পারবেন কি জো বাইডেন? । প্রতীক ইজাজ

  •  
  •  
  •  
  •  

 333 views

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ তাদের নতুন নেতাকে বেছে নিয়েছেন। ইতিহাসের সর্বোচ্চ আলোচিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডেমোক্র্যাট দলের জো বাইডেন। রানিংমেট হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন কমালা হ্যারিস। এই নতুন নেতৃত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের গৌরবময় অভিযাত্রা’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয়কে এখনো মানতে নারাজ। আইনী লড়াই দিয়েই  জয়-পরাজয়ের ইতি টানতে চান তিনি। এ জন্য তহবিল সংগ্রহেও নেমেছে তার দল রিপাবলিকান। কিন্তু শেষঅবধি তাতেও ট্রাম্পকে হার মানতে হবে- তা নিশ্চিত। কারণ ভোট অঙ্কের যে তথ্য, তাতে আর কোনভাবেই ট্রাম্পের জয়লাভের ন্যুণতম সম্ভাবনা নেই। বরং এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে, সেখানকার নির্বাচন পদ্ধতি ও ভোট সংস্কৃতির যে ইতিহাস, সেখানে আরেক দফা নেতিবাচক নেতা হিসেবে সমালোচিত হবেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবার বাইডেন-ই আসছেন- এমন একটা বিশ্লেষণ আমার নিজেরও ছিল। ইলেকটোরাল ভোটের প্রশ্নে যখন সাত রাজ্যের সুতোয় ঝুলছিল জয়-পরাজয়, আমি প্রশ্ন রেখেছিলাম-‘বাইডেন তিন ভোট বেশি পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন?’। সেটা ৪ নভেম্বরের বিশ্লেষণ। এর দুদিন পর একেবারে শেষমুহুর্তে জয়-পরাজয়ের বিশ্লেষণ আরো কিছুটা সুনির্দিষ্ট হয়। ৬ নভেম্বর ভোট গণনা বাকি পাঁচ রাজ্যের, তখন নতুন বিশ্লেষণ দাঁড়ায় ‘নেভাডা দিয়েই কি বের হবেন বাইডেন? নাকি জর্জিয়া বা পেনসিলভানিয়াও যুক্ত হবে?’। সর্বশেষ বাংলাদেশ সময় গত শনিবার রাত ১০টায় বেসরকারি যে ফল ঘোষণা আসে, সেখানে আমার শেষের বিশ্লেষণ আরো সুনির্দিষ্ট করে পেনসিলভানিয়ায় জয়ের মধ্য দিয়েই বিজয়ের পথ সুনিশ্চিত করেন বাইডেন। তবে এর ঠিক কয়েক মিনিট পরই নেভাডায়ও জয় আসে বাইডেনের। ফলে যা ধারণা করেছিলাম, তার চেয়েও বেশি ইলেকটোরাল ভোট যেমন পেয়েছেন বাইডেন, তেমনি শেষঅবধি নেভাডা ও সঙ্গে পেনসিলভানিয়াও যুক্ত হয়।

শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন বাংলাদেশেও দারুণ প্রভাব ফেলে। মুল কারণ গণতন্ত্র ও বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ। আঞ্চলিক রাজনীতিও কারণ। যদিও দক্ষিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশকে এখন আর অন্য কোন দেশের চোখ দিয়ে দেখতে হয় না, বাংলাদেশকে দেখে ‘বাংলাদেশ’ হিসেবেই, স্বতন্ত্রভাবে। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে বাংলাদেশেরও স্বার্থ আছে। সেখানকার বাংলাদেশি অভিবাসী যারা আছেন, তাদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা, চাকরি, বাসস্থান ও নাগরিকত্ব- আমাদের ভাবনায় ফেলে, রাষ্ট্রকে ভাবতে হয়। মুলত এই ভাবনা থেকেই বাংলাদেশ চায় সেখানে উদারপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসুক। অভিবাসীরা কিছু সুবিধা পাক, ভালো থাক। রক্ষণশীল ভাবনা থেকে বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদার গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের রাজনীতি করুক। এতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য-ও কল্যানকর।

২০১৬ সালে নাটকীয়তার মধ্য দিয়েই ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন। সেটাই ছিল মুলধারার রাজনীতির বাইরে কোন ব্যবসায়ীর সে দেশে প্রথম প্রেসিডেন্ট হওয়ার ঘটনা। এমনকি হিলারি ক্লিনটনের মতো একজন জনপ্রিয় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে হারিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। অবাক হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিক, সাধারণ মানুষও। ঠিক একইভাবে সেই ট্রাম্পকেই এবার অবাক করা ভোটযুদ্ধেই বড় ধরণের পরাজয় বরণ করতে হলো। এমনকি তার এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন কোন প্রেসিডেন্টের হেরে যাওয়ার ঘটনাও তেমন নেই। ১৯৯২ সালের পরে সেই বিরল ইতিহাসের জন্ম দিলেন ট্রাম্প।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন- কি এমন করেছিলেন ট্রাম্প, তার জনপ্রিয়তা এতটা তলানীতে এসে ঠেকলো কেন? তার রাজনীতি, পররাষ্ট্র নীতি, অর্থনীতি, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক মুল্যধারার দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে কোথায় ভুল ছিল তার? দেশের মানুষ কেন এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলেন ট্রাম্প থেকে? এ কি তার শুধুই ভুল রাষ্ট্র পরিচালনা নীতির কারণে, তিনি কি সত্যিই দেশ চালাতে ব্যর্থ? নাকি বর্তমান বিশ্বের বদলে যাওয়া রাজনীতি ও কুটনৈতিক যুদ্ধের পাশাপাশি বানিজ্যিক যুদ্ধ এবং কর্তৃত্ববাদের রাজনীতিতে পেরে উঠছিলেন না? ট্রাম্প কি ব্যর্থ হয়েছিলেন বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ধরে রাখতে? যুক্তরাষ্ট্র কি দিন দিন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে? এমনতর নানা প্রশ্ন নানা দেশে, সচেতন মানুষের মনে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে এবার ডেমোক্র্যাটরা নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পপুলার ভোট পাওয়ার রেকর্ড গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সর্বাধিক পপুলার ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার সেই রেকর্ড আর অক্ষুণ্ণ রইল না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে এবার সবচেয়ে বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। এর সঙ্গে নতুন ধরনের পোস্টাল ভোটও দেখা গেছে এ নির্বাচনে। বিপুল পরিমাণ ভোট পড়ার এ নির্বাচনে জো বাইডেন এই নতুন ইতিহাস গড়লেন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সে ৭৭ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস গড়লেন বাইডেন।
এমনকি বর্ণবাদের বিপরীতে সাদা-কালোর মিশ্রণে নতুন নেতৃত্ব এনেছেন ডেমোক্র্যাট। বাইডেনের জয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমালা হ্যারিস। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম কোনো নারী ও প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ এ আসনে বসলেন।

ছয়বারের সিনেটর বাইডেন সিনেটর ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির প্রধান। ছিলেন জুডিশিয়ারি কমিটিতেও। মার্কিন ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দুই দফায় ভাইস প্রেসিডেন্ট। পেয়েছেন প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম।
জয়-পরাজয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ যেমন হচ্ছে; তেমনি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম। কি করেছিলেন ট্রাম্প তার শাসনামলের চার বছরে, যার জন্য এভাবে সে দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করলো তাকে?
ট্রাম্প কম যুদ্ধবাজ ছিলেন। বেশি কথা বললেও কুটচাল কম জানেন। মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে ছিলেন। তার সময়ে বিশ্ব তুলনামুলকভাবে বেশ শান্তিতে ছিল। তবে একথাও সত্যি ট্রাম্পই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি বিভাজন সৃষ্টি করেছেন।

ক্ষমতায় চড়েই অভিবাসীদের ওপর চড়াও হন তিনি। ধর্ম ও বর্ণের ভেদ তুলে মার্কিন নাগরিক থেকে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের আলাদা করেন। নানা অজুহাতে দেশত্যাগে বাধ্য করার হুমকি অব্যাহত রাখেন। ধর্মের বিভাজন এনে ছয় মুসলিম দেশে ভ্রমন নিষোধাজ্ঞা দেন। কৃষ্ণাঙ্গ এশিয়াসহ অশ্বেতাঙ্গ কালো মানুষের ওপর শ্বেতাঙ্গরা একের পর এক হামলা করে। বিশেষ করে মিনিয়াপোলিস শহরে গত ২৬শে মে পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো আমেরিকায় বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তখনও নিশ্চুপ থাকেন ট্রাম্প। বরং হামলাকারীদের পক্ষ নেন। এই ঘটনায় রিপাবলিকান দলের যেমন ব্যাপক সমালোচনা হয়, তেমনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে মাঠে নেমে আরো সামনে চলে আসেন ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে এই সময় ডেমোক্র্যাট ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমালা হ্যারিস আন্দোলনের পক্ষ নিয়ে বেশ আলোচিত ও প্রশংসিত হন যুক্তরাষ্ট্রে। সেটার প্রভাব পড়ে নির্বাচনে।
এমনকি নির্বাচনচলাকালীন ট্রাম্পের বারবার ভোট কারচুপির অভিযোগ একেবারে ক্ষমতার শেষমুহুর্তেও তাকে আরো বেশি সমালোচিত করে তোলে দেশটিতে। একসময় বিরক্ত ও বিব্রত নিজ দল রিপাবলিকান নেতারাই ট্রাম্পের প্রতি ভোট জালিয়াতির প্রমাণ হাজির করতে না পারলে ফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। এসব নেতারা এমনও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ভোট ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যেসব অস্পষ্ট অভিযোগ তুলছেন, তা দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যই ক্ষতিকর। এই ক্ষতি সহজে পুষিয়ে ওঠা যাবে না।

শুরু থেকেই মিথ্যুক হিসেবে খ্যাতি পাওয়া ট্রাম্প নির্বাচনের সময় মিথ্যার পরিমান আরো বাড়িয়ে দেন। বাধ্য হয়ে টুইটারে করা তার প্রায় প্রতিটি পোস্টেই টুইটার সতর্কবার্তা জুড়ে দেয়। এক পর্যায়ে সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের মন্তব্য প্রচার বন্ধ করে দেয়। অবশ্য ট্রাম্প শুরু থেকেই শেষঅবধি তার নানা কর্মকান্ডের সমালোচনা করায় গণমাধ্যমকে দুষেছেন।

ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দেশটিতে রাজতন্ত্র, নাকি গণতন্ত্র-এ নিয়ে দ্বিধান্বিত হয় মানুষ। হোয়াইট হাউসের পদগুলোকে তিনি মিউজিক্যাল চেয়ার বানিয়ে ফেলেছিলেন। পান থেকে চুন খসলেই উচ্চারণ করতেন তিন শব্দ—ইউ আর ফায়ারড।
নির্বাচনী প্রচারণায় ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল- তারা ক্ষমতায় এলে দেশে বামপন্থি রাজনীতির প্রচলন ঘটবে। আর ডেমোক্র্যাটরা বলছিলেন, ট্রাম্প আরেকবার নির্বাচিত হলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ আরো অধিকার বঞ্চিত হবেন।

এসব সংকট তা হলে কিভাবে কাটাবেন বাইডেন? তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মুল্যবোধ পুনরুদ্ধার করতে পারবেন? কেমন হবে তার পররাষ্ট্রনীতি? যুক্তরাষ্ট্র কি কেবলই সে দেশের মানুষের কথা বলবেন; নাকি বিশ্ব রাজনীতি ও মানুষের জন্য-ও ভাববেন ও করবেন? বাণিজ্যযুদ্ধ, লাভলোকসানের হিসাব কি শুধু নিজেদের জন্যই হবে; নাকি সাম্য ও মানুষের সমঅধিকারের দিকেও নজর দেবেন? প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেমন হবেন জো বাইডেন? তার প্রেসিডেন্সি-ইবা কেমন হবে?
ট্রাম্প মহামারি চ্যালেঞ্জ পেয়েছেন; সফল হতে পারেননি। করোনা নিয়ে উদাসীনতা ও অবজ্ঞা, মানুষকে ভীতবিহ্বল করেছে; মৃত্যুর রেকর্ড গড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। অর্থনীতিতে মন্দাভাব এসেছে। প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়েছে। বড় দাতা হয়েও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শেষঅবধি এই আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এ নিয়ে বেশ হাসাহাসি হয়েছে বিশ্ব জুড়ে। একইভাবে আরো অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে দেশটি।

বাইডেন দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি হয়তো চাইবেন যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক রাজনীতির নেতৃত্বের আসনে ফিরিয়ে আনতে। তবে এটা ঠিক যে করোনা ভ্যাকসিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেতৃত্ব নিয়ে ভাববেন বাইডেন। যে সব আন্তর্জাতিক সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগ্য প্রতিনিধির সংকট রয়েছে; তাও পুরণ করবেন তিনি। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন বাইডেন। তবে বিশ্ব জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে বাণিজ্যযুদ্ধ, সেখান থেকে এই মুহুর্তে দেশটির সরে আসার কোন পথ নেই। বাইডেনও হয়তো তা চাইবেন না। বরং এক্ষেত্রে বাইডেন আরো রক্ষণশীল নীতি নিতে পারেন।

ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রথাগত পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা হলেও হারিয়েছে। মুলধারার রাজনীতির বাইরে থেকে আসা ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছেন বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মযাদা রক্ষায়। বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্টকে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সরে এসেছে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে না জড়ালেও সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র বিরত রেখেছে নিজেকে। মিত্র দেশ বা জাতির স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। রক্ষণশীল পথেই চলেছেন। নেতৃত্বের আসন ছেড়ে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের সেই পররাষ্ট্রনীতি বাইডেনের সময় কতটা বদলাবে? যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে নিজের ও মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা করে; বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক, সেটাকে সচল ও ব্যবহার করে কূটনৈতিক স্বার্থ আদায় করে- সেদিকেই তাকিয়ে সবাই। অর্থাৎ ট্রাম্পের রক্ষণশীল পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে বাইডেন কি পারবেন বৈশ্বিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠা করতে?
ট্রাম্পের সময় মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখেনি যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়েছে। জার্মান ও ফ্রান্সসহ অনেক মিত্র দেশই ট্রাম্পের নানা আচরণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেশ বিরক্ত। এখন বাইডেন এসব মিত্র ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জোটের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করবেন, নাকি ট্রাম্পের পুরনো পথেই হাঁটবেন? নিরাপত্তায় রক্ষণশীল নাকি সামস্টিক নীতি নেবেন বাইডেন? বিশেষ করে চীনের সম্প্রসারণ রাজনীতির কারণে দীর্ঘদিনের মিত্র ভারতসহ এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে কি করেন বাইডেন, সেটা দেখার বিষয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মুল শক্তি নিজেদের রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুল্যবোধের আদান-প্রদান। ট্রাম্পের সময় সেখান থেকে সরে এসে জনতুষ্টির রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিভাজনের রাজনীতি করে এমন অনেক দেশ ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে জনতুষ্টির রাজনীতি নেই। বাইডেন হয়তো সেখান থেকে সরে এসে গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের দেশগুলোর দিকে নজর দিতে পারেন।
মধ্যপ্রাচ্য সামলানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোন সংঘাতে জড়াননি। সংঘাতের সৃষ্টিও করেনি। কিন্তু এখানে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনা নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির প্রশ্রয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে। সৌদিআরব, ইরান ও তুরস্কের জটিল আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে বাইডেনকে। এ জন্য সাম্য ও শক্তির পথ বেছে নিতে হবে। বিশেষ করে  ট্রাম্পের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে সৌদিআরব, আরব আমিরাত ও ইসরায়েল বলয়ের দিকে ঝুকেছে, সেখান থেকে বাইডেন বেরিয়ে আসে কি না, এলেও পথ কি হবে- সেটাও বিবেচ্য বিষয়।
অবশ্য তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বাইডেন ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের। তবে সৈন্য প্রত্যাহার করলেও মুসলিম বলয়ে শক্তি অক্ষুন্ন রাখবেন বলেই ধারণা করা হয়। বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের সখ্যতা থেকে বেরিয়ে এসে সেখানে গণতান্ত্রিক মুল্যবোধকে পুনরোজ্জিবিত করার দিকে নজর দিতে পারেন।

জো বাইডেন বাম ঘরানার। তার সময়ে জনতুষ্টি ও কর্তৃত্ববাদের দেশ ও নেতারা এবং রাজনীতি কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বৈশ্বিকভাবে গণতান্ত্রিক মুল্যবোধের উত্থান ঘটতে পারে। বিশেষ করে চীনের সম্প্রসারণবাদ রাজনীতির বিপরীতে সে দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বাইডেন কি ধরণের পররাষ্ট্রনীতি নেয়- সেদিকে নজর থাকবে সবার।
রাশিয়ার সঙ্গে পারমানবিক অস্ত্র চুক্তিতে ফেরে কি না যুক্তরাষ্ট্র এবং ফিরলেও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কতটুকু স্বাভাবিক হয়, সেটাও দেখার বিষয়। কারণ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনের সময় রাশিয়ান হ্যাকারদের কর্মকান্ড ডেমোক্র্যাটদের বেশ বিপদে ফেলেছিল। তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হতে পারে। কারণ ইতোমধ্যেই বাইডেন ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শর্ত মানলে সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথাও বলেছেন।
আপাতত: ২০ জানুয়ারি পযন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ি সেদিন দুপুর ১২টায় নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস শপথ গ্রহণ করে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শুরু হবে সেদিন থেকেই। বাইডেন পারবেন কি সেই আমেরিকাকে ফিরিয়ে আনতে?

৮ নভেম্বর ২০২০।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments