পাপিয়ার পৃষ্ঠপোষকদেরও ধরা হোক -রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

এবার সম্রাজ্ঞী পাপিয়া, যুব মহিলা লীগ। প্রায় প্রকাশ্যে বহু সর্বনাশ করে, লুট করে, দুর্নীতি করে, যুবক-যুবতীদের চরিত্র হনন করে, টাকার কুমির সেজে, সবার সামনেই অঢেল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে বিদেশে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার করে কোন এক ভুলবশত কারণে ধরা পড়ে অবশেষে দল থেকে তিনি বহিষ্কার হলেন ‘আজীবন’। এমন বহিষ্কার এ যাবত কম দেখলাম না। মাত্র কয়েক মাস আগেই তো যুব লীগ নেতা ওমর ফারুক চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া, জি কে শামীমসহ বেশ ক’জনকে বহিষ্কার করা হলো, কেউ কেউ জেলেও আছেন। কিন্তু তাঁদের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য? বিশাল বিশাল অট্টালিকা? দামি গাড়ি-বাড়ি? ব্যাংক ব্যালান্স? বিদেশে পাঠানো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা? তাদের গড়ে তোলা এবং লালিত ক্যাডার-বাহিনী? এরা কি কম কিছু? এগুলোর গায়ে কাঁটার আঁচড়ও লাগেনি আজ পর্যন্ত। তাদের জমি-জিরাত ব্যবসা-বাণিজ্য, তাও চলছে বহাল তবিয়তে। শামীমা নূর পাপিয়া, তার গুণধর স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী, এদের দুই সহযোগী সাব্বির খোন্দকার ও শেখ তায়্যিবারা যে দাপটের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরে নরসিংদী ও ঢাকায় দলের সুবাদে রাজত্ব করেছেন, তা কি গোপন কোন ব্যাপার ছিল? তাদের এত সাহসের ভিত্তিই বা কি? তাদের পৃষ্ঠপোষক কারা? তাদের বেনিফিসিয়ারিই বা কারা এবং কে কে? তাদেরও ধরা হোক। আমরা তাদেরও দেখতে চাই।

তদন্ত চলছে, চলুক। তবে এ যাবত প্রাপ্ত তথ্যাদি দ্রুত সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে সবিস্তারে জানানো হোক। তদন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে সমাপ্ত হলে তখন আবার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক। এই নিবন্ধটি লিখতে লিখতে ফেসবুকের মাধ্যমে ২৫ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি দৈনিক প্রকাশিত খবরে জানা গেল, ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থানার আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনমুল হক এনু ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভুঁইয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব। সূত্রাপুর মুরগীটোলা মোড়ের বাসা থেকে নগদ এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা ও ৭৩০ ভরি স্বর্ণ জব্দ করেছে। সোমবার দিবাগত রাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে এসব সামগ্রী জব্দ করা হয়। অভিযান শেষে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক (সিও) লে, কর্নেল কে এম সফিউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেল, রাজধানীর ইংলিশ রোড থেকে ৫টি ভল্ট ভাড়া নেয় কে বা কারা। পরে তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায় ভল্টগুলো রূপন ও এনামুল এই দুই ভাই ভাড়া নিয়েছে এবং ক্যাসিনোর লাভের টাকা এসব ভল্টে রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, জুয়ার টাকা দিয়ে এরা অনেকগুলো বাড়ি কিনেছে। এখন পর্যন্ত ১৫টি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। ৩১, বানিয়ানগরে অবস্থিত ভবনের দ্বিতীয় ও পঞ্চম তলায় অভিযান চালিয়ে তিনটি ভল্ট উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকেও টাকা ও স্বর্ণ পাওয়া যায়। একইসঙ্গে ওই অভিযানে ৫টি অস্ত্রও পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা র্যাবকে জানিয়েছে, এসব অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখানো হতো এলাকাবাসীদের।

সূত্র জানায়, এনামুল ও রূপনরা ছয় ভাই। ১৯৮৫ সাল থেকেই এনামুল ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও রূপন আরামবাগ ক্লাবে জুয়া খেলত। কিন্তু গত ৩/৪ বছর আগে তারা হঠাৎ করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি কিনতে শুরু করে। যে বাড়িটি র্যাব ঘিরে রেখে অভিযান চালাল, সে বাড়িটি গত দেড় বছর আগে হারুনর রশিদ নামে একজনের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। ভবনের চতুর্থ তলায় এনামুলের শ্যালক-শাশুড়ি থাকেন। সূত্র জানায়, এই চতুর্থ তলার সিন্দুক থেকে ৭ কেজি স্বর্ণ পাওয়া গেছে। আর একটি সিন্দুক থেকে এক কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, ওয়ারী, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, বংশাল, কোতোয়ালি থানা এলাকায় এই পরিবারের ৫০টির মতো বাড়ি রয়েছে। তবে রূপন এবং এনামুল কোন বাড়িতে থাকেন, সেটা তাঁরা জানেন না। ওই বাড়িতে এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত অভিযান চলছিল। সর্বশেষ জানা গেল, অভিযান শেষে মোট পাওয়া গেছে নগদ প্রায় সাড়ে ২৬ কোটি টাকা এবং সোনার গহনা ও এফডিআর পাঁচ কোটি টাকা। অপরাপর সম্পত্তির দাম ধরলে মোট কত কোটি টাকায় পৌঁছাবে, তা অনুমান করাও দুঃসাধ্য। এছাড়াও প্রতিদিনকার সংবাদপত্রগুলো বয়ে আনছে ক্ষমতাসীন দলীয় বা তাদের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনগুলোর কোন না কোন নেতা-নেত্রী বা কর্মীরা কারও বাড়ী দখল, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট দখল ও হলে অস্ত্র রাখা, টর্চার সেল পরিচালনাসহ নানা অপকর্মের লজ্জাজনক কাহিনী। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো লাইভও দেখায়। দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে এখন যেন অনেকটা গা সহা হয়ে পড়েছে। জন্মাচ্ছে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী ও দলসমূহের এবং সামগ্রিকভাবেই রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণা, ঘৃণা ও অনীহা। এই বিতৃষ্ণা, ঘৃণা ও অনীহাই ধীরে ধীরে সবার অলক্ষ্যে মানুষকে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ও তার নেতা-নেত্রীদের প্রতি গভীর অনাস্থার সৃষ্টি করে চলেছে যা অতীতে অরাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতা দখলের পথকে সুগম করে দিয়েছে।

শুধুমাত্র পাপিয়া এক নন। হাজার হাজার পাপিয়া হাজার নামী-দামী হোটেলে পতিতাবৃত্তি, মেয়েদের নগ্ন-ভিডিও ধারণ ও ব্ল্যাকমেইলিং-এ লিপ্ত। কিন্তু কারা তাদের খদ্দের? কারা ওই কথিত সুন্দরী যুবতীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে অন্ধকারের রাজ্যে টেনে এনে তাদের জীবন-যৌবন-ভূত-ভবিষ্যত ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত? জিজ্ঞাসাবাদে নাকি পাপিয়া ও তার স্বামী মুখ খুলতে শুরু করেছে। তারা পুলিশকে জানিয়েছে, ১১ জন মন্ত্রী ও ৩৩ জন এমপি পাপিয়ার কল লিস্টে আছেন। ধারণা করা যায় ওই কললিস্টে আরও অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং ওপর মহলের আরও অনেকের নামই রয়েছে, যাদের অনেকেই ওই মেয়েদের বিপথগামী করে তুলছে।

প্রতিদিন দুই লাখ টাকার মদের বিল ঢাকার অভিজাত এলাকার পাঁচ-তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে। তাহলে সকল খরচ যোগ করলে ওই স্যুটসহ দৈনিক কত টাকার বিল পরিশোধ করতে হতো? মগের মুল্লুক আর কাকে বলে? আমাদের সুস্পষ্ট দাবি, পাপিয়ার মোবাইলের কল লিস্টে যাদের নাম পাওয়া গেল, তাদের নামধামসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক পরিচয় অবিলম্বে সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হোক। হোমড়া-চোমড়ারা সকল অপকর্মেই জড়িত, কিন্তু এর বেশি আর কিছু তাদের সম্পর্কে কোনদিনই কাউকে জানতে দেয়া হয় না।
বলা হয়, ওপর মহলের সম্মতি পেলেই সবকিছু প্রকাশ করা হবে। কিন্তু কিছুকাল পরেই সবকিছুই যেন বিস্মৃতির অতলে চলে যায়। সবকিছু নিয়ে যাওয়া হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে। এই গোপনীয়তা কার স্বার্থে? দেশ ও জনগণের স্বার্থে নিশ্চয়ই নয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দিব্যি বলে দিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পাপিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কী মারাত্মক। সমগ্র আওয়ামী লীগ, নানা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব ও মন্ত্রণালয় যেন দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যজ্ঞানহীন। তারা নিজেরা কেন কোন অপরাধীকে নিজ উদ্যোগে আইন অনুযায়ী গ্রেফতার করতে পারেন না? কোন রাঘব বোয়ালদের কোনভাবেই কেন গ্রেফতার করতে পারেন না? বাধাটা আসলে কোথায়? আইন নাকি তার নিজের গতিতে চলে? তাহলে আইনের গতিকে রুদ্ধ করে রেখেছে কে? এ প্রশ্নের উত্তর সকলের জানার অধিকার রয়েছে। অবিলম্বে তা জানানো হোক। যুবলীগ নেত্রী সংগঠন থেকে আজীবন বহিষ্কৃত হয়েছেন। যেমন, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের, বিশেষ করে পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত হলে ক্লোজ করতে দেখি বা ওএসডি হতে দেখি বা অন্যত্র বদলি হতে দেখি, এটাও যেন তেমনই একটা কিছু। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে তদন্ত হচ্ছে, মামলা দায়ের করা হয়েছে, গ্রেফতার করে জেলে ঢোকানো হয়েছে- সবই ঠিক। কিন্তু ওই অন্ধকার জগতটা ও তার অলি-গলি, নায়ক-নায়িকারা সর্বদাই ধরাছোঁয়ার অন্তরালে। সকল তথ্য অবিকল প্রকাশ করা হোক।

দুই আওয়ামী লীগ নেতার পুরান ঢাকার বাড়ির গোপন জায়গা থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হলো, যেন টাকার খনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগের ছোট-বড়-মাঝারি নেতাদের বাড়িতে বা তাদের ব্যাংকে বা বিদেশে। তাদের বাড়ির সংখ্যাও অগণিত। যে দেশে প্রায় সিকি ভাগ মানুষ গৃহহীন, সেখানে আওয়ামী লীগের পাতি নেতাদেরও এত বাড়ি? কোথা থেকে আসে এত সম্পদ? তার সকল উৎস জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক। এগুলো ছাড়াও ছাত্র লীগের নামে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে টর্চার সেল তৈরি করে বিরোধীদের নির্যাতন-এসবই সংবাদপত্রে হর-হামেশাই প্রচারিত হয়। প্রচারিত হয় নানা জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতা-উপনেতা-পাতিনেতাদের দ্বারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু-আদিবাসীদের বাড়ি-ঘর-সয়-সম্পত্তি দখল, দেশ ত্যাগের হুমকি, তাদের পরিবারের মেয়েদের অপহরণ-ধর্ষণ-খুন ইত্যাদির খবর।

মাত্র কয়েক বছর আগে খোদ ঢাকা শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রলীগ নেতা ছাত্রী-সহপাঠিদের ধর্ষণের সেঞ্চুরি পালনের খবরও দেশবাসী গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জেনেছে। সেই নেতার শেষ পর্যন্ত কি শাস্তি হয়েছে বা হয়নি-আজও তা অজ্ঞাত। ব্যাংক ডাকাতি, বিদেশে টাকা পাচার, উন্নত দেশে বহুতল বাড়ি নির্মাণেও আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতা পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। সব মিলিয়ে আজ বলতেই হয়, মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যেমন অপরিহার্য ছিল, তেমনই আজ বলার এবং উপলব্ধি করার সময় এসেছে যে, না, এরা নন। দুর্নীতিমুক্ত, লুটপাটমুক্ত, ধর্ষণমুক্ত, স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়ন এক মাত্র সৎ রাজনীতির মাধ্যমেই সম্ভব। তাই প্রগতিশীল বিকল্প শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনসমর্থন সৃষ্টি করে ব্যাপক জনতাকে সঙ্গে নিয়ে বলতে হবে, ‘অনেক হয়েছে-এবার খামোশ’।

রণেশ মৈত্র
সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।