দেশ ও দেশের বাইরে দুর্গা বন্দনা । অজয় দাশগুপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  

 112 views

অজয় দাশগুপ্ত

এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আঙ্গিকে ভিন্ন বিশ্ব বাস্তবতায়  উদযাপন হবে শারদীয় দুর্গা পূজা। পূজার আমেজ কবেই সর্বজনীন হয়ে এর নাম পাল্টে দিয়েছে। এখন আমরা বলি শারদ উৎসব। শারদ উৎসব যে বলি এর কারণ কি আসলে? কখন একটি সম্প্রদায়ের উৎসব সবার হয়ে ওঠে? কিভাবে তা হয়? ঈদ উল ফিতর যেমন আমাদের দেশে সবার উৎসবে পরিণত হয়েছে তেমনি দুর্গা পূজাও সেই কবে রূপ লাভ করেছে শারদীয় উৎসবে।

এর সাথে সাহিত্য সংস্কৃতি শিল্প যোগ হওয়ায়  উৎসব হয়েছে সর্বজনীন। পূজা সংখ্যাই ছিলো  তখনকার সাহিত্যের অন্যতম অবলম্বন । আমরা যদি এই উৎসবকে বাঙালির উৎসব বলি তাহলে বাংলা ভাষায় যা প্রকাশ হয় বা করা হয় সেটাই এখানে বিবেচ্য। তাই অনিবার্যভাবেই দেশ, আনন্দবাজার, সানন্দা থেকে আনন্দলোকের কথা চলে আসে। আমাদের মনে পড়ে যায় বিখ্যাত বহু লেখকের কথা। যাঁদের জন্ম হয়েছে এই শারদীয় সংখ্যার গর্ভে। ধীরে ধীরে তার প্রভাব পড়েছে আমাদের বাংলায়। যারা আমাদের দেশ ও সমাজে খালি সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতা দেখেন তাদের বলি, পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয় কোন সংবাদপত্রে ঈদ সংখ্যা বলে কিছু আছে কি না তা আমার জানা নাই। কিন্তু আমাদের বাংলার প্রায় সবগুলো সংবাদপত্র সাময়িকীই পূজার সময় কোন না কোন ভাবে এই উৎসবের মেজাজ ও চেতনার সাথে মিলে বিশেষ সংখ্যা বাজারে আনে। সে সংখ্যাগুলো কি কেবলই পূজার বন্দনা আর মন্ত্র ইত্যাদিতে ভরা? বরং এর ভেতরে থাকে বহু গবেষণালব্ধ লেখা ইতিহাস ও আলেখ্য। বাংলাদেশের শারদীয় উৎসব অনেক আগেই ঢুকে গেছে আমাদের অন্দর মহলে।

আরো যে বিষয়গুলো বাঙালিকে যুক্ত করে তার ভেতরে আছে আনন্দ উৎসব। হিন্দু ধর্মের উৎসবগুলোর একটা বড় সুবিধার দিক এতে প্রবেশাধিকার বা আনন্দ অংশগ্রহনে কোন সীমাবদ্ধতা নাই। যার ইচ্ছা সেই অংশ নিতে পারে। মন্ডপে মন্ডপে আপনি দেখবেন সর্বধর্মের তারুন্যের ভীড়। তাদের নাচ গান আর সপ্রাণ অংশগ্রহণ পাঁচদিন এই উৎসবকে করে রাখে জমজমাট। মাঝে মাঝে এমনও হয় যাদের পূজা তারা কেউ নাই মন্ডপ আগলে পাহারা দিয়ে রাখছে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ। এই ঐক্য আর সম্প্রীতিই আমাদের ম্যালবন্ধন।

আমি বিদেশে আসার আগে ভাবতাম জীবন হয়তো কেটে যাবে যে থাকবো তাদের মতো করে। কোথায় পাবো বাঙালি খাবার কোথায় মিলবে বাঙালি পোশাক আর উৎসব? জেনে নিশ্চয়ই অবাক হবেন না দুনিয়ার প্রায় সবদেশে বাঙালিরা আছে বাংলানন্দে। বাংলা নামের আনন্দ তাদের সঙ্গী। সিডনিতে খুব বেশী বাঙালি থাকেন না। ধারণা করি লাখ খানেকের কম। তার ভেতরেও পূজার আনন্দ জমজমাট। আমি যখন এলাম তখন দু থেকে তিনটি পূজা হতো। তাও এক দিনের জন্য। আর এখন ডজনেরও বেশী পূজা। এর ভেতর কারো কারো পূজার মেয়াদও পাঁচদিন। কি হয় না? শারদীয় পূজার সাময়িকী বার্ষিকী থেকে গান নাচ আরতি সব এমন ভাবে হয় যে আপনি বুঝতেই  পারবেন না কোথায় আছেন। এটাও ব্যাপার যে আর্থিক স্বচ্ছলতা একটি বড় বিষয়। যেহেতু এখানে তা আছে তাই জৌলুসও বেশী।

দেশের সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে বাঙালির শারদ উৎসব হয় কোন দেশে শীতকালে কোথাও বসন্তে কোথাও বা প্রচন্ড গরমে। কিন্তু শারদ উৎসবের আমেজ একটুও ম্লান হয় না। এবারের কথা বলছিলাম, এই করোনা কালে বিদেশে যেখানে হাজার ডলার জরিমানার ভয়, যেখানে আইন কঠোর নিয়ম না মানলে শাস্তি নিশ্চিত সেখানে এবারও কিন্তু মহা আগ্রহে উদযাপন হবে দুর্গাপূজা। কোথাও মন্দিরে কোথাও স্বাস্হ্যবিধি মেনে নিজেদের পছন্দের অডিটরিয়মে। করোনার কঠিন সময়ে সবাই যখন ভাবছিলেন আদৌ পূজা হবে কি না তখন সব হিসেব নিকেশ বদলে দিয়ে পূজার আগমনী বাজছে প্রবাসী বাঙালির দুয়ারে।

দেশের পূজায় এবার সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বাস্থ্য বিধি মানার পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলার নারীরা ভালো নাই। তাদের জীবন আজ দস্যুদের কারণে লোলুপ মানুষদের কারণে ঘরে বাইরে অসহায়। এতো ধর্ষণ এতো শ্লীলতাহানি আগে দেখিনি আমরা। গ্রামে গঞ্জে শহর বন্দরে কোথাও ভালো থাকতে পারছে না আমাদের মা বোনেরা। এমন সময় দুর্গাপূজা মানে শক্তির আরাধনা। সেই কবে আমাদের জাতির জনক বলেছিলেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আজ সে কথার রেশ ধরে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে ঘরে ঘরে দুর্গা গড়ে তোল। সেই দুর্গা যে সর্বংসহা কিন্তু অসুর বিনাশে সংকল্পবদ্ধ। যিনি ত্রিনয়নী। যাঁর এক নয়নে ভরসা এক নয়নে স্নেহ ভালোবাসা আর ললাটের নয়নে আছে তেজ। সে তেজরশ্মি জ্বালিয়ে ছারখার করে দিক অসুরের অশুভতা। বাংলার নারীদের সহায় ও শক্তি হয়ে উঠুন দেবী দুর্গা।

জীবন ও মানুষের কল্যানে নিবেদিত হোক এবারের শারদীয় উৎসব। আমরা যেন করোনা মুক্ত হয়ে সবাই মিলে বলতে পারি: তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে….
সবাইকে জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা।

সিডনি
২০/১০/২০। 

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments