নতুন বছরের অঙ্গীকার -শিল্পী রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  

কি পেলাম না সেটা থাক,
বরং কি পেলাম চলুন তার হিসেবে করি।
বছরের শেষ দিনটা এলে খুব ঘটা করে পেছন ফিরে দেখবার একটা সুযোগ আসে। রিফ্লেকশনের সময়। গত বছরটা কেমন গেলো, কি শিখলাম, কি পেলাম ইত্যাদি।
একজন আমাকে বললো, ২০১৯ এর কাছে সে খুব ঋণী হয়ে থাকবে, কারণ এই বছরটা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। যেটাকে তার সীমানা ভেবে নিশ্চিন্তে বেঁচে ছিল সারাজীবন, সেই সীমানাতে হঠাৎ করেই ঘুর্নিঝড়ের দাপটে থমকে গিয়েছিলো সে কিছুদিনের জন্য। সেই সীমানাতে দাঁড়িয়ে বুঝেছে এবং শিখেছে কিভাবে নিজের সীমানাকেও পুনর্বিন্যাস করা যায়। অন্যকে তার অবস্থানে রেখে এবং বুঝে, তাকে ক্ষমা করে দিয়ে নিজের শান্তি রক্ষা করা যায়। সে বললো, জীবন প্রথম এতো বড় ধাক্কা খেয়েছে সে এবং জীবনে প্রথম অনেক বেশী শক্ত হয়ে দাঁড়াতে শিখেছে। এটাই বেড়ে ওঠা। নিজের অবস্থান থেকে আরেকটু সামনে এগিয়ে যাওয়া। জীবনে চলতে চলতেই জীবনের শিক্ষা নিয়ে নেয় মানুষ। এটাই সঞ্চয়।
আমরা কেউ অন্যের ব্যবহার বা তাদের বিচার বিবেচনার পরিধি পরিবর্তন করতে পারবো না। যা আমরা পরিবর্তন করতে পারবো না, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই তা আমাদের ছেড়ে দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আমরা সবাই জীবনের কোন না কোন সময়ে এমন অবস্থানে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করি। আমার নিজেরও খুব কঠিন কতোগুলো জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নিয়ে হিমশিম খাবার উপক্রম হয়েছিলো কয়েকবার। অমন একটা পরিস্থিতিতে কি করা উচিৎ, কি করলে আমি আমার জায়গা থেকে সরে যাবো না, আমার আমিত্বকে হারাবো না, সেসব নিয়ে অনেক টানাপোড়েন গেছে নিজের সাথে। নিজের  প্রতি যে বিশ্বাস, তার ওপরেও আক্রমণ এসেছিলো কয়েকবার, প্রচণ্ড ধাক্কায় থমকে যেতে হয়েছিলো। যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছে তাহলো “ ক্ষমা করা এবং ছেড়ে দেওয়া” ফরগিভ অ্যান্ড লেট গো । মনে হয়েছে পারবো না, কয়েকবারই মনে হয়েছে হেরে যাচ্ছি বোধহয়। কিন্তু নিজেকেই অবাক করে দিয়ে বুঝলাম দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে নতুন পথ খুঁজে নিতে শেখে মানুষ, যা কখনো কল্পনাতেও ভাবতে পারেনা। এটা মানুষের সহজাত একটা ব্যাপার যা এমনিতে জানবার উপায় নেই, শুধুমাত্র ওই পরিস্থিতিতেই নিজেকে আবিষ্কার করবার সুযোগ আসে। এটাই গ্রোথ। এই বেড়ে ওঠাটা অন্য কোনভাবেই সম্ভব হয়না। তাই এই ধরণের পরিস্থিতি আমাদের জীবন শেখাতে সাহায্য করে। আমরা নিজেরা আমাদের ক্ষমতার বিশ্বাস রেখে যে কোন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারি। এটা সম্ভব।

Marianne Williamson এর একটি উক্তি আমাকে অসম্ভব রকমের সাহস এবং শক্তি দেয়ঃ “Our deepest fear is not that we are inadequate. Our deepest fear is that we are powerful beyond measure. It is our light, not our darkness that most frightens us. We ask ourselves, who am I to be brilliant, gorgeous, talented, and fabulous? Actually, who are you not to be? You are a child of God. Your playing small does not serve the world. There is nothing enlightened about shrinking so that other people will not feel insecure around you. We are all meant to shine, as children do. We were born to make manifest the glory of God that is within us. It is not just in some of us; it is in everyone and as we let our own light shine, we unconsciously give others permission to do the same. As we are liberated from our own fear, our presence automatically liberates others. “। খুব শক্তিশালী কথাগুলো, এর সত্যতা ভাবতে গেলে শিউড়ে উঠতে হয়।

২০১৯ থেকে নেওয়া শিক্ষা সারাজীবনই কাজে লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস। বেশী দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু ভাবুন নতুন বছরের জন্য কি ভাবছেন?
ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা ভালো, সেই সাথে বড় কোন লক্ষ্যও থাকতে পারে। অথবা বড় কোন লক্ষ্যকে ছোট ছোট ধাপে সাজিয়ে নেওয়া যায়। এরপর একটা একটা করে সেই ছোট ছোট লক্ষ্যগুলোকে জিতে নেওয়া সহজ হয়। এই দুটো পদ্ধতিই সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে আমাদের।
এবার ফিরে তাকান ২০১৯ এর দিকে, নিজেকে ছোট বা বড় সব ধরণের প্রাপ্তির জন্যে অভিনন্দন জানাতে ভুলবেন না। একটু ভাবলেই উপলব্ধি করতে পারবেন, কৃতজ্ঞবোধ করবার মতো অনেক কিছুই আছে আমাদের। জীবন একটাই, তাই এটাকে সেলিব্রেট করবার সময়ও এটাই। সেলিব্রেট করবার অর্থ বলতে পার্টি করার কথা বলছি না। কৃতজ্ঞতাবোধ। প্রাপ্তির পর তৃপ্ত হওয়া, নিজেকে বাহবা দিয়ে নিজের পিঠ চাপড়েও সেলিব্রেট করতে পারেন, ভালো কোথাও ডিনার করতে পারেন, কিংবা কোথাও ঘুরতে যেতে পারেন অথবা আপনার পছন্দের কিছু।
ভেবে বের করুন আপনি কি পেয়েছেন গত বছরে? নতুন কি শিখেছেন ?
কোন সময়ে মনে হয়েছে আপনি খানিকটা বেড়ে উঠেছেন অর্থাৎ আপনার গ্রোথ হয়েছে ?
কোন বিষয়ে আপনি অনেক বেশী কৃতজ্ঞ ? কোনো কিছু না করেই যেটা পেয়েছেন সেটাতে? নাকি অনেক কষ্ট করে যেটা অর্জন করেছেন সেটাতে?
আপনি কিভাবে এ বছরের সফলতাকে আগামী বছরে ব্যবহার করবেন? অথবা এ বছর থেকে শিখে নেওয়া জ্ঞানকে আগামীতে কাজে লাগাবেন?

• এবার ভাবুন, আপনার তিনটি শক্তি কি কি? সেই শক্তি দিয়ে আপনি কি করবেন ২০২০ এ?
• একটা শব্দ বা বুলি (ফ্রেইস) বলুন যা দিয়ে আপনি আপনার শক্তির দিকে মনোযোগ বা ফোকাসটা রাখতে পারেন, যেটা আপনার ২০২০ এ সাহায্য করতে পারে। যেমন , “ Can do” , “আমি নিজের শান্তির জন্য হলেও ক্ষমা করতে পারি “।
• আপনার ছোট ছোট সফলতাগুলোকে সেলিব্রেট করুন
• যখন কোন কারণে সংশয় বা ডাউট হবে, প্রকৃতির কাছে চলে যাবেন। প্রকৃতি হচ্ছে সবচেয়ে বড় চিকিৎসক বা হিলার।
আর আমাদের জীবনের বিশাল অংশ জুড়ে যার যার নিজস্ব প্রার্থনা তো আছেই। সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসীরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করুন, মেডিটেশন করুন, হাঁটতে যান ভালো লাগবে।
যখনই মনে হবে আপনার শান্তির জায়গাটা এলোমেলো হচ্ছে তখন রিলাক্স করতে চেষ্টা করুন। নিজের ভেতর থেকে অস্থিরতাকে দুর করতে হৃদয় উন্মুক্ত করুন। অন্যের কাছ থেকে পাওয়া দুঃখ, কষ্ট, অবহেলা বা যে কোন একটা দুর্ঘটনাকে ব্যাক্তিগত ভাবে বা personally নেবেন না, ছেড়ে দিতে বা অর্থাৎ “লেট গো” করতে চেষ্টা করুন দেখবেন আপনার শান্তি আবার আপনার মধ্যেই ফিরে আসবে। যত বেশী হৃদয় উন্মুক্ত করতে পারবেন ততো বেশী ভালোবাসা ঘিরে ধরবে আপনাকে ।

নতুন বছরের শুভেচ্ছা সবাইকে।
তাহলে মুল কথা হলো, কি পেলেন না, তার হিসেব না করে – কি পেয়েছেন তার হিসেব করুন এবং হৃদয় উন্মুক্ত করুন- দেখবেন ২০২০ আপনাকে আরেকটু এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
শুভ কামনা রইলো।

শিল্পী রহমান: গল্পকার, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, কাউন্সেলর ও গবেষক। স্থায়ী নিবাস ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়ায়। কর্মসূত্রে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে।