‘তবু দেখা হোক’ একটি সহজিয়া ঘটনার অসাধারণ বিন্যাস । ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন

  •  
  •  
  •  
  •  

কোন এক সময়ে বাঙ্গালি মুসলিম নারীদের ঘরের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ ছিল নিষিদ্ধ। আর সাহিত্য ভূবনে প্রবেশ ছিল কল্পণারও বাইরে। বেগম রোকেয়া ও সুফিয়া কামালের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় কিছু মহীয়সী নারীর সাহসী নেতৃত্বে নারী শিক্ষার প্রচলন এবং সাহিত‍্য জগতে পদার্পণ। এরই ধারাবাহিকতায় মেঘনা পাড়ের মেয়ে পিয়ারা বেগমের লেখালেখি জগতে প্রবেশ। ইতিমধ্যে তার লেখা গল্প, উপন‍্যাস পাঠক সমাজে হয়েছে সমাদৃত। ব‍্যক্তিগতভাবে আমিও এ লেখিকার একজন ভক্ত। তার লেখা উপন‍্যাস ‘তবু দেখা হোক’ মিতু ও শিহাবের মিষ্টি প্রেমের উপখ‍্যানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। রেহানা ও নীহারিকার সহযোগিতায় তাদের সম্পর্ক এগিয়ে যায় বাস্তবতার একটা প্রত‍্যাশার দিকে। কিন্তু মিতু আর শিহাবের পারিবারিক বৈষম্যের কারণে শিহাব তার অভিভাবকের অস্বীকৃতি বা আপত্তির জন্য মিতুকে উপেক্ষা করে বিদেশে চলে যায়। যা তার দূর্বল ব‍্যক্তিত্বের বহি:প্রকাশ হলেও আমাদের সমাজের সাধারণ চরিত্র ফুটে ওঠেছে এ উপন‍্যাসের ক‍্যানভাসে।

অন‍্যদিকে মিতুর চরিত্রটি বাস্তবধর্মী এবং ভারসাম্য ব‍্যক্তিত্বের পরাকাষ্ঠা হিসেবে রচনা করেছেন লেখিকা। মিতু কলেজের সহকর্মীকে বিবাহ করেছেন। দাম্পত্য জীবনে সন্তানের মা হয়েছেন। কিন্তু জীবনের প্রথম ভালোবাসাকে কোনদিন ভুলতে পারেননি। এমনকি স্বামীর মৃত‍্যুর পর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে শিহাবের অপেক্ষায় থাকেন মিতু। শিহাবের প্রতি মিতুর ভালোবাসা নৈতিক মূল‍্যায়নে আত্মার আকুতি এবং পুত পবিত্র। যার জন্য হৃদয়ের চাওয়ার সাথে লড়াই করে মিতু বিশ্বস্ত থেকেছেন তার স্বামীর ভালোবাসার প্রতি। শিহাবের আহবান উপেক্ষা করে বন্ধুতের নামে একবারের পর আর কোনদিন তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে সাক্ষাত করেননি। এখানে তথাকথিত জৈবিক  চাহিদা এবং সাময়িক আবেগ পরাজিত হয়ে প্রকৃত প্রেমের জয় হয়েছে। মিতু শ্রদ্ধা এবং নৈতিকতার সাথে নিজের সবকিছু উজাড় করে নিবেদন করেছেন দাম্পত‍্য সুখের তরে। যদিও মনের গহীন কোনে সদা জাগ্রত ছিল শিহাবকে পাওয়ার এক সুপ্ত কামনা। তাই উপন‍্যাসের নামকরণ যথার্থ। অন‍্যদিকে মিতুর বান্ধবী নীহারিকার অনেক অর্থসম্পদ ও ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও স্বামীর ভালোবাসা না পাওয়ার বেদনা কষ্টদায়ক। নীহারিকা তার স্বামীর চারিত্রিক সমস্যার কথা জেনেও তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সন্তানের মা হয়েছেন।

লেখিকা এখানে নীহারিকার ব‍্যক্তিগত সুখকে জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজ তথা পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করে প্রকারান্তরে আমাদের সমাজে নারীদের সত‍্যিকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। কেননা ভালোবেসে বিয়ে করেও একটা সময়ের পর ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের মতো করে পাননি নীহারিকা। তাই লেখিকা নীহরিকার প্রতি কিছুটা অবিচার করেছেন বলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হলেও বতর্মান প্রেক্ষাপটে নারীদের এ অবস্থান নিভৃতে থেকে যাচ্ছে। তবে মিতু এবং নীহারিকার অটুট বন্ধুত্ব এবং তাদের সন্তানদের পারস্পরিক বিবাহ কিছুটা অতি নাটকীয়তা মনে হলেও, এটা তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন। মিতুর প্রথম জীবনে রেহানার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও উপন‍্যাসের ধারাবাহিকতায় রেহানার চরিত্রটি লেখিকাকে সীমিত রাখতে হয়েছে। সর্বোপরি লেখিকা সহজ -সরল ভাষায় একটি সাধারণ ঘটনাকে অসাধারণ করে তুলেছেন তার লেখনির মাধ্যমে। তার লেখা গল্প বা উপন‍্যাস এক নি:শ্বাসে পড়ে শেষ করা যায়। আশা করি ভবিষ্যতে লেখিকার কাছ থেকে আরো এ জাতীয় লেখা পাব। এ প্রত‍্যাশায়-

ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন, পি এস সি, বি এন (অব:)।
প্রাক্তন অধ‍্যক্ষ – কুমিল্লা  ক‍্যাডেট কলেজ, প্রতিষ্ঠাতা অধ‍্যক্ষ নৌ বাহিনী কলেজ ঢাকা, প্রাক্তন অধ‍্যক্ষ নৌ বাহিনী কলেজ চট্রগ্রাম ও সাবেক পরিচালক নৌ শিক্ষা, নৌ বাহিনী সদর দপ্তর।
ঢাকা, বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments