ড: আব্দুর রাজ্জাক : প্রিয় অগ্রজের অন্তিম যাত্রা -অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  
ড. আব্দুর রাজ্জাকের সাথে অজয় দাশগুপ্ত

আমি যখন সিডনিতে অভিবাসন নিয়ে আসি তিনি তখন খ্যাতির মধ্যগগণে। পরিচয় ঘটতে খানিকটা বিলম্ব হয়েছিল। সাধারণ মানুষ বা আম বাঙালির চোখে দেশের কাজ বা দেশের সংস্কৃতি রাজনীতি লালন করা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। আর আমার গোড়ার দিকের বসবাস ছিলো তাদের সাথে। তারা ঈদ পূজা বা ধর্মীয় উৎসব বাদে জন্মদিন বিয়ে বার্ষিকী আর সাপ্তাহিক দাওয়াতেই সন্তুষ্ট। নিজের গাড়ী না থাকলে যা হয়। মনে হয় প্রায় সাত আট মাস পর দেখা হয়েছিল তাঁর সাথে। পরিচয় পর্বেই মনে হলো আমাদের ধারার মৌলিক মানুষ। জর্দা সুপারী আর কি কি যেন মিশিয়ে কৌটায় করে রাখেন পকেটে। যখনই বের করেন মৌ মৌ গন্ধ। আমি আবার গন্ধ মূষিক স্বভাবের। হাত না পাততেই হাতে চলে এলো তাঁর সুগন্ধি পান পরাগ। বন্ধুত্বও হাত না বাড়াতেই শুরু হতে লাগলো।

যৌবনে আব্দুর রাজ্জাক, ছবি কৃতজ্ঞতা: আনিসুর রহমান নান্টু

বন্ধুত্ব হবার কারন ছিলো না যদিও। তাঁর বর্নাঢ্য জীবনের কাছে আমার জীবন নিতান্তই সাদাকালো। অল্পকিছু লেখালেখি ছাড়া ভাঁড়ার শূন্য। আর তিনি ? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ তেজী অধ্যাপক। যাঁর নেতৃত্বে রাজাকার উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে সরকারও নড়ে উঠেছিল। এস এ বারী এটি র কমিশন তাঁকে ছাড় দেবে এমন তো হবার কথা না। তিনি এর আগেও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় এক ইতিহাস রচনা করে ফেলেছিলেন। পরিবেশ বৈরী না হলে তাঁর কন্ঠেই হয়তো শোনা যেতো রাজশাহী বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা। পড়াতেন মনোবিজ্ঞান । পরে আমেরিকা চলে গেলেন। আইন পড়ে সেখানকার বিশ্ববিদ্যলয়ে আইন পড়াতেন তিনি। আমার সাথে যখন পরিচয় তখন তিনি পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড: আব্দুর রাজ্জাক।

একমাত্র কন্যা শ্রেয়সী এবং স্ত্রী রুনুর সাথে ড. রাজ্জাক

এদিকে সিডনিতে তখন বঙ্গবন্ধু পরিষদই একমাত্র সংগঠন যার নেতৃত্বে চলছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক শুদ্ধ ধারা। সেটিও নানা কারনে ছিলো বিভক্ত। কুরুক্ষেত্রের মতো বঙ্গবন্ধু পরিষদের এই দ্বন্দ্বে কোন দিকে যাবো নির্নয় করা সহজ ছিলো না। দুদিকেই পরিচিত আর স্বজনদের ভীড়। তবু শুধু এই মানুষটির জন্য আমি তাঁর দিকে ঝুঁকেছিলাম। আজ আমি সেসব যুদ্ধ বা ইতিহাস নিয়ে কোন কথা বলবো না। শুধু বলবো নানা ঘাত প্রতিঘাত আর অপমানেও তাঁর মুখে কটু কথা শুনিনি। প্রতিরোধ জানতেন কিন্তু উন্মত্ততা দেখিনি। রাগ করলে তাঁর মাথার চুলগুলো দাঁড়িয়ে যেতো। ঘনঘন পানপরাগ মুখে নিতেন। সে সময় বা যখন আনন্দ বা রিল্যাক্সের সময় হঠাৎ হঠাৎ ফোন দিতেন। বাড়ীতে ডাল সবজী রান্না করা আছে কি না এই ছিলো প্রশ্ন। আর দীপা কি করছে? তারপরই চলে আসতেন আড্ডা দিতে। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তাঁর তুলনা মেলা ভার। মনে আছে দীপাকে নিয়ে প্রথম যেদিন তাঁদের বাড়ীতে যাই রুনু আপা শাড়ী দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিন সন্তানকে কি অপরূপ নামে ডাকতেন শ্রেয়সী, অনির্বাণ এবং সন্দীপন। রুনু আপা তো নানা কারণেই প্রণম্য। তাঁর পিতা আমাদের দেশে এম এন রায়ের অনুসারী ছিলেন। সেই মানবেন্দ্র নাথ রায় লেনিন স্তালিন যাঁর মুখস্ত। আর তাদের কারো কারো সাথে দেখাও হয়েছিল এম এন রায়ের। এম এন রায়ের দর্শণে বিশ্বাসী হাবিবুর রহমান ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার। গণিত বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ হাবিবুর রহমানের কন্যা রুনু আপা। সে সুবাদে ড: আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন হাবিবুর রহমানের জামাতা।

রক্তে পূর্বাধিকারে আর মেধায় এমন প্রগতিশীল মানুষ সিডনিতে দু’জন নাই। আমি হলপ করে অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে পারি তিনি ছিলেন প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক। তাঁর এক মেয়ে দুই ছেলে। সবগুলো ছেলে মেয়ের বিয়েতে আমন্ত্রিত হবার সুবাদে জানি খাবার থেকে আচরণে কতটা উদার আর মুক্তমনা ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা তিনি পড়াশুনো করতেন। প্রচুর পাঠ আর অধীত বিদ্যাই তাঁকে মুক্ত করে রেখেছিল। আমাদের এই প্রবাসে আমরা যখন পরিচয়সূত্রের জন্য মরিয়া তিনিই সেই মানুষ যাঁর হাত ধরে বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠে হওয়া বৈশাখী মেলা পৌঁছে গিয়েছিল অলিম্পিক পার্কের মতো বিশাল আন্তর্জাতিক ময়দানে। যা এখন তাঁর উত্তরসূরী শেখ শামীমুল হকের নেতৃত্বে দুনিয়া জোড়া বাঙালির সবচে জননন্দিত মেলা নামে পরিচিত। ড: রাজ্জাককে এর জন্য কম কাঠখড় পোড়াতে হয় নি। তবে অদম্য মনোবল আর নিন্দাকে তুচ্ছ করার কৌশল রপ্ত ছিলো বলে সব উতরে গেছিলেন। এদিক থেকে আমাদের অগ্রদূত তিনি। আমাদের দেশের পরিচয়কে বড় করে তোলার কারিগর। মৃত্যুর আগেও আওয়ামী লীগের একটি অংশের সভাপতি পদে ছিলেন তিনি ।

দুই পুত্র অনির্বাণ ও সন্দীপনের সাথে বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ছবি: আনিসুর রহমান নান্টু

শেষ দিকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। যে কোন অনুষ্ঠানে গেলেই বাড়ী ফেরার জন্য পাগল হয়ে উঠতেন। এখন বুঝি শরীর তাঁকে শান্তি দিতো না। যার বাসায় বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির মহীরূহরা কোন না কোন মসয় আতিথ্য গ্রহণ করেছেন, যাঁর বাড়ীতে মুনতাসীর মামুন, বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শিল্পী রথীন্দ্র নাথ রায়, কবীর সুমন থেকে নির্মলেন্দু গুণ, আসাদুজ্জামান নূর আড্ডা দিতেন তাঁকে নি:সঙ্গ একা দেখতে ভালো লাগতো না। যে মানুষ রাত তিনটায় গাড়ী চালিয়ে তরুণদের বাড়ী পৌঁছে দিতেন, শেষ বয়সে তাঁর জন্য মানুষ খুঁজতে হতো যেন নামিয়ে দিয়ে আসে কেউ। কারন তখন তিনি আর গাড়ী চালাতে পারতেন না। আমার ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক জীবনের বহু সংকটে আমি তাঁর কথায় ভরসা পেয়েছি। তিনি এমন পরোপকারী মানুষ যাঁর বেতনের টাকা থেকে কিছু ডলার আলাদা থাকতো কোন বাংলাদেশী ছাত্র বা তরুণ তরুণীর বিপদ হলে যেন সাহায্য করতে পারেন, করেছেনও। আইনি সহায়তা দিতে নিজের গাঁটের ডলার খরচ করে ছুটে যেতেন।

আজ তাঁকে শেষবার দেখলাম। জীবননান্দের কবিতার মতো চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন টেবিলের পরে। কফিনে মোড়ানো শুভ্র মানুষটির মুখটি কেমন ছোট বাচ্চার মতো মনে হচ্ছিল। আজীবন দীপ্র আর চঞ্চল মানুষের এমন স্থির শুয়ে থাকা বেমানান। এই মুখটি ভুলতে আমার অনেক সময় লাগবে। হয়তো এই জীবনেও ভুলতে পারবো না।
অগ্রজ অভিভাবক বন্ধু ড: আব্দুর রাজ্জাক সতীর্থ অনুজ আর পুত্রদের কাঁধে চড়ে চলে গেছেন আজ। যেখানে গেলে কেউ আর ফেরে না। ভালো থাকবেন রাজ্জাক ভাই। ঝাপসা হয়ে আসা চোখে আপনাকে আমি এমনিতেই আর দেখতে পাচ্ছি না। গুড বাই।

অজয় দাশগুপ্ত
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
সিডনি,অস্ট্রেলিয়া।