তত্ত্বানুসন্ধান (২য় পর্ব)। রাজীব কুমার হাওলাদার

  •  
  •  
  •  
  •  

 190 views

মধ্যম খন্ড

এটাই রেখার প্রথম হেলিকপ্টার ভ্রমণ, চার সিটের হেলিকপ্টার। রেখা একাই যাত্রী। সারাদিন ঝক্কি ঝামেলার মধ্য দিয়ে গেলেও হেলিকপ্টারটা আকাশে ওড়ার পর একটা অন্যরকম ভালো লাগায় রেখার মন আচ্ছন্ন হলো। রেখার মনে হতে লাগল সে পাখির মতো ডানা মেলেছে নীল দিগন্তে, জানালা দিয়ে দেখছে চেনা শহর ঢাকাকে। যে ঢাকা শহরকে এতদিন ইটের স্তুপ বলে মনে হতো, সেই ঢাকা শহরকে আজ অন্যরকম লাগছে। যেন ছবির মতো সাজানো ভিন্ন এক নগরী। দুর্গন্ধযুক্ত কালো জলের বুড়িগঙ্গা মনে হতে লাগলো শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া মায়ার স্রোত, বুড়িগঙ্গার সেতু দুটো যেন মায়ার বন্ধন। ধীরে ধীরে চোখের নিচ থেকে পালিয়ে যেতে থাকল শহর। রেখার চোখের পলক ফেলতে ইচ্ছে করছে না। শহর পেরোবার পর সবুজ পৃথিবীর বুকের ভেতর নদীর চলন দেখে মুগ্ধ হতে থাকলো। কতটা সময় পার হয়েছে হিসেব করেনি, দেখলো বিকেলটা ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে সবুজ বনানীতে, সূর্যের শেষ আলোর সোনালী আভা ছড়িয়ে পড়ছে নদীর জলে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকলো চারিদিক।

কিছুক্ষন পর হেলিকপ্টারের পাইলট জানাল,
-ম্যাডাম আমরা আর অল্প কিছুক্ষনের ভেতর রিভার ড্রিম সিটিতে পৌছাবো।

রেখা দেখলো দূরের রিভার ড্রিম সিটির উঁচু বাতিঘর, তারপর ধীরে ধীরে পুরো শহর চোখের উপরে ভেসে উঠল। আলোতে আলোতে সেজেছে পুরো শহর, ছোট ছোট কিছু আলোর টুকরো প্রতিচ্ছবি আঁকছে জলের গায়ে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে নক্ষত্রের দ্বীপ, কাছাকাছি যেতে রেখা আরো বিমোহিত হলো। বাতি ঘরের পাশ থেকে একটা বৃহৎ আলোর ঈগল পাখি পাখা মেলেছে নদীর উপর।

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ কপ্টারটি হোটেলের হেলিপ্যাডে এসে নামল। হোটেল রুমে প্রবেশ করেই রেখা সোফায় গা এলিয়ে দেয়। সারাদিনের ছোটাছুটিতে ক্লান্ত লাগছে, কেমন যেন ঝিমুনি আসছে। গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল, আলসেমি দূর করতে ব্ল্যাক কফির অর্ডার দিয়ে বাথরুমে ঢোকে শাওয়ার নিতে। শাওয়ার নিয়ে বেশ ঝড়ঝড়ে লাগে, এর মধ্যেই কফি এসে যায়। রিলাক্সেশন মিউজিক শুনতে ইচ্ছে করছে। স্মার্টফোন এবং কফির মগ নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে, রিভার ভিউ বারান্দা। বারান্দায় এসে মোহিত হয়ে যায় রাতের নদীর সৌন্দর্যে । ঝিরঝিরে হাওয়ায় ভাসছে শরীর, চোখের সামনে রাতের নদীর অপরূপ রূপ। নদীর বুকের উপর নেমে এসেছে রাতের প্রথম প্রহরের চাঁদ। চাঁদের রূপালী আলো নিঃশব্দে নেমে এসেছে জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে। অনেক দূরে নেমেছে জেলেদের নৌকা। নৌকাগুলোর আলো দেখে মনে হচ্ছে অজস্র তারা নেমে এসেছে নদীর সীমানায়। রেখার চোখে শুধুই মুগ্ধতা, মনে মনে বলে কার সাধ্য আছে এই সৌন্দর্যের বর্ণনা করার!!

ফোনের এসএমএস টোনে রেখার মুগ্ধতার রেশ কেটে যায়। ইনবক্স খুলে দেখে খুব ছোট একটা এসএমএস: It’s dangerous area, go back to home.

রেখা দেখেই বোঝে ইনকামিং ফোন নাম্বারটা ভার্চুয়াল নাম্বার। রেখা একটু অবাক হয়, সে তো গোয়েন্দা নয়! তবুও কেন এই অকারণ হুমকি! রেখা উঠে রুমের ভেতর ঢুকে ল্যাপটপ বের করল শহরের ম্যাপ দেখার জন্য।
নদীর তীর ঘেঁষে শহরের চারপাশে রয়েছে পায়ে হাঁটার প্রশস্ত পথ। শহরের ভেতর দুটো প্রশস্ত রাস্তা, এই রাস্তা দুটোর পাশে ছোট ছোট ব্লকে তৈরি হয়েছে আবাসন। পুরো শহর নর্থ এবং সাউথ দুই জোনে বিভক্ত, মাঝখানে নদীর ছোট শাখা। চারটে সেতু দুই জোনকে একসাথে বেঁধে রেখেছে। সাউথ জোনে রয়েছে আর্ট গ্যালারী, মিনি থিয়েটার এবং পাওয়ার গ্রিড। নর্থ জোনে লাইট হাউজ, স্পীডবোট জেটি, হোটেল এবং হাসপাতাল। শহরের মাঝামাঝি শপিং মল, মিনি পার্ক, সুইমিং জোন এবং থানা।
পুরো ম্যাপটা দেখতে দেখতে খেয়াল হলো শহরের চারপাশে গাড়ি চলে না। এতটা পথ হেটে হেটে দেখা সম্ভব নয়। নুরুল হোসেন সাহেব থানার অফিসার ইনচার্জ রশিদ সাহেবের এর মোবাইল নাম্বার দিয়েছিলো। রেখা সময় দেখল সোয়া আটটা বাজে খুব একটা দেরি হয়নি। অফিসার ইনচার্জ কে ফোন করল।

-হ্যালো, আপনি কি রশিদ সাহেব বলছেন।

-জী, কে বলছেন?

-আমি ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক বেজ ডাটাবেজের চিফ এডমিনিস্ট্রেটর রেখা বলছি। আপনাকে সম্ভবত আমার সম্পর্কে ইনফর্ম করা হয়েছে।

-জী, জী, ম্যাডাম সালামুআলাইকুম।

-আমাকে কি রাতের ভেতর একটা সাইকেল সংগ্রহ করে দেয়া সম্ভব? দুঃখিত রাতে নয়,সকাল ছয়টার ভেতর হোটেলে পৌঁছে দিলেও চলবে।

-অবশ্যই সম্ভব ম্যাডাম, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।

-ধন্যবাদ রশিদ সাহেব, শুভ রাত্রি।

-ধন্যবাদ, ম্যাডাম।

রশিদ সাহেবের ধন্যবাদ বলার স্বরে একটা সমীহ ছিল। সম্ভবত ওনাকে কোনো অফিসার এত নরম সুরে শুভ রাত্রি বলেনি। রেখা ফোন রেখে আবার ল্যাপটপ এ বসে।

আফতাব সাহেবের বাড়িটা নর্থ জোনের সীমানায়, নদীর তীর এবং শাখা প্রবাহের কর্নারে। বাড়ির পেছনের দুই দিকে পায়ে হাঁটার রাস্তা। রেখা ক্যামেরার সিস্টেম এ লগইন করলো, আফতাব সাহেবের বাড়ির আশেপাশের ক্যামেরা গুলো ডিটেক্ট করলো। খুনের সময়কালীন ভিডিও ফুটেজ গুলো দেখতে শুরু করলো। শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য রয়েছে নগর বনায়ন। তবে সিকিউরিটি ক্যামেরা গুলো পরিকল্পিত ভাবে বসানো হয়েছে বাদ পড়ছে না কিছুই।
প্রায় ঘন্টা দেড়েক ধরে দেখছে ভিডিও গুলো। কোথাও কিছু নেই । ঘন্টা দেড়েকের ভেতর মেইন রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি চলে গিয়েছে তাও খুনের চল্লিশ মিনিট আগে, আর খুনের পর পুলিশের গাড়ি আশা যাওয়া। দীর্ঘক্ষন ঝুকে দেখতে দেখতে রেখার ঘাড় টনটন করছে। ল্যাপটপ বন্ধ করে ওঠে, ভাবছে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে এমন সময় রিসিপশন থেকে ফোন এলো।
রেখা ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বলল:
– ম্যাডাম একটা ঝামেলা হয়েছে ওসি সাহেব এসেছেন।

-তাতে ঝামেলার কি হয়েছে?

-উনি একটা লেডিস সাইকেল এনেছেন, সেটাকে উনি রেসিপশন এর সামনে রাখতে চান। যাতে আপনি সকালে নামলেই আপনার চোখে পরে। আমরা ওনাকে বুঝিয়েছি যে আমরা গ্যারেজে রেখে দেই, ম্যাডাম নামলেই তার হাতে তুলে দেব। কিন্তু উনি মানছেন না, বলছেন এখান থেকে সাইকেল এক ইঞ্চি সরালে তোদের সবাইরে প্যাঁদানি দেবো।

-আচ্ছা আমি দেখছি, ওনাকে আমার রুমে পাঠিয়ে দেন। বলুন আমি ডেকেছি।

মিনিট দুয়েকের মধ্যে রশিদ সাহেব এলো। রেখা রশিদ সাহেব কে দেখে একটু অবাকই হল, সুদর্শন লম্বা এক যুবক। কতই বা বয়স হবে ছাব্বিশ-সাতাশ। দেখেই মনে হয় এই ছেলেকে পুলিশে মানায় না, মডেল কিংবা সিনেমার নায়ক হলে ভালো মানায়। অথচ ভেবেছিল রশিদ সাহেব বয়স্ক টাইপ এর হবে। রশিদ সাহেবকে বসতে বসে জিজ্ঞেস করল:
-ডিনার করেছেন?

-না, ম্যাডাম।

-আমিও খাইনি, আপনি চাইলে আমার সাথে খেতে পারেন।

-না, ম্যাডাম, থানায় গিয়ে খাব।

-চা, কফি বা অন্যকিছু ? এই হোটেলের কফি বেশ ভালো।

-না, ম্যাডাম, ধন্যবাদ।

রেখা সাইকেল বিষয়ে সরাসরি না গিয়ে অন্য কথায় গেলো।

-আপনাদের এখানে কি মহিলা পুলিশ নেই?

-আছে ম্যাডাম, প্রয়োজন হলে আমি এখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি।

-না না আমার জন্য বলছি না। আমি যখন এখানে এসেছি তখন দেখলাম – পুলিশ গেস্টদের ব্যাগ চেক করছে। এটা খুব ভালো উদ্যোগ, এই শহরের খুন খারাপি নিয়ে আমরা সবাই চিন্তিত। তবে সম্ভবত মহিলা পুলিশ না থাকায় আমার হাত ব্যাগ চেক করেনি। অথচ আমার হাত ব্যাগে একটা ৯ এমএম পিস্তল ছিল।

রশিদ সাহেব একটু নরম স্বরে বললো
-আমি এ ব্যাপারে কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছি।

-তবে রশিদ সাহেব এ কারণে আপনাকে ডাকিনি। ডেকেছি ধন্যবাদ দেবার জন্য। এতো দ্রুত সাইকেলের ব্যবস্থা করার জন্য। আমি ভেবেছিলাম এই চরের ভেতর আপনি সাইকেল পাবেন কোথায়?

-আপনি বলার সাথে সাথে আমি স্পীডবোট পাঠিয়ে নদীর ওপার থেকে আনিয়েছি।

-আবারো ধন্যবাদ আপনাকে, এতো দ্রুত ব্যবস্থা নেবার জন্য। কাল থেকে আমি শহর টা দেখতে বের হবো। খুনের স্পটগুলোতে যেতে পারি, সেক্ষেত্রে আমি আপনাকে ফোন করে জানাবো।

কথা শেষে রশিদ সাহেব চলে যাবার সময় বলল:

-রশিদ সাহেব রিসেপশন এর লোকদের বলবেন সাইকেল টা গ্যারেজে রাখতে, আমি সকালে গ্যারেজ থেকে নিয়ে নেবো।

-জী ম্যাডাম ।

রেখা ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হয়ে কাপড় পরে, অন্য সময়ের মত আজো জিন্সের প্যান্ট এবং ফতুয়া পরেছে। রাতে ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিল, তবুও আর একবার চেক করে নেয় ক্যামেরা, বাইনোকুলার, তিন জোড়া হ্যান্ড গ্লাভস, ছুরি সব আছে। পিস্তলটা কোমরে গুঁজে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গ্যারেজ থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পরে। আগেই পরিকল্পনা করে রেখেছে লাইট হাউজ থেকে শুরু করবে।
লাইট হাউজের কাছেই ঈগল আকৃতির স্পিডবোট জেটি, গতকাল হেলিকপ্টার থেকে এটাকেই আলোর ঈগল বলে মনে হয়েছিল। সকালের সূর্য উঠছে, নদীর সূর্যোদয় যে এতোটা মনোমুগ্ধকর হয় ওর জানা ছিলোনা। দু একজন স্পিডবোট জেটিতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের ছবি তুলছে। জেটির পাশেই ওপেন এয়ার রেস্টুরেন্ট, রেস্টুরেন্ট সবে খুলেছে। রেখার ঘুম থেকে উঠেই চা খাওয়ার অভ্যাস, আজ চা খাওয়া হয়নি। রেস্টুরেন্ট এ ঢুকে চা আর এক বোতল পানির অর্ডার করল। চা খেয়ে পানির বোতল টা ব্যাগের সাইড পকেট এ ভরে পশ্চিম দিকের পথে চলা শুরু করল।

ধীরে ধীরে সাইকেল চালানোটা কষ্টকর হলেও আশেপাশে দেখতে দেখতে চলায় রেখা সেটা টের পেলো না। পুরো নদীর পারে কংক্রিটের ব্লক স্থাপন করা। পশ্চিম দিকের সেতুটার কাছে এসে কিছুক্ষন দাঁড়াল, এ দিকটায় নদী খুব একটা প্রশস্ত নয়, বেশি হলে আধা কিলোমিটার। বাইনোকুলার দিয়ে নদীর ওপার দেখার চেষ্টা করল।
রেখার মনে হল শৈশবে চলে গেছে। নানা বাড়িতে গিয়ে সাইকেল চালানো শিখেছিল। ছোটবেলা থেকেই ভয় ডর কম ছিল, চেহারায়ও একটা মারদাঙ্গা ছাপ ছিলো। ঠিক চেহারায় নয় চোখের ভেতর ছিলো সাহসের ছাপ। পাওয়ারফুল চশমার ফাঁকে সেই চোখ এখন আর দেখা যায় না। মামাতো ভাইদের কাছে সাইকেল চালানো শিখেছিলো, বাসায় এসে সাইকেল এর বায়না ধরেছিলো। আব্বা রাজি হলেও মায়ের কারণে রেখার কপালে সাইকেল জোটেনি। তার সাফ কথা, মেয়ে মানুষের আবার কিসের সাইকেল।

ঘন্টা দুয়েক পার করার পর শহরের দক্ষিণ,পূর্ব দিকের নদীতে ঝুলন্ত রেস্টুরেন্ট এ এসে ঢুকল। সকালে কিছু না খেয়েই বেরিয়েছিল, কিছুটা ক্লান্তি লাগছে। নাস্তা শেষ করে কফির সাথে একটা সিগারেট ধরাল। রেস্টুরেন্ট খুব একটা কাস্টমার নেই, একটু দূরে ২৭-২৮ বছেরর একটা ছেলে বসে আছে। ছেলেটার চোখেও রেখার মতোই পাওয়ারফুল চশমা। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও রেখা বুঝতে পারছে ছেলেটা মাঝে মাঝে রেখাকে দেখছে। এদেশে এখনো বয়স্ক নারীকে মুক্তাঞ্চলে সিগারেট খেতে দেখলে মানুষ আড়চোখে তাকায়। লোকে অভদ্রতা ভাবে, অথচ রেখা অনেক পেইন্টিং এ এদেশের গ্রামীণ নারীর হুক্কা খাওয়া ছবি দেখেছে। কফিটা শেষ হয়ে গেছে, রেখা আর একটা কফির অর্ডার দেয়।

সিগারেটটা এস্ট্রেতে গুঁজেছে, এমন সময় ছেলেটা এসে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বললঃ

-আপনি ভাবছেন আপনার সিগারেট খাওয়া দেখে আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আসলে তা নয়, ঠিক আপনার মত দেখতে আমার একটা বড় বোন ছিল। পার্থক্য শুধু তার চোঁখে চশমা ছিলনা।

রেখা একটু হচকচিয়ে গেল, ওহ সে কোথায়?

-সে বহু বছর আগে একসিডেন্টে মারা গেছে।

রেখার মনটা হুহু করে ওঠে, রেখার নিজের ছোট ভাই ছোট বেলায় পালিয়েছিলো, আর ফিরে আসেনি। এখন হয়তো এই ছেলেটার বয়সী হবে। ছেলেটা চলে যাচ্ছে দেখে ডাক দেয়। কাছে আসলে বসতে বলে আরো একটা কফি অর্ডার দেয়।

ছেলেটা বসলে রেখা বলে:

-তোমার আর আমার একটা অদ্ভুত মিল আছে। আমারো একটা ছোট ভাই ছিল, অনেক বছর আগে সে পালিয়েছে। চশমার ব্যাপারটায় ও মিল আছে। তোমার বোনের যেমন চশমা ছিলনা, তেমনি আমার ভাইয়ের চোখেও চশমা ছিলনা। একটা ছোট্ট দীর্ঘশাস ফেলে জিজ্ঞেস করে তুমি কি এখানেই থাকো?

-না, এখানে আমার মামার একটা বাড়ি আছে।

-বেড়াতে এসেছো?

-বেড়াতে এসেছি আবার কাজেও এসেছি। আমার মামার বাড়ির ডিজাইনটা আমি করেছিলাম যেটা তার পরিচিতজনের খুব পছন্দ হয়। এখন মামার বন্ধুর বাড়ির ডিজাইন করতে হবে তাই এখানে আসা।

-ওরে বাবা তুমি আর্কিটেক্ট? আমি তো ভেবেছিলাম অল্প বয়েসী একটা ছেলে।

-আপনি কি এখানে থাকেন?

-না আমিও এখানে থাকিনা, দুদিনের জন্য বেড়াতে আসা।

-এখানকার আর্ট গ্যালারির খুব সুনাম শুনে দেখতে আসা। শুনেছি এস এম সুলতান এবং কামরুল হাসানের কিছু দুর্লভ ছবিও এখানে আছে।
আর্ট গ্যালারির নাম “ছবিঘর”, এখান থেকে খুব কাছে। হেটে যেতে ১০ মিনিট লাগবে। আপনি চাইলে আমি নিয়ে যেতে পারি। আর একটা কথা বলি, আপনাকে যদি আমি আপা ডাকি আপনি কি কিছু মনে করবেন?

-আপা ডাকলে আমি কিন্তু তুই করে বলবো, আমার ভাইকে আমি তুই করে বলতাম। রেখার চোখ কেন যেন ছলছল করে উঠতে চাইলো।

-চলো তোমাকে ছবিঘর দেখাতে নিয়ে যাই। যেতে যেতে আরো দু একটা সুন্দর জিনিস দেখাবো।

-চল, আচ্ছা এতো কথা বললাম অথচ তোর নাম টাই জানা হলোনা?

-রাহাত। আমার নাম।

-আমার নাম তো জানার দরকার নাই, আমি তো আপা, বলে রেখা হেসে ফেলে।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে নদীর লাগোয়া পথ দিয়ে ওরা উত্তর দিকে হাটতে থাকে। এই শহরের বাড়ির গুলোর ডিজাইন প্রত্যেকটা আলাদা রকমের সুন্দর। বেশির ভাগ বাড়িগুলোই ডুপ্লেক্স। মিনিট দশেক হাটতেই শহর বিভক্তির শাখা নদীর কাছাকাছি এসে পরে। পায়ে হাঁটা পথের সেতুটা দেখা যাচ্ছে। সেতুটার ঠিক আগের ব্লকে এসে রাহাত বললো:

-আপা আমরা বাম দিকের রোড দিয়ে মেইন রোডে যাব।

বাম দিকের পথের ডান দিকের প্রথম বাড়িটায় রেখার চোখ পড়তে রেখা চোখ ফেরাতে পারলো না। রাহাতকে বললো:

-রাহাত দেখ এই বাড়িটা কেমন যেন অন্য রকম সুন্দর। রাজকীয়তা আর আধুনিকতার এক অদ্ভুত কম্বিনেশন।

-হুম সুন্দর, এখানকার সব বাড়ি সুন্দর।

-তুই সুন্দর বুঝিস! সব বাড়ি সুন্দর হলেও এই বাড়িটায় চোখে আটকে যায়।

-তোমার এতো ভাল লাগলে চলো, বাড়ির ভেতরটা দেখে আসি।

-আরে নাহ বাদ দে, কার না কার বাড়ি !

-সে দেখা যাবে, তুমি চলো তো।

রেখা দোদুল্যমানতা নিয়ে রাস্তা পার হলো। বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দারোয়ান গেট খুলে দিয়ে সালাম দেয়। বাড়ির ভেতরে ঢুকে আরো অবাক হয়, বাড়ির আঙিনা ছবির মতো সাজানো। রেখার খটকা লাগে দারোয়ান ওদের কিছু জিজ্ঞেস না করেই ঢুকতে দিয়েছে। তারমানে এটাই রাহাতের ডিজাইন করা ওর মামার বাড়ি। রাহাতকে জিজ্ঞেস করে এটাই কি তোর ডিজাইন করা বাড়ি?

রাহাত কথা না বলে, মুচকি মুচকি হাসে।

রাহাতের হাসিতে বুঝতে পেরে বলে ওঠে:

-আরে তুই তো একটা জিনিস রে ভাই! আর আমি তোরে কিনা বলেছি সুন্দর বুঝিস! আমারে ক্ষমা দে রে, ভাই।

রাহাত এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। ছেলেটার হাসিটা সুন্দর, চোখের সৌন্দর্য্যের সাথে নাকি হাসির সৌন্দর্য্যের একটা সম্পর্ক আছে। অথচ রেখার মতই ছেলেটার চোখ দুটো ঢাকা পড়েছে পাওয়ারফুল চশমায়। হাসতে হাসতে রাহাত বলে চলো এই জিনিসের বানানো আরও একটা সুন্দর জিনিস দেখাই।
হাটতে হাটতে ওরা বাড়ির পেছনের দিকটায় যায়। পেছনে দেয়ালের ওপারে শাঁখা নদীটা দেখা যাচ্ছে। ছোট সুন্দর একটা গেট, গেট পেরোতেই রেখা সত্যিই মুগ্ধ হয়। গেটের বিপরীতে শ্বেতপাথরে বাঁধানো নদীর ঘাট নেমে গেছে নদীতে। ঘাটের দুই পাশে অপূর্ব ডিজাইন এর কৃত্রিম ঝর্ণা।

-আপা কেমন দেখছিস?

-অপূর্ব রে ভাই!

-এই জায়গার আসল সৌন্দর্য্য পূর্ণিমায়। এই ঘাটে বসে দেখা যায় মেঘনার উপর জোছনার খেলা।

দুজনে হাটতে হাটতে ঘাটের শেষ দিকে নামে। শেষ ধাপে নেমে রেখা বলে:

-আয় আমরা একটা সেলফি তুলি।

সেলফি তোলা শেষে রাহাত বললো

-তুমি ঘাটে বসো, আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি। তুমি চাইলে মেঘনার জলে পা ডুবিয়ে চা খেতে পারো।

রাহাত চলে যেতেই, রেখা সায়মনকে ফোন করে:

-হ্যালো সায়মন আমি তোমাকে হোয়াটস্যাপে একটা ছবি পাঠাচ্ছি, যার ছবি পাঠাচ্ছি তার ডাক নাম রাহাত। তুমি যত দ্রুত সম্ভব তার বিস্তারিত তথ্য আমাকে জানাও।

চলবে…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments