দেশ ভাবনা ২ । উন্নয়ন সমন্বয় ও আমাদের উপলব্ধি । সজল চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

বিজয়ের মাস। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই ডিসেম্বরকে বাংলার মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সেইসব মহান যোদ্ধাদের যাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগের বিনিময়ে এসেছিল আমাদের স্বাধীনতা। অনেক ত্যাগের ইতিহাস, অনেক না বলা গল্প। সবকিছু মিলিয়ে আমার দেশ বাংলাদেশ।
জাতি হিসেবে আমরা অনেক আশাবাদী। সারা বিশ্ব যখন করোনা মহামারীতে সংক্রামিত লকডাউন, ঠিক তখন এই আমরাই নিজ উদ্যোগে সকল বাধা কাটিয়ে একে অপরের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ছুটে চলছি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। এমনকি দেশের বাইরে যারা অবস্থান করছেন বিভিন্নভাবে অনেক দূর দেশ থেকেও বাংলাদেশকে সাহায্য করার যে আন্তরিক প্রচেষ্টা, খুব কাছ থেকে সেগুলো দেখেছি। আর মনে মনে গর্ব বোধ করেছি এর নামই তো বাংলাদেশ। যেখানে রয়েছে স্নেহ, ভালোবাসা, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্য।

ডাক্তার, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের সেবা করে চলছে। যখন প্রয়োজনীয় নিরাপদ পোশাকের অভাবে মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষ হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঠিকভাবে কাজ করতে পারছিল না – এই আমরাই আমাদের যেটুকু সামর্থ্য আছে তাই দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছি তাতে কিছু পাই আর নাই পাই! সামাজিক নেটওয়ার্ক গুলো যখন বিশাল এক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কত চেনা অচেনা মানুষকে যোগসূত্রের মাধ্যমে এক সারিতে দাঁড় করাচ্ছে তখন আমরা আশান্বিত হই। তরুণরা দিন নেই রাত নেই মাঠ পর্যায়ের কাজ করেছে। যারা ঘরে বন্দি তাদের প্রতিদিনের বাজার পর্যন্ত করে দিয়েছে। শুধুমাত্র নিজেদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা একটু ভালোবাসার জন্য।

পাড়া-মহল্লায় ছেলে-বুড়ো সবাই যখন সংক্ষিপ্ততার মাঝেও নিজ মনোবলে মহামারী কে জয় করতে চায় তখন আশাবাদী হই। যে যার অবস্থান থেকে যখন কিছু একটা করতে চায় তখন সংকল্পিত হই। বাঙালিরা যুদ্ধ করতে জানে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। এই মহামারিতে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি প্রান্তে সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ জনগোষ্ঠী, আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংগঠন দরিদ্র-বৃদ্ধ মানুষদের সাহায্যার্থে যেভাবে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছে সেটি অবশ্যই আশার সঞ্চার করে। তবে একথা স্পষ্ট যে আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে ভবিষ্যতের দিনগুলোর জন্য। কারণ আমরা কেউই বলতে পারছি না ভবিষ্যতে আমাদের দেশ কোন পথে এগোবে এবং আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে? বিশেষ করে এই করোনা মহামারী পরবর্তী সময়কে কিভাবে আমরা আমাদের অর্থনীতি, সামাজিকতা, শিক্ষা, পরিবেশ সবগুলো বিষয়েকে একত্রে সমন্বয় করে একটি টেকসই উন্নয়নের দিকে যাব? সাধারণভাবে টেকসই উন্নয়ন বলতে সেই ধরনের উন্নয়নকে বোঝায় যেখানে আমাদের সম্পদ বর্তমান প্রজন্মের জন্য সুষ্ঠু ভাবে ব্যবহার করে অবশিষ্টাংশ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে দেয়া কিংবা সঞ্চিত করা যেখান থেকে উপকৃত হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু সেই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো প্রযুক্তিতে আমাদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং খুব সহজেই যেকোন কাজ অতি দ্রুত অল্পসময়ের যেনতেন ভাবে সম্পন্ন করা। যার মাশুল আমাদেরকে দিতে হয় পরবর্তীতে বছরের পর বছর ধরে। এই মনোভাব থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে করে ফেলতে হবে। আর স্থানীয় প্রযুক্তিকে বিভিন্নভাবে আমাদেরকে ব্যবহার করতে হবে নগরায়ন এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে। শ্রমিকদের টেকসই উন্নয়নের উপর জোর দিতে হবে এবং পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদেরকেউ উপলব্ধি করতে হবে তাদের মূল্য। তাদের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে দেশের উন্নয়ন। তাই শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের দেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবে দেখতে হবে।

তাছাড়া নগরের পরিকল্পনা এমন ভাবে করতে হবে যেখানে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিক তার চারপাশের সবকিছুকেই নিজেদের বলে ভাবতে শেখে। যার ফলে একে অপরের মধ্যে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি বন্ডিং তৈরি হবে। আমাদের সমাজের প্রতিটা উপাদানের সাথে অন্য উপাদান গুলো কোন না কোন ভাবে জড়িত। সেটি পরিবেশগত দিক থেকে হোক কিংবা সামাজিক দিক থেকে হোক। কারণ সামাজিক অপরাধ প্রবনতার সাথে স্থানীয় পরিবেশ এবং নগরায়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রয়েছে। যদিও সামাজিক অপরাধ শুধমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর নির্ভর করে না, তথাপি একটি সুষ্ঠ পরিকল্পিত নগরী এনে দিতে পারে সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক। যার অভাব এখন আমরা প্রতিদিনই উপলব্ধি করছি।

অন্যদিকে আমাদেরকে শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবলে চলবে না পরবর্তী বছরগুলোতে। আমাদেরকে গ্রামের মানুষের জীবন যাপন এবং তাদের মানোন্নয়নের কথাও বিশদভাবে ভাবতে হবে এবং গবেষণার মাধ্যমে কিভাবে সেগুলোকে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় সেগুলো নিয়ে চর্চা করতে হবে। কারণ গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। নদীনির্ভর, কৃষি নির্ভর গ্রামপ্রধান বাংলাদেশকে নতুন একটি সকালের স্বপ্ন দেখাতে হবে। শহরকেন্দ্রিক জীবন থেকে মুক্ত করে সেই আশার আলো মানুষের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে যেখানে গ্রাম হবে স্বনির্ভরর প্রতীক।

সজল চৌধুরী
স্থপতি, শিক্ষক ও পিএইচডি গবেষক (মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়)।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments