তবুও বেঁচে থাকা – তানিয়া আহাদ

  •  
  •  
  •  
  •  

তবুও বেঁচে থাকা

তানিয়া আহাদ

কি যে প্রচন্ড এক তাপদাহ শুরু হয়েছে কদিন যাবত ,কিছুতেই এই তাপ সহ্য করা যাচ্ছেনা।শরীর যেন আর চলতেই চায়না কিন্তু তাই বলে কি জীবন থেমে থাকে ,জীবন তো চলবেই তার নিজস্ব গতিতে ।মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে জীবিকার জন্য কাজ করতেই হয় ।নইলে কি আর সোহেল এর মা’র মতন অমন বৃদ্ধ বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া মানুষকেও পেটের দায়ে ভিক্ষা করতে হয় ।আহা জীবন ….কি কষ্টের জীবন ।

শুকনো রোগা মহিলার মুখখানা দেখলে মনে হয় যেন এক্ষুনি পড়ে যাবে মাটিতে কিন্তু মুখে তবুও একখানা হাসি লেগেই থাকে সোহেলের মা’র।

এমন কষ্টের মাঝেও অমন করে হাসা যায় বুঝি ! কিছু মানুষ,কি দিয়ে গড়া সত্যিই বুঝতে পারিনা ।তবুও এবার রমজানে সোহেলের মায়ের শরীর একটু বেশিই খারাপ মনে হচ্ছিলো ।

দেখলে মনে হয় তার ক্লান্ত শরীর আর চলতে চায়না ।হাঁটতে দেখলে মনে হয় এক পা এগুলে দু’পা পিছিয়ে যাচ্ছে ।কিন্তু তবুও তাকে হাঁটতে হবে কারণ তার এই পথ শেষ হবার নয় ততদিন যতদিন সে বেঁচে থাকবে।সোহেলের মা’র যে এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই ।যে তাকে দু’বেলা দু মুঠো খেতে দিবে। বহুবছর মায়ের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সব কিছু ।চার সন্তানের জননী ।সে আজ একা।

সে সময় মানুষের ভাতের খুব অভাব ছিল ,ভাতের জন্য মানুষ কত কি করতো ,তবুও দু বেলা দু মুঠো ভাত জুটতো না। এইতো কয়েক মাস আগের কথা ,সোহেলের মা ভাত খেতে খেতে খুব কান্না করছিলো আর বলছিলো ….

অহন তো মাইনসের ভাতের দুঃখ নাই গো মা ,আমার পোলাপাইন গুলা কত্ত কষ্ট করছে কয় ডা ভাতের লাইগা …

কথাগুলো বলছিলো আর অঝোর ধারায় কাঁদছিলো। চোখের পানিতে যেন ভাত গুলো ভিজে যাচ্ছিলো। তার কি যে হলো…

ছেলেদের কথা মনে করে শুধু কেঁদেই চলেছে ।মায়ের মন বুঝি এমনি হয় । চারটি সন্তানই মারা যায় ।অবশ্য এই পৃথিবীতে সৃস্টি কর্তার ইচ্ছের বাইরে কিছুই হয়না ।সৃস্টিকর্তা কাকে কিভাবে রাখবেন সবই তার ইচ্ছে ।মানুষকে তিনি জীবন চলার পথে নানা পরীক্ষায় ফেলেন। চারসন্তানের মা হয়েও আজ তার একটা সন্তানও তার পাশে নেই ।সোহেল সবার ছোট তার বড় আরো তিন ভাই ছিল ।সেসময় খুব অসুখ বিসুখ লেগে থাকতো ।কলেরা,বসন্ত ,জলগুটি আরো নানা রকম রোগ ছিল ।যে রোগের নাম বলতেই পারেনা সোহেলের মা, রোগের কারণ বুঝে উঠার আগেই রোগী মারা যেত।

সোহেলের ভাই গুলোর বয়স খুব একটা বেশি ছিলোনা কিশোর বয়সেই তারা মারা গিয়েছে ।অজানা রোগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে ।একেক করেই সোহেলের তিন ভাই চলে গেলো কিন্তু তাদের কি হয়েছিল সোহেলের মা আজও বুঝে উঠতে পারেনি ।

মা বলে, আমার বাজান গুলার যে কি ওইছাল যে অমন কইরা চইলা গেলো কিছুই বুঝি নাই গো মা …।এসব কথা বলেই কাঁদে সোহেলের মা ।সন্তান হারা মা বাবা সোহেল কে আগলে ধরেই বেঁচে ছিল ।শতকষ্ট বুকে নিয়েও তো মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় ।কারণ সময়ের কাছে জীবন সত্যি অসহায় ।এভাবেই সোহেলকে নিয়ে তার বাবা মায়ের দিন কাটতে লাগলো ।গরিব মানুষের বসে থাকলে চলে না কারণ তাদের পেটের দায়ে প্রতিদিন ই কাজ করতে হয়।

পুরোনো কষ্ট বুকে পুষে রেখেই নতুন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে সোহেলের বাবা কাজ করে যায় প্রতিনিয়ত । দরিদ্রর ভিতর বেড়ে উঠতে থাকে সোহেল ।দু বেলা খাবার জুটেনা বলেই নয়/দশ বছরের সোহেল কে বাবার সাথে কৃষি কাজ করতে হয় অন্যের জমিতে।এমন টানা টানির সংসারে এ ছাড়া আর উপায়ই বা কি আছে ।কখনো পানি পান্তা বা কখনো অনাহারেই দিন কাটে সোহেল এর ।এত কষ্টের মাঝে ও সোহেল ভালো আছে তার বাবা মায়ের আদর আর ভালোবাসায় । দিন এভাবে ভালোই যাচ্ছিলো ….।

কিন্তু হঠাৎ একদিন সোহেল কাজ শেষে বাড়ি ফিরে কেমন যেন হয়ে গেলো ,তার শরীর প্রচন্ড ঘামছে চোখ মুখের অবস্থাও খুব খারাপ দেখাচ্ছে ।সোহেল ভালো মতন নিঃস্বাস নিতে পারছেনা মাকে বার বার বলছে মা আমার খুব কষ্ট হইতাছে আমি মনে ওয় আর বাঁচমু না মা …মা আমার কষ্ট বলতে বলতে ক্রমশ ওই সোহেলের চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ,ছটফট করতে করতেই সোহেল পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলো ।

এদিকে সোহেলের বাবা গিয়েছে কবিরাজ ডাকতে ,কবিরাজ নিয়ে বাড়ি ফিরে সে দেখলো তার কলিজার টুকরা বাপ ধন আর নেই ।তার প্রাণ পাখি চলে গেছে ।এমন দৃশ্য চোখে দেখা যায়না এ যে কত কষ্টের তা কেবল একজন পিতা মাতাই বুঝতে পারে।

সোহেলের দাফন কাজ শেষ হলো, একটা বাড়িতে এখন শুধু দুজন মানুষ ,সন্তান হারা এক অসহায় বাবা মা যাদের শেষ অবলম্বন টুকুও হারিয়ে গেলো ।সোহেলের মা শোকে পাথর হয়ে গেছে ,খাওয়া নেই ,ঘুম নেই ,কথাও তেমন বলেনা কিন্তু এত কিছুর মাঝে সে বুঝতেই পারেনি যে সোহেলের বাবার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে দিন দিন ।কিছুদিন যেতে যেতে সোহেলের মা খেয়াল করলো সোহেলের বাবা ভীষণ ভাবে পাগলামি করে তার মানুষ চিনার ক্ষমতাও হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

হঠাৎ করেই একদিন সোহেলের বাবার পাগলামি বেড়ে গেলো তাকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছিলো না ,সন্তান হারানোর শোকে সে বদ্ধ পাগল হওয়ার পর একদিন সে নিখোঁজ হলো,কোথায় যে চলে গেলো তাকে আর কোনো দিন খুঁজেই পাওয়া যায়নি।একা একাই জীবন পাড় করলেন সোহেলের মা। তার জীবনে সাহায্য করার মতন কেউ নেই ,কি ভীষণ যন্ত্রনা আর কষ্ট নিয়ে দিন পার করেছেন। যুগের পর যুগ কেটে গেলো বাবার কোনও খোঁজ আর কখনোই পাওয়া গেলো না। সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তাও জানেনা সোহেলের মা ।

সোহেলের মাকে কাজ করে খেতে হয় লোকের বাড়িতে ।কষ্টে ভরা জীবনে তার পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই ।এভাবেই সোহেলের মা’র জীবন কাটতে লাগলো দুঃখে আর কষ্টে ….।

হঠাৎ তার জীবনে এল আরো এক নতুন ঝড় ,সে জানতে পারলো তার স্বামী অভাবে পড়ে সোহেলের চাচার কাছ থেকে বাড়ি বিক্রি করে টাকা নিয়েছিল। কাজটা করেছিল গোপনে যাতে সোহেলের মা কষ্ট না পায়।এত বড় একটা কথা শুনে সোহেলের মা দিশেহারা হয়ে পড়ল। থাকার মধ্যে ছিল তার এই বাড়ি টুকুই।

তবুও সে নিজেকে সামলে নিলো আর মনে মনে ভাবতে লাগলো ,কি জানি ছেলে গুলো মারা যাওয়ার পর তো অনেক দিন কোনো কাজ করেনি সে টাকা ছাড়া তো আর জীবন চলেনা তাহলে বোধহয় বাড়িটা সে সময় ই বিক্রি করেছিল।আর ছোট্ট একটু জায়গা দাম ই বা কি হয়েছিল।

সব ভেবে চিনতে সোহেলের মা সিদ্ধান্ত নিলো সে বাড়ি ছেড়ে দিবে কিন্তু সে যাবে কোথায় তার তো যাওয়ার জায়গা নেই ।তাই সে সোহেলের চাচা কে বললো ভাইজান আপনি আমাকে এই বাড়ির এক কোনায় জায়গা দিন আমি একা কোথায় যাবো।সোহেল এর চাচা পাড়া প্রতিবেশী চাচা তবুও মন নরম করে তাকে থাকতে দিলো কিন্তু দিন যেতে যেতে তারাও বিরক্ত।

এদিকে সোহেলের মায়ের বয়স বাড়ছে শরীরের শক্তি কমে যাচ্ছে দিন দিন। সে আর আগের মতন কাজে শক্তি পায়না তাই বাধ্য হয়েই ভিক্ষা করতে বের হলো ।ততদিনে সোহেলের মা বয়সের ভারে নুইয়ে গিয়েছে।আর বাড়িটাও বেশ উন্নত হয়েছে বাড়ির লোকেরা আজ সবাই শহরে থাকে ,বাড়ির এক কোনে একটা ছোট্ট ঘরে বাস সোহেলের মায়ের ,ঘরে আলো জ্বালানোর জন্যও সামান্য কেরোসিন থাকে না। অথচ চাচার ঘরে ইলেক্ট্রিসিটির ব্যবস্থা আছে।পৃথিবীর মানুষ গুলো কত স্বার্থ নিয়ে ভাবে ,কেউ কারো জন্য এত টুকু ছাড় দিতে চায়না ।সোহেলের মা কষ্টে আর দুঃখের আগুনে পুড়ে পুড়ে জীবনটা পার করে ফেলেছে প্রায় আর অল্প সময় বাকি।সে জীবনের শেষ মুহূর্তের জন্য প্রহর গুনছে।সে সময়ের প্রতীক্ষায় আছে সেই সময় যখন তার এই পথ চলা শেষ হবে।ক্লান্ত শরীরে একটু বিশ্রাম খুঁজছে সোহেলের মা ….।

কিন্তু এই সমাজে কেউ কাউকে এমনিতে বিশ্রাম দেয়না এক মাত্র মৃত্যুই মানুষ কে বিশ্রাম দেয়। টেনে দেয় কষ্টে ভরা জীবনের সমাপ্তি।