পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ‘ভৈরবী মিউজিক স্কুল’ এবং একজন শাঁওলী শহিদ । শরীফা টুলটুলী

  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের বেড়ে ওঠার যুগে রোজকার নিয়মিত আবশ্যিক কাজগুলোর প্রাধান্য থাকতো বেশী। বিনোদন পাওয়ার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হতো। তখনকার বিনোদন এতো সহজলভ্য ছিল না। তখনকার বিনোদনগুলো আমার নিজেরা সৃষ্টি করতাম অথবা আমাদের অভিভাবক ,পাড়া প্রতিবেশী ,মহল্লা অথবা কলোনির বড়রা আমাদের জন্য সৃষ্টি করে দিতেন। গান ,নাচ ,আবৃতি ,গল্প বলা ,গল্প লেখা ,ছড়া ,অভিনয় ,বিতর্ক এসব আয়োজন হত পাড়ায় -মহল্লায় -শিশু একাডেমী ,শিল্পকলা একাডেমীতে। বিভাগীয় শহর হোক ,গ্রাম হোক অথবা মফস্বল হোক সব জায়গায় সম্প্রীতি ছিলো। পরিবারের বাইরেও আমাদের আরেকটা পরিবার থাকতো ,আত্মীয়র বাইরেও আত্মীয়তা হতো । আমাদের সময়ে মহল্লার খুব বখাটে ছেলেটাও মহল্লার মুরব্বীদের দেখে বিনয়ে হাতের সিগারেট পেছনে লুকিয়ে রাখতো । অসহায়ের সহায় হওয়া ,বিপদে একে অন্যকে সাহায্য করা ,বৃক্ষ -ফুল -শিশুকে ভালোবাসা, বিনয়ী হওয়া আবার অপরদিকে অকৃতজ্ঞকে এড়িয়ে চলা ,কটাক্ষকে উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া ,সঙ্গতি আর অসঙ্গতির তফাত বোঝা ,অন্যায়কে সর্ব শক্তি দিয়ে প্রতিহত করা এই বিষয়গুলো আমরা আমাদের পরিবার ও পরিবেশ থেকে শিখেছি ।

মুঠোয় মুঠোয় বায়স্কোপের এই যুগে বিনোদনগুলো খুব সহজে পাওয়া যায় । এই সহজে পাওয়া বিনোদনগুলো তার তুকতাক মন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমাদের বড় ছোট সব্বাইকে । সময় করে জীবনের শিক্ষা দেওয়া ,সৃজনশীলতা নিয়ে কথা বলা অথবা শুদ্ধ সঠিক সংস্কৃতির শিক্ষা দেওয়ার সময় যেন হারিয়ে গেছে । আমরা সব্বাই নিজ নিজ মনের রুদ্ধ -গৃহে বসবাস করছি ,এই রুদ্ধ গৃহের খিড়কি -দুয়ার খোলার সামান্য ফুরসৎ যেন আমাদের নেই ।
আমরা যারা নিজেদের দেশ -সংস্কৃতি ছেড়ে নিজেদের জীবনের দরকারে অন্যদেশে এসে নিজেদের স্থায়ী ঘাঁটি গাড়ি আমাদের জন্য এই বিষয়গুলো আরো বেশী কঠিন । জীবন বাস্তবতায় আমরা এখানে বর্ণনাতীত ব্যস্ত জীবন কাটাই । এতো দৌড় ঝাপময় জীবন ,ভিন্ন ভাষা , ভিন্ন সংস্কৃতি এসবের মধ্যে নিজেদের মাতৃভাষা , সংস্কৃতি ,ঐতিহ্য আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেন অনেকে । তারা তাদের শ্রম ,নিষ্ঠা আর ভালোবাসা সৃষ্টির জাদুর কাঠি দিয়ে আমাদের পরিবারের বাইরে আরেক পরিবার হয়ে ওঠেন ,আত্মীয়ের অধিক আত্মীয় হন ।আমাদের সন্তানেরা তাদের কাছ থেকে শেখে ,জানে ,বোঝে ঠিক যেন আমাদের হারিয়ে যাওয়া অতীতের মফস্বলের মতো ,যেখানের স্মৃতিরা ফুলের সুবাসের মতো সুন্দর ,আগুনের মিহি তাপের মতো আরামদায়ক।

ঠিক তেমনই একটা জায়গার নাম “ভৈরবী মিউজিক স্কুল “। যেখানে সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে আসন গেড়ে বসে থাকেন আমাদের বাচ্চাদের শাওলী অ্যান্টি । তার হাত দুটো ব্যাস্ত থাকে ঘণ্টার পর পর ঘণ্টা …উদারা মুদারা তারায়…হারমোনিয়ামের সাদা কালো পথ ধরে তার হাত কেবল দুলে চলে নিয়ত। আমাদের বাচ্চাদের সর্বদা ইংরেজি উচ্চারণক্ষম জিহ্বা সরল সাধারন বাংলা বলতেও মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়, কিন্তু তাদের শাঁওলী অ্যান্টি ক্লান্ত হন না। একজন একজন করে প্রতিটা শব্দ ঠিক করে দেন। আমাদের বাচ্চারা চেষ্টা করে …চেষ্টা করতে করতে তাদের সদা অভ্যস্ত ইংরেজি উচ্চারণ ক্ষম জীহবা একসময় শিলা খণ্ডের ন্যায় কঠিন কঠিন বাংলা শব্দগুলো ও উচ্চারণ করতে পারে। তারা তাদের শাঁওলী অ্যান্টিকে ভালোবাসে। অ্যান্টির শাসন, আদর সব তাদের ভালোলাগে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে তারা একজন শাঁওলী অ্যান্টি হবে।

শাঁওলী শহিদ- স্কুলের প্রতিটা বাচ্চার প্রতি তার মমতা বাচ্চারা অনুভব করে ।

গত প্রায় দুই আড়াই বছর ধরে মেয়েকে নিয়ে যাই এই গানের স্কুলে কখনো নিয়মিত কখনো অনিয়মিত। কিন্তু এই দুই আড়াই বছরে এই স্কুলের হয়ে শুধুমাত্র পহেলা বৈশাখের একটা দলীয় সংগীত করেছিলো। অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহন করতে হলে নিয়মিত রিহারসেল করতে হয় মানে বাধ্যতামূলক। এই বাধ্যতামূলক যাওয়া আসার ভয়ে অনুষ্ঠানগুলোতে মেয়ের অংশগ্রহণকে এড়িয়ে চলি। কিন্তু এবার মনে হল একটা স্কুলের সাথে দুই আড়াই বছরের যোগাযোগে কারণে হলেও স্কুলটির বার্ষিক অনুষ্ঠানে থাকা অবশ্যই দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতা পালন করতে গিয়ে আমি যার পর নাই অপরাধবোধে ভুগেছি। ত্রিশটা বাচ্চার ত্রিশটা একক গান এক এক করে শেখানো ,শোনা ,ঠিক করে দেওয়া ,ভুল হলে বারবার করে সংশোধন করা এসব একজন মানুষই করেছেন আর তাকে সাহায্য করছেন তারই স্বামী সন্তানেরা ! প্রতি সপ্তাহে তার বাড়ীতেই গানের স্কুলের ক্লাস হয় আর রিহারসেলের সময় উইক ডে গুলোতে পালাক্রমে তিন চারদিন রীহারসেল করান তিনি ।এই অনুষ্ঠানের পূর্ব প্রস্তুতি ও তার পরিবারের চারজন সদস্যের সাপোর্ট দেখে আমরা হতবম্ভ হই ।বড় ছেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মায়ের কাছে বসে কিবোর্ড বাজায় । নাম তার সূর্য ।। গানের সুর -তাল -লয় -ভাষা নিয়ে যখন মায়ের সাথে আলাপ করে তখন মনে হয় মা আর ছেলে যেন একই শ্রেণীতে অধ্যায়ণ রত দুই বন্ধু আর নিসর্গ যেন এক শান্ত -সৌম্য উড়াল পঙ্খী , মা শুধু একবার ডাকে নি …সর …গো , অমনি দোতলা থেকে একদৌড়ে নিচ তলায় এসে মায়ের সামনে হাজির । এবার মায়ের ফরমাশ “যাও বাবা এই গানের লীরীক্সগুলো প্রিন্ট করে নিয়ে আসো “।মায়ের আদেশ শুনে বাধ্য নিসর্গ  প্রিন্টারের কাছে যায় ।প্রায় প্রতি সপ্তাহে এই ছেলের এই বাধ্য হয়ে উড়ে বেড়ানো মুগ্ধ হয়ে দেখি । এই গানের স্কুলে বাচ্চাদের একজন বাপ্পী আংকেল আছেন ।যিনি সব সময় চান বাচ্চারা ভালোটা শিখুক ,ঠিকটা শিখুক । স্কুলের প্রতিটা বাচ্চার প্রতি তার মমতা বাচ্চারা অনুভব করে ।বাপ্পী ভাইয়ের স্নেহ আর অনুপ্রেরণা বাচ্চাদের জন্য অনেক বড় একটা সাপোর্ট ।ভুলে হলে অ্যান্টি একটু বকা দেয় আর আংকেলের স্নেহ ওই সময় তাদের ঢাল হয়ে যায় ।

গানের স্কুলটা এই পরিবারের একটা ভালোবাসার নেশা ,কিন্তু এই পরিবারের প্রতিটা সদস্য তাদের আপন পেশায় মহিমামণ্ডিত । আমি একজন প্রাইমারী স্কুলের সহকারী শিক্ষক সপ্তাহে জুড়ে চাকরী করে শনি ,রবিবার রান্না -বাজার সংসারের ইত্যাদি ইত্যাদি কাজ করে মেয়েকে গানের স্কুলে নিয়ে যেতে আলস্য বোধ করি আর শাওলী শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পড়ান ,সংসার করেন , ঘর নিপুণ হাতে সাজান , বৃক্ষ-ফুল -লতা পাতার -টবের -মাটির যত্ন করেন আবার নিখুঁত ভাবে একটা গানের স্কুল চালান । প্রায় ত্রিশটা বাচ্চাকে গান শেখান নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখেন ,নিজেই প্রতিটা বাচ্চাকে এক এক করে বাংলা উচ্চারণ শেখান , ।ষোলটা বাচ্চাকে দিয়ে পর্যায়ক্রমে উপস্থাপনা করান ,সেই উপস্থাপনার উচ্চারণ ঠিক হয় কিনা তা ঠিক করার জন্য নিয়মিত বাচ্চাদের সাথে মাসেঞ্জারে গ্রুপ চ্যাট করেন , আবার নিজে সব স্ক্রিপ্ট রেকর্ড করে বাচ্চাদের অভিভাবকদের কাছে পাঠান । একটার পর রিমাইন্ডার দেন যেন বাচ্চারা একটু প্র্যাকটিস করে বাসায়। অনুষ্ঠানের দিন তাকে দেখা যায় নগ্ন পায়ে স্টেজে -ব্যাক স্টেজে ঘুরে বেড়াতে ,। কখনো তিনি হন্তদন্ত ,কখনো তিনি ধীর স্থির ,একটু পর পর বাচ্চাদের খোঁজ নিচ্ছেন ,কে কখন কার পরে যাবে বলছেন , আবার স্টেজেও লিড দিচ্ছেন । যেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞের একক প্যাকেজ তিনি !!কোন জাদু মন্ত্রে তিনি এসব করেন করেন তা আমাদের জানা নাই । তবে এইটুকু শুধু জানি এতো শ্রম দিয়ে গত নয় বছর তিনি যে অসাধ্যকে সাধন করেছেন তার জন্য আমরা অশেষ কৃতজ্ঞ । আপনার জন্য আমাদের ছেলে -মেয়েরা গুনগুন করে বাংলা গান গায় ,গাড়ীতে বাংলা গান বাজলে তারা আনন্দে গলা মেলায় ,এই পাওয়া যে কতো বড় আনন্দের তা আমরা অভিভাবকেরা শুধু অনুভব করতে পারি।

বিদেশের মাটিতে আপনারা যারা মাতৃভাষা আর দেশীয় শুদ্ধ সংস্কৃতি বীজ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের বুকের মধ্যে খুব দৃঢ়ভাবে পুঁতে দিচ্ছেন ,আপনাদের সব্বার প্রতি কৃতজ্ঞতা রইলো।

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments