তুমি আমার সকাল বেলার সুর । এস এম জাকির হোসেন

  •  
  •  
  •  
  •  
এস এম জাকির হোসেন

খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল বড়মামার ডাকে। মামা অনেকটা জোড় করেই ঘুম থেকে তুলে দিলেন। বললেন, ‘দেখ, সকালটা কি সুন্দর!’ অনিচ্ছাসত্বেও উঠে পড়লাম। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি ঘরের সামনের বাধাঁনো সিঁড়িতে বসে আছে শ্যামল। আমাকে দেখে হেসে বলে উঠলো, ‘তোমাকেও তুলে দিয়েছে!’ আমি হেসে বলি- ‘উঠেই যখন পড়েছি, চল নদীর পাড়ে যাই।’
দু’জনেই একসাথে নদীর দিকে হাঁটতে লাগলাম। পূব আকাশে তখনো সূর্য উঁকি দেয়নি। তবে অন্ধকার কেটে যাওয়ায় ফর্সা হয়ে এসেছে চারপাশ। একটি চমৎকার স্নিগ্ধ সকাল। শরতের সকাল!

বাড়ি থেকে নদী একদম কাছে, খুব বেশী হলে দু’শ গজ হবে। বেড়িবাঁধ ধরে দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে অল্প সময়েই পৌছে গেলাম নদীর পাড়ে। চমৎকার আবহাওয়া। নদীর দিক থেকে হালকা ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই অদ্ভুত এক ভাললাগা অনুভূতি হলো। মনের গহীন কোণে বেজে উঠলো ইন্দ্রানীর সুরেলা কন্ঠে নজরুলের গান- ‘তুমি আমার সকাল বেলার সুর…..’
নদীতে তখনো জোয়ার চলছে। কানায় কানায় পূর্ণ। আমরা নদীর একেবারে পাড় ধরে হাঁটছি। পরিষ্কার টলটলে পানি, সেই পানিতে দু’জনে হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। মাঝনদীতে বেশ কয়েকটা মাছ ধরার নৌকা পাড়ে ভিড়ানোর জন্যে এগিয়ে আসছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে দুই নদীর মোহনায় চলে এলাম, গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদীটা এখানেই এই বড় নদীতে এসে মিশেছে। এখানে নদীটা অনেক চওড়া। স্রোতও অনেক বেশি। তবে এখান থেকে তিনদিকই দেখা যায়। চমৎকার একটী ভিউ।
ও-পাড়ে বিস্তীর্ণ চরজুড়ে ধবল কাশফুল।  বাতাসে এদিক-ওদিক দোল খাচ্ছে। একবার সামনে হেলে পড়ছে তো আরেকবার পেছনে। সেদিকে তাকিয়েই মনে হলো আজকের প্রাতভ্রমণটা না হলে এই অপার সৌন্দর্য মিস করতাম।  ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। পূব দিগন্ত ক্রমশঃ লাল হয়ে উঠছে। ও-দিকে নদীর বুক জুড়ে রক্তিম একটা আভা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্যটা কেমন রাজকীয় ভঙ্গিতে জানান দিচ্ছে তার আগমনী বার্তা।

নদীর ভাঙা পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ওর কড়াল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাওয়া মোল্লাবাড়ির শেষ চিহ্নটুকু ধ্বসে পড়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আমার মনে পড়ে গেলো বহুবছর আগে এই নদীটির অবস্থান আরও দক্ষিণে ছিলো। এখান থেকে আরও কয়েকটি বাড়ি পার হয়ে তবে নদীর পাড়ে পৌঁছাতাম আমরা।  সেগুলো আজ সবই নদীগর্ভে চলে গেছে। আমাদের অনেক পৈত্রিক সম্পত্তিও আজ কেড়ে নিয়েছে এই নদী। হারিয়েছি আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত সেই বিচরণভূমি। তবুও কেন জানি ওর প্রতি রাগ হয় না কখনও। এখনও তেমনি ভালোবাসি এই কীর্তনখোলাকে, যেমন বাসতাম বহুবছর আগে।
মাছ ধরার নৌকাগুলো ইতিমধ্যে পাড়ে ভিড়েছে। মেজমামাকে দেখলাম জেলে নৌকার দিকে এগিয়ে আসছে। আমাদের দু’জনকে দেখে হাসিমুখে বললেন, ‘কি, শহরের বাসিন্দাদের কাছে কেমন লাগলো এই প্রাতভ্রমণ?’ আমি হেসে বললাম, ‘চমৎকার ! এমন সকাল অনেক দিন দেখিনি!’
মামা হেসে বললেন, ‘চল, দেখি ওরা কি-রকম মাছ পেলো আজ।’ আমরা মামার সাথে জেলেনৌকায় উঠে এলাম। ছোট-বড় নানা জাতের মাছ উঠেছে জেলেদের জালে। মেজমামা দু’টি ইলিশ আর গলদা চিংড়ি কিনলেন। সবই টাটকা! অনেকদিন এমন তাজা মাছ দেখিনি। মাছ কেনা হতেই আমরা ফেরার পথ ধরলাম। বাড়ির কাছা কাছি আসতেই দেখি বড়মামা আমাদের খোঁজেই এদিকেই আসছেন। একগাল হেসে বললেন, ‘আজ সন্ধ্যায় কোথাও যেও না। আজ মাছ ধরতে যাবো।’ শ্যামলের দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম ও মিটিমিটি হাসছে। বুঝলাম আজ রাতে খবর আছে। কোনো অজুহাতেই আর কাজ হবে না। মনেমনে ঠিক করলাম মাছ ধরতে যাওয়ার সময় আরও দু-তিনজনকে সাথে নিয়ে নিতে হবে।
শহরে আমার কিছু জরুরি কাজ ছিলো। মূলত এই কাজটা সম্পন্ন করার জন্যেই দু’দিনের ছুটিতে গ্রামে আসা। দুপুরের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে শহর থেকে ফিরে এলাম। বাড়িতে ঢুকেই দেখি বড়মামা মাছ ধরার চারা (বেশ কিছু উপকরণ দিয়ে তৈরি এক ধরনের মাছের খাবার) বানাতে ব্যস্ত। আমাদের দেখেই বললেন, ‘তোমরা গোসল-খাওয়া শেষ করে রেস্ট নিয়ে নেও, আমরা সন্ধ্যার পর বের হবো।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা।’

মাছ ধরা আর পাখি শিকার বড়মামার কাছে নেশার মতো। এর যে কোনো একটাতে একবার মজে গেলে তাঁর আর সময়জ্ঞান থাকে না। এই নিয়ে বড়মামার সাথে আমাদের দুই কাজিনের অনেক স্মৃতি আছে। ছেলেবেলায় প্রতি বছর যখন গ্রামে বেড়াতে আসতাম, মামাবাড়ি আসার জন্য দু’জনেই উন্মুখ হয়ে থাকতাম। বড়মামার সাথে মাছ ধরা আর পাখি শিকারের লোভে। মামার নেশা আর আমাদের এডভেঞ্চারের স্বপ্ন- এ দু’টো মিলে মামা-ভাগনের দিনগুলো কখন যে শেষ হয়ে আসতো সে হিসেবটাও মনে থাকতো না। তবে শুরুটা আনন্দময় হলেও মামার নেশার কাছে প্রায়ই হার মানতে হতো আমাদের।  কোনো-কোনোদিন পাখি শিকার করতে করতে দেখা যেতো নদী পেরিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ছাড়িয়ে আরও দূরে চলে যেতাম কিন্তু মামার ফেরার ইচ্ছেটাই জাগতো না। শেষে আমাদের পিড়াপিড়িতে রণে ভঙ্গ দিতেন।
আজ মামার মাছ ধরবার চারা বানানো দেখে সে সব দিনের কথা মনে পড়ে গেল। মামাকে বললাম, ‘পুরানো দিনের সেই মাছ ধরার কথা মনে আছে?’ মামা হেসে বললেন, ‘সেসব দিনের কথা ভুলে যাও মামা! তখন এক ঘন্টায় যে পরিমাণ মাছ পেতাম, এখন সারা দিনেও তা পাওয়া সম্ভব না, নদীতে মাছ থাকলে তো!’
রাত একটু বাড়লে মামা তাঁর দলবল নিয়ে মৎস্য শিকারে বের হলেন। পেছনে পেছনে আমরা। চমৎকার জ্যোৎস্না পড়েছে, মামা নদীর পাড় ধরে জাল ফেলতে ফেলতে চললেন কিন্তু আমরা হতাশ হয়ে দেখলাম মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় দেড় ঘন্টা জাল ফেলে কিছু চিংড়ি, বেলে আর টেংরা ছাড়া তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। আমার মনে পড়লো আগেকার সেই দিনগুলির কথা। আমরা দু’ভাই প্রথম প্রথম খুব উৎসাহ নিয়ে মামার পিছনে পিছনে ছুটতাম, আর একসময় এত মাছ উঠতো যে ব্যাগগুলোর ভার বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হত না। মামাকে যেন নেশায় পেত, শেষে আমাদের কান্নাকাটিতে ফিরতেন। সেইসব দিনগুলি আসলেই নেই! নদীতে জোয়ার এলে মামা মাছ ধরা বন্ধ করে ফেরার পথ ধরলেন।
মামাকে বললাম, ‘আপনারা যান আমরা আরেকটু থাকি। মামা তার দলবল নিয়ে চলে গেলেন। আমরা দু’জন নদীর পাড়ে ঘাসের উপর বসলাম। আকাশে নির্মল চাঁদ, চমৎকার জ্যোৎস্না পড়েছে। নদীর টলটলে পানিতে চাঁদের আলো পড়ে অদ্ভুত সুন্দর মায়াবী একটি পরিবেশ তৈরি করেছে। চাঁদের আলোয় আশপাশটা বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আমি অনেক জায়গায়ই জ্যোৎস্না দেখেছি কিন্তু আমাদের এই নদীর পাড়ের জ্যোৎস্নার প্রতি আমি অদ্ভুত একটি টান অনুভব করি সবসময়। এর কারণ এই নদীর সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত। এখানকার জ্যোৎস্নার পেলব কোমলতা আমাকে যেন আবিষ্ট করে রাখে এক ভিন্ন আমেজে। আমরা যারা এই গ্রামের ধুলোমাটি মেখে বড় হয়েছি, জীবনের প্রয়োজনে জীবিকার প্রয়োজনে আজ শহরে আস্তানা গেড়েছি, তাদের কাছে এই সৌন্দর্যের ঢের মূল্য আছে। এই প্রকৃতির কাছে আসলে এখনও যেন প্রাণ ফিরে পাই!
মাঝ নদীতে কিছু মাছ ধরার নৌকায় টিম টিম করে আলো জ্বলছে। মাঝে মধ্যে দু’একটা ছোট ছোট লঞ্চ চলতে দেখা যাচ্ছে, তাদের হালকা ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে জোয়ার এসে আবার নদী কানায় কানায় ভরে উঠছে। শ্যামল বলল, ‘অনেক রাত হয়ে গেছে, চল ফিরি।’ আমরা ফিরে চললাম বাড়ির দিকে আর মনে গেঁথে থাকলো জ্যোৎস্না মাখানো স্বপ্নাতুর সময়টুকু।
বাড়িতে এসে দেখি বড়মামী খাবারের আয়োজন করেছে। রাতের আহার শেষ করে আমরা ঘুমাতে চলে গেলাম। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম আরেকটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশায়।

এস এম জাকির হোসেন: গল্পকার ও লেখক, ঢাকা।

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments