ধারাবাহিক উপন্যাস/মাতাল শিশু(২০ ও ২১তম পর্ব)-মোয়াজ্জেম আজিম

  •  
  •  
  •  
  •  
মোয়াজ্জেম আজিম

২০তম পর্ব:
খবিশের খবরের অপেক্ষায় আমি আর মা। আমি অপেক্ষার ফাঁকে ফাঁকে টিভির দিকে চোখ রাখছি। দেখছি কি দেখছি না সেদিকে খেয়াল নাই। মাঝে-মধ্যে চ্যানেল চেঞ্জ করছি। সাথে মার দিকেও চোখ রাখছি কী করে। যদিও মাকে বুঝতে দিচ্ছি না যে উনাকে টিভির মতোই অবজার্ব করছি। সেই সকালে খবিশ বললো যে সে মেডিকেলে যাচ্ছে। মুন্নির লাশ যেভাবেই হোক খুঁজে বাইর করবে। তার এক ছ্ত্রানেতার সাথে পরিচয় আছে। মাকে বললো, বাইর করতে অসুবিধা হবে না। খবিশ যখনই কোনো কথা বলে এমনভাবে বলে যেন সবই ওর হাতের মুঠোয়। অসুবিধা হবে না তাতেই এতক্ষণ, আর যদি অসুবিধা থাকতো তাহলে তো কয়েক যুগেও কোনরকম ইনফর্মেশন বাইর করা যেত না মেডিকেল থেকে! যা-ই হোক, মা বাসায় আছে তাতে আমি বেশ নিশ্চিন্ত। কিন্তু মুন্নির অনুপস্থিতি আমার মধ্যে কেমন যেন একটা দুঃখ-দুঃখ ভাব চাগান দেওয়ার পায়তারা করতেছে। যদিও টিভি নাটকের দুঃখ-প্রতারণার সাথে প্রতিযোগিতায় মুন্নির বিরহ বারবার হেরে যাচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধটা ক্ষ্যান্ত দিচ্ছে না। বারবার হেরে গিয়েও কন্টিনিউ করতেছে। এইরকম যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব মনের মধ্যে চলতে থাকলে আমার নেশাটা তাড়াতাড়ি ছুটে যায়। মা তো বেশী দেবে না। নেশার চিন্তাটা মাথায় আসতেই মুন্নিকে বেশী মাত্রায় মিস করা শুরু করেছি। গত কয়েক মাস আমার ভালই গেল। প্রত্যেকদিন ডাবল ডোজ। ডাবল মেরে মেরে মার কেনা বোতল ফুরিয়ে যাবার পর ওর বয়ফেন্ড এক বোতল বাড়তি এনে দিয়েছিল। মা টেরই পায়নি যে এরই মধ্যে বোতল রিপ্লেস করা হয়ে গেছে।
মা একটু পরপর একবার ঘরে আসছে, একবার বারান্দায় যাচ্ছে। তার সাথে ফোন তো আছেই। মা ফোনে কী বলে তা আর মনোযোগ দিয়ে শোনার আগ্রহ নাই। গত দুদিন ধরে মা যা বলছে তা প্রায় একই কথা। কত আর শোনা যায় একই সঙ্গীত।
মার এই অস্তিরতাই হোক, কি মুন্নির জন্যে ভালবাসাই হোক, কি কয়েকদিনের ডাবল ডোজের কারণেই হোক আমার খুব অস্থির লাগছে। কিছুই ভাল লাগছে না। টিভির চ্যানেলটা পাল্টাচ্ছি তো পাল্টাচ্ছিই, কিন্তু কোথাও থামতে পারছি না। কতগুলো চ্যানেল আমাদের টিভিতে তা কোনদিন গুনিনি। পঞ্চাশ-ষাটটা তো হবেই। কিন্তু কোথাও কিছু দেখার নাই। কোথাও কনসেন্ট্রেড করতে পারছি না। ক্ষণে ক্ষণে মুন্নির কথাই মনে পড়ছে। মানুষ কি এইটাকেই মিসিং বলে। মাকে শুনি সারাক্ষণই বলে, বাবু তোমাকে মিস করছি, বোনকে বলে মিস করছি, বন্ধুদের বলে মিস করছি, খবিশকে বলে মিস করছি। কিন্তু ওদের মিসিং আর আমার মিসিং-এ মনেহয় পার্থক্য আছে। ওরা সাধারণত মিস করে যখন ফোন করে। আর আমি সবসময় মিস করি না। কারো সাথে ফোনে কথা বলার সময়ও না। যখন একা থাকি তখন মনেহয় করি। কিন্তু সুমি আন্টিও গতরাতে মাকে ফোন দিয়ে বলেছে আমাকে মিস করছে। সবাই মিস করে ফোনের সময়, আর আমি করি আজাইরে সময়। ভাল্লাগে না ঘোড়ার ডিম! মানুষের কোনকিছুর সাথেই আমার বেশী মেলে না! এখন আমার মনে হচ্ছে মুন্নিকে মিস করছি। কিন্তু মিসিংটা এখন আর ফিলিংয়ের মধ্যে নাই; কেমন যেন একটা দমবন্ধ হওয়া কষ্টের দিকে চলে যাচ্ছে। আর এই ফিলিং তো মদের জন্যে হয়। মুন্নি কি তবে উছিলা মাত্র? কার জন্যে যে কষ্ট হচ্ছে তা-ই তো ধরতে পারতেছি না। এই মনে হয় টিভি দেখতে চাই, এই মনে হয় মুন্নির সাথে কথা বলতে চাই, এই মনে হয় সুমি আন্টির সাথে খেলতে চাই, এই মনে হয় আইসক্রিম খেতে চাই, এই মনে হয় গোসল করতে চাই, এই মনে হয় মবিন সাহেবের মুরগীগুলোর সাথে কথা বলতে চাই, এই মনে হয় রিকসা নিয়ে মার সাথে রাস্তার কয়েকফুট উপর দিয়ে সমস্ত জ্যামের উপর দিয়ে ঘুরে বেড়াতে চাই। রিকসাটা চলবে না, উড়বে। কিন্তু চাইলে আবার রাস্তায় রিকসায় বসা কারো মাথার চুল ধরে টানাটানি করা যাবে। কিন্তু বাইরে তো দোজখের আগুনের মতো গরম। দোজখের আগুনে পোড়ার চাইতে জেলখানায় বন্দি থাকা অনেক ভাল। অনেককিছু চিন্তা করছি, কিন্তু অস্থিরতা কমাতে পারছি না। এখন কেবলই কান্না পাচ্ছে। কোন ফাঁকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করেছি টেরও পাইনি। সেই ফোঁপানো একসময় ভেউভেউ-এ রূপ নিলে মা বারান্দা থেকে ছুটে আসে। এসেই কোলে তুলে নিয়ে বলতে থাকে, কী হয়েছে সোনা? কেন কান্তিছো? সোনা আমার, মানিক আমার। কী হয়েছে?
আমি এর কী উত্তর দেবো খুঁজে পাইনা। এবার শুরু হয় উত্তর না দিতে পারার কান্না, কেঁদেই চলি। মা তখন এটা দেয়, সেটা দেয়। ক্ষিদা লাগছে কিনা জিগায়। মার সব চেষ্টা ফেইল মারার পর বলে, এক পেগ হুইস্কি দেই?
হুইস্কি শব্দটা শোনার সাথে সাথে আমার কান্না অটোমেটিক থেমে যায়। আমি কিন্তু ইচ্ছা করে থামাইনি। মা মুচকি হাসি দিয়ে বেডরুমে ঢুকে যায়। আমি বোকা সেজে বসে থাকি। কোনকিছু পাইতে চাইলে বোকা সাজার বিকল্প নাই। বেশী চালাক মানুষকে কেউ পছন্দ করে না। আবার চালাকি ছাড়া কোনো কাজ হাসিলও করা যায় না। তবে মানুষ ভাঙ্গিয়ে খাওয়ার জন্যে বোকার ভাব বড় কার্যকর। মা আসলো আমার জন্যে ড্রিঙ্কস নিয়ে। আমি দুনিয়া ভুলে গিয়ে মদের পেয়ালায় ডুব দিলাম।

চমৎকার একটা ঘুম দিয়ে উঠলাম! বাসাভর্তি লোকজন। এত লোক কখন আসলো! কিছুই তো টের পাইনি! সাদিয়া আন্টি, সুমি আন্টি, খবিশ, খবিশের বাপ, মুন্নি, মুন্নির বাবা-মা ভাইবোন সবাই। বাড়িওয়ালা-দাড়িওয়ালা ছাগলটাও কি এখানে? মুন্নির বয়ফ্রেন্ড কই? মানুষ এত জোরে কথা কয় কেন? আমরা কি যাত্রাবাড়ী মোড়ে জ্যামের মধ্যে আটকা পড়ছি? আরে মবিন সাহেব কখন এলো! উনি কি সাথে করে মুরগী নিয়ে এসেছে? মুরগীগুলোরে ধরতে গিয়ে দেখি আমি নড়াচড়া করতে পারি না। মাকে ডাক দিই। মা আমাকে এই মুরগীটা ধরে দাও। দাও না। প্লিজ, দাও না।
মা বলে, কী বলিস?
-মুরগী ধরে দাও।
-মুরগী কোথায় পেলি?
আমি তাকিয়ে মুরগীর বদলে মার মুখ দেখি। মা কিভাবে মুরগী হয়ে গেল? সবাই হো হো করে হাসে। এত হাসে কেন সবাই? সবাই খালি মুরগীর মতো কককক করে। মোচড় দিয়ে উঠে বসতেই কোলাহল কিছুটা কমে আসে। কিন্তু মানুষগুলো গেল কই? আমি রুমের চারদিকে চোখ ঘুরাই। মা আমার সামনে, খবিশের গলা শোনা যায়। সে কি মানুষকে গালিগালাজ করছে? এত জোরে কথা কয় কেন? ও যে গালি দিতে পারে! কোনরকম রাগ না করেও গালি দিতে পারে। অনবরত গালি দিয়ে যেতে পারে হাসি হাসি মুখ করে। অন্য সবাইকে দেখি শুধু রাগলেই গালি দেয়। গালি দিতে দিতে আরো রাগে। আর খবিশ হলো খোশমেজাজে মানুষকে গালি দেয়। গালি দেয় আর ওর মুখের খুশি-খুশি ভাব আরো খোলতাই হয়। না, সত্যি খবিশের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। হাসতে হাসতে গালি দিতে পারার মতো কঠিন কাজ আর কয়টা আছে দুনিয়াতে? যারা এটা পারে আমার ধারণা তারা সবই পারে। এতক্ষণে বুঝলাম খবিশ গালি দিচ্ছে পুলিশকে।
-জানো শুয়োরের বাচ্চা, মাদারচোদ কী করছে?
সবাই চুপ। কেউ কোনো কথা বলছে না। একটা কোনো রহস্য শোনার ধান্দায় সবাই মশগুল। খবিশ কোনো বিরতি না দিয়ে বলে যায়। পুলিশ তো লাশের সাথে যে চিঠি দিছে তা লাশ মর্গে প্রেরণ করার জন্যেই। আমি তো ধরছি ওসি রে। এখন তো ওসি পারলে ওর মেয়েকে দিয়ে দেয় আমার সাথে। হাত-পা ধরতেছে বাঁচানোর জন্যে। আমি বলছি, আমি তো বাঁচাতে পারবো না। চিঠির ওরিজিনাল কপি এখন আমার বসের হাতে। এর থেকে বাঁচতে হলে কমপক্ষে দশ ছাড়তে হবে।  সুমি বলে, দশ মানে কী? দশ হাজার?
-তোমার কি মাথা খারাপ হইছে? দশ হাজার কোনো টাকা হইলো? দশ লাখ।
দশ লাখ শুনে সবাই আরো বেশী চুপ হয়ে গেল। খবিশ বলতে থাকে। শালা নাটকির পুত! পাঁচ দিতে রাজি হইছে সাথে সাথে। আমি আটের নীচে নামছি না। খবিশের এই কথা শুনে সবাই এমন টাসকি খায়ছে যে কেউ কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এই স্বপ্ন দেখছি। মুন্নির এই মার্ডার কেইস থেকে খবিশ কিভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি বাইর করতেছে। অথচ মা, সুমি আন্টি, সাদিয়া আন্টি সবাই মিলেও বছরে এত টাকা বেতন পায় না। মা আমার চিকিৎসার জন্যে কতই না কষ্ট করছে। আর খবিশ এত টাকার মালিক, বাপকে তো এক হাজার টাকা দেয়ার মুরোদ নাই! মা-ই শেষ পর্যন্ত দুই হাজার টাকা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছে একটা চিৎকার দিয়ে দালানটা ফাটিয়ে দিই। কাউকে কিছু না বলে বিছানা থেকে উঠে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলাম। বাথরুমে ঢুকে খবিশের মুখ বরাবর মুতে কিছুটা ঠাণ্ডা করলাম নিজেকে। কিন্তু মুতা শেষ হলে কী করবো চিন্তা করতেই মেজাজটা আবার খিঁচে উঠলো। নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠলাম, মুন্নি, পানি দে।
চিৎকার শুনে মা দৌড়ে আসলো। কী হয়েছে বাবা?
-কী হয়েছে?
-আমি মুতবো।
-হ্যাঁ, মুতো।
-আমি মুতছি।
-ঠিক আছে ভাল করেছো। আর কিছু করবে?
-জানি না, বলে আবার কাঁদতে শুরু করি।
মা আমাকে কোলে নিয়ে সোজা বেডরুমে ঢুকে যায়। এই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমে না গিয়ে যেন বেঁচে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আসে সুমি। এসেই দুষ্টু-দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে, হে যুবক, বাথরুমে গিয়েও মাকে ডাকা লাগে? কয়দিন পর বউকে ডাকা লাগবে।
আমি আবার আম্মু বলে হাফ চিৎকার দিতেই সুমি বলে ওঠে, আচ্ছা আচ্ছা, আর বলবো না বাবা, ঠিক আছে। আমি এই গেলাম। বলে খাটের এককোনায় বসে পড়ে।
-মা, মুন্নির সাথে কী উনার দেখা হয়ছে?
মা আমার প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। বুঝতে পারে না আমি কী বলছি। আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকায়। আমি আবার বলি, মুন্নিকে কি পায়ছে? এবার মা বুঝতে পারে এবং বলে, না, পায়নি। লাশ নাকি কাটাছেঁড়ার পরপরই কঙ্কাল বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দিছে।
তাহলে এখন উপায়? আমার এই অসহায়ের মতো প্রশ্ন মাকে কতটা ছুঁতে পারলো বোঝা গেল না। মা বললো, তুই এইসব নিয়ে চিন্তা করিস না। মুন্নি মরে নাই, ও চলে আসবে। বারান্দায় কে যেন পাথরের সাথে বেঁধে একটা চিরকুট ঢিল মেরেছে। তাতে লেখা, আপা আমি ভাল আছি। চিন্তা কইরেন না। ইতি মুন্নি।
জানলাম, খবিশ এই চিরকুট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। অনিচ্ছা সত্তে¡ও ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলাম। অন্তত ওদের কথা তো শোনা যাবে।
ওদের কথা শুনতে আসলাম, আর ওরা বলছে, উঠবে। খবিশই সবার আগে উঠতে চায়। রাতের খাওয়াও খাবে না। ওর অনেক কাজ। মহা ব্যস্ত ধান্ধাবাজ! ওর কি সময় আছে এত কথা বলার! ওকে আমি তো একেবারেই পছন্দ করি না। কিন্তু ওর কথা শুনলে আমার লাভ আছে। অন্তত মরে যাব বলে দুঃখ লাগবে না। আমার নিজেরও মনে হয়, মা আর মবিন সাহেব ছাড়া, এখন অবশ্য সাদিয়া আন্টির কথাও বলা উচিৎ, ওরা ছাড়া সবাই ধান্ধাবাজ। এমন একটা দুনিয়াতে যত কম দিন থাকা যাবে ততই মঙ্গল।
খবিশ উঠে চলে গেল কিন্তু তার কথা আর কাজের রেশ এখনও কাটেনি মা আর তার বান্ধবীদের থেকে। ওরা কি চিন্তা করছে, হায়, এমন একটা বয়ফ্রেন্ড হলে তো আর কিছু লাগে না? যেমন আছে ক্ষমতা, তেমন টাকা হাতিয়ে নেয়ার বুদ্ধি। সুমি নিশ্চয় গোপনে যোগাযোগ করা শুরু করবে? মা কি আবারও খবিশকে বাসায় জায়গা দেবে? যেভাবে আসা শুরু করছে! মুন্নিও নাই, আমাদের এই বিপদের সুযোগে খবিশ আবার ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু ও এখন আসবে না, ওর তো এখন অনেক টাকা। ও কি এখন আর নিজে রান্না করে খাবে! ও খাবে বড় বড় রেস্টুরেন্টে। থাকবে বড় বড় হোটেলে। ওর ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা। এখন মা ওকে অনুরোধ করলেও থাকবে কিনা সন্দেহ। না থাক, তুই জাহান্নামে যা! আমাদের টাকার দরকার নাই।
এরই মধ্যে খবিশ উঠে দরজার কাছে গিয়েও আবার ফেরত আসে। মাকে ডেকে গোপনে কী যেন বলে। মাকে চিন্তিত মনে হয়। ও চলে গেলে এখন আবার তিনকন্যা নানা বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসে। কিন্তু আমার ওদের কথা শুনতে কেন যেন মেজাজ খারাপ হচ্ছে। আমি বসে থাকতে পারছি না। চোখ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মা আমার অবস্থা দেখে এসে পাশে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকে। আমি মনে মনে বলি, তুমি কেন সুমিকে বলো আমার পাশে এসে বসতে? সুমি আজকাল আর আগের মতো খেলে না! ও কি আমার উপর মাইন্ড করলো? কেন মাইন্ড করবে? আমি তো এমন কিছুই করিনি যে মাইন্ড করবে। মা বলে, তোরা চেয়ারগুলো টেনে এদিকে এসে বোস, আমি একটু রান্না বসাই। সবারই তো খেতে হবে, নাকি?

মা উঠে রান্না করতে যায়। আর সুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। আমার কিচ্ছু ভাল্লাগে না। সুমি আমার মাথায় হাত দেয়, গায়ে হাত বুলায়। তারপর বলে, আচ্ছা, বাবুর শরীরটা কী একটু গরম-গরম?
মা একদম চমকিয়ে জিজ্ঞেস করে, তাই নাকি? দেখ তো, দাঁড়া থার্মোমিটারটা আনি। দেখ তো, কী অবস্থা! সকাল থেকে তো খালি কান্নাকাটি করছে। আমি ভাবলাম মুন্নিকে নিশ্চয় মিস করছে তাই। ঠিক করে তো আর বলতে পারে না। শুধু বলে যে, খারাপ লাগে।
মা থার্মোমিটার এনে সুমির হাতে দিলো। সুমি থার্মোমিটার আমার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বসে থাকলো আরো কিছুক্ষণ। তারপর বের করে বলে, হ্যাঁ রে, একটু জ্বর জ্বর ভাব।
-কত?
-এই বেশী না, একশো।
-আল্লা, এর মধ্যে আর ছেলের কোনো ঝামেলা দিয়ো না। এমনিতেই আমি মনে হচ্ছে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে যদি আবার বাবুর কিছু হয়! ক, কেমন লাগে?
-শোন, ওকে খাইয়ে একটা পেনাডল দিয়ে শুয়ায়ে দে। তারপর আমরা যা করার করবোনে। প্রয়োজনে হোটেল থেকে খাবার এনে খেয়ে নেব।
মা তাই করে। খাওয়ায়ে-দাওয়ায়ে ওষুধ দিয়ে আমাকে নিয়ে শুয়ে পড়ে। সাদিয়া আর সুমি আন্টি মার বিছানার দুই পাশে বসে গল্প করে। আমি গল্প শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে গেছি টের পাইনি। যখন ঘুম ভাঙ্গে দেখি মা ফোনে কথা বলছে। ‘সাগর’ শুনে বুঝলাম, খবিশ। এখন কি ও আসবে? মা ফোন রেখে আবারও শুয়েই থাকে। কিন্তু আমি আর শুয়ে থাকতে পারছি না। আবার কান্না শুরু করলাম। মা উঠলো, লাইট জ্বালালো। দেখে, আমি ঘেমে একদম ভিজে গেছি। মা একটা গামছা এনে আমার সারা গা মুছে দিলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে খবিশ আসে। মাকে কেন এত অতঙ্কিত মনে হচ্ছে জানি না। খবিশ একটা ব্যাগ মার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, এখন আমি আর বসবো না, কাল ফোন করবো। আর শোনো, আমাকে আর পুরনো নাম্বারে পাবে না, আমি নতুন নাম্বার দিবো সকালে; চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে; ওসি কথা দিয়েছে সে মুন্নিকে খুঁজে বাইর করবে, বাই বাই।
বলার সময় মাকে জড়িয়ে ধরলো। মা যেন পাথরের মূর্তি। ব্যাগটা এক সেকেন্ড হাতে রাখতে পারলো না। সাথে সাথে ফ্লোরে। কী এত ভারি? ও কি ব্যাগে করে টাকা নিয়ে আসছে নাকি! খবিশ চলে যাওয়ার পরও মার চেহারায় আতঙ্কের ভাব যাচ্ছে না। মা স্টিলের আলমিরা খুলে ব্যাগ ঢোকায়। তালা-টালা দিয়ে আবার কী মনে করে খুলে ব্যাগ বাইর করে। এবার খাটের নীচে রাখে। কিছুক্ষণ পর আবার উঠে খাটের নীচ থেকে বাইর করে একটা ছালার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে আবার খাটের নীচে রাখে। আবার উঠে খাটের নীচ থেকে সেটা বাইর করে রান্না ঘরে নিয়ে রাখে। মার এই ছটফাটানি শেষ হওয়ার আগেই মৌলবী সাহেব মসজিদের মাইকে ফুঁ দেয় আজান দেওয়ার জন্যে।

 

২১তম পর্ব:
চোখ খুলে দেখি চারদিক আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। মা কি জানে ঘরে যে আগুন? আমি চোখ পুরোপুরি না খুলেই বলি, মা, এত আগুন কেন? মা মনেহয় পাশেই ছিল। বলে, না বাবা, আগুন তো নাই। অনেক সুন্দর রোদ উঠেছে, দেখো দেখো! আমি চোখ একটু খুলতেই তা পুড়ে যাওয়ার দশা, আমি তো রোদের মধ্যে কোনো সৌন্দর্য দেখি না। চারদিকে এত আলো কেন? পাশে দণ্ডায়মান একজনকে দেখে চিনতে পারি, আরে উনি তো মবিন সাহেব। ডাক্তার সাহেব কখন আসলো? তাহলে কি তাকে দেখেই সূর্য এমন চেতে উঠলো? কিন্তু, উনাকে দেখে তো কারো চেতে ওঠার কথা না! তাহলে কি খুশিতে এমন ঝলমল করছে? কিন্তু সূর্য কি বোঝে না যে ওর এই ঝলমলে আলোতে আমার চোখের বারোটা বেজে যাচ্ছে? আমি তো তাকাতেই পারছি না। সারারাতও চোর আর তায়েবদারের লুকোচুরি খেলার কারণে ঘুমাতে পারিনি। এখন ঘুম নাই, কিন্তু চোখ খুলতে পারছি না। শুয়ে শুয়েই মনে করার চেষ্টা করছি, মা আর খবিশ মিলে সারারাত ধরে কী কী করেছে। দেখি খুব একটা মনেও করতে পারছি না। শুধু মনে হচ্ছে খুব ভয়ঙ্কর একটা রাত পার করলাম। এখন ওঠার কিঞ্চিৎ চেষ্টা করতে গিয়ে দেখলাম শক্তি-সামর্থ্য কোনোটাই আমার নাই।
এরই মধ্যে ডাক্তার সাহেব মাকে যেন কী বলছে, উনার গমগমে গলার আওয়াজ মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে আসছে। কিন্তু আমি টের পাচ্ছি, উনি কিন্তু আমার পাশেই দাঁড়ানো! বুঝিনা এত সকালে কেন উনি এসে উপস্থিত! আমাদের কি নিতে এসেছে? উনি বিছানার কাছে আসে, এসেই ডাক্তারি কায়দায় হাত দেখে, চোখ দেখে বলে, দেখি বাবু জিহবাটা দেখাওতো। আমি চোখ না খুলেই দেখাই। উনি বলে হুম, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবে একবার আবার সবকিছু চেক করা দরকার। আজ একবার তালুকদারের কাছে যাও। বাবু, তুমি কি আর একটু ঘুমাবে? ঘুমাও, ঘুমালে শরীর নিজেই ঠিক করার সময় পাবে। এই বলে উনারা ড্রয়িং রুমে চলে গেল।
গিয়ে বেশ খোশগল্পে মেতে উঠলো। আমি বুঝছি ওরা কথা বলছে, কিন্তু কী কথা হচ্ছে তা শুনতে পারছি না। কী ব্যাপার, আমার বাদুরের কান কি নষ্ট হয়ে গেল? হঠাৎ জোর করে তাকাতে গিয়ে দেখি কারেন্ট চলে যাওয়ার দশা। পুরা দুনিয়া যেন অন্ধকারের পেটে চলে গেল নিমিষে। আমি মাথা তোলার চেষ্টা করছি, কিন্তু উঠে যাচ্ছে পা। এরই মধ্যে মা এসে আমাকে ধরে। আমি বলি, মা, আমার মাথা কেন নীচের দিকে? মা বলে, না বাবা, তোমার মাথা ঠিকই আছে। নীচের দিকে না। ডাক্তার সাহেব গমগম করে বলেন, ওকে একটা বাড়তি বালিশ দাও। মা দেয়, তাও আমি বলি, না, আমার মাথা নিচের দিকে, পা উপরের দিকে। মা এবার আমাকে উঠিয়ে বসায়। তাতেও কাজ হয় না। আমার মনে হচ্ছে আমি সিলিংয়ে ঝুলে আছি। আমি আবারও বলি মা আমার পা উপরে। আমি আতঙ্কে গোঙাতে থাকি। মনে হচ্ছে মা কাঁদছে। মা আর ডাক্তার সাহেবের ভাঙা ভাঙা কিছু শব্দ মনে পড়ছে। গত রাতে . . . মুন্নি হারিয়ে . . . ফেরৎ . . . আসে . . . জ্বর আসে . . . কেমন যেন ভয় করে . . .
আমি বুঝছি মা কান্নাকাটি করছে। খবিশ, মুন্নি, ডাক্তার সাহেব সবার উপস্থিতিতে আমি মরে যাচ্ছি! মা অমন দৌড়াচ্ছে কেন? মুন্নি শয়তানের বাচ্চা বড় বেশী জোরে কথা কয়! সবার কথারই শুধু আওয়াজ বোঝা যায়, কথা বোঝা যায় না। সবাই এত জোরে কথা বলে কেন? মাকে দেখি টিভির রিমোট হাতে নিয়ে সবাইকে হঠাৎ করে মিউট করে দেয়। তাতে আমি খুশিমনে মৃত্যুর দিকে আগাতে থাকি।
মা কাঁদছে। আর দৌড়াদৌড়ি করে কী কী যেন করছে আমার জন্যে। আমি মরে যাচ্ছি। এটাই আমার প্রথম মৃত্যু না, এর আগেও আমি বহুবার মরছি। আবার হাসপাতালে গিয়ে ঠিক হয়ে বাসায় চলে এসেছি। এবারের মৃত্যু বরং আমাকে একটা বাড়তি সুযোগ এনে দেবে বলে মনে মনে ভাবি। মরার পর আর-একটা কাজ করার চেষ্টা করবো, সেটা হলো মুন্নির সাথে দেখা করা। কিন্তু ওর ঠিকানা তো নাই আমার কাছে। যা-ই হোক, ঠিকানা লাগবে না। হাসপাতাল আর কত বড়! গতরাতেই তো ওর সাথে কথা হলো, ও তো হাসপাতালেই শুয়ে ছিল!
মা মনে হয় এখনও কাঁদছে, নাকি দৌড়াচ্ছে আর কাঁদছে? মার দৌড় আর কান্না কি কোনদিন শেষ হবে না? আমার আশেপাশে এত মানুষ কেন? আমি কি হাসপাতালে? সেই দজ্জাল মহিলা দেখি কাচের জার নিয়ে আবার আসছে আমাকে বন্দী করার জন্যে। এবার আসলে সত্যি সত্যি ওর মুখে আমি পেসাব করে দেবো।
মহিলার সাথে দেখি তালুকদারও চলে এসেছে। আমি চোখ খুললাম। তালুকদারকে দেখে বেশ ভরসা পাচ্ছি। লোকটা কিন্তু জোস। মানুষকে গালি দিতে পারে বেশ। আমার শুনতে মজা লাগে।
এসেই দজ্জাল মহিলার ট্রে থেকে কী নিয়ে যেন আমার হাতে লাগালো। লাগিয়ে একটু নীরবতার পর শুরু করে তার শাশ্বত বক্তৃতা। এবার মনে হলো কানটা আগের মতোই ঠিক হয়ে গেছে।
-প্রেসার ঠিক আছে। সাধারণ মানুষের মতোই, কিন্ত হার্ট এত দুর্বল যে এই প্রেসারই নিতে পারছে না। ফার্মের মুরগীর অবস্থা। ফার্মের মুরগী ধমক দিলে হার্টফেল করে মারা যায় জানেন তো? বৃষ্টি-বাদলের দিনে ঠাডা পড়লে, এমনকি মেঘের গুড়গুড় শব্দটা যদি জোরে হয তাতেও ৫-১০টা মুরগী হার্টফেইল করে মারা যায়। তখন খামারীরা ছোরা নিয়ে রেডি থাকে জবাই করার জন্যে। তাদের আউটপুটই তো আমরা, নাকি? হার্ট শক্ত হবে কোত্থেকে? অপেক্ষা করেন আর দশটা বছর! হাইব্রিড খাবার আর ফর্মালিনসহ নানারকম পয়জোনাস কেমিকেলের ইফেক্ট তো এখনও শুরু হয় নাই পুরোপুরি! এখনও ট্রায়াল চলতাছে! কয়দিন পর দেখবেন আসল মৃত্যু! পঙ্গপালের মতো ঝাঁকে-ঝাঁকে মানুষ মরবে! কারো বোঝার সাধ্য থাকবে না, মানুষ, নাকি মশামাছি মরে! অবশ্য জ্ঞানীগুণী লোকজনও বলে, নেচার নাকি নিজেই একটা ব্যালেন্স করে তার নিজের জন্যে। এই যে দেশে এত কোটিকেটি মানুষ পয়দা করে বসে আছেন, তার তো একটা সমতা আসতে হবে নাকি? সমতা তো আর একপথে আসবে না, আসবে নানা পথে। এই যেমন ধরেন, অপঘাতে মৃত্যু, মহামারী, প্লাবন, সাইক্লোন, খরা। তাতেও যদি ব্যালেন্স না হয় তো মানুষ নিজেই মারা শুরু করবো। কেউ কেউ জেনে, কেউ কেউ না জেনে। এই যে হাইব্রিড আবিষ্কার করছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়াররা, এরা তো আবিষ্কার কইরা মহা খুশি! মহৎ কাজ একখান কইরা ফালাইছে! দুনিয়ার মানুষ আর না খায়া মরবো না! খোদার উপর তোয়াক্কারী? বুঝবো নে মজা! মানুষের কথা কী কমু, আমি নিজে বড় ডাক্তার, কোনো গ্যারান্টি আছে? যে-কোনদিন মরে যেতে পারি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাপের সাধ্য আছে কেউরে বাঁচায়, যদি আজরাইল আইসা হাজির হয়? আর কি কমু কন? আজরাইলও চেনে খালি বাংলাদেশ! অবশ্য আজরাইলরে দোষ দিয়া লাভ নাই। আমরা নিজেরাই উনার জন্য লাল গলিচার ব্যবস্থা কইরা রাখছি। আল্লাও গরীব মাইরা খুব মজা পায়!


তালুকদার আজ মনে হচ্ছে বেশী চেতা। নিশ্চয় বউয়ের পেদানি খাইয়া আসছে। লোকটার ফ্যামিলিতে মনে হয় ভালই সমস্যা চলতেছে। উনি দেখা হলেই বউ-বাচ্চার গল্প শোনায়। গতবার দেখা হওয়ার পর শুনিয়েছিল তার ছেলের গল্প। সে এখন আর ইরাকযুদ্ধের খেলা খেলে না। যুদ্ধ তো শেষ। আমেরিকার বিজয়। এখন সে গুয়ান্তামো প্রিজনসেলে বন্দীদের টর্চার করা ও সেখান থেকে পালানোর খেলা খেলে। একবার আমেরিকান পুলিশ সেজে জিহাদিদের টর্চার করে, আবার জিহাদি সেজে প্রিজনসেল থেকে পালানোর চেষ্টা করে। যদি সাকসেসফুলি পালাতে পারে তো গেইম উইন। না পারলে আবার খেলো, খেলা চলতেই থাকবে আনটিল উইন। তালুকদারের কথা শুনতে শুনতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি।
খবিশ, সাদিয়া আর সুমি আন্টি সবাই খালি হাসে। উনাদের হাসির যন্ত্রণায় মনে হচ্ছে ঘুমাতে পারবো না। হাসির সময় সুমি আন্টির কাপড় গলে উনার গেøাব সাইজের তুতুন দুইটা বাইর হয়ে আসতে চায়। আমার চোখ পারতপক্ষে সেই দিকে যায় না। আবার কোনো কোনো সময় শয়তানের ইশারায় চোখের মণি দুইটা অটোমেটিক বাঁকা হয়ে উনার তুতুনের দিকে চলে যায়। মা তো এই কয়েকদিন আগেও আমাকে তুতুন খাওয়াতো।  এখন আর খাই না। মা বলেছে, বড় হয়ে গেলে আর তুতুন খেতে হয়না। কিন্তু সুমি আন্টির তুতুন মনে হয় খাওয়ার চায়তে ছুঁয়ে দেখতে ভাল হবে। মাঝে-মধ্যে আমার হাত উনার তুতুনের দিকে চলে যায়। আর সুমি আন্টিও কেমন জানি খালি আমারে জড়ায়ে ধরে উনার তুতুনের সাথে চেপে ধরে। একদিন তো আমারে আদর করতে গিয়া দম আটকায়ে মেরে ফেলার দশা হইছিল। আমি লজ্জায় মাকে বলিনি। কিন্তু শ্বাস নিতে পারছিলাম না। উনি যেভাবে চেপে ধরে তো কবে জানি দম আটকাইয়া মরে যাই! আবার মজাও লাগে, নরম তুলতুলে তুতুনের সাথে নাক-মুখ ঘষা লাগলে আমার কেমন যেন গা শিরশির করে, কাঁটা দিয়া উঠে। আমি তখন টিভির দিকে বেশী করে মনোযোগ দিই। কিন্তু উনি আমার সাথে ঘষাঘষি করতেই থাকে। আমি যতই উনার কোল থেকে বাইর হইতে চাই, উনি ততই জোরে আমাকে চেপে ধরে। কী মুসিবত! উনি কি বোঝে না, নাকি বোঝে বলেই আরো বেশী বেশী করে?
সুমি আন্টির তুতুনে মুখ চাপা থাকলেও নাকে কিন্তু পাউডারের গন্ধের বদলে স্যাভলনের গন্ধই বেশী লাগছে। চোখটা একটু খুলতেই দেখি সাদা ধবধবে বালিশে আমার মাথা। আমি কি মরে গেছি? মরে গিয়ে মুন্নির হাসপাতালে চলে এসেছি? কখন এলাম? মুন্নির কথা মনে হতেই চোখ পুরোপুরি খুলে দেখি সম্পূর্ণ অচেনা একটা বাসায়। না, এটা আমি চিনি, হাসপাতালের রুমে শুয়ে আছি। প্রথমে আমার জায়গাটা অচেনা মনে হলেও এখন আমি বুঝে গেছি এটা অজেনা জায়গা না। আমি কবে আসছি জানি না, তবে হাসপাতাল আমার চেনা। জন্মাইছি যেখানে সেই জায়গা চিনতে কি আর ভুল হয়? আশেপাশে চোখ ঘুরাতেই দেখি মা, খবিশ আর সাদিয়া আন্টি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। উনাদের আমার দিকে কোনো খেয়াল নাই। খুব হাসিখুশি আর কলবল করে কথা বলছে তো বলছেই। আমিও দেখছি তো দেখছিই। উনাদেরকে বলার আসলে আমার কোনো কথা নাই। আমি খুঁজছি মুন্নিকে। সেদিন রাতে মুন্নি যখন ভিডিও কল করেছিল তখনও কিন্তু এমনই একটা রুমে সাদা ধবধবে বিছানায় ওরে শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম। মুন্নি কি কল করেছিল? নাকি আমি স্বপ্নে দেখছি? কিছুই তো মনে করতে পারছি না! আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ও আমার আশেপাশেই আছে। আমি ডানপাশ-বামপাশ দুইপাশেই দেখলাম, কিন্তু দুইপাশেই সাদা কাপড় দিয়ে বেড়া দেওয়া। পর্দার ঐ পাশে মানুষ আছে আন্দাজ করা যায়, কিন্তু কে আছে তা বোঝা যায় না। এইভাবে কতক্ষণ মুন্নির চিন্তায় ছিলাম জানি না। এর মধ্যে মা এসে হাজির। মাকে কেন যেন খুশি খুশি মনে হচ্ছে। আমি হাসপাতালে আর মা খুশি খুশি, মার চরিত্রের সাথে তো তা মেলে না! তাহলে কি মুন্নির কোনো ভাল খবর পেয়েছে? মাকে কি জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে? আমি কথা বলার আগেই মা কথা বলা শুরু করে।
-বাবু, তুমি উঠছো? এখন কি একটু ভাল লাগছে? আমরা মনে হয় আজকে বাসায় যেতে পারবো।
আমি জিজ্ঞেস করি, মা, আমি হাসপাতলে কেন? মুন্নি কি এই হাসপাতালেই থাকে? মা আমার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসে, কিন্তু কোনো কথা বলে না। মুন্নির প্রসঙ্গ উঠলেই মা হাসে। কোনো কথা বলে না। আমি আবারও বলি, আমি এখানে কখন আসছি?
-আমরা গতকাল আসছি, বাবা। তুমি তো খুব অসুস্থ হয়ে গেছিলে। তাই বাবা বললো তাড়াাতড়ি হাসপাতালে নিয়ে আসতে, তখনই দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম। এখন আল্লার রহমতে ভাল। আমরা আজই বিকালে বাসায় চলে যাব।
-মুন্নি কি এই হাসপাতালে, মা?
এবার মা আর হাসে না। বরং মুখে একটা দুশ্চিন্তার প্রলেপ দিয়ে আমার দিকে তাকায়। বলে, বাবু সোনা আমার, তুমি কোনো চিন্তা কোরো না, মুন্নি চলে আসবে।
-তুমি কিভাবে জানো?
-হ্যাঁ বাবা, আমি জানি। ও আবার এসএমএস পাঠিয়েছে। ভাল আছে। বলেছে চিন্তা না করতে, ও আসবে তোমার সাথে দেখা করতে।
মা কথাগুলো বলে আর আমার বিছানাটা একটু ঠিকঠাক করে দেয়। মার কথা শুনে কেন যেন মনে হচ্ছে মা যা বলছে তা সত্যি কথা না। মুন্নি তো মরে গেছে, না হয় হাসপাতালে শুয়ে আছে। ও কি চাইলেই আসতে পারবে? ডাক্তার কি ওরে ছাড়বে নাকি? যে শয়তান হারামি ওগুলা! ওকে মেরেই ফেলবে! আমার এই চিন্তার মধ্যেই খবিশ আসে, সাদিয়া আন্টি আসে। কিন্তু সুমিকে দেখছি না কেন। ও কই?
খবিশ এসে আমার দিকে তাকায় কিন্তু কিছু বলে না। মাকে বলে, আমি তাহলে যাই। তোমরা ওকে রিলিজ করে বাসায় যাও। আমি পরে বাসায় আসবো।
মা বলে, হ্যাঁ, তুমি যাও। আমরা মনে হয় বিকালের আগেই বাসায় যেতে পারবো।
মা আমাকে কিছু একটা খাওয়ানোর জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সাথে চলে সাদিয়া আন্টির সাথে গল্প। এতক্ষণ কী নিয়ে গল্প করছিল জানি না। কিন্তু এখন আমাকে নিয়ে কেমন যেন গোপন ভাষায় কথা বলছে। মুন্নির সাথে আমার গভীর প্রেমের কাহিনী বানাচ্ছে দুজন, আর মুচকি মুচকি হাসছে। তাতে আমি খুব লজ্জা পাচ্ছি। মা কেমন যেন দিনদিন শিশু হয়ে যাচ্ছে, আর আমি হয়ে যাচ্ছি বড় মানুষ। মা আর সাদিয়া আন্টি আমি জ্বরের মুখে কী কী বলছি তা নিয়ে মজা করছে। দুজনই চাপা হাসি হাসছে। মন খুলে হাসতে পারছে না আমার ভয়ে, যদি আবার চেতে যাই। আকারে-ইঙ্গিতে বলছে। এবার মুন্নি ফেরত আসলে নাকি আমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবে। এই কথা বলে মা হেসে কুটিকুটি। মার কি কাণ্ডজ্ঞান লোপ পাচ্ছে! আমার কাণ্ডজ্ঞান গজাচ্ছে আর মার কাণ্ডজ্ঞান বুড়া হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন যা যা বললে লজ্জা পাই, মা তাই অবলীলায় বলে যায়। মুন্নিকে আমি মিস করি ঠিক। তাই বলে তো ওকে আমি বিয়ে করতে চাই না। কোনো মেয়েকেই আমি বিয়ে করতে চাই না। আমার কি বিয়ের বয়েস হয়েছে নাকি? মার যতসব দুষ্টামি! মুন্নি লাপাত্তা হওয়ার পর অফিসেও যাচ্ছে না। তাতে দুষ্টামির পরিমাণ যেন আরো বেড়ে গেছে। বিশেষ করে আজ কিন্তু বেশী বেশী করছে। কপালে মনেহয় দুঃখ আছে। অফিসে যে কবে যাবে কে জানে! বসকে ফোন করে বলে দিয়েছে মুন্নির লাপাত্তার কথা। রিলাইয়েবল কাউকে খুঁজছে। পেলেই কাজ শুরু করবে। আমি অবশ্য মার এই আইডিয়ার সাথে একমত না। রিলাইয়েবল আবার কী? মানুষ আবার রিলাইয়েবল হয় নাকি? মুন্নি কি রিলাইয়েবল ছিল, বা খবিশ?
চলবে।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা