিয়ে দেখলাম?
কারন সাম্প্রতিক সময়ে একাত্তর টেলিভিশন বয়কট সংক্রান্ত আলাপে যেসব র‍্যাডিকাল ডানপন্থীরা এই টেলিভিশনের নানাবিধ ‘অপরাধ’, ‘ত্রুটি’র বয়ান তথা যে অভিযোগ উঠিয়েছেন, সেগুলোকে ক্রস চেক করবার জন্য এই অনুষ্ঠান দু’টি দেখা আমার জন্য জরুরী ছিলো। কেননা এই বয়কট দাবীতে আলোচ্য এই দুইটি অনুষ্ঠানকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে।
মোটা দাগে বলা হচ্ছে ফারজানা রূপা মুসলমানদের কবর দেয়ার পরিবর্তে পুড়িয়ে ফেলতে সাজেস্ট করেছেন এবং মিথিলা ফারজানা বলেছেন ‘সব’ মুসলমানরা মসজিদের মাধ্যমে জমি দখল করে। আমরা এই লেখার মাধ্যমে এইসব সব কিছুর সলুক সন্ধান করব আজকে।
মিস রূপা একাত্তর টিভি’র এক অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করছিলেন। সাথে ছিলেন শ্যামল দত্ত নামে আরেক সাংবাদিক সাহেব এবং ডাক্তার আব্দুল্লাহ সাহেব।
এই আলোচনায় কথা হচ্ছিলো যে বিশ্বের অন্যান্য দেশে কোভিড রোগীদের দেহ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে চূড়ান্ত সতর্কতার অংশ হিসেবে। বাংলাদেশে কি এটা সম্ভব বা করা উচিৎ কিনা? মানে একটা ব্যাপার জানতে চাওয়া। এইটুকুই।
রূপা প্রসঙ্গক্রমে ডাক্তার সাহেবের কাছে জানতে চাইলেন যে, এই যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই যে কোভিডে আক্রান্ত লাশ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে এতে করে চায়না একটা বড় সফলতা পেয়েছে।
রূপা কিন্তু এইসব কথা বলতে গিয়ে বার বার নানাবিধ সংবাদপত্রের রেফারেন্স টানছিলেন। তিনি এই প্রসঙ্গে ডাক্তার আব্দুল্লাহর কাছে জানতে চাইলেন এইভাবে যে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যদি লাশের সৎকার আমাদের দেশে না করা হয় তাহলে কেমন ঝুঁকি রয়েছে এখানে?
ডাক্তার আব্দুল্লাহ সাথে সাথেই জানালেন যে কোভিডে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীর ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু যেহেতু ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের ব্যাপার এখানে রয়েছে ফলে এইটা হয়ত এখানে সম্ভব হবে না।
ঠিক এর পরপর শ্যামল দত্ত জানতে চাইলেন গতকাল একজন ব্যাক্তি কোভিডে মারা গেছে তাঁকে কি করা হয়েছে?
ডাক্তার আব্দুল্লাহ জবাব দিলেন তাঁকে দাফন করা হয়েছে কিন্তু সেই মৃত ব্যাক্তির একজন স্বজনও সেই দাফনকার্যে ভয়ে আসেন নি।
শ্যামল দত্ত আবার জানতে চাইলেন এইটা কি বিজ্ঞান সম্মত, এই সময়ের সিচুয়েশন অনুযায়ী?
ডাক্তার আব্দুল্লাহ যা বললেন তার সার সংক্ষেপ দাঁড়ায় এমন যে- দাফন করলেও সমস্যা নেই। দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর যেহেতু এটা ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের ব্যাপার ফলে দাফনটাই ভালো। তিনি একই সাথে মাটির উপরে ভাইরাস কতক্ষন বাঁচে সে কথা জানালেন। হাতে লাগলে কি হয়, মেটালে লাগলে কি হয় কিংবা ভাইরাস কতক্ষন বাঁচে আমাদের জানালেন।
রূপা এইবার জানতে চাইলেন যে, সমস্ত অনুভূতির উপরে উঠে সবচাইতে বেস্ট পদ্ধতি কি লাশ সৎকারের?
ডাক্তার আব্দুল্লাহ এইবারও বললেন দাফনের কথা ধর্মীয় রীতিতে। ভদ্রলোক বার বার তাঁর কথায় ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের কথা বলছিলেন কেননা তিনি বুঝতে পারছিলেন লাশ পুড়িয়ে ফেলবার কথা বললে তিনি বড় ঝামেলায় পড়বেন। অন্তত ভিডিওটি দেখে আর ডাক্তার সাহেবের ইতস্তত গলা শুনে আমার সেটাই মনে হয়েছে।
রূপা এবার বললেন, যদি কোনো ব্যক্তি স্বজনেরা নিজের থেকেই স্বপ্রনোদিত হয়ে লাশ পুড়িয়ে ফেলে সেক্ষেত্রে তো হতে পারে। তাইনা?
ডাক্তার আব্দুল্লাহ এই ক্ষেত্রে বললেন, এটা যার যার নিজস্ব ব্যাপার। তবে তিনি আবারও দ্রুত দাফনের কথাই উপস্থাপককে বললেন। সোজা কথা দাফন সংক্রান্ত কোনো ভেজালেই ভদ্রলোক পড়তে চাইছিলেন না। আমার ঠিক তেমনটাই মনে হয়েছে ভদ্রলোকের কথা শুনে।
এই ভিডিও দেখে একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার যে কোভিডের এই অবস্থায় মৃত দেহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলবার ব্যাপারটা যে পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রে করছে এবং সেটা কার্যকর হচ্ছে রূপা সেটাই বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন ডাক্তার আব্দুল্লাহকে।
মূলত, এমন এক ভয়াবহ মহামারীর সময় সমস্ত সেন্টিমেন্টের উপরে উঠে এসে আসলে সৎকারের সবচাইতে বেস্ট পদ্ধতি কি এটাই বের করতে চাইছিলেন আলোচনা থেকে। আর রূপা তাঁর আলোচনার ভিত্তি হিসেবে রেখেছেন চায়নার পাওয়া সফলতা সহ সারা বিশ্বেই এই পদ্ধতির সৎকারের কার্যকারিতা।
একটি বারের জন্যও রূপা বলেন নি যে মৃতদেহ কে পুড়িয়েই ফেলতে হবে? একটি বারের জন্য তিনি নিজের থেকে একটি অক্ষরেও তাঁর নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলেন নি। একটি বারের জন্যও তিনি এই অনুষ্ঠানে উচ্চারণ করেন নি যে জোর করে মৃত মুসলমানকে পুড়িয়ে ফেলা হোক।
কিন্তু তারপরেও এই র‍্যাডিকাল ডানেরা ঠিক কোথায় পেলো এই তথ্য যেখানে রূপা লাশ আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন? র‍্যাডিকাল ডানেরা ঠিক এই যায়গায় কোথায় পেলেন যে রূপা ধর্ম অবমাননা করেছেন?
এর উত্তর আমি দেব। তবে এখন না। একটু পর।

এবার আসি ফারজানা মিথিলার সঞ্চালনায় একাত্তর টিভির আরেকটি অনুষ্ঠানের দিকে। এই অনুষ্ঠানে স্টুডিওতে ছিলেন দুইজন ব্যক্তি আর বাসা থেকে সংযুক্ত ছিলেন নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের সচিব আব্দুস সালাম।
প্রসঙ্গ ছিলো তুরাগের তীরে অবৈধ স্থাপনাগুলো নিয়ে। এই অবৈধ স্থাপনার মধ্যে ছিলো ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্রকল্প, মসজিদ, স্কুল, ঘর-বাড়ী ইত্যাদি।
এইসব অবৈধ স্থাপনা ভাংতে সরকারকে কিভাবে বেগ পেতে হচ্ছে এবং কিছু কিছু ভবনের কারনে কিভাবে এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না কিংবা সময় লাগছে এসব সব কিছুই এই অনুষ্ঠানে আলোচনা হচ্ছিলো।
মিথিলা ফারজানা যখন এইসব অবৈধ স্থাপনার একটা একটা করে উদাহরণ দিচ্ছিলেন তখন তাঁর অতিথির কেউ একজন মিথিলাকে ধরিয়ে দেন মসজিদের কথা।
স্ক্রিনে সে সময় মিথিলা থাকাতে কে ধরিয়ে দিয়েছেন এটা বলতে পারছি না কিন্তু মনে হচ্ছিলো মিথিলার ডানে থাকা পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক-ই এই মসজিদ ব্যাপারটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন মিথিলাকে।
সুনির্দিষ্টভাবে তিনি বলছিলেন, ‘এইখানে পাওয়ার স্টেশন আছে, সরকারী অফিস আছে’ ঠিক এই সরকারী অফিসের কথা বলার মুহুর্তেই তাঁর সেই অতিথি মনে করিয়ে দেন মসজিদের কথা।
মিথিলা সেটার সূত্র ধরেই বলেন, মসজিদ তো আছেই। জমি দখলের প্রথম কাজ হচ্ছে ধর্মীয় উপাসনালয় তৈরী করা।
এই হোলো মিথিলার সেই বাক্য যেটার জন্য র‍্যাডিকাল ডানেরা ছড়িয়েছেন, মিথিলা ফারজানা ধর্ম অবমাননা করেছেন এবং মসজিদ দিয়ে জমি দখল করা হয় সেটা বলেছেন।
কিন্তু এরা এই ধর্ম অবমাননা কিংবা মিথিলার মুখে জোর করে পুরে দেয়া এইসব বাক্য বা শব্দ পেলেন কোথায় যে কথা মিথিলা কখনো বলেন-ই না!
এটার উত্তর আমি দিচ্ছি। আরো দিচ্ছি আগের সব প্রশ্নের উত্তর।

ঐ যে শুরুতেই আমি প্রশ্ন করেছিলাম গিয়াস উদ্দিন আত তাহেরীর বিরুদ্ধে মামলাকারী ইব্রাহিম খলিল কেন সব বুঝবার পরেও মিথ্যে মামলা দায়ের করেছিলো?
ইব্রাহিম মোটেও তাহেরির কথা শুনে ধর্ম-ভিত্তিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। কারন তাহেরি কোনো বিড়ি ফুকার দোয়াও বলেনি কিংবা কারো মাথায় চা ঢেলে দেবার কথাও বলেনি।
ইব্রাহিম খলিলের এটা লেগেছে কারন খলিল কওমীপন্থী ঘরানার আর তাহেরি সুফি ঘরানার। ইব্রাহিম খলিল শরীয়ত পন্থী আর তাহেরি শরীয়ত এবং মারফতি পন্থী।
তাহেরি মাজারের পক্ষে আর ইব্রাহিম খলিল মাজারের সামনে লোক সমাগমকে মনে করে পুজো। ইনফ্যাক্ট এই মামলা ইব্রাহিম খলিলকে দিয়ে করিয়েছে কওমীপন্থী হুজুরেরা। কারন তাহেরি তাদের আদর্শগত শত্রু।

তাহলে রূপার দোষ কি? রূপা তো কখনো বলেনি মুসলমানের দেহ আগুনে পুড়িয়ে দাও কিংবা পোড়াতেই হবে! রূপা শুধু বার বার চিকিৎসকের কাছে বৈজ্ঞানিক ও সারাবিশ্ব সে সময়ে হয়ে যাওয়া কার্যকর উপায় নিয়ে কথা বলেছে, জানতে চেয়েছে। এইটুকুই!
কিন্তু এরপরেও রূপাকে ল্যাং দিয়ে ধরতে হবে কারন র‍্যাডিকাল ডানপন্থীরা রূপাকে ঘৃণা করে। কারন রূপা একাত্তর টিভিতে কাজ করে। কারন মেয়ে হিসেবে রূপা অসম্ভব রকমের ভোকাল। কারন রূপা লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের আরাম আয়েশের জীবন নিয়ে, তার রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। কারন রূপা একজন মানুষ হিসেবে আওয়ামীপন্থী।
ব্যাস এটাই রাগ রূপার উপর। এখানে নেই ধর্ম অবমাননার কিছু। এখানে নেই ধর্ম ভিত্তিক আঘাতের কোনো গল্প। সাইবার ট্রাইবুনালের সেই ইব্রাহিম খলিল তাহেরির উপর রাগ ঝাড়তে ব্যবহার করেছে ধর্ম। এখানে রূপার উপর রাগ ঝাড়বার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ধর্ম। কারন রূপা ওয়াজের নোংরা কথা বলা মোল্লাদের ধরিয়ে দেয়। আর ধর্ম ব্যবহার করে কনুই মারা এই বাংলাদেশে বড় সহজ।

মিথিলাও যে ধর্মীয় উপাসনালয় দিয়ে জমি দখলের কথা বলেছেন এই কথা কতটুকু সত্য এই দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা জানেন। এই দেশের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে দিন আনে দিন খায় মজুরও জানে কিভাবে সরকারী খাশ জমি দখল করে বানানো হয় মসজিদ তারপর পাশে দিয়ে বানানো হয় নিজের জন্য বাড়ি কিংবা নিজের সুবিধার জন্য কোনো স্থাপনা।
যে র‍্যাডিকাল ডানেরা আজকে এই কথা ধরে বয়কট নামের হাস্যকর খেলা খেলছেন খোঁজ নিয়ে জানা যাবে তাদের অনেকেরই খাশ জমিও হয়ত এলাকার কোনো মাস্তান বা ভূমিদস্যু মসজিদের নামে দখল করে নিয়ে গেছে।
কিন্তু মিথিলা তো কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মের কথা বলেন নি। বরং বৃহৎ আকারে ধর্মীয় উপাসনালয়ের কথাই বলেছেন মিথিলা। বাংলাদেশে এই দখল হয় মসজিদ দিয়ে, ভারতে তা দখল হয় মন্দির দিয়ে কিংবা ইসরাইলে তা দখল হয় তাদের সিনেগগ দিয়ে। এইতো অবস্থা!! সারা পৃথিবীতেই এই চলছে।
মিথিলাকে তাই সিঙ্গেল আউট করে গাল কিংবা কনুই দেয়াটাও ঐ একই ঘৃণার অংশ। এটা একটা চক্র। একাত্তর টিভি মোজাম্মেল বাবুর। মোজাম্মেল বাবু আওয়ামীপন্থী ফলে একাত্তর টিভি সরকারের ভক্ত। এটাই ওদের সূত্র। ঠিক যেভাবে তারা সূত্র দিয়ে মিলিয়েছিলো শাহবাগে যারা যায় সব ‘নাস্তেক’।

আপনি যদি এই র‍্যাডিকাল ডানদের কাছে গিয়ে একবার জানতে চান যে কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তনের ছবিকে সাঈদীর পক্ষে মানবন্ধনের ছবি বলে চালিয়ে দেয়া আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিচার চান কিনা? কিংবা এটা ধর্মের অবমাননা কিনা? কিংবা যারা নাস্তিক নয় তাদের কে মিথ্যে করে নাস্তিক বলে আমার দেশে প্রচার করাটা ধর্মের অবমাননা কিনা, কোরান বা সুন্নাহ বিরোধী কিনা আপনি সেগুলোর উত্তর পাবেন না।
আপনি যদি এইসব র‍্যাডিকাল ডানদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন মিজানুর রহমান আজহারী মহানবী (সাঃ)-এর প্রথম স্ত্রীকে বুড়ি বলে সম্বোধন করেছে ওয়াজে, মুফতি ইব্রাহিম মিথ্যে বলে আল্লাহর নাম দিয়ে করোনা ভাইরাসের সাথে কথা বলছে, মামুন মারুফ নামে একটা মিথ্যে চরিত্র আমদানি করেছে, জিহাদী নামের আরেক হুজুর ওয়াজে বিড়ি টানার প্রক্রিয়া দেখাচ্ছে ওয়াজে বসেই, হিন্দি গানের নকল করে ওয়াজ করছে, কিংবা মেয়েদের নামে নোংরা সকল কথা বার্তা বলছে রাজ্জাক বিন ইউসুফ কিংবা ওয়াজের মধ্যে শত শত গালাগাল, খুন করে ফেলার হুমকি, মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে হুজুরেরা, এসব কি ধর্ম অবমাননা কিনা কিংবা ধর্মের পরিপন্থি কাজ কিনা, তাহলেও আপনি উত্তর পাবেন না।
এই পুরো ব্যাপারটাতে ফারজানা রূপা, মিথিলা ফারজানা, মোজাম্মেল বাবু, একাত্তর টেলিভিশন এইসব আসলে কোনোটাই কোনো ঘটনা না। মূল যা ঘটনা সেটা বলে দিয়েছেন বোকা জাফুরুল্লাহ।

বোকা জাফরুল্লাহ বলেছেন তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচন চান। এটা দিয়ে দেন। মোদ্দা কথা হচ্ছে শেখ হাসিনা গদি থেকে নেমে যান। মোদ্দা কথা হচ্ছে এই সরকার ভালোনা, আমার পছন্দের সরকার চাই। তিনি অবশ্য আরো বলেছেন, মানুষ এখন তিনবেলা খেতে পাচ্ছে বলে আন্দোলন করতে পারছে না কারন তাদের আন্দোলনের দরকার নেই। আর এই সাধারণ মানুষ এইসব অহেতুক আন্দোলন করছে না বলেই জাফরুল্লাহ আর তাঁদের স্যাঙ্গাতেরা একাত্তর টিভি বয়কট, অমুক বয়কট, তমুক বয়কট দিয়ে আন্দোলনের পটভূমি রচনা করবার কাজে মন দিয়েছেন। আর এই মন দেয়া নেয়ার কাজ এখন চলে গেছে মধ্য নির্বাচনের দিকে। এটাই মূল কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর এই ভেতরকার মূল কথা বলতে গিয়েই ভাত খেতে হয় ঘুরিয়ে আর পেঁচিয়ে। একাত্তর বয়কট, রাস্তা বয়কট, নদী বয়কট, মানুষ বয়কট। ওই যে আমার লেখার শুরুতে শেয়াল আর গাধার পার্থক্য বলেছি, একেবারেই সে রকম। ডানপন্থীরা গাধার মত পানি ঘোলা করে খাচ্ছে এখন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে ডানপন্থীরা কবে একাত্তর টিভিকে বুকে টেনে রেখেছিলো? শুরু থেকেই তো ডানপন্থীদের কাছে এই টিভি বয়কট। শুরু থেকেই এই টিভি কিংবা রূপা, মিথিলারা এই শ্রেণীর কাছের পরিত্যাজ্য।
যে কথা ধূর্ত আজহারী বলেনি, যে কথা ধূর্ত নূরু বলেনি, যে কথা বলেনি বাকি সকল ধূর্তেরা সেটি বোকার মত বলে দিয়েছেন ডাক্তার জাফরুল্লাহ। ঠিক যেমন ইলেকশনের আগে প্রধানমন্ত্রীকে দেখেই সব কিছু ভুলে জাফরুল্লাহ চেয়ে বসেছিলেন তার হাসপাতালের জন্য আরো কিছু জমি। ঠিক তেমন করে এই ভোলা ডাক্তার চেয়ে বসেছেন মধ্যবর্তী নির্বাচন। আমরা আমাদের জীবদ্দশায় হুমায়ুন আহমেদের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক বহুব্রীহি-তে দেখেছি এক বোকা ডাক্তারকে আর বাস্তবে এখন দেখা যাচ্ছে বিএনপিপন্থী ডাক্তার জাফরুল্লাহকে। যিনি কিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকদের নিয়ে এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মিথ্যাচার করে একদিনের দন্ডও পেয়েছিলেন।
এইসব বয়কট, মামলা, প্রতিবাদ, নুরা, আজাহারী, জাফরুল্লাহ, করিমুল্লাহ সব এক ঘাটেই পানি খেতে চায়। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পানি।
এটাই সত্য। এটাই এখন এইসব র‍্যাডিকাল ডানদের অনুচ্চারিত বাকি কথা।

নিঝুম মজুমদার
লেখক, কলামিস্ট ও আইনবিদ।
ব্যারিস্টার এন্ড সলিসিটর, সুপ্রিম কোর্ট অব নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া;
এনরোল্ড ব্যারিস্টার এন্ড সলিসিটর, হাইকোর্ট অব নিউজিল্যান্ড।

বসবাস: লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments