নারীরা কিন্তু রাষ্ট্রও চালাতে পারে । ইসমত আরা প্রিয়া

  •  
  •  
  •  
  •  

জন্মের পর, ছেলে কি মেয়ে বড় কথা নয়। একজন প্রকৃত বাবা মায়ের কাছে, তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়- তারা তাদের সন্তান।
কিন্তু যখন আমরা বড় হতে থাকি, তখন আমাদের আলাদা একটা পরিচয় হতে থাকে। এ সমাজের কাছে আমরা আলাদা পরিচয়ে বড় হতে থাকি। যাকে বলে নারী-পুরুষ।
তারপর যখন সামাজিক ফাঁদে পা দিবেন, সেখানে গিয়ে আর একটা নতুন পরিচয় দেখবেন, স্বামী-স্ত্রী।
এই ফাঁদের মধ্যে আরো একটি পরিচয় লুকিয়ে থাকে, যাকে বলে জামাই -বৌ।
কি ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় হয় আমাদের তাইনা!
অথচ সৃষ্টিকর্তা আমাদের একই নিয়মে কত যত্ন করে মানুষ বানিয়ে পাঠিয়েছেন।

আসুন এখন সেই সব মানুষের গড়া কিছু কীর্তি দেখি।
এসএসসি পরীক্ষা শেষ না করতেই শুনলাম বান্ধবীর বিয়ে, জামাই সরকারি চাকরি করে। বয়স একটু বেশী তবে সরকারি চাকরিতে ঢাকা পরে গেলো সবটা। গেলাম সেজে গুজে বান্ধবীর বিয়ে খেতে, বর আসতেই সব হুমড়ি খেয়ে পরলো। খাওয়া দাওয়া চলছে, বরের জন্য বিশাল প্লেট, বড় মাছ, মুরগী, খাসির মাথা থেকে শুরু করে সব কিছু দিয়েই সাজানো।
আমি দাঁড়িয়ে জামাইয়ের খাওয়া দেখছি, বেচারা বুঝতে পারছে না কি দিয়ে শুরু করবে। অবশেষে মুরগির পা ধরে এক কামড় দিলো।
বান্ধবীর কাছে গিয়ে বললাম কিরে তুই খেয়েছিস, উত্তরে বললো, আমার আন্টি খাবার আনতে গিয়েছে, একটু পরে খাবো। এই বলতেই একজন ভদ্রমহিলা আসলেন।
একটা প্লেটে ভাতের উপর শুধু একটু মাংস দিয়ে এনে, কোনো মতে ওর মুখে দুগাল ভাত খুসে দিয়েই তিনি চলে গেলেন।
কিন্তু বরের খাওয়া এখনো চলছে। বর খেয়ে হাপ ছাড়া না পর্যন্ত এ খাওয়া চলবেই। এখনো এ সমাজে বিয়ের দিন মানেই বরের প্লেট রেডি করা। শুধু বরই খেতে জানেন। বরেরই খিদে পায়। আচ্ছা বিয়েটা কি শুধু একজন ছেলে করে? নাকি ওখানে একটা মেয়েরও বিয়ে হয়!
তার খিদে পায়না? তার জন্য কি কখনো আয়োজন করে এভাবে প্লেট সাজান হয়? তবে কি এটা আপনাদের নিয়মে নেই?
নাকি এটাকে বলে একটা ছেলে আর মেয়ের বৈষম্য!

শাড়ি পরেও ব্যাট হাতে নিতে পারে নারী।

আবার ধরুন আপনার স্ত্রী খুব যত্ন নিয়ে আপনার জন্য রান্না করেছেন। আপনাকে সামনে বসিয়ে তুলে তুলে কতো ভালবাসায় খাওয়াচ্ছে। আপনার স্ত্রী কিন্তু জানেন আপনি কি খেতে পছন্দ করেন। আচ্ছা আপনার কখনো মনে হয় না, আপনার স্ত্রীর পছন্দের খাবারটা রান্না করে এনে, ঠিক এভাবে বসিয়ে খাওয়াবেন?
ছিঃ মনেমনে ভাবতেই কেমন কাপুরুষ লাগছে তাইনা! পুরুষ মানুষ আবার এমন করতে পারে নাকি। এগুলোতো ওই দাসিবাদী নারীদেরই কাজ। যা আমরা বৈষম্যের খাতায় লিখি নারী-পুরুষ।

কবে যেন এক আত্মিয়ার বাড়িতে গেছিলাম। ঘুম থেকে উঠেই দেখি এক হুলুস্থুল ব্যাপার।
ঘরবাড়ির কোথায় কি আছে খুটিনাটি সব গোছাচ্ছে। সেই বাড়ির সব থেকে ছোট এক সদস্যকে ডেকে বললাম, কি হয়ছে? সবাই এতো কাজ করছে কেন?
সে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো তুমি জানোনা!
-না আমি সত্যি জানি না।
আজ আমার “দুলাভাই “আসবে।
মেয়েটির কথা শুনে আমি হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। কারন আমি মনে মনে ভাবতেই শুরু করে ছিলাম এ বাড়িতে আজ রাষ্ট্রপতি আসছেন।

হ্যা, আপনি জামাই, আপনি মহামান্য রাষ্ট্রপতি আসছেন আর আপনার জন্য জমজমাট ব্যবস্থা থাকবে না এটা তো হতে পারে না।
দুপুরের আয়োজনে আপনার জন্য পোলাও কোরমা থেকে শুরু করে, শেষ পাতে ডেজার্টের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। টেবিল সাজানো থাকবে আপনি শুধু কষ্ট করে খেয়ে নিবেন।
কারন আপনি তো মহামান্য জামাই। দাসত্ব তো করবে শুধু বাড়ির বউ।
সবার খাওয়া শেষ করে তবেই ঘরের এক কোনে বসে খেয়ে নিতে হয় এদের। যাদের এই সমাজ খুব সহসাই বৈষম্য দেখিয়ে বলে ওঠে জামাই -বউ।

প্রশ্ন থেকে যাবে এ সমাজের সেই সব মহামান্য জামাইদের কাছে। আপনি যে আদর যত্ন শ্বশুর বাড়ি থেকে পেয়ে যাচ্ছেন, আপনার বউকে নিয়ে যাবার পরেও কি আপনার বাড়িতে এই একই আয়োজন, একই হুলুস্থুল ঘটে! নাকি এ সমাজে এখনো বৈষম্য চলছে জামাই -বৌ এর!

সময়ের সাথে সাথে যুগ এগোচ্ছে। আপনার মা, তার মা, মা’র দাদি, তার দাদি, তার দাদির দাদি, কি করে গেছেন সে ইতিহাস এখানে টানবেন না। কারন মেয়ে, নারী, বউরা এখন ঘরে বসে শুধু থালবাটি মাজে না। তারা সংসার সামলে, ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে অফিসেও ছোটে। তারা কলম ধরে মেধার খাতায়, নাম লিখতে জানে।
তারা এখন ব্যাট হাতে নিয়ে, বল ছুড়ে মাড়ছে।
এখন তারা অধিকার চেনে, অধিকার নিতে জানে।তারা শুধু আপনাদের সাথে তাল মিলিয়েই কাজ করছে এটা ভাববেন না।
তারা এখন রাষ্ট্র চালাতেও জানে, তাই তাদের কাছে সমাজের এই বৈষম্যের রীতিনীতি, নিয়ম কানুন, যত বিধান, দেখানোর আগে একবার ভালোমতো ভাববেন। যারা রাষ্ট্র চালাতে জানে, তারা চাইলেই এই বৈষম্যের ঠেকনা পিষিয়েও দিতে পারে।

ইসমত আরা প্রিয়া
কথাসাহিত্যিক।
প্রকাশিত গ্রন্থ: নীলপদ্ম (কবিতা), আওয়াজ (উপন্যাস), কান্নাগুলোর প্রার্থনা (উপন্যাস), মিরার নীল শাড়ি (ছোট গল্প)।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments