দেশ এখন উগ্র ধর্মান্ধদের, হেরে যাচ্ছে মানুষ । নাদেরা সুলতানা নদী

  •  
  •  
  •  
  •  

দেশে সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজায় যে সাম্প্রদায়িক হামলা এবং সহিংসতার দানবীয় নারকীয় কাণ্ড ধর্ম রক্ষার নাম নিয়ে মানুষ ঘটালো তার প্রতি একটা নিন্দা এবং প্রতিবাদ করে কিছু লিখবো বলে বসেছি। নিজেকে লেখার মানুষ বলি আমি, চেষ্টা করি সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে নিজের আবেগটুকু রেখে যেতে। কিন্তু এই প্রথম খুব বেশী অসহায় লাগছে।

শব্দেরা যেন নির্বাক, ভেতর থেকে একটা অসহায়ত্ব, ক্ষোভ সব মিলে মিশে যে তীব্র ঘেন্না হচ্ছে সেটা বারবার গিলে ফেলবার চেষ্টা করছি!
এই প্রথম নিজেকে অনেক বেশী বিচ্ছিন্ন এবং একা লাগছে। আমার লেখা ক’জন মানুষই বা পড়বে। লিখলেও কী আমি যে বার্তা দিতে চাই তা কি পারবো আর?

আমি তো আর যাই হোক কোনভাবেই আমার স্বপ্নের বাংলাদেশের পরিচয় হয়ে উঠতে পারছিনা। খুব গৌরবে বলবো আমিই বাংলাদেশ সে সৌভাগ্য আর হবে আমার জীবদ্দশায় সে আশা করিনা। তারপরও বুকের মাঝে একটা জগদ্দল পাথর চাপা দিয়ে হলেও মনে হলো, কাল যদি আমি নাই থাকি, থাকুক আমার প্রতিবাদটুকু।

১৯৪৭- এ দেশ ভাগ হয়েছিল,
ধর্মের ভিত্তিতে, হিন্দুস্থান- পাকিস্তান।
১৯৭১- এ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছিলাম এই অসহায়ত্ব এবং অসভ্যতা থেকে বের হয়ে আসতে। আমরা অন্যকোন দেশের মতো হতে চাইনি বিধায় স্বাধীনতাকামী সাধারণ জনতা এক হয়েছিল। আমাদের মূল মন্ত্র ছিল আমাদের দেশ হবে সকল ধর্ম, বর্ণ এবং ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর! অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। যুদ্ধও করেছে সকল ধর্মের মানুষ, হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে…
কিন্তু আজ এই সময়ে এসে, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আবার আমরা ফিরে যাচ্ছি সেই কালো অতীতে।

যে বা যারা মানতে পারেনি কোনদিন, ভাই থেকে ভাইয়ের আলাদা হয়ে যাওয়া তারা সেই স্বপ্ন দিনের পর দিন আগলে রেখেছে, লালন- পালন করেছে। এই সত্য আমাদের অজানা ছিলোনা। কিন্তু সেই গোষ্ঠী স্বাধীন বাংলাদেশেই সরাসরি রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় ফুলে ফেঁপে বেড়ে উঠেছে। এবং শেষমেশ রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ব্যর্থতায় তাদের স্বপ্নই বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।

গত এই এক দশকেরও কম সময়েই, বাংলাদেশে ধর্ম চর্চা বেড়েছে উল্ল্যেখযোগ্য ভাবে। আমি অবুঝের মতো মাঝে মাঝেই ভাবি, বিষয়টি এমন হতেই পারতো মানুষেরা সব মুনি, ঋষি, আওলিয়া হয়ে গেছে। খুব সরল এবং সুন্দর মন মানসিকতার তারা, ধর্মচর্চা তাদের এমন করে তুলেছে…
কোন হত্যা, দূর্নীতি, নারী নির্যাতন নেই দেশে। আছে সকল সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিরাপদ শৈশব, মানে সব মিলে রীতিমত কাঙ্ক্ষিত সুন্দর এবং সভ্য এক বাংলাদেশ!

বাস্তবে কী বলে, কিচ্ছুটি হয়নি তার, বরঞ্চ এই সব অপরাধ বেড়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে।
বিশেষ করে ফেসবুকের নানান ফেইক এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পেইজ যখন মানুষকে ধর্মীয় বাণী শেখায় তখন সেই ধার্মিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে সুস্থ, সুন্দর স্বাভাবিকতা আশা করা যায়না।
রাজনৈতিক বড় দুটো দল তাদের নিজেদের স্বার্থে সব সময়ই এই সব ঘটনার ব্যাখা দেয় একদম তাদের মতো করেই। এবং তাদের সমর্থনকারীরা সেখান থেকে যা বার্তা নেবার ঠিক নিয়ে নেয়। এই যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ নানাভাবে ছড়ানো হচ্ছে সেই কবে থেকে নানা ভাবে, নানা মাধ্যমে এর সমাধান হয়নি। সরকারের কোন কার্যকর ভুমিকা চোখে পড়েনি। অদূর ভবিষ্যতে হবে এটা এই সময় অন্তত কল্পনার অতীত!

ঘটনার পর সরকার দলীয় মন্ত্রী এমপি গলা ফুলিয়ে যা বলেন আজকাল তা শোনার মতো ধৈর্য আর হয়না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে আছেন প্রায় এক যুগ, এখনও যদি সেই শক্তিই থাকে এমন দৃশ্যমান তাহলে আপনারা কোন মুখে ক্ষমতা দখল করে বসে আছেন। এভাবে শুধু দোষ চাপিয়ে আর কত দায় এড়াবেন।

যেভাবে বিরোধীপক্ষকে নিষ্ক্রিয় করেছেন সেভাবে যদি এই যে ধর্মের নাম নিয়ে একের পর এক অনাচার সৃষ্টি করছে, মিডিয়াতে নানান প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে তাকে আর বাড়তে না দিতে পারতেন, তাহলে আপনাদের অন্য অনেক অক্ষমতার কিছুটা হয়তো সাময়িক চাপা দিলে দেয়াই যেত!

তারপরও সবটুকু ক্ষোভ এবং কষ্ট নিয়ে যা বলতেই চাই, মানুষ অন্ধভাবে ধর্মের নামে যা খুশী তাই বিশ্বাস করতে যেয়ে এটাই ভুলে যাচ্ছে, বাংলাদেশ আগামী যে প্রজন্মের কাছে আমরা রেখে যাচ্ছি তারা যে কী ভীষণ ঘৃণার এক পরিবেশ পাবে…
কী ভীষণ করে সবকিছু এক তরফা বিচার বিবেচনা করবে…
কী ভীষণ করে শিখবে তাদের ধর্ম ছাড়া অন্য সব মানুষ নিকৃষ্ট…
এটা বোধ হয় এই সময়ের ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠী কল্পনাও করতে পারছেনা।

আমরা যে বাংলাদেশ সৃষ্টি করছি অল্প অল্প করে, সেই বাংলাদেশ, তার মানুষ জানবেওনা,
‘’বাংলাদেশ’’ এ দেশটির জন্ম হয়েছিল কীভাবে, কেন এবং কেমন করে !

দেশ হয়ে যাচ্ছে উগ্র ধর্মান্ধদের, হেরে যাচ্ছে মানুষ… মানবিকতা! এই সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের দেশ আমার না, এই অনুভবের অভিমান যে বা যারা তীব্রভাবে আজও পোষেণ বুকে তাদের বলি- সেই আপনি আমিও আজ সংখালঘু। আপনার আমার প্রতিবাদের মিছিল সেই সব সাম্প্রদায়িক মানুষের মিছিলের সামনে আজ খুব বেশীই ক্ষীণ ধারার।

এই সব জেনে শুনেও আমরা অল্প কিছু মানুষই আজ বলার চেষ্টা করছি, কোন একদিন হয়তো ইতিহাসের অধ্যায়ে আমার উত্তরসূরী কিছু মানুষ ঠিক বুঝবে এই কষ্ট। খুঁজে পাবে আমাদের আত্মপরিচয়। সে আশায়, কেউ কী পাবে সে স্বপ্নালোক?

নাদেরা সুলতানা নদী
সহযোগী সম্পাদক, প্রশান্তিকা।
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments