নীল দরিয়ার নোনা জলে – সাদাত হোসাইন

সম্প্রতি প্রশান্তিকা ও মাসিক মুক্তমঞ্চের আমন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়ায় সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনে এসেছিলেন সাদাত হোসাইন। শুনিয়ে গেলেন তাঁর ‘জীবনের গল্প, গল্পের জীবন’ শীর্ষক আলেখ্য। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই প্রথম ভ্রমণ কাহিনী লিখছেন সাদাত হোসাইন…

 

 

পর্ব-১: বিহঙ্গ-মানব

 

স্থানঃ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা।

নাঈম আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললো, ‘ভাই, ইমিগ্রেশনে ঝামেলা হইলে জানাইয়েন। আমরা বাইরে আছি। যদি এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত যাওয়া লাগে, তাইলে একলা কেমনে যাইবেন এতো রাইতে?’
আমি উৎকণ্ঠিত গলায় বললাম, ‘ঝামেলা হবে কেন? আর এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত যাওয়া লাগবে কেন?’
-‘না মানে, বলাতো যায়না। হইতেওতো পারে। যতই ইনভাইটেশন থাক, আপনের পাসপোর্টেতো ভিসা নাই’!
নাঈমের কথা সত্য। আমার পাসপোর্টে কোন ভিসার সীল নেই। অথচ আমি যাচ্ছি অস্ট্রেলিয়ায়। এই দেশের ভিসা নাকি সোনার হরিণের চেয়েও দামি! তাহলে?
নাঈমকে আমার বিদেশ বিদ্যার ইন্সট্রাক্টর বলা যেতে পারে। পাসপোর্ট, ভিসা, ইমিগ্রেশন, লাগেজের ওজন ও এক্সেসরিজ থেকে শুরু করে এয়ারপোর্টে, প্লেনে কোথায় কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে, তা অবধি আমি ওর কাছে জিজ্ঞেস করি। ও এর মধ্যেই মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ব্যাংকক, হিল্লি-দিল্লি ঘুরে এসেছে। সেই নাঈম যখন আমার ভিসা বিহীন পাসপোর্টে অস্ট্রেলিয়া যাত্রা নিয়ে চিন্তিত, সেখানে আমিতো থরহরি কম্প!
এয়ারপোর্টে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তেও আমি তাই আবারও আমার পাসপোর্ট উল্টে পালটে দেখলাম, নাহ, কোথাও কোন সীল ছাপ্পড় নেই! থাকবে কী করে?আমিতো ভিসার জন্য পাসপোর্টই জমা দেইনি। কেবল কিছু ইনফরমেশন মেইল করে পাঠিয়ে দিয়েছি, তাতেই অস্ট্রেলিয়ার ভিসা? ডাল মে কুছ কালা নয়তো?
এর আগে আমার বিদেশ যাওয়ার অভিজ্ঞতা বলতে কেবল পাশের দেশ ভারত। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে কলকাতা। সেই ভিসা পেতেই গলদঘর্ম অবস্থা। ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়ানো, অসংখ্য তথ্য-উপাত্ত, দলিল-দস্তাবেজ, কাগজ-পত্রসহ পাসপোর্ট জমা দেয়ার সপ্তাহখানেক পরে আবার সুদীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট হাতে পাওয়া। সেখানেও ভিসা পাওয়ার পুরোপুরি নিশ্চয়তা নেই। আর অস্ট্রেলিয়া! ভিসার সীল বিহীন পাসপোর্ট জমা দিলেই হবে ইমিগ্রেশনে?
আমার বিশ্বাস হয়না। বুক ধুকফুক করে। এয়ারপোর্ট, প্লেন, ইমিগ্রেশনে আমার খুব ভয়। সেখানে গেলেই সবকিছু গুলিয়ে ফেলি। আর এবার? এবারতো ভিসার সীলই নেই।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে আমার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন সেখানকার বাংলা পত্রিকা প্রশান্তিকা’র সম্পাদক আতিকুর রহমান ও বার্তা সম্পাদক আরিফুর রহমান। মূলত তাদের আমন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায়ই আমি যাচ্ছি অস্ট্রেলিয়া। সাথে আছে নোমান শামিম-এর আরেক জনপ্রিয় পত্রিকা মুক্তমঞ্চ। তারা আমাকে বারবার নিশ্চিন্ত করছেন, ‘আরে এতো ভয় কিসের?আমরাতো বলছিই যে তোমার ভিসা হয়ে গেছে। এটাকে বলে ই-ভিসা’।
আমি সেই বায়বীয়, অদৃশ্য ই- ভিসা নিয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকলাম।রাত তখন ১০ টা। আমার বুক কাঁপছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হচ্ছে না। তারপরও একজনকে জিজ্ঞেস করে ক্যাথি প্যাসিফিক এর কাউন্টার খুঁজে পেলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, তারা শুধু আমার নাম আর পাসপোর্ট নম্বর জিজ্ঞেস করলেন। আর কিচ্ছু না। তারপর চোখের পলকে হাতে ধরিয়ে দিলেন বোর্ডিং পাস। আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে যাওয়ার আগেই দেখি পেছন থেকে ভিড় ঠেলে একজন এগিয়ে এলেন। তিনি স্মার্ট ভঙ্গীতে চোস্ত ইংরেজিতে কথা বলতে লাগলেন। সেই ইংরেজির বেশিরভাগই আমি বুঝতে পারলাম না, খানিক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে লাইন থেকে সরে দাঁড়ালাম। আমার আর কিছু জিজ্ঞেস করা হলো না।
আমার বুকের ধুকফুকানি আরও বাড়লো। ভেবেছিলাম, কাউন্টারে ভিসার কথাটা জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে নেবো, আসলে ঘটনা কী! কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না। এবার?
এবার ইমিগ্রেশন।
ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইন। ইমিগ্রেশন অফিসার ঠান্ডা, কঠিন চোখে তাকালেন। আগের অভিজ্ঞতায় আমি এবার প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। ইমিগ্রেশন অফিসার কিছু বলার আগেই তড়িঘড়ি করে তাকে পাসপোর্ট আর বোর্ডিং পাস এগিয়ে দিলাম, সাথে ইনভাইটেশন লেটারের ফটোকপিটাও। তিনি অবশ্য অতো কিছু দেখলেনই না।কেবল পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে কম্পিউটারে কিসব খটমট করলেন। তারপর অকস্মাৎ গম্ভীর মুখে হাসির আভা ফুটিয়ে বললেন, ‘কী কনফারেন্সে যান?’
আমি থতমত ভঙ্গীতে বললাম, ‘জ্বি, না। ও হ্যাঁ’।
–       কীসের কনফারেন্স?
–       না মানে, ঠিক কনফারেন্স না’।
–       তাহলে?
–       মানে, গল্প বলতে।
–       গল্প বলতে!’ এবার যেন ইমিগ্রেশন অফিসারের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়, ‘কীসের গল্প?’
আমি মিনমিন করে বললাম, ‘জীবনের’।
–       কার জীবনের?
–       আমার।
–       আপনার?
–       হু।
তিনি আমার পা থেকে মাথা অবধি কঠিন চোখে স্ক্যান করে বললেন, ‘আপনার জীবনের গল্প কারে শোনাইতে যান?’
–       অস্ট্রেলিয়ায় যারা বাংলাদেশি থাকেন, তাদের’।
–       তারা আপনার জীবনের গল্প কেন শুনবে?’
এই প্রশ্নের উত্তরে আমি কী বলবো! খানিক চুপ করে থেকে হঠাৎ বললাম, ‘কারণ, আমাদের সবার জীবনের গল্পই যে কোথাও না কোথাও কোন না কোনভাবে এক! কোন না কোনভাবে মিলে যায়। এইজন্যইতো আমরা গল্প পড়ি, সিনেমা দেখি। কারণ সেসবে আমরা আমাদের জীবনের গল্পই খুঁজে পাই’।
অফিসার কী বুঝলেন কে জানে! তিনি আমাকে ক্যামেরার দিকে চোখ তুলে তাকাতে বললেন। আমি তাকালাম। তিনি কম্পিউটারের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে। কী দেখলেন সেখানে, আমার চোখ? কী আছে সেই চোখে? যা ক্যামেরা কিংবা কম্পিউটার পড়তে পারে, কিন্তু মানুষ পারে না! নাকি চোখের ভেতর অন্যকিছু? আচ্ছা, চোখের ভেতর অন্য কিছু থাকলে কী তা কম্পিউটার কিংবা ক্যামেরা পড়তে পারে? আমি জানি না। আমার কেবল মনে হয়, মানুষের চোখ পড়তে পারে কেবল মানুষ। মানুষের চোখ পড়তে পারে কেবল মানুষের মন।
তিনি বললেন, ‘করেন কী আপনি?’
–       লিখি’
–       কী লিখেন?
–       বই।
–       আর?
–       সিনেমা বানাই। চেষ্টা করি আরকী!
–       ওহ!
আমি আরও কঠিন কঠিন সব প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে তিনি আর কিছু বললেন না। বরং হেসে বললেন, ‘প্রথম যাচ্ছেন না?’
আমি বললাম, ‘হুম’।
–       ‘বুঝেছি। যান। হ্যাভ আ সেফ ট্র্যাভেল’।
–       তিনি আমার পাসপোর্টে সীল মেরে দিলেন, ‘ডিপারচার’।
আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। অবশ্য তাকেও আর জিজ্ঞেস করা হলো না, আমার ভিসা ঠিকঠাক আছে কীনা! কিছুটা এগিয়ে যেতেই, তিনি অবশ্য আমাকে পেছন থেকে ডাকলেন। তারপর আমি ফিরে তাকাতেই মুখভর্তি হাসি নিয়ে বললেন, ‘আরও অনেক গল্প নিয়ে ফিরে আসুন। জীবনের গল্প…’

আমি তাকে জবাব দিতে গিয়েও পারলাম না। তিনি ততক্ষণে কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছেন। অপেক্ষমান মানুষের সুদীর্ঘ সারি। ঘরে ফিরবার, ঘর ছাড়বার মানুষের সারি। পাখির মতন আকাশে আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাবে শত শত বিহঙ্গ-মানব। এমন কত কত বিহঙ্গ-মানবের এমন বিদায় বই-এ রোজ সীল মেরে দেন তিনি। কী অদ্ভুত! তার নাম কী দেয়া যায়? বিদায় বাহক?
নামটা আমার মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকলো। ঘুরঘুর করতে থাকলো আরও কত কী! আচ্ছা, এই মানুষগুলোর বুকের ভেতরও কী অসংখ্য গল্প জমে নেই? সেই সকল গল্প কী তারা কাউকে কখনো বলে? বললে কেমন সেই গল্পগুলো? সেই গল্পের কোথাও কী আমি আছি? আমার আচমকা তার বুকে জমে থাকা অসংখ্য বিদায়ের গল্প শুনতে ইচ্ছে হতে লাগলো। ইচ্ছে হতে লাগলো মানুষের চোখ, চোখের ভাষা পড়বার এই যে ক্লান্তিহীন রাত্রি, সেইসকল রাত্রি পাঠ করতে।
ঠিক ১ টায় ফ্লাইট। আমি তাকিয়ে আছি এয়ারপোর্টের ডিস্প্লে’র দিকে। কত কত ফ্লাইট, কত কত দেশ, কত কত মানুষ, কত কত ঘর, সব এসে কেমন একাকার হয়ে গেছে এখানে। পেচিয়ে যাওয়া সুতোর মতোন। খানিক বাদেই সুতোগুলো আলাদা হয়ে যাবে, ছুটতে থাকবে নিজ নিজ গন্তব্যে। কেউ কেউ পেছনে ফেলে যাবে ফিরে আসবার অপেক্ষা। কেউ কেউ সামনে রেখে এসেছে ফিরে যাবার অপেক্ষা।
অপলক তাকিয়ে রইলাম। পাশাপাশি ডিসপ্লে-তে লেখা এরাইভাল আর ডিপারচার।আমার হঠাৎ মনে হলো, এ যেন আস্ত এক জীবন। জীবনেরর আখ্যান। এখানে কেবলই অপেক্ষা, এরাইভাল আর ডিপারচারের। আগমন আর প্রস্থানের…
(চলবে)