‘পি.এফ.৬০৬-৪৮’: গোপন নথিতে নতুন বঙ্গবন্ধু । প্রতীক ইজাজ

  •  
  •  
  •  
  •  

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকলে শতবর্ষী হতেন এবছর। ‘৭৫ এর ১৫ আগস্টে নির্মমভাবে নিহত হন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার ও স্থপতি।জাতীয় শোকদিবসে প্রশান্তিকার আয়োজন ‘রক্তস্নাত শোকাহত আগস্ট’ সংখ্যায় ঢাকা থেকে লিখেছেন সাংবাদিক প্রতীক ইজাজ।

১৩ জানুয়ারি ১৯৪৮ সাল। এখন যেটা বাংলা একাডেমি, তখন সেটা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘বর্ধমান হাউস’। সেদিন এই হাউসেই সভা চলছিল পাকিস্তান মুসলীম লীগের। উপস্থিত ছিলো পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আই আই চুন্দ্রিগর, পাকিস্তান মুসলীম লীগ নেতা আবদুর রব নিশতার ও পীরজাদা আবদুস সাত্তার। এ সময় সেখানে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রকাশিত তিন টাকা মূল্যের ‘পূর্ব পাকিস্তানের দুর্ভাগা জনসাধারণ, কৈফিয়ত দিতে হবে আমাদের দাবী’ শীর্ষক পুস্তিকা বিক্রি করছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের কিছু কর্মী।

ব্যস, সে রিপোর্ট চলে গেল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার ডিআইজি’র কাছে। সেখানে এক সাব ইন্সপেক্টর লিখলেন, ‘স্যার, আই বেগ টু রিপোর্ট দ্যট বিং ডেপুটেড বাই ডিএসআই …। সাম আননোন ওয়ার্কার্স অব ইস্টার্ন পাকিস্তান মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্প সোল্ড বুকলেটস অ্যাট থ্রি টাকা ইচ ইনটাইটেলড ‘পুর্ব পাকিস্তানে দুর্ভাগা জনসাধারণ কৈফিয়ত দিতে হবে আমাদের দাবী, পাবলিশড বাই এসকে মুজিবর রহমান, বি.এ. এন্ড নাইমুদ্দিন আহমদ, বি.এ. (অনার্স) ইস্টার্ন পাকিস্তান মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্প অব ১৫০ মোগলটুলি, ঢাকা। এ কপি অব দ্য বুকলেট ইজ এনক্লোসড।’

রিপোর্টটি নথিভুক্ত হলো একটি নির্দিষ্ট ফাইলে- পি.এফ.৬০৬-৪৮।

হ্যাঁ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরদারির কথাই বলছিলাম। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরপরই বঙ্গবন্ধুর দেশব্যাপি প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচি, ব্যক্তিগত জীবন ও অন্যান্য কর্মকান্ডের ওপর নজরদারি শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থা, তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে থাকে।

বিশেষ করে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের আন্দোলনে প্রতি সমর্থন জানানোর পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর ওপর নজরদারি আরো বেড়ে যায়।

পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত বঙ্গবন্ধুর কর্মকান্ড পযবেক্ষণ করত, তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন লিখত ও সেগুলো উর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাত। এসব তথ্য নথিভুক্ত করতে ১৯৪৮ সালেই গোয়েন্দা সংস্থা বঙ্গবন্ধুর নামে একটি ব্যক্তিগত ফাইল খোলে ও তাতে সকল তথ্য সংরক্ষণ করা শুরু করে। ‘পি.এফ.৬০৬-৪৮’- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে খোলা সেই ব্যক্তিগত ফাইল।

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডের ওপর পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের নজরদারির ও ‘পি.এফ’ ফাইলে সংরক্ষিত গোপন নথিগুলোর অস্তিত্ব বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে পারেন ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। পরে প্রধানমন্ত্রীর নিবিড় যত্ন, ধৈয্য ও দক্ষতায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশ হয় ‘পি.এফ’ ফাইলে সংরক্ষিত সেসব দুর্লভ নথিপত্র নিয়ে ইতিহাসের আকরগ্রন্থ ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভলিউম ওয়ান (১৯৪৮-১৯৫০)’। সম্পাদনা করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার ৪৬টি ফাইলে ৪০ হাজার পৃষ্ঠার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে রচিত ১৪ খন্ডের ভলিউমের প্রথম খন্ড এটি। এই প্রথম খন্ডে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন, সংগ্রাম, ভাষণ, গতিবিধি এবং কর্মকান্ডের বিভিন্ন তথ্য সংযোজিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট বইটির সম্পাদনাসহ প্রকাশে সার্বিকভাবে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাভেদ পাটোয়ারীর নেতৃত্বে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ২২ সদস্যের একটি দল পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার বিশাল এই তথ্য ভান্ডারকে নথি হিসেবে প্রস্তুত করেন। হাক্কানী পাবলিশার্স বইটির প্রকাশক।

বইটা মাঝে মধ্যে পড়ি। নাড়িচাড়ি। দেখি। গন্ধ নেই। হাত বুলাই। পৃষ্ঠা উল্টায়। নিবিষ্ট মনে প্রচ্ছদে সাদাকালোয় জলদগম্ভির বঙ্গবন্ধুর ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকি। পুরোটা পড়া হয়নি এখনো। পড়া শেষ হবে বলেও মনে হয় না। পৃষ্ঠা উল্টাই, তাকিয়ে থাকি, সামনে এগোতে পারি না। শব্দগুলো ছবি হয়ে যায়, ফুল হয়ে যায়। ভেসে উঠেন বঙ্গবন্ধু। কখনো মোটা ফ্রেমের চশমা, কখনো চকিত চাহনি, কখনো সংসারে স্বজন পরিবৃত। আমার পড়া হয় না। ছবির মতো, মুগ্ধ হয়ে, আমি শুধু বঙ্গবন্ধুকে দেখি।

বইটা হাতে নিলেই চোখ ভিজে যায়। কেঁদে ওঠে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসা। আমরাও কাঁদি। রক্তমাখা সিঁড়ি, কালো পাইপ, কৃষ্ণচূড়ামুখ। টানটান বুক নিয়ে অজানুলম্বিত মানুষটি এখনো আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় সংঘাতে, সংলাপে। পথ দেখায় মুক্তির, আন্দোলনের। বুকের ভেতর থেকে বারবার উচ্চারিত হন বঙ্গবন্ধু।

আমার বইটা নিয়েই লেখার কথা। এমন বই দেখতে পারাটা সৌভাগ্যের। এর স্পর্শ, গন্ধও আনন্দের, অহংকারে উল্লসিত করে, গর্বিত করে। এমন বই সংগ্রহে রাখা, পড়া, বহন করা, ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকাটাও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা। এ  শুধু পড়ার নয়; উপলব্ধি, বোঝার। বঙ্গবন্ধু, তার স্বদেশ ও মানুষপ্রেম, বিচক্ষণ রাজনীতিবোধ ও সমাজ সচেনতা, মানবিক উদারতা- এসব উপলব্ধি করতে পারলেই কেবল বঙ্গবন্ধুকে বোঝা যাবে, পাওয়া যাবে। কেননা রাজনীতির এমন দার্শনিক, এমন প্রাকৃত রাজনীতিক, এমন বিরল প্রতিভার মানুষ পৃথিবীতে একশ-দেড়শ বছর পর পর একজন করে আসেন। আমরা বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি। এ আমাদের পরম সৌভাগ্য।

৫৮২ পৃষ্ঠার বই। এমন গ্রন্থ প্রকাশ করাও দুরুহ। পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন গোয়েন্দা দপ্তরে সংরক্ষিত গোপনীয় প্রতিবেদনগুলো জীর্ণ, ভঙ্গুর এবং বহুক্ষেত্র দুষ্পাঠ্য অবস্থায় পাওয়া গেছে। সেগুলো পাঠোদ্ধার ও সমন্বয় করে কালানুক্রমিকভাবে বিন্যস্ত করাও ভীষন জটিল কাজ।

ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা, দেশপ্রেম- অর্থাৎ ছবির মতো উঠে এসেছেন বঙ্গবন্ধু। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কিছু চিঠি, যেগুলো শেষঅবধি প্রাপকের কাছে পৌঁছেনি, সেগুলোর মুল্যমান অসীম। একজন নেতা কতটা নিবিড়ভাবে দেশ ও রাজনীতিকে বুকে ধারণ করে, সাহস ও সততা নিয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন, এসব গোয়েন্দা রিপোর্ট সেসবেরই প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি, নেতৃত্ব, সমসাময়িক ভাবনার গভীরতা, দৃঢ় অনুভুতি ও শক্ত মানসিক অবস্থা, অর্থাৎ একজন নেতা যে ধীরে ধীরে মানুষকে সাথে নিয়ে স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছেন, তার স্পষ্ট চিত্রায়ন এসব রিপোর্ট।

পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের এসব নথির বেশ কয়েক জায়গায় বঙ্গবন্ধুকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘সিকিউরিটি প্রিজনার শেখ মুজিবুর’ হিসেবে।

এসব নথিপত্রে উঠে এসেছে সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ভাষা আন্দোলন ও বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, খাদ্য সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, কর্ডন প্রথা, জনসাধারণের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। এমনকি ১৯৪৮ সাল থেকেই হিন্দুদের প্রতি পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক নীতি এবং ভারত-বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়েছে এসব গোপন নথিপত্রে।

বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান, আন্দোলন বেগবান করতে তার রাজনৈতিক কৌশল ও নীতি প্রণয়ণ, এমনতর না জানা অসংখ্য তথ্যের আকরিক দলিল। এর মধ্য দিয়ে মানুষ যেমন জানবে স্বাধীনতার ইতিহাসের আদ্যোপান্ত, তেমনি না জেনে এতদিন যারা বিতর্ক ও সমালোচনা করে আসছেন, সমাধান হবে সেসব কুতর্কেরও। কেননা পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের বহু প্রতিবেদনে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বলা আছে।

ফরিদপুর, ১৯ জুলাই ১৯৪৮। ফরিদপুরের জেলা গোয়েন্দা শাখার এসপি পুর্ব বাংলার প্রধান গোয়েন্দা কাযালয়ে সেদিন একটি প্রতিবেদন পাঠায়। প্রতিবেদনে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনবৃত্তান্ত, বিভিন্ন সভায় তার বক্তৃতা, উর্দুকে সমর্থন করে সংসদের দেওয়া মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য ও রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে পাকিস্তান সরকারের সমর্থনের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ড, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অনুসরণ ও সমর্থন ইত্যাদি বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের একটি জায়গায় উল্লেখ করা হয়- ‘সিক্রেট ইনফরমেশন ওয়াজ রিসিভড অন ১২.৩.৪৮ দ্যাট দি সাবজেক্ট (বঙ্গবন্ধু) অ্যালং উইথ আদার টু পার্ট ইন দ্য ডিসকাশন হেল্ড অ্যাট ফজলুল হক হল অন ১০.৩.৪৮ এন্ড গেফ অপিনিয়ন ইন ফেভার অব ভায়োলেটিং সেকশন ১৪৪ সিআর.পি.সি অন ১১.৩.৪৮। অন দিস ডিসিশন, স্মল ব্যাচেস অব হিন্দু এন্ড মুসলিম স্টুডেন্টস ওয়ার সেন্ট আউট অন ১১.৩.৪৮ টুক পিকেট দ্য জিপিও, দ্য সেক্রেটারিয়েট এন্ড আদার ইমপর্টেন্ট গভ. অফিসেস। দ্য সাবজেক্ট (বঙ্গবন্ধু) অন ১১.৩.৪৮ফর ভায়োলেটিং দ্য অর্ডারস।
অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সচিবালয় এবং জিপিও’র সামনে ধর্মঘটে ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করেন ও নিজে অংশ নেন। সচিবালয়ের সামনের রাস্তা থেকে বঙ্গবন্ধুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সভা-সমাবেশ করেছেন। প্রচারপত্র, লিফলেট বিতরণের ব্যবস্থা করেছেন। নিজে বহু পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন। এগুলো গোপন তৎপরতা ছিল না। লিফলেট এবং পুস্তিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম মুদ্রিত ছিল। তিনি আরবি হরফে বাংলা লেখার তীব্র সমালোচনা করেন।

এসব প্রতিবেদনে রাষ্ট্র ভাষার আন্দোলনকে ‘ভাষা বিতর্ক’ বলা হয়েছে। নথিপত্রের কোথাও সরাসরি বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, কোথাও ‘দ্য সাবজেক্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাকে।

জমিদারি প্রথা বাতিলের দাবিতে তখন সোচ্চার পুর্ববঙ্গের কৃষিজীবী মানুষ। বঙ্গবন্ধু জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৪৮ সালের ১ জুন নরসিংদির ঈদগাাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, সব জমিদার হোক হিন্দু অথবা মুসলিম, কলকাতা অথবা বড় বড় শহরে বাস করেন। আমাদের রাজস্ব চলে যায় তাদের কাছে। সে সব টাকা কোথায় ব্যয় হয়? তারা কে? তারা দেশের শত্রু।

সেদিন বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, বিনা ক্ষতিপূরণে পূর্ব বাংলার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে। পূর্ব বাংলার মানুষের খাদ্য নাই, বস্ত্র নাই, প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নাই। দেশ দুর্নীতিতে ভরে গেছে, একটি দুর্ভিক্ষ প্রায় আসন্ন। তাই জনগণকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, না খেয়ে মরার চেয়ে বুকে বুলেট নিয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। এ অবস্থায় জেহাদই কাম্য।’

সে জনসভার কথা তো বটেই, পরে ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পুর্ব বাংলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ এক সপ্তাহের একটি বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠায় প্রধান গোয়েন্দা কাযালয়ে। প্রতিবেদনে ফরিদপুর, গেপালগঞ্জ ও মাদারিপুরে বেশকিছু জনসভায় বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বক্তৃতার সারমর্ম, গোপালগঞ্জে কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলোচনা, জমিদারি প্রথার বিলুপ্তের দাবিতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান, খাদ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে ব্যর্থ হওয়ায় এমএলএ ও সরকারের সমালোচনাসহ নানা বিষয় উল্লেখ করা হয়।

সে প্রতিবেদনের এক জায়গায় বলা হয়- ‘হি আস্ক দ্য পিপল নট টু পে এনি সাবক্রিপসশনস টু এনি ফান্ডস ইফ ফোর্সড ইজ ইউজড। হি অ্যাডভাইসড দ্য পিপল টু ক্রিয়েট পাবলিক অপিনিয়ন ইন ফেভার অব অ্যাবোলিশন অব দ্য জমিদারি সিস্টেম উইদাউট এনি কমপেনসেশন …।

বেশকিছু চিঠি ও কারাগারে বঙ্গবন্‌ধুর সঙ্গে দেখা করতে স্বজনদের আবেদনপত্র পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর ‘পিএফ’ ফাইলে। আবেদন অনুযায়ি মাঝেমধ্যে স্বজনদের বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে দিলেও চিঠিগুলোর অধিকাংশই বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছেনি। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর এসব চিঠি আটকে দেয়। ৬২ বছর পর সে সব চিঠি মুখ দেখলো আলোর!

একটা আবেদনের কথা বলি। ১৯৫০ সালের মে মাস। বঙ্গবন্ধু তখন ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগারে। ৮ মে বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছেলের সঙ্গে দেখা করার জন্য ঢাকার গোয়েন্দা সংস্থার ডিআইজি বরাবর একটি আবেদনপত্র লেখেন- ‘স্যার, আই হ্যাভ দ্য অনার টু স্টেট দ্যাট আই ইনটেন্ড টু সি মাই সন শেখ মুজিবুর রহমান, হু ইজ নাও ইন সেন্ট্রাল জেল ঢাকা…।’ আবেদনে শেখ লুৎফর রহমান বর্তমান ঠিকানা লেখেন- ’২৫ কামিনি ভুষন, রুদ্র রোড, ঢাকা’।

সে আবেদন অনুযায়ি পরদিন সকাল ১১টায় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার উপস্থিতিতে শেখ লুৎফর রহমান ছেলে বঙ্গবন্‌ধুর সঙ্গে দেখা করেন। সেদিনই পুরান ঢাকার ৭, ওয়াইজ ঘাট রোড, পুর্ব বাংলা গোয়েন্দা শাখা থেকে সে সাক্ষাতে বাবা-ছেলের কি কথা হয়েছিল সে সব জানিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাঠানো হয় কেন্দ্রিয় কাযালয়ে। সেখানে বলা হয়, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত আলোচনা হয়েছে, আপত্তিজনক কোন কথাবার্তা হয়নি।

জেপু নামে এক আত্মীয়কে লেখা বঙ্গবন্ধুর এক চিঠির সন্ধানও মিলেছে গোয়েন্দাদের গোপন ফাইলে। ‘সেন্ট্রাল জেল, সিকিউরিটি প্রিজনার, ডিভিশন ১, ঢাকা, ২৬.৫.৫০’। বঙ্গবন্ধু সেখানে লেখেন- মাই ডিয়ার জেপু, …আমি জানি, যারা বুদ্ধি দিয়ে চলে, এ দুনিয়া তাদের কাছে রঙ্গশালা মাত্র, আর যারা অনুভূতির দ্বারা পরিচালিত হয়, তাদের কাছে এটা বিয়োগান্তক। আমি নিশ্চিত, মিথ্যা আর সত্যের দীর্ঘ যুদ্ধে মিথ্যা হয়ত প্রথমবার জয়ী হয়, কিন্তু শেষ যুদ্ধে জয়ী হয় সত্য।’

চিঠির শেষে বঙ্গবন্ধু লেখেন, আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে তুমি ‘মুচলেকা’ শব্দটি আমাকে লেখার সাহস পেলে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে আমি মাথা নত করতে শিখিনি।’

বঙ্গবন্ধু আরো লেখেন, …তোমার জানা উচিৎ, যে ব্যক্তি আদর্শের জন্য, তার দেশ ও মানবতার মঙ্গলের জন্যনিজেকে নিয়োজিত করেছে, তার কাছে জীবনের মানে অনেক ব্যপক। সেই তুলনায় জীবনের যন্ত্রণা তার কাছে ততটাই কম গুরুত্ব পায়।’
এই চিঠির ভাষা, শব্দ, দর্শন, মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও অবিচল আস্থা স্পষ্ট করে তোলে।

আরেক চিঠিতে উঠে আসে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। ১৯৫০ সালের ২১ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ফরিদপুর কারাগারে বন্দি শেখ মুজিব লেখেন- ‘জনাব সোহরাওয়ার্দী সাহেব, … যারা নীতির পক্ষে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত, তারা খুব কমই পরাজিত হয়। মহৎ কিছু অর্জিত হয় মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে। আল্লাহ যে কারো চেয়ে শক্তিশালী, আর আমি তার কাছেই সুবিচার চাইব।’

এমন অসংখ্য অজানা গোপন দলিল সন্নিবিষ্ট ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থে। এ যেন কেবল গোপন নথিই নয়; স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের এক অমোঘ ইতিহাস। প্রতিটি নথি, চিঠি, বক্তব্য, বিবৃতি- কায়ক্লেসে খেটে খাওয়া এদেশের মানুষের মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক পথনির্দেশক, দর্শন, বেদবাক্য।

এই গ্রন্থ কেবল মুদ্রিত কালোঅক্ষরের ইতিহাস নয়, বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নানা অধ্যায়ের আরও স্বচ্ছ, বস্তুনিষ্ঠ অকাট্য দলিল। এসব নথিপত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের উৎস। এর মূল্য অপরিসীম, অসীম। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ও বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের ইতিহাস যে এক ও অভিন্ন, তারই প্রমানপত্র।

বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। বঙ্গবন্ধু ও অবিচ্ছেদ্য বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলাভাষা আন্দোলন ও ভাষার প্রতি মমত্ববোধ, সর্বপরি ইতিহাসে ও পঠনে, মানবিক বোধে ও চেতনায়, দেশের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বের এসব গোপনীয় নথিপত্র উন্মুক্ত করে বঙ্গবন্ধুকে নতুন করে চিনিয়েছেন আপনি। আমাদের সামনে এ এক নতুন সমুজ্জ্বল জাতির পিতা।

পিতা, আমরা এখনো কাজে, কারণে, সংগ্রামে আপনাকে খুঁজি। এখনো ১৫ আগস্ট এলে আমরা বিষন্ন হয়ে পড়ি, মন খারাপ হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই রক্তসিঁড়ি আমাদের বুকের ওপর উঠে আসে। জলে ভিজে যায় চোখ। আমরা আপনার বজ্রকন্ঠের ভাষণ শুনি, মুখ পড়ি, আবার উদ্বেলিত সাহসী হয়ে উঠি। মনটা খারাপ হয় এই ভেবে যে, জাতি হিসেবে আমরা কতটা অকৃতজ্ঞ, আপনার মতো একজন মানুষকে পিতাকে নির্বিঘ্নে হত্যা করলাম।

কাল রাতে যখন বাড়ি ফিরছিলাম, চারদিকে আপনার জলদগম্ভীর কন্ঠ। চোখের জল রাতের অন্ধকারকে আরো বেশি গভীর করে তোলে। আমি সক্রিয় রাজনীতি করি না। রাজনৈতিক মিছিলে স্লোগান তুলি না। আমি জয় বাংলা বলি, জয় বঙ্গবন্ধু বলি। বুকের ভেতর যে গল্প, আগুন, বিপ্লব- তার অনেককিছুই তো আপনার থেকেই আসা। আমি আপনাকে পাহাড়সম চিতল বুকের একজন সাহসী নেতা হিসেবে জানি, মানি, অনুসরণ করি। আপনি দেশে, বিশ্ব লোকালয়ে মুক্তিপাগল মানুষের ঠিকানা।

বঙ্গবন্ধু আপনি আমাদের মুক্তিদাতা। স্বজাত্যবোধ ও স্বদেশপ্রেমে- আমাদের শক্তি, সাহস ও উদ্দীপনা। ব্যক্তি বা দলকে ছাড়িয়ে আপনি মুক্তিকামী মানুষের আকাশে ধ্রুবতারা।

বঙ্গবন্ধু, আপনি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেন। আপনি এসেছিলেন বলেই আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। আজ আমরা সেই সবুজ মুক্ত স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক। আপনি আপনার গোটা জীবন উৎসর্গ করেছেন আমাদের জন্য। একটাই তো জীবন। সে জীবনটা আপনি আমাদের দিয়ে গেলেন! এ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমাদের জানা নেই।

শুধু জানবেন, এই দেশ মানেই আপনি। আমি স্বদেশ মানে আপনাকে দেখি। আপনার চোখ হাসি দেখি। এই মানচিত্র, প্রিয় মাতৃভূমি- সবই তো আপনি। আমরা আপনাতেই যাপন করি জীবন, পিতা।

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ভোর চারটা, ২০২০
পশ্চিম মালিবাগ, ঢাকা।

প্রতীক ইজাজ
সাংবাদিক, লেখক
ঢাকা, বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments