পথ দেখিয়েছে, পথ প্রোডাকশনের জলসা

1604

ফাহাদ আসমার : সিডনির স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক সংগঠন পথ প্রোডাকশন আয়োজন করলো সম্পূর্ন ব্যতিক্রমধর্মী একটি সংগীত সন্ধ্যার। গত শনিবার (১৮ আগস্ট) নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স থিয়েটারে ‘জলসা’ নামের এই আয়োজন সত্যি হয়ে উঠেছিল সিডনি প্রবাসী বাঙ্গালীদের একটি জলসা সন্ধ্যা। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙ্গালিদের বড় মাপের অনুষ্ঠান মানেই বাংলাদেশ থেকে আগত কোন শিল্পীর অনুষ্ঠান, যেখানে পথ প্রোডাকশনের এই আয়োজন ছিল শুধুমাত্র সিডনিতে বসবাসরত বাংলাদেশি শিল্পীদের অংশগ্রহণে এক ভিন্নধর্মী সংগীতসন্ধ্যা। প্রবাসী শিল্পীদের অংশগ্রহণে কোন আয়োজন সিডনিতে এই প্রথম নয়। ছোট বড় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে নিয়মিতই শুধু প্রবাসী বাঙ্গালিদের অংশগ্রহণে নানা ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। অনেক সংগঠনের ভিড়ে বিশেষ করে বলতে হয় ‘প্রতীতি’র কথা। খ্যাতিমান শিল্পী সিরাজুস সালেকিন এবং তার পরিচালিত সংগঠন ‘প্রতীতি’ অনেক বছর ধরেই এই ধারা লালন করে এসেছে এবং সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিয়মিত আয়োজন করে এসেছে দূর পরবাসে বাংলা গানের আসর। তাহলে ‘জলসা’ কেন ব্যতিক্রম? এত বড় কলেবরে এই জাতীয় অনুষ্ঠান সাম্প্রতিক কালে ‘জলসা’ই প্রথম। কি ছিল না এই অনুষ্ঠানে? পশ্চিমা ইন্সট্রুমেন্টের সাথে দেশীয় যন্ত্রের মিশ্রণে সম্পূর্ন আধুনিক মানসম্মত বাদকদল, উচ্চমানের শব্দকৌশল এবং জমকালো আলোকসজ্জার এ ছিল এক সম্পুর্ন ভিন্ন ধারা এবং মানের একটি সঙ্গীত সংযোজন।

এ সংগীতানুষ্ঠানটি শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটায়। নানা বয়স এবং পেশার হলভর্তি বাঙ্গালী দর্শকের সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ। এরপর একে একে দুই প্রজন্মের স্থানীয় বাংলাদেশিদের পরিবেশনা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন সকলে। এখানে যেমন পারফর্ম করেছেন প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীরা, তেমনি অভিভূত করেছেন এখানে জন্ম নেয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান শিল্পীরা।

অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি এবং অনুষ্ঠান শেষে সকলের চোখে মুখে বিমোহিত প্রশংসাই বলে দেয় এই অনুষ্ঠানের সফলতা।
 সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ উচ্ছ্বসিত দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ন ভিন্নধর্মী।
অনেকেই হয়তো কি হবে ভেবে জলসায় আগমন থেকে বিরত ছিলেন, অনেকে হয়তো আসতে পারেননি প্রবাসের ব্যাক্তিগত নানা ব্যাস্ততায়।

 কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে যারা উপভোগ করতে পারেননি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের দুঃখ ভারাক্রান্ত মন্তব্য ছিল আয়োজক এবং শিল্পীদের বাড়তি পাওনা। প্রায় সবাই আফসোস করেছেন এবং পরবর্তী আয়োজনে যে কোন মূল্যে উপস্থিত থাকার আশা ব্যক্ত করেছেন।

দুই পর্বের পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন খ্যাতিমান প্রবাসী ব্লগার শুভজিৎ ভৌমিক। তার অসধারন শব্দচয়ন এবং বাংলা গানের সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যবেক্ষনে পুরো অনুষ্ঠানটি পেয়েছিল সম্পূর্ন ভিন্নমাত্রা। অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ভিড়ে সিডনি প্রবাসীরা অনেকদিন মনে রাখবে শুভজিতের নির্ভুল উচ্চারণের এই উপস্থাপনা। পথ প্রডাকশনের দীর্ঘদিনের অন্যতম কাণ্ডারি রূপসা শুরু করেন অনুষ্ঠানের প্রথম পরিবেশনা।

আর তারপরেই চমক নিয়ে আসেন দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি শিল্পী নাবিলা। প্রবাসে বড় হয়ে এভাবে বাংলা গানের লালন এবং পরিবেশনা বিমুগ্ধ করে আগত সকল দর্শকদের। তারপর একে একে সঙ্গীত পরিবেশন করেন পলাশ বসাক, ইমন ফেরদৌস, তামিমা শাহরিন, নিজামুদ্দিন উজ্জ্বল এবং আরো অনেকে। দ্বিতীয় প্রজন্মের কিশোর শিল্পী নিলাদ্রি একাধারে পুরো অনুষ্ঠানে যেমন মুগ্ধ করে রেখেছিল অসাধারণ পিয়ানো বাজিয়ে তেমনি তার গান বিমোহিত করেছে সকলকে। জলসার অন্যতম আকর্শন ছিল খ্যাতিমান শিল্পী নিজামুদ্দিন উজ্জ্বলের রাগ ঘরানার গান এবং গজল। দর্শক সারি থেকে কিছুক্ষণ পর পর বাহবা এবং উচ্ছ্বসিত করতালি সমৃদ্ধ করেছে তার পরিবেশনা।

অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের নিজেদের মধ্যে আনন্দিত আলাপ এবং ভূয়সী প্রশংসা কার্যতই পথ প্রোডাকশনের এই অনুষ্ঠানের সফলতা প্রকাশ করে। বেশ কয়েক বছর ধরে সিডনির সবচেয়ে বড় বাঙ্গালিদের অনুষ্ঠান বৈশাখী মেলার মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পথ প্রোডাকশন অনেকদিন ধরেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে এসেছে। মেলার মঞ্চের বাইরে তাদের সবচেয়ে সফল অনুষ্ঠান ছিল ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী প্রিতমের কনসার্ট। তবে সম্পূর্ন বাঙ্গালীদের নিয়ে এটাই ছিল তাদের প্রথম পরিবেশনা। পথ প্রোডাকশনের পূর্ববর্তি অসামান্য সফলতার জন্যই দর্শকদের চাহিদা ছিল আরো একটু বেশি। তাই কিছু ব্যাপারে দর্শকদের সমালোচনা লক্ষ করা গেছে। সাউন্ড সিস্টেমে মাঝে মাঝেই ছন্দপতন এবং যন্ত্রসঙ্গীতে বেশ কিছু ভুল তাল সম্পর্কে কিছুটা হতাশা জানিয়েছেন অনেক দর্শক শ্রোতা।

এ ছাড়া অতিমাত্রায় হিন্দি গান নির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এ প্রজন্মের প্রবাসী দর্শকেরা। গজল হিন্দি বা উর্দূতেই বেশি মানায় তবুও অনেক মানসম্মত বাংলা গজল গাওয়া যেত বলে অনেকে শ্রোতার মন্তব্য। সেই সাথে বেশ কয়েকজন মেধাবী যত্রসঙ্গীত শিল্পী থাকার পরেও কোন একক যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশনার অভাব অনেকে দর্শকদেরকেই নিরাশ করেছে। ভালো যে কোন পরিবেশনার সাথে সাথে শ্রোতা দর্শকদের চাহিদারও উত্তরণ ঘটে। ছোটখাট কিছু বিষয়ে ভবিষ্যতে উন্নতির প্রস্তাবনা এবং কিছু গঠনমূলক সমালোচনা থাকলেও সব মিলিয়ে সময়টা অবধারিতভাবে উপভোগ্য ছিল আগত সকল সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে। যদিও এটাই তাদের প্রথম প্রযোজনা তবুও এই মানের একটি সংগঠনের কাছে পরবর্তিতে আরো উন্নতমানের অনুষ্ঠান পাওয়া যাবে বলে ক্যমুনিটির সকল স্তরের দর্শক-শ্রোতারা আশা প্রকাশ করেছেন।

পুরো অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার বাংলা রেডিও, ‘গান বাকসো’। এছাড়া ‘বাংলা সিডনি’ ওয়েবসাইটের কর্ণধার আনিসুর রহমান সম্পূর্ন আয়োজনটি ক্যামেরায় ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এ সুযোগে যারা উপস্থিত হতে পারেননি তারা চাইলেই সেখান থেকে দেখে নিতে পারেন পথের এই সঙ্গীত সন্ধ্যা। এমনকি উপস্থিত যারা অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখেছেন তারাও চাইলে দেখে নিতে পারবেন প্রিয় পরিবেশনা অংশটুকু।

সম্পূর্ন স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় এ জাতীয় অনুষ্ঠান একটি মাইলফলক হিসেবেই লেখা থাকবে এবং সিডনি প্রবাসীরা অনেকদিন মনে রাখবে শনিবার সন্ধ্যার এই ভিন্নমাত্রার সঙ্গীত সন্ধ্যা। দর্শকদের ইতিবাচক সাড়া এবং এই অনুষ্ঠানের অভাবনীয় সফলতায় ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন পথ প্রোডাকশনের পক্ষ থেকে সংগঠনের বিপণন প্রধান সাকিব ইফতেখার।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ রাকেশ মণ্ডল (RGB Production)