পরীমণির জন্য ন্যায়বিচার দাবি করছি কেন? । অনীলা পারভীন

  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের সমাজ ভয়-ভীতিহীন, প্রতিবাদী নারী পছন্দ করে না। মেয়েমানুষ মাত্রই হবে নম্র, ভদ্র, লাজুক, নীচু গলায় কথা বলা একজন উনমানুষ। সে কেনো এভাবে গলা উচুঁ করে কথা বলবে? আওয়াজ তুলবে?

ভয়-ভীতি কেউ মায়ের পেট থেকে নিয়ে আসে না। ছোটবেলা থেকে মেয়েদের মস্তিস্কে ভয়কে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, অতি কুকৌশলের সাথে। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, জোরে কথা বলা ঠিক না, উচ্চশব্দে হাসলে গুনাহ হবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না, সবকিছু সহ্য করতে হবে।

একটা প্রচলিত কথা আছে- ‘যে যত সয়, সে তত রয়।’ অর্থাৎ প্রতিবাদ করেছ তো মরেছ। তাই বহু শিক্ষিত মেয়েরাও দিনের পর দিন নির্যাতিত হয়ে মুখ বুঝে সংসার করে যায়। অনেক সময় চরম ক্ষতি সাধিত হলে হয়তো সংসার থেকে বের হয়ে আসে, না হয় মৃত্যু বরণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেই রোমানা মোর্শেদের কথা মনে আছে?

অনেকেই মনে করে, “পরীমণির মতো এমন খারাপ একজন মেয়েকে কিভাবে সাপোর্ট করা যায়? যে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অনৈতিক কাজ করেছে। তাকে তথাকথিত মানুষেরা ‘রাতের রানী’ নামে আখ্যায়িতও করেছে। এরকম একটা ‘বাজারের মেয়ে’র পক্ষ নিয়ে কথা বলাটাও লজ্জার।“

পরীমণি কোন ধরনের মেয়ে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে একজন মানুষ। সেটা বিবেচনা করা উচিৎ সবার আগে। তাহলে বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে কথা বলার প্রথম ও প্রধান কারণ, পরীমণি একজন প্রতিবাদী, দৃঢ়চেতা নারী। যা আমাদের সমাজে সত্যিই বিরল।

পরীমণি সিনেমার নায়িকা হতে চেয়েছেন, এটা কি দোষের? দুঃখজনক হলেও সত্য, হলিউড-বলিউড-ঢালিউডের চলচ্চিত্র জগতে কি ঘটে, তা কে না জানে? শো-বিজের দুনিয়ায় যাদের বাপ-ভাই নেই, তাদের জন্য এই রঙ্গিন জগৎটা নরকের অগ্নিপথ ছাড়া আর কি? নিজেকে দাঁড় করাতে হলে কিছু স্বার্থান্বেষী মহলকে মনোরঞ্জন করতেই হয়। তা না হলে পরীমণির মতো সাধারণ মেয়েদের স্বপ্ন অপূর্নই থেকে যায়।

এই সুযোগেই বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী তথাকথিত মানুষেরা পরীমণিকে ব্যবহার করেছে। রাতের পর রাত ক্লাবে, আড্ডায়, অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রভাবশালী মুখোশধারী ভদ্রলোকেরা নিজেদের স্বার্থে এবং মনোরঞ্জনে তাঁকে ব্যবহার করেছে।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারাই এখন পরীমণিকে বিপদে ফেলার সব ব্যবস্থা করেছে। পরীমণি নিজেকে রক্ষা করার তাগিদে তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে বহু নায়িকারা এভাবে ব্যবহৃত হলেও, কাউকেই সমাজ-রাষ্ট্র-পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করতে দেখা যায়নি। #MeToo আন্দোলন কিন্তু আমাদেরকে এই বার্তাটিই দিয়েছিল।

আজ পরীমণি যদি এভাবে তাঁর কথা না জানাতেন, তবে তাঁর অবস্থা যে মুনিয়ার মতো হতো না, তা কি কেউ জোর গলায় বলতে পারব? কয়েক মাস আগে যিনি বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালকের লাম্পট্যের শিকার হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। এভাবে পরীমণিকেও হয়তো একদিন ঝুলন্ত অবস্থায় ঘরে পাওয়া যেত। আমরা কিছুদিন ‘আহা’, ‘উহু’ করে ভুলে যেতাম। এরকম ঘটনা তো অনেক সেলেব্রিটির ক্ষেত্রেই ঘটেছে।

পরীমণির এই প্রতিবাদ শুধু নিজেকেই রক্ষা করেনি বরং বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তিনি সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়েছেন ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ কিছু চাপিয়ে দিলে তার প্রতিবাদ করতে হবে’। এখানেই পরীমণির জয়।

আমি ন্যায় বিচারের বিপক্ষে নই। পরীমণি যদি দোষী হয়, আইনের মাধ্যমে তাঁর বিচার হোক। একই সাথে যারা তাঁকে এই পথে নিয়ে এসেছে কিংবা আসতে বাধ্য করেছে, পরিশেষে তাঁকে যারা বিপদে ফেলেছে, আমি তাদেরও বিচার চাই।

অনীলা পারভীন
লেখক, সংগঠক
কর্মকর্তা, সিডনি ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments