দেবী দর্শন – মা অন্নপূর্ণা (শেষ পর্ব)-তানিম হায়াত খান রাজিত

  •  
  •  
  •  
  •  

 316 views

ভারতীয়শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুর সম্রাট উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী। সুরসম্রাজ্ঞী অন্নপূর্ণা একসময় সহধর্মিনী ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্করের। ১৩ অক্টোবর অন্নপূর্ণা শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।তাঁকে নিয়ে দেবী দর্শন লেখাটি লিখেছেন তাঁর ভাইপো এবং বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ মোবারক হোসেন খান ও সঙ্গীত শিল্পী ফওজিয়া ইয়াসমিনের কনিষ্ঠ সন্তান তানিম হায়াত খান রাজিত। অন্নপূর্ণার জীবদ্দশায় এই লেখাটি প্রকাশের বারণ ছিলো। তার অন্তর্ধানের পর পরই রাজিত প্রশান্তিকায় লিখলেন এই মহামূল্যবান লেখাটি।
আজ লেখাটির শেষ পর্ব।

আগের লেখা:
ফিতে খুলে মাথা উঁচু করে তাকিয়েই দেখি এক ভদ্রমহিলা, যেন সাক্ষাৎ দেবী – ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন ! আমি তাকাতেই হাসিমুখে বললেন , ” আমি তোমার পিসিমা …..”

শেষ পর্ব:
আমি কিছুক্ষনের জন্য স্থবির হয়ে গেলাম। আমার পৃথিবীর সমস্ত সময় যেন থমকে দাঁড়ালো। আমার জিহবা ভারী হয়ে এলো। আর আমার চোখ দিয়ে আনন্দে কখন যে জল গড়িয়ে পড়ছে টেরই পাইনি। আমার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না আমি দাঁড়িয়ে আছি এক জীবন্ত কিংবদন্তির সামনে – এক সুরের মহাসমুদ্রের কাছে।

কতক্ষন কেটে গেলো জানিনা। হয়তোবা ১০ সেকেন্ড-ও নয়। কিন্তু মনে হচ্ছিলো যেন কত যুগ পার হয়ে গেছে। আমার মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা শব্দ বের হয়ে এলো। আমি কত কথা বলতে চাই, কিন্তু সব শব্দ যেন হারিয়ে গেলো। আমার শুধু মনে আছে আমি পিসিমার পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছি, ওনার একটুখানি আশীর্বাদের জন্য। তারপর মাথা তুলে বললাম, “পিসিমা, আমি রাজিত”। পিসিমা জোরে জোরে হাসতে হাসতে বললেন, ” এতো দেখি একেবারে পাগল ছেলে, কোথা থেকে ছুটে এসেছে দেখো তো? একেবারে পাগল ছেলে!” এরপর পিসিমা সেই প্রবীণ ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করে বললেন, রাজিত, উনি তোমার পিসেমশাই। আমি আগেই বুঝেছিলাম – শুধুমাত্র নিশ্চিত হলাম। পিসিমা বললেন, এসো রাজিত, ভেতরে এসো, খুব নোংরা কিন্তু, সারা বাড়িতে কাজ হচ্ছে তো তাই, একটু কষ্ট করে বসো কেমন।

আমি ড্রয়িং রুমে ঢুকলাম। ঢুকে প্রথমেই নজরে এলো আলাউদ্দিন দাদুর একটা বিশাল আবক্ষ মূর্তি। আর সারাটা ঘর জুড়ে শুধু যন্ত্রের পর যন্ত্র; সেতার, সরোদ, সুরবাহার, সুরশৃঙ্গার, তবলা, পাখোয়াজ আরও কত কি! আর আরেকটা স্ট্যান্ডে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো আরও সব যন্ত্র যেগুলোর প্রত্যেকটিই ছিল সুদৃশ্য ঢাকনা দিয়ে ঢাকা। ঘরের একটা দেয়ালে দাদু আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের বিরাট এক ছবি, সেই ছবিতে ফুলের মালা পরানো। যেহেতু অন্যঘরে মিস্ত্রিরা চুনকামের কাজ করছিলো তাই ড্রয়িং রুমের মেঝে জুড়ে একরাশ বই স্তূপ করা ছিল। এইসব বই আর কারো নয় রুশীজির নিজস্ব কালেকশন। উনি নিজে প্রফেসর মানুষ। ডাইনিং টেবিলের ওপরেও ছোটছোট সব জিনিস স্তূপীকৃত ছিল। ঘরে একটা কম্পিউটার দেখলাম, নিশ্চয় রুশীজির কাজের কম্পিউটার। এছাড়াও ছোট ছোট আরো কয়েকটা মূর্তি চোখে পড়লো এখানে ওখানে, শোকেসের ভেতর। যেগুলোর সবগুলোই ছিল আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের প্রতিকৃতি। কোনোটাতে উনি বসা, কোনোটায় উনি দাঁড়ানো, কোনোটা আবক্ষ, কোনোটায় যন্ত্র সহকারে উপবিষ্ট। বাবার প্রতি, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা আর সম্মানের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত যেন অবাক হয়ে দেখছি, গুরুভক্তি।

আমি ঘরে এসে বই সরিয়ে সোজা মেঝেতে বসে পড়লাম। পিসিমা তাড়াতাড়ি এসে টুল এগিয়ে দিলেন। আমি সেই টুলটা পাশে সরিয়ে রেখে বললাম যে আমি নিচে বসতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করছি। আসলে পিসিমার সামনে টুল বা চেয়ারে বসাটা বেয়াদবি মনে হচ্ছিলো আমার কাছে। এরপর পিসিমা এসে সোফাতে বসলেন। বললেন, “আমাকে দেখার জন্য এতো কষ্ট করে এসেছো, এখন দেখোতো আমাকে, পিসিমা কি বিশেষ কিছু?” আমি বললাম, “আপনার তো বাইরেটা সব কিছুই না, আসল তো সব ভেতরে,সেটা কি আমি উপলব্ধি করছি না? ” আমি তখন পিসিমাকে আমার কলকাতা থেকে বোম্বে আসবার টিকিট সংক্রান্ত পুরো ঘটনাটা খুলে বললাম। উনি শুনে বললেন , “হ্যাঁ, আমি জানি। এজন্যই ভাবছিলাম তুমি ১১ তারিখ এসে টিকিট কেটে সত্যি সত্যি বোম্বে আসতে পারবে কিনা। কারণ আমি যখন ছাত্রদের সময় দেই তখন প্রায় ২ মাস আগে থেকেই জানিয়ে দেই যাতে তারা টিকেট সমস্যায় না পড়ে। আমি পিসিমা কে বললাম যে আমি ৫:৪৫ এ আকাশগঙ্গার সামনে আসলেও যেহেতু পিসিমা ৬:৩০ এ সময় দিয়েছেন, তাই আগে নক করতে সাহস পাইনি। পিসিমা শুনে হাসলেন, বললেন, দূর বোকা ছেলে, চলে আসলেই তো পারতে। আমি তো প্রতিদিনই অপেক্ষা করছি তুমি আসবে বলে। রুশীজিকেও তো বলাই আছে। পিসিমা এবার আমাকে বললেন রুশীজির সাথে গল্প করতে আর উনি ভিতরে চলে গেলেন এই বলে যে, “আমি একটু আসছি।”

কথায় কথায় রুশীজি জানলেন যে আমি বাড়ির সবার ছোট। তাই শুনে বললেন যে ছোটরা মনে হয় এরকমই হয়। ইংলিশেই কথা হচ্ছিলো রুশীজির সাথে, যেহেতু আমার হিন্দি তথৈবচ! এরপর রুশীজির কাছে এক লোক আসতে উনি একটু উঠে গেলেন। আমি পিসিমার ব্যালকনি থেকে আরব সাগরে সূর্যাস্ত দেখে পিসিমাকে খুঁজতে খুঁজতে ওনাকে আবিষ্কার করলাম রান্নাঘরে, বললাম, “পিসিমা, শুরু করে দিয়েছেন? এসে তো বসলামও না!” তাড়াতাড়ি পিসিমা বললেন, “না বাবা, শুধু চা, চা খেতে খেতে গল্প করবো। “ আমি আর জোর করলাম না কারণ আমি জানি পিসিমা অসম্ভব রান্না প্রিয় আর অতিথি পরায়ণ একজন মানুষ। আমি ঘরে এসে বসলাম। পিসিমা চায়ের সাথে আরও এক গাদা খাবার নিয়ে আমার সামনে রেখে নিজে সোফায় বসলেন। তারপর বললেন, “দেশের খবর কি বলো? মোবারক কেমন আছে?” একজন একজন করে নাম ধরে ধরে সবার কথা জিজ্ঞেস করলেন। বাবা – চাচা – ফুপুদের সবচাইতে বড় ভাই হীরালাল জ্যাঠার কথা আলাদা ভাবে জিজ্ঞেস করলেন। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম পিসিমা বাংলাদেশে কখনো যাননি, মাইহারে জন্ম, বেড়ে ওঠা, তারপর কলকাতা হয়ে বোম্বে, অথচ প্রতিটা ভাইবোনের কথা নাম ধরে ধরে জিজ্ঞেস করলেন। কতটা মনে রেখেছেন সবাইকে।

তারপর জিজ্ঞেস করলাম খাদেম হোসেন খাঁ সাহেবের কথা, আবেদ হোসেন খাঁ সাহেবের কথা, আম্বিয়া বোনের কথা, আসিয়া বোনের কথা, ইন্দ্রবালা বোনের কথা। এ এক বিশাল গুষ্টির গল্প যেনো। আর আমার কাছে আবার সব সময় সবার আপডেটেড খবর সবসময় থাকে। তাই দারুন জমে গেলো। বড় চাচা আবেদ হোসেন খান সাহেব দুই বছর আগে মারা গেছেন শুনে উনি আকাশ থেকে পড়লেন, “আবেদ হোসেন মারা গেছে? কেউ তো একটা খবরও দিল না।” বুঝলাম কোনো কারণে এমন খবরটা ওনার কাছে না পৌঁছানোতে উনি কষ্ট পেয়েছেন।

খুব খুশী হলেন শুনে আমার বড় বোন Professor-Reenat Fauzia এর কথা শুনে। এজন্য যে পিসিমার পরে আমার বোনই একমাত্র মেয়ে এই পরিবারে যিনি সেতারকে জীবন দিয়ে আঁকড়ে ধরেছেন। আশীর্বাদ করলেন আপুর জন্য।

আলাদা করে জিজ্ঞেস করলেন ওনার চাচাতো বোনের ছেলে উস্তাদ খুরশিদ খানের কথা। নিশ্চিত করে নিলেন, “আয়েত আলী কাকার মেয়ে আম্বিয়া বোনের ছেলে না?” আমার দাদুকে কেউ ‘আয়েত আলী কাকা’ বলে সম্বোধন করলেন, এটা আমার কাছে একদম নতুন ছিল। কানে ভীষণ লেগে যাচ্ছে এটা এখনো। আমার দাদু পিসিমার আপন কাকা। এতো দেখি গুনের সমারোহ।

এরপরে শিবপুর গ্রামের কথা একে একে উনি জিজ্ঞেস করলেন। জিজ্ঞেস করলেন মসজিদের কথা সেই পুকুরটার কথা। উনি আজও এসব দেখেননি। কিন্তু বাবার কাছে শুনেছিলেন। আলাউদ্দিন দাদু ১৯৩৫ সালে নিজের হাতে মসজিদ আর পুকুর তৈরী করে দিয়ে গিয়েছিলেন শিবপুর গ্রামে, যেগুলো এখনো বহালতবিয়তে আছে। সেসব অনেকের কথা বলতে বলতে আর অনেক কিছু আমার কাছ থেকে শুনতে শুনতে কতবার যে ওনার চোখ অশ্রসজল হয়ে পড়ল। আমি তখন পরিবেশ হালকা করার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে বললাম, “পিসীমা বলেন তো, আপনি এতো সুন্দর হলেন কিভাবে?” পিসিমা হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “এতক্ষন ভাবছিলাম পাগল কিন্তু এখন তো দেখছি বদ্ধ উন্মাদ! তোমাকে তো এখনই ডাক্তার দেখানো দরকার। বলে কিনা আমি সুন্দর। তুমি কি আমাকে আগে দেখেছো? ” বললাম, “কেন দেখবো না পিসিমা ? আপনার কম বয়সের ছবিগুলো আমাদের বাড়িতেই আছে। সেই যে সুরবাহার হাতে, তারপর দাদুর সাথে তোলা ছবি?” শুনে বললেন, “ও বুঝেছি। সব আশীষের কাজ।” এরপর পিসীমা বললেন, “তো তোমাকে বাসা থেকে অনুমতি দিল ? তুমি তো নিশ্চয় এর আগে বোম্বে আসনি।” বললাম, “আর বলেন না পিসিমা। অনুমতি কি আর সহজে দেয়? তবে এটা ঠিক যদি না আপনার চিঠিটা না পেতাম, তাহলে অনুমতি দিত কিনা কে জানে। চিঠিটা পাবার পর বাবা মা তো অবাক! এমন কান্ড আমি ঘটালাম কিভাবে। শুধুমাত্র আপনার এখানে আসবো এবং আপনি অনুমতি দিয়েছেন বলেই সেটা সম্ভব হয়েছে।”

পিসিমা বললেন, “তাও ভাল যে উত্তর দিয়েছিলাম। তুমি তো জানো বোধহয় আমি বাসার থেকে বের হই না কারো সাথে দেখা করি না। কাউকে চিঠিও লিখি না। কোন ফোন আসলে ফোনও করি না। এমনকি ফোন নম্বর এবং আমার গাড়ী নাম্বারও আমি জানি না। কি দরকার বল? আমি ফোন করি না, ফোন ধরি না, বাসার থেকে বের হই না, গাড়ীর কোন দরকারই নাই। তাই ফোন নম্বর আর গাড়ীর নম্বর দিয়ে আমার কি হবে? কিন্তু তোমার চিঠিটা পেয়ে ভেবেছিলাম একবার যে উত্তর দিব না। কিন্তু তোমার লেখাগুলো আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল যে আর উত্তর না দিয়ে পারলামনা না। এমনকি এটাও ভাবলাম যে চিঠির উত্তর না দিলে তুমি হয়তো ভাববে পিসীমা অহংকারী, ভাইয়ের ছেলেকেও উপেক্ষা করল। কিন্তু আসল ব্যাপার তো তা না। আমি কাউকেই লিখি না। আবার ভাবলাম ছেলেটা এতো কষ্ট করে শুধু আমাকে দেখার জন্য এখানে আসছে। আর আমি দেখা করব না, সেটা কি ঠিক? তবে কেবলমাত্র রক্তের টান বলেই এটা হয়েছে।” পিসেমশাই বললেন, “Of course he has found his roots and he is searching for the roots. Otherwise it can’t be possible.”
আমি সায় দিয়ে বললাম আসলেই পিসিমার আমাদের বিশাল ফ্যামিলির প্রায় সবার সাথেই আমার যোগাযোগ আর সম্পর্ক আছে। পিসিমা বললেন, “আশীষ ধ্যানেশের সাথে পরিচয় আছে?” বললাম, “জ্বি ধ্যানেশেদার সাথে তো সেই কবে থেকে চেনা আর আশীষদা গত বছর বাংলাদেশে গেলেন সাথে প্রানেশদাও ছিলেন। পিসীমা হঠাৎ বিমর্ষ হয়ে বললেন, “ধ্যানেশেটা বড় তাড়াতাড়ি চলে গেল। এতো বড় অসুখ হল কাউকে বলল না। জন্ডিস হবার পরও গুরুপাক খাবার খেত। এগুলো কি সহ্য হয়?” আশীষদা আর ধ্যানেশদা হলেন অন্নপূর্ণা পিসিমার বড় ভাই উস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেবের বড় দুই ছেলে। আশীষদা তো জগতবিখ্যাত সরোদিয়া, আর ধ্যানেশদার মতো সংগীত শিক্ষক কলকাতায় আরো একটি খুঁজে পাওয়া ভার। রবীন্দ্র ভারতী ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ছিলেন ধ্যানেশদা। ধ্যানেশদা জীবিত থাকাকালে উনি মাসে একবার করে কলকাতা থেকে বোম্বে এসে পিসিমার বাজার সদাই আর যা যা প্রয়োজন করে দিয়ে যেতেন।
তারপর পিসিমা আবার পুরনো প্রসঙ্গ টেনে এনে বললেন, “কিন্তু এখন ব্যাপারটা কেমন হবে? যদি সবাই মনে করে যে আমি সবার সঙ্গে দেখা করি?” বললাম, “কে বলল পিসিমা আমি আপনার সাথে দেখা করেছি। আপনার সাথে তো আমার দেখা হয় নি।” পিসীমা হো হো করে হেসে উঠলেন, “ভারী চালাক ছেলে তো?” আমি বললাম, “পিসিমা কলকাতার শুধু একজন জানে যে আমি আপনার সাথে দেখা করার জন্যই চলে আসছি। সেটাও উনি বিশ্বাস করেননি। বাকি সবাই জিজ্ঞেস করছিল তোমার রুটটা কি? বলেছিলাম কলকাতা-বোম্বে- দিল্লি-কলকাতা। সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিলো। কারন রুটটা ছিল ত্রিভুজকার। একেকটা একেক দিকে। আমি আর খোলাসা করে কিছু বলিনি। আর বাংলাদেশ থেকেও আর কেউই কিন্তু আপনার সাথে দেখা করতে আসবেনা। সেক্ষেত্রে দুরত্বটিই মুল কারণ।

এরপর পিসেমশাই তখন আমাকে ওনার একটা লেকচারের ক্যাসেট এবং ওনার Research- – এর topic উপহার স্বরূপ দিলেন। পিসীমা আমাকে আচার্য্য আলাউদ্দিন মিউজিক সার্কেলের একটা Invitation Card দিলেন বললেন, “প্রোগ্রাম হবে ১৮ই এপ্রিল। জানি তুমি থাকছো না তবুও রাখো সুভেনির হিসেবে।”

স্বাভাবিকভাবেই এসে গেল গান বাজনা প্রসঙ্গ। পিসিমা বললেন, “জানো কষ্ট লাগে এজন্যই যে শিখতে চাই কিন্তু শেখাবার মত তেমন কাউকে পাইনি। কয়েকদিন শিখেই মনে করে মহাপন্ডিত হয়ে গেছে। প্রোগ্রাম করার জন্য পাগল হয়ে গেছে। আরে বাবা আগে তো শিখো তারপর প্রোগ্রামতো আছেই। বুঝতে পারছি না বাবার শিক্ষা কি হারিয়ে যাবে? কাউকে কি তেমন করে তৈরী করে দিতে পারবোনা । অথচ আমি শেখাবার জন্য পয়সাও নেই না। বাবার আদেশ আমি মেনে চলছি।“

পিসিমা বাজানোর স্টাইল নিয়ে কথা তুললেন, “একটা ব্যাপার আমার যেটা ভালো লাগেনা সেটা হলো এই যে সব রাগ মিশ্র করে বাজানো! মিশ্র করে বাজালে কিন্তু আসল রাগের মূল নোটগুলো আর মূল ভাবটা থেকে সরে গেলেও শিল্পী নিরাপদ থাকেন, কিন্তু তাতে আসলে রাগটা কতটুকু প্রকাশ পায় বা বিশুদ্ধতা থাকে? আরো একটা জিনিস যেটা আমার পছন্দ নয় সেটা হলো বাজনা ধরেই কখন স্পিডে উঠবো এই প্রবণতা। কখন সপাট তান বাজাবো তার যেন প্রতিযোগিতা লেগে যায়। অথচ একটা নোট ধরে ধরে বিস্তার করে আসল রাগটা ফুটিয়ে তোলাতে যে পরিপূর্ণতা, এখনকার শিল্পীদের মাঝে সেটা দেখিনা। শুধু দ্রুত বাজাতে পারলেই কি বড় শিল্পী হয় যায়….?”

প্রসঙ্গ ক্রমে আসলো শান্তিনিকেতনে আলাউদ্দিন খা সাহেবের আর মুর্তি স্থাপন প্রসঙ্গে জটিলতার কথা। পিসিমা বললেন, “হ্যাঁ বুঝতে পারেছি না কেন সেখানে ঝামেলা হল। বাবা তো সারা বিশ্বের সবার বাবা, উনি তো আর আমার একার নন। উনি সার্বজনীন অথচ ওনার মুর্তি বানানো নিয়ে এতো বিরোধিতা। আমি তো এ ব্যাপারে সব কিছু জানতাম না।” একজনের নাম বললেন পিসিমা। বললেন, যে সেই মেয়ে জানালো যে শান্তিনিকেতনে বাবার মুর্তি তারা বসাতে চায় ; এখন আমার অনুমতি এবং সম্মতি আছে কিনা। আমার তো না বলার কোন কারনই নাই। আমার এক ছাত্র দিপু, বাঁশী বাজায়, ওকে দিয়ে জানিয়ে দিলাম সে কথা।”

কথা প্রসঙ্গে আমি জানিয়ে রাখি এখানে যে সেই মূর্তি কিন্তু বর্তমানে শান্তিনিকেতন থেকে যে কোনো কারণেই মিসিং। এ নিয়ে কলকাতার পত্রিকায় বেশ লেখালেখিও হয়েছে, কিন্তু মূর্তি খুঁজে পাওয়া যায় নি।

আবার আসি আকাশগঙ্গায়। এরপরে আমি তাকালাম আলাউদ্দিন দাদুর বিশাল আবদ্ধ মুর্তির দিকে। পিসিমা বললেন, “এই মুর্তিটা এক শিল্পীকে দিয়ে বানিয়েছিলাম শান্তিনিকেতনে বসানোর জন্য কিন্তু আমার মুর্তিটা পছন্দ হল না। সব কিছু ঠিকই আছে, কিন্তু চোয়ালের জায়গাটা বসে গেছে। মনে খুঁত রেখে এটা আর পাঠালাম না, বাসাতেই রেখে দিলাম। ভাবছি আবার আরেকটা বাসাবো।” পিসীমা এরপর জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি মাইহারে গিয়েছো ?” আমি মাথা নেড়ে না বললাম। আর যাবার যে খুব ইচ্ছা সেটা জানালাম। পিসীমা বললেন, “কলকাতায় সিয়ে আশীষকে দিয়ে একটা চিঠি লিখিয়ে নিয়ে মাইহারে আমাদের বাড়ীটা সুযোগ পেলে দেখে এসো। ওখানে তো আর কেউ নেই, শুধু কেয়ার টেকার আছে। ওই বাড়ীতেই থাকতে পারবে।”

স্বেচ্ছা নির্বাসন সম্পর্কে পিসিমার মন্তব্য, “যখন দেখলাম কারো সাথে কথা বললেই কেউ আমার নামে বাজে দুর্নাম ছড়াবে তখন ভাবলাম কারো সাথে দেখা করব না, কথা বলব না। সেই থেকে ঘরের ভিতর ঢুকলাম। আজকে জানি না কতদিন হয়ে গেল যে আমি বাইরে যাই না। কিন্তু উপরওয়ালা তো একজন আছেন। তিনি হয়ত বললেন দাঁড়াও বেরোবেনা মানে? বের করিয়ে ছাড়বো। শুরু হল ওনার খেলা। আমার হঠাৎ দাঁতের ব্যথা শুরু হল। রুশীজি ডাক্তার দেখাতে চান, কিন্তু আমি তো যাবোই না। শেষে উপায় না দেখে যেতে হল তাও গেলাম রাত্রে ১০.৩০ এর পরে। ডাক্তার আমার জন্য চেম্বার খালি করে রেখেছিলেন। কিন্তু ওই শেষ। এরপরে মনে হয় দুই বছর হয়ে গেছে। আমি সবরকম ওষুধ আনিয়ে রেখেছি ব্যথা উঠলে খেয়ে নেই, ব্যস হয়ে গেল।”

আমি এ প্রসঙ্গে বললাম, “কিন্তু এটা কি ঠিক? বড় কোন অসুবিধা হয়ে যেতে পারে।” কিন্তু পিসীমা ওনার সিদ্ধান্তে অটল। অসুখের সাথেও আপোষ করবেন না। বরং আরো বললেন, “বাবা বলে গেছেন নিজের কাজ সব নিজে করতে নিজের করতে। উনিও তাই করতেন। আমি তাই অনুসরণ করছি। এখনও আমি আমার কাপড় আমি নিজে ধুয়ে নেই। বাবার আদেশ পালন করতেই হবে।”

আমি বুঝলাম কি এক কঠিন নীতির মহিলার সামনে বসে আছি। কেন তিনি মা স্বরস্বতী সবার জন্য।

ক্রমে রাত হয়ে এলো গল্পে গল্পে, আমার উঠবার সময় হয়ে এলো। পিসিমার পা ছুঁয়ে আবার আশীর্বাদ নিলাম। বের হবার জন্য উঠলাম। তখন পিসিমা রুশীজিকে কিছু একটা ইশারা করলেন, সাথে সাথে রুশীজি এগিয়ে এসে আমার শার্টের পকেটে একটা খাম ঢুকিয়ে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি এটা? পিসিমা বললেন, “তুমি অনেক কষ্ট করে খরচা করে এখানে এসেছো। আমি জানি তুমি ছাত্র মানুষ, আর আমিও বের হয়ে তোমাকে কিছু কিনে দিতে পারবোনা, তাই এই ছোট্ট উপহারটুকু রাখো, নিজের মতো খরচ করে নিও।” আমি কথা বাড়ালাম না, কারণ আমি জানি পিসিমার আদেশ শিরোধার্য, তাই আশীর্বাদ হিসেবেই নিয়ে নিলাম।

আমি ধীরে ধীরে বের হয়ে এলাম। নিচে নেমে ফিরে তাকালাম ‘আকাশগঙ্গা’র দিকে, যার চার দেয়ালে কত ঘটনা, পিসিমার দুর্ভেদ্য জীবন। আর আমি পেলাম আমার সামনে পথ চলার আশীর্বাদ – সরোদ বাজানোর অনুপ্রেরণা।

বাংলাদেশে ফিরে এসে সরোদ হাতে তুলে নিলাম। শুরু করলাম সরোদ শেখা ১৯৯৮ থেকে।

তানিম হায়াত খান রাজিত
সরোদ আর্টিস্ট, শিল্পী ও সুরকার
ভাইপো- অন্নপূর্ণা দেবী
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments