দানে যেন প্রচ্ছন্ন প্রত্যাশাও না থাকে । পিয়ারা বেগম

  
    

‘দান’ এর আভিধানিক অর্থ অর্পণ; প্রদান, স্বত্ব ত্যাগ করে দেওয়া, সম্প্রদান, উৎসর্গ ইত্যাদি। এখানে স্বত্ব ত্যাগ করে টাকাকড়ি বা বস্তুসামগ্রী জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গরীব-দুঃখীকে নিঃশর্তে, নিঃস্বার্থভাবে দেওয়াকেই আমরা দান বলি।

দাতা দান করেন স্বেচ্ছায়, তার মনের শান্তির জন্য, আত্মার তৃপ্তির জন্য। সর্বোপরি স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য। দাতা দিয়ে তৃপ্ত, গ্রহীতা পেয়ে তৃপ্ত। তবে গ্রহীতার মুখের ঐ নিষ্পাপ হাসিটুকুই দাতার তাৎক্ষণিক পুরষ্কার। তাৎক্ষণিক রিটার্নও বলতে পারি। মূলত গ্রহীতা যতটুকু খুশি হোন ঠিক ততোটুকু আনন্দই দাতা উপভোগ করেন। এই নির্মল উপভোগ্য আনন্দটুকু কোন মাপকাঠিতে মাপার বিষয় নয়। এটা কেবল অনুভবের বিষয়। এতে স্রষ্টাও খুশি হোন। কারণ, সৃষ্টির সেবাতেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি।

তবে এ দান যে খুব বড় মাপের হতে হবে তা কিন্তু নয়। আমাদের সামর্থ্যের চৌহদ্দির মধ্যে থেকে যে যতটুকু পারি এই দান আমরা অনায়াসে করতে পারি। বড় মাপের দান হলে তো আরো ভালো। প্রবাদ আছে, “যত গুড় ততো মিষ্টি।” তবে দান ছোটই হোক কিংবা বড়ই হোক তা হতে হবে সৎদান দান। সৎদান মানে ত্রুটিমুক্ত দান।

এবার জেনে নিই, ত্রুটিমুক্ত দান বলতে আমরা কি বুঝি?

ত্রুটিমুক্ত দান প্রসঙ্গটা আসছে এই কারণে যে, দানের সাথে প্রতিদান শব্দটা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তাই তো  অনেকেই বলে থাকেন, “প্রতিটি দানের মধ্যেই প্রতিদানের প্রত্যাশা লুকিয়ে থাকে৷  একটা প্রছন্ন বাসনা কিংবা সুপ্ত উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। অথচ ধর্মীয় দৃষ্টির আলোকে যা বুঝি, দান মূলত একবারে সত্ব ত্যাগ করে মানুষের উপকারের জন্য কিছু দেওয়া বা করা। তাহলে বলা যায় যে, প্রত্যাশা প্রাপ্তির আশা নিহিত থাকে এমন দান আসলে ত্রুটিযুক্ত দান। আরো বিভিন্ন কারণে দান ত্রুটিযুক্ত হতে পারে।

হাদিসে বর্ণিত আছে ডান হাতে দান করলে বাম হাত যেন জানতে না পারে। মূলকথা দাতা আর গ্রহীতা ছাড়া কেউ যেন না জানে। কিন্তু এখন মিডিয়ার বদৌলতে সাথে সাথে তা প্রচার হয়ে যায়। আবার অনেকেই স্বেচ্ছায় প্রচার করেনও এটা ভেবে, এতে অন্যেরা দান করায় উৎসাহী হবেন, উদ্বুদ্ধ হবেন। এটাও সত্য, দান করার সময় ক্যামেরাবন্দী ছবি প্রচারে অতি উৎসাহী মানুষের বাড়াবাড়ি একটু বেশিই হয়ে থাকে। এতেও দান ত্রুটিযুক্ত হতে পারে।

ত্রুটিযুক্ত দান প্রসঙ্গে আরও একটা বিষয় এসে যায়। দানকরা টাকা বৈধ, না অবৈধ? কিন্তু আবহমান কাল থেকেই সামাজিক সম্পদ বিনির্মাণে তথা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড  এলাকার দানশীল ব্যক্তিবর্গের অর্থায়নেই চলে। যেমন স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ-মাহফিল ইত্যাদি। এখনো তা-ই। দাতারা অনুদান দেন সংশ্লিষ্টরা সানন্দে লুফে নেন। তাছাড়া অনেকেই অবসর জীবনে এলাকায় গিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও মসজিদ- মাদ্রাসা দিয়ে থাকেন। আজ পর্যন্ত কখনো শুনিনি এসব ক্ষেত্রে  টাকার উৎসের কথা কেউ জানতে চেয়েছেন। তবে  উৎসের পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনাকারীরা সরব থেকে তাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যকে বহাল রাখে। যারা সমালোচনা করেন তারাই সুবিধা ভোগ করেন আবার দাতার প্রশংসায় স্লোগানও দেন।

আসলে, দাতার উপার্জিত টাকার গায়ে সাদা বা কালো, বৈধ বা অবৈধ ছাপ মারা থাকে না। তাহলে গ্রহীতা বুঝবে কীভাবে? এটা বুঝার কোন যন্ত্র আবিষ্কার হয় নি।

সঙ্গত কারণেই বলা যায়, দানে স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রচ্ছন্ন প্রত্যাশাও থাকতে পারে। এটাও বুঝার কোন যন্ত্র আবিষ্কার হয় নি। তবে আমি এর বিশ্লেষণে না গিয়ে বলব, শাস্ত্রের কথা – নিয়ত গুণে বরকত। যে যে উদ্দেশ্যই দাতা দান দিয়ে থাকেন সেটা তার নিয়তগুণেই ফল পাবেন।

আবহমান কাল থেকেই দেখে এসেছি  দানের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সমালোচনাটাই মুখ্য। তবে দাতারা মূলত সমালোচনা হজম করেই দান করে থাকেন। সত্যিকারের দানশীল ব্যক্তি সমালোচনায় কোন প্রতিক্রিয়া দেখান না। দান করে কারো কাছ থেকে এতটুকু ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশাও করেন না। মূলত দান করার আনন্দেই তারা দান করে থাকেন।

দান মূলত সম্পদে বরকত আনে।

দান অর্জিত অর্থসম্পদকে বিশুদ্ধ করে।

দান দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। অনেকেই বিশ্বাস করেন দান বালা-মুসিবত এবং রোগব্যাধি দূর করে।

দানের পর হৃদয়ে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি পাওয়া যায়। আল্লাহ দাতাকেই পছন্দ করেন। আসুন, আমরা নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্তে দান করি। নিয়মিত দানের মাধ্যমে অসহায় মানুষের মুখে একটু নির্মল হাসি ফুটাই। নিজেও উপভোগ করি অনাবিল আনন্দ।

পিয়ারা বেগম : প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক। বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments