থোকা থোকা আগস্ট, থোকা থোকা সেপ্টেম্বর -শাখাওয়াৎ নয়ন

  •  
  •  
  •  
  •  

সেপ্টেম্বর ২০১৯। ছাত্রলীগের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগে এটা যদিও নতুন কিছু না। ইতোপুর্বেও ছাত্রলীগের সভাপতিকে বরখাস্তের নজির আছে। সে যাই হোক- সরকার বলছে, শুদ্ধি অভিযান চলবে। এবার যুবলীগে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। প্রথমেই বিভিন্ন ক্লাবের দিকে নজর দিয়েছে। আন্ডার ওয়ার্ল্ডের কতিপয় ডনদের ধরা হয়েছে। আওয়ামীলীগের এমন চমকপ্রদ পদক্ষেপ দেখে কি মনে হচ্ছে? ইতিহাস কি বলে?

১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২ সাল। ঢাকার পল্টন ময়দান। লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র আট মাসের মাথায় এই বিশাল গণজমায়েত। বাঙ্গালি জাতির অবিসংবাদিত একজন নেতার বিরুদ্ধে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকার রাজপথে আ স ম আব্দুর রব হুংকার দেয়ার সাহস পেলেন। কিন্তু কেন? একজন রব হুংকার দিলেই কি লাখো মানুষ দলে দলে চলে আসার কথা? না, আসার কথা না। কোনোভাবেই না। তবে কী ঘটেছিল তখন?
একদিকে দেশজুড়ে প্রচন্ড খাদ্য সংকট, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া, চারিদিকে কেবল ঘাটতি, সংকট, বাজার ব্যবস্থা সুবিধাভোগী, মজুদদার এবং চোরাকারবারীদের হাতে জিম্মি। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, বেকারত্ব, গুম, ধর-পাকড়, পুলিশের অত্যাচার। অন্যদিকে ছোটখাটো মূদীদোকানীরা হয়ে গেল সব ‘বিজনেস ম্যাগনেট’। ছোট ছোট সরকারী কর্মচারী হয়ে গেল অঢেল সম্পদশালী। দুর্নীতি কেবল সরকারী আমলা আর কূটনীতিকদের মধ্যেই সীমিত রইল না, যে যার সুবিধামতো নেটওয়ার্ক তৈরি করে নিল। আরো একদল লোক জুটে গেল যারা কেবল পরিচয় বিক্রি করে ভালো রোজগারের বন্দোবস্ত করে নিল। এরা মূলতঃ তদবির এবং দালালি করে বিভিন্ন রকম কমিশন খেত।
বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতার হাতে দেশের ভার থাকার পরও এসব ঘটল কিভাবে? কারণ বঙ্গবন্ধুর চারিদিকে নির্লজ্জ জঘন্যতম চাটুকরের কোনো অভাব ছিল না। মন্ত্রীদের মধ্যে চাটুকারিতায় অগ্রগামী ছিল খন্দকার মোশতাক এবং তাহেরউদ্দিন ঠাকুর। তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ঢাকা বিমান বন্দরে বঙ্গবন্ধুর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেছিল। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনতেন, তখন চাটুকর মন্ত্রীরা বলত- ‘ এ সবই দুষ্ট লোক আর রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপের অংশবিশেষ’। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই মোশতাক এবং তাহেরউদ্দিন ঠাকুর বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিল।
কেউ কেউ বলবেন, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটা জাতির অসীম প্রত্যাশা, আকাশ-কুসুম স্বপ্ন থাকে, যা কারো পক্ষেই পুরণ করা সম্ভব না। কেউ কেউ বলবেন, মুক্তিযুদ্ধের এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের পর দেশের অর্থনীতি বলে কিছু না। বঙ্গবন্ধুর করার কিছু ছিল না।

লন্ডনে ‘গল্ড ব্লাডার অপারেশন’ এর পরে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেছেন। শারিরীক অবসাদ তখনো পুরোপুরি কাটেনি। অথচ তার উপর পল্টনের এই সমাবেশ। শারিরীক এবং মানসিক সব মিলিয়ে তার সত্তায় একটা ঝাকুনির সৃষ্টি করল। একের পর এক পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যেতে থাকল। কিন্তু রাজনৈতিক চমৎকারিত্ব প্রদর্শনে বঙ্গবন্ধুর তুলনা আজ অব্দি বাংলাদেশে নেই। এক পর্যায়ে আমলা, মন্ত্রীবর্গ এবং সর্বোপরি পার্টির লোকদের প্রতি খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বললেন, ‘আমি জনগনের সঙ্গে আছি’। চোরাকারবারী, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্নীতির অভিযোগে, তিনি হুট করে তাঁর দলের উনিশ জন সংসদ সদস্যকে বরখাস্ত করলেন। উক্ত শুদ্ধি অভিযান, জনমনে এক ধরণের স্বস্তি কিংবা আশার সঞ্চার করলো। বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে ঘোষনা দিলেন, ‘আমি কাউকে ছাড়বো না। যে কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে আমি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো’।

শেখ হাসিনা লন্ডনে চোখের অপারেশন করিয়ে দেশে ফিরলেন। একাল-সেকালের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন? অল্প-বিস্তর পাওয়ার কথা, তাই না? বঙ্গবন্ধুর আমলের সাথে সব কিছুর মিল অবশ্যই পাবেন না। শেখ মনি যুবলীগের নেতা ছিলেন, তাই না? এখনকার যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীটা কে? শেখ মনির আপন বোনের জামাই। একটু খুঁজলেই আরো অনেক অনেক মিল পাবেন।
তবে বঙ্গবন্ধুর কন্যাও চমক দেয়ায় ক্ষেত্রে কম ওস্তাদী দেখান নাই। আর মাত্র দুই মাস পরে আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অধিবেশন। এখন কেন শুদ্ধি অভিযান? ছাত্রলীগ-যুবলীগের লোকেরা যে অপরাধে পদ হারাচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে; সেটা কি নতুন কোনো ঘটনা? এসব তো ওপেন সিক্রেট, সব দলে সব আমলেই ছিল। তাহলে কেন এমন চমক? কয়েকটি সম্ভাব্য কারনের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে, আগামী অধিবেশনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। সেই নেতৃত্ব যাতে শুরুতেই কোনো বড়সর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হয়, তাই সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে একটু নিড়ানি দেয়া হচ্ছে। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়?

ড. শাখাওয়াৎ নয়ন
একাডেমিক, প্রাবন্ধিক এবং কথাসাহিত্যিক।
www.facebook.com/shakhawat.nayon
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।