দূর থেকে ‘বাংলাদেশ’ । সজল চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

 390 views

[ সজল চৌধুরী স্থপতি, শিক্ষক ও পিএইচডি গবেষক। পেশায় স্থপতি এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে এম-ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য, বিল্ডিং ও প্ল্যানিং অনুষদের পিএইচডি গবেষক। তার মূল গবেষণার বিষয় স্থাপত্য, পরিবেশ এবং মানুষের অভিজ্ঞতা-সম্পৃক্ততা। তার গবেষণা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত স্থাপত্য-পরিবেশ বিষয়ক লেখক। আমরা আনন্দিত, তিনি কথা দিয়েছেন প্রশান্তিকায় নিয়মিত লিখবেন। প্রশান্তিকা পাঠকদের জন্য আজ প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম এই লেখা।]

একথা বললে ভুল হবে না যখন কেউ আমরা দেশের ভেতরে থাকি তখন হয়তো দেশের প্রেক্ষাপট আমাদের দৃষ্টিতে ধরা দেয় একভাবে। নগরীতে পথ চলতে চলতে সমস্যাগুলোকে উপলব্ধি করি নিজেদের মতো করে। কিন্তু যখন আমরা এই মাতৃভূমি বাংলাদেশের বাইরে চলে যাই প্রয়োজনের তাগিদে, দেশের প্রতি এক অদ্ভুত ভালোবাসা-ভালোলাগা আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে সবসময়। এ যেন দূরে কোথাও বসে পুরো দেশটাকে দেখা। দেশের মানুষকে দেখা। দেশের ছয় ঋতু কে দেখা। অসংখ্য মানুষের প্রতি দিনকার পথ চলার এক দুর্ভেদ্য জীবন কথা! এ এক অন্যরকম উপলব্ধি। অনেক দূরে থেকেও দেশের আলো, বাতাস, মাটি, জলকে উপলব্ধি করা নিজের মতো করে! এ যেন সবসময় দেশের কথা মাথায় রেখে অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ানো। আমি জানি এই উপলব্ধি শুধুমাত্র আমার একার নয় – এই উপলব্ধি আপাময় জনগণের, যারা আজ দেশ থেকে অনেক অনেক দূরে রয়েছে। দূর থেকে তাকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দিকে। যারা সর্বদাই শুধুমাত্র এই অপেক্ষায়ই বসে থাকে একটি ভালো কিছুর আশায়। নতুন কোন সম্ভাবনায়!

সামনে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন আরেকটি বছর। চলমান বছরটিতে দীর্ঘ সময় ধরে এক অদৃশ্য জীবাণুর সাথে মানুষকে আজ অবধি সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে। আশেপাশের চেনা মুখ গুলো হঠাৎ করে কোথায় যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে! জানিনা এই অনিশ্চয়তার সময়টুকু আর কতটা দীর্ঘ হবে? তবে এ কথা বলতে পারি সামনের বছরটিতে আমরা নিজেদেরকে কিভাবে সামনের দিকে মেলে ধরবো, কিভাবে আমাদের পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে ভাববো, সম্ভাবনাগুলোকে নিয়ে ভাববো, সমস্যা বিশ্লেষণ করবো সেগুলোর পরিকল্পনা কিন্তু আমরা এখন থেকেই করতে পারি। শুধুমাত্র এই আশায় হয়তোবা আমাদের সমষ্টিগত সুচিন্তিত গঠনমূলক ভাবনাগুলো কোন না কোনভাবে দেশের উন্নয়নে একটু হলেও ভূমিকা রাখবে।
এই নতুন বছরে আমরা আসলে কি চাই? কি আমাদের ভাবনা আমাদের গ্রাম গুলো নিয়ে, শহরকে নিয়ে, সাধারণ মানুষজনকে নিয়ে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে কিংবা সংস্কৃতি নিয়ে? আমরা যখনই কোনো ভালো কিছু দেখি এই পাশ্চাত্যে আমাদের চারপাশে অযাচিত মনেই পার্থক্য খুঁজে বেড়াই আমার দেশ বাংলাদেশ এর সাথে। অবধারিত ভাবেই মনে প্রশ্ন আসে আমরা কেন এমন হতে পারছি না? কিংবা এভাবে তো আমরাও ভাবতে পারি আমাদের দেশকে নিয়ে!

প্রত্যেকটি বছর আসে আবার বছর যায়। ঘুরে ফিরে এই ঋতুচক্রের বিবর্তনের মধ্যে মানুষের জীবন পরিচালিত হয় নতুন স্বপ্নের আশায়-বাস্তবতায়। সময় আমাদের একদিকে যেমন প্রতিকুলতাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে শেখায়, ঠিক অন্যদিকে এই প্রকৃতি এবং পরিবেশের সাথে আমাদের অভিযোজন ক্ষমতার বহি:প্রকাশের স্বরূপ কেমন হবে সেটি নিয়েও ভাবতে শেখায়। যেমনটা শেখাচ্ছে বর্তমান এই করোনা মহামারী সময়কাল। হাজারো কষ্টের মধ্যেও আমাদের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই নিজেদের মতো করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বেঁচে থাকার নিমিত্তে। ছোট্ট একটি দেশে কোটি কোটি মানুষের বসবাস। দেশকে নিয়ে আমার গর্ব হয়, কারণ ছোট্ট এই দেশে আজ কোটি মানুষের ক্ষুধা নিবারণ হচ্ছে! কোটি কোটি মানুষ বসবাসের জায়গা পাচ্ছে। আমাদের শহর গুলোকে হয়তো আমরা অনেক সময় বলি অস্বাস্থ্যকর, শহর বসবাসের অনুপযোগী। অথচ এই শহরগুলোতেই আমরা বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে আসছি, স্বপ্ন বুনে আসছি চার দেয়ালের মধ্যে থেকে।

সমস্যা থাকবেই। আর সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক হবে এটাই স্বাভাবিক। কথাগুলো একারণেই বলা হচ্ছে এই মহামারী একদিকে যেমন আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি আমাদেরকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব। অল্প নিয়েও কিভাবে জীবনধারণ করা যায় যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বর্তমান সময়ে। কারণ সম্পদের অপ্রাচুর্যতা আমাদের রয়েছে। তাই এই স্বল্প সম্পদকে কিভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এর থেকে সব থেকে বেশি উপকারিতা পাওয়া যায় সেই বিষয়টি এখন অত্যন্ত জরুরী।
হয়তো এই নতুন বছরের শুরুতে চাওয়া থাকবে, প্রাপ্তি থাকবে – দেশের কাছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের নিজেদের কাছে কি কোন চাওয়া থাকবে কিংবা স্বপ্ন পূরণের গল্প থাকবে? যে চাওয়া গুলো হয়তোবা আমরা আমাদের মতো করে নিজেরাই পূরণ করতে পারি পরিবারের জন্য, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য? কিংবা একটু মানসিকতার পরিবর্তন এর মাধ্যমে আমরা কি নিজেদেরকে একটু বদলাতে পারি? আর এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হোক আমাদের সামনের বছরের পথচলা ঠিক যেমনটি দেশের জন্য কিছু স্বপ্ন হোক মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে!

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments