পেঁয়াজে সেঞ্চুরি: বিপদে ক্রেতা, নিশ্চিত- নিরুদ্বেগ মজুতদারেরা । রণেশ মৈত্র

  •  
  •  
  •  
  •  

দাম আগের থেকেই বাড়িয়ে দিচ্ছিল ব্যবসায়ীরা। আমি নিজেই গত ১২ সেপ্টেম্বর হাফ কেজি পেঁয়াজ কিনলাম ৬০ টাকা কেজি দরে। এই দাম টাও ছিল অযৌতিকভাবে বেশী। ন্যায্য দাম হলে দুই কেজি কিনতাম। কারণ এখন তো আগের মত রোজ বাজারে যাই না-বাইরেও না করোনার কারণে। হঠাৎ গত ১৪ সেপ্টেম্বর টেলিভিশন চ্যানেলগুলি প্রচার করলো ভারত আকস্মিকভাবে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছে। আর যায় কোথা? এ সুযোগ হাতছাড়া করার মত বোকা তো ব্যবসায়ীরা-মওজুতদারেরা নন-অন্তত: পক্ষে বাংলাদেশে। ওঁদের মধ্যে কেউ কেউ দোকান বন্ধ করে দিলেন ঘোষণা করলেন, পেঁয়াজ নেই এতে আরও এক দফা দাম বাড়ালো অন্যান্য ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যের আগেই পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকায় পৌঁছালো। খদ্দেরদের নাভিশ্বাস।

পেঁয়াজ সেঞ্চুরীটা করেই ফেললো।

সরকারিভাবে ঘোষণা করা হলো উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই। প্রচুর পেঁয়াজ সারা দেশে মজুদ আছে। তা ছাড়াও টি.সি.বি দেশজুড়ে ৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রী করতে শুরু করেছে।
সত্য কথাই বটে। পেঁয়াজের যথেষ্ট মওজুদ আছে। কোটি কোটি মানুষও তা জানে। মানুষ এও জানে যে অসৎ ব্যবসায়ী ও মওজুতদারেরা বিপুল পরিমাণ মওজুদ পেঁয়াজ লুকিয়ে ফেলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে অস্বাভাবিক হারে মুনাফা করার লক্ষ্যে। এই সত্যটি সরকারের আরও বেশী জানা। সরকার পরিস্থিতি দৃষ্টে হুঁশিয়ারী দেন পেঁয়াজের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি সরকার চোখ বুঁজে সইবে না। যারা বেশী দামে বিক্রী করবেন, মোবাইল কোর্ট তাদেরকে শাস্তি দেবেন। মোবাইল কোর্টও কোথাও কোথাও বেরোলো-বোকা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কেউ কেউ শাস্তি পেলেন বেশী দামে পেঁয়াজ বিক্রী করার জন্য শাস্তি পেলেন জেল খাটতে গেলেন বা জরিমানা দিলেন বা উভয় শাস্তিই পেলেন।
কিন্তু আসল ক্রিমিন্যালরা? বড় বড় ব্যবসায়ী মজুতদার মুনাফা খোরেরা? তারা চতুর। তারা দোকান বন্ধ রাখলো মোবাইল কোর্ট বেরোনোর খবরে। তাই তারা বেঁচেও গেল। সরকার তাদের টিকিটও ছুঁতে পারলো না-এ যাবতন কোনদিনী পারেও নি। অসহায়েরমত ক্রেতারা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই শুধু এ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।

ভারত পেঁয়াজ রফতানী বন্ধের ঘোষণা দিল। আর সাথে সাথে অর্থাৎ চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই ঢাকা সহ বাংলাদেশের সর্বত্র পেঁয়াজের দাম বাড়তে শুরু করলো। প্রশ্ন থাকে যে মুহুর্তে ভারত ঐ ঘোষণা দিল সাথে সাথেই কি প্রদেশে পেঁয়াজের মজুদ নি:শেষ হয়ে গেল? তা কখনও হতে পারে? পারে-পারে বাংলাদেশে। এখন পারে, অতীতেও পেরেছে। হয়তো বা ভবিষ্যতেও পারবে। পারছে কেন? কারণ এ মওজুতদার বড় ব্যবসায়ীদের গুদামে হানা দিতে কদাপি পুলিশ পাঠানো হয় না। কেন হয় না? কারণ তাদের পেছনে দামী-দামী নেতারা আছেন। আছেন ছোটবড় আমলারাও। এরপর কে তাদের গায়ে হাত দেবে? নেতা-আমলারা বে-অকুফ নন। ঐ মজুদদারেরা তাদেরকে অনেক দিয়ে থাকেন। তাই  নেতা-আমলারা বে-ঈমানি তো করতে পারেন না? সাধারণ মানুষের কষ্ট? তা হয়েই থাকে। আবারও হলো। তাতে কি? তারা তো মিছিল করবে না। মজুতদারদের গুদামে হামলা করবে না। নেতার বাড়ী-ঘর, কর্তাদের অফিস-বাংলো ঘেরাও করবে না। তাই চিন্তারও কারণ নেই। ছোট ছোট দলের নেতারা হয়তো পত্রিকায় বিবৃতি পাঠাবে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে-আবার কেউ কেউ হয়তো কোথাও কোথাও মানন্ধন করবে। ব্যস প্রতিবাদের পালা এভাবেই শেষ। তাই এগুলি রমহড়ৎব করো। কোন গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই।
মওজুদার মুনাফাখোরেরা এও জানে যে টি.সি.বি’র বিক্রী সাময়িক এবং তার পরিমাণও স্বল্প। বিশাল সংখ্যক ক্রেতার ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর ক্ষমতাও তাদের নেই। তদুপরি বেশীর ভাগ ক্রেতা জানতেও পারে না-কবে কোথায় তারা পেঁয়াজের ট্রাক নিয়ে দাঁড়াবে। যে স্বল্প সংখ্যক ক্রেতা তার হদিস পান-তাঁরাও দীর্ঘ লাইনের পাল্লায় পড়ে হাঁপিয়ে ওঠেন। সারা দিন না হলেও কয়েক ঘন্টা তো দাঁড়িয়ে থাকতেই হয়। তারপরও লাইন শেষে না-ও পাওয়া যেতে পারে। পেলেও লাভের গুড় পিঁপড়ায়। কারণ সারাদিন  কয়েক ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের দৈনন্দিন রুজি-রোজগার ব্যাহত হয়। ফলে আসলে তাঁরা লাভবান হননা। ট্রাকের চাইতে রিক্সা ভ্যানে করে পাড়ায় বিক্রী করলে বাড়ীর গিন্নীরাই কিনতে পারেন তবে তা আগ্রিম বা তাৎক্ষণিক জানান দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ ষিয়টি ভেবে দেখতে পারেন।

কাঁচা লংকার ট্রিপল সেঞ্চুরী
ভাগিস কাঁচালংকা ভারত থেকে আসে না বা অন্য কোন দেশ থেকেও আমদানী করা হয় না। দেশের কৃষকরাই বিস্তর উৎপাদন করে এই দৈনন্দিন অবশ্য প্রয়োজনীয় মসলার চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। শুধুমাত্র অতি বৃষ্টি হলে কাঁচামরিচের ফলন কমে যায়।
এবারে অবশ্য খুব একটা অতিবৃষ্টি না হলেও মাঝে মাঝে বৃষ্টি একেবারে কমও হয় নি। তাতে উৎপাদন খানিকটা ব্যাহত হয়েছে সত্যি। কিন্তু কাঁচা মরিচের মূল্য কেজি প্রতি ৩০০ টাকায় উঠে গেল। ট্রিপল সেঞ্চুরী করলো। এমন মূল্যবৃদ্ধি অতীতে কাঁচামরিচের ক্ষেত্রে কোন দিন হয়নি। দাম অবশ্য কয়েক বছর আগে বেড়েছিল কাঁচামরিচের তখন পণ্যটি ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রী হচ্ছিল। মানুষ হাহাকার করছিল-সংবাপত্রগুলিও শিরোনামে ঐ অশ্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির খবর গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছিল। কিন্তু এবার ৩০০ টাকা কেজি দরে কাঁচামরিচ বিক্রী হলে তার ঝালের কোন খবর তেমনভাবে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে দেখিনি। ধকলটা ক্রেতদের উপর দিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এখন ৩০০ টাকা ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রী হচ্ছে। কিন্তু এটাও অতিরিক্ত খুব বেশী। দেখা যাচ্ছে পত্র-পত্রিকাই না শুধু-সরকারও নির্বিকার। পত্র-পত্রিকা যদি জোরে সোরে খবর প্রকাশ করতো-টেলিভিশন চ্যনেলগুলিও যদি পেঁয়াজের মত সক্রিয় হতো-তাহলে হয়াতো সরকারও কিছুটা নড়েচড়ে বসতো। তাই কাঁচামরিচের ট্রিপল সেঞ্চুরী চুপি সারেই সকলকে সয়ে যেত হলো।

সবজীগুলিও তো প্রায় সেঞ্চুরী করলো
পূরোপুরি দেশেই উৎপাদিত হয় নানা জাতীয় শাক-সবজি। আমাদের দেশের কৃষকেরাই তা উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মেটান। বিদেশ থেকে আমদানী নয়-এই পণ্যগুলির প্রায় সবই পৃথিবীর নানা দেশে রফতানী করে কম-বেশী বিদেশী মুদ্রা অর্জন করে থাকে বাংলাদেশ প্রতি বছর। দামে শাক-সবজী তরীকরারী সর্বদাই বাংলাদেশে অত্যন্ত শস্তা। কিন্তু সেঞ্চুরীর নজর শুধুমাত্র পেঁয়াজ-মরিচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। অনেক সবজীর দামই কেজি প্রতি সেঞ্চুরীতে পৌঁছেছিল। টেলিভিশনের কোন কোন চ্যানেল সবজী কেনা-বেচা লাইভ দেখিয়েছিল তখন তাদের তালিকায় সবজীও স্থান পেয়েছিল। ইদানীং অবশ্য কিছুটা কমেছে তবে স্বাভাবিক হয়নি এখনো।
আদার দামও আকাশ চুম্বি মসলা হিসেবে আদার প্রয়োজনীয়তা-রোগ প্রতিরোধে আদার ক্ষমতা এসব কারণে এই করোনার যুগে আদার চাহিদা এখন মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে। স্বাস্থ্য বিষেষজ্ঞরাও বলেছেন, আদার রস করোনা প্রতিরোধে বহুলাংশে সক্ষম। বিশেষ করে সর্দি, কাশি, জ্বরে, গলা ব্যথায় আদার প্রয়োজনীয়তা তুলনাহীন। আর ঐ সর্দি, কাশি, জ্বর প্রকৃতিই তো, চিকিৎসকদের মতে, করোনার লগ্ন।
এই অতি প্রয়োজনীয়টির চাহিদা শুধুমাত্র উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যে তবুও সীমাবদ্ধ যা দেশের বিপদ ডেকে আনতে পারে জনস্বাস্থের ক্ষেত্রে। বাজারে দেশী বিদেশী দু’চারজনের আদা পাওয়া আয়। দেশীটারইা স্বাদ বা ঝাঁঝ বেশী। বিদেশীটার দামও কম ঝাঁঝও কম। উপকার কোনটার বেশী জানি না। তবে অন্তত: করোনা পরিস্থিতির নির্ভরযোগ্য উন্নতি না হওয়া পর্য্যন্ত বিদেশ থেকে অনেকট বেশী পরিমাণে আদা আমদানী করার জন্য সুপারিশ করছি। এভাবে আমদানী করে দুস্থ ও সঙ্গতিহীন মানুষদেরকে বিনামূল্যে বা অতি স্বল্পমুল্যে বিক্রি করে তাদের দেহের পুষ্টি বাড়ানো যেতে পারে, করোনা প্রতিশোধ শক্তিও বাড়তে পারে। বিষয়টা সরকারের ভাবনায় এলে ভাল হয়-তবে তার ন্যূনতম সম্ভাবনা দেখি না কারণ অভিজ্ঞতা তেমন না।
তবে মধ্যবিত্তরাও তাতে উপকৃত হবেন কারণ আমদানী বাড়লে দামও কমবে নীর্ঘাত। তবুও আমাদের ব্যবসায়ী মহলে যে ভয়াবহ অর্থ এবং তা প্রতিরোধে সীমাহীন সরকারি নিষ্ক্রিয়তার ফলে আসলে জনগণ সুফল পাবে কিনা জানি না। বেশী আশাবাদী হওয়ার কারণও সে কারণে নেই।

চালের দামও বাড়ছেই
বাজারে চালের দাম প্রতি সপ্তাহে কেজি প্রতি অন্ততপক্ষে দু’তিন টাকা করে বাড়ছে। বেশী বাড়ছে মোটা চালের দাম কারণ মোটা চাল গরীবের খাদ্য-অর্থাৎ শতকরা কমপক্ষে ৮০ ভাগ মানুষের নিত্যদিনের খাদ্য।
চালের দাম বৃদ্ধির এখবরও বহুবার টেলিভিশন চ্যানেলগুলি বহুদিন লাইভ প্রচার করেছে। কিন্তু তার তেমন কোন প্রতিক্রিয়া সরকারি মহল থেকে পাওয়া যায় নি।
চালের দাম বৃদ্ধির এই বিষয়টি দুর্বোধ্য। চাল উৎপাদনে এবার কোথা থেকেও কোন সমস্যা বা ঘাটতির খবর গণ মাধ্যমগুলিতে চোখে পড়েনি। সরকার দাবী করে থাকেন আমরা ধান উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। এ কথাতে বিশ্বাসও রয়েছে মানুষের। তারপরও গরীব মানুষের এই দৈনন্দিন অপরিহার্য্য পণ্যটির দাম কেন বেড়ে যাচ্ছে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলগুলির কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
উৎপাদন ছাড়াও বিদেশ থেকে কিছু কিছু চাল আমদানী আবার ভাল কোয়ালিটির চিকন চাল রফতানীর খবরও শুনি। অহরহ এও শুনি যে বিস্তর খাদ্য সরকারি গুদামে মজুদ আছে উৎপাদনও হয়েছে প্রচুর। যদি তা সত্য হয় তবে কেন মোটা চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তা ভাল করে তদন্ত করে দেখা দরকার। কোন ক্রমেই যাতে গরীবের খাদ্যের দাম সহনশীলতার বাইরে না যায়-তা অবশ্যই দেখতে হবে যে কোন মূল্যে কারণ ঐ গরীবরাই ১৬ কোটি মানুষের নিত্যদিনের আহার জুগিয়ে থাকে।

শিশু খাদ্য
শিশুখাদ্য এখন তো একমাত্র গরুর দুধই। শারীরিক কারণেই বেশীর ভাগ মা ছয় মাস ধরে শিশুকে বুকের দুধ দিতে পারেন না। তাই গরুর দুধ এর বিকল্প নেই। তার দামও ভয়ানক ভাবে বেড়েছে। তবুও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই খাঁটি দুধ পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়েই বাজারে যা পাওয়া যায় তাই কিনতে হয়, তাই খাওয়াতে হয়। কিন্তু দাম এতটাই বেশী যে ঐ দুধও গরীব মানুষেরা কিনতে পারেন না। ফলে অপুষ্টিতে ভুগছে ব্যাপক সংখ্যক শিশু। দেশে দুধেল গাই এর সংখ্যা স্বল্পতার ফলেই মূলত: এ সংকটের সৃষ্টি। দুর্মূল্যের কারণে প্রাপ্তবয়স্ক, বয়স্ক, সন্তান-সম্ভাবা বধূরাও বহুকাল যাবত দুধকে তাঁদের খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বস্তুত: বাংলাদেশের সকল বাজার দীর্ঘদিন যাবত নিয়ন্ত্রণ করছে অসংখ্য সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিক্টেগুলির পেছনে মদদ ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে সরকারিদলের নেতাদেরও কতিপয় আমলার। তাই সিন্ডিকেটগুলি বহাল তবিয়তে তাদের গণ-বিরোধী ক্রিয়াকলাপ অবাধে চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
সিন্ডিকেটগুলি ভাঙ্গতে দৃঢ়ভাবে সরকারকি এগিয়ে আসবে? মানুষ বাঁচানোর জন্যে তা অপরিহার্য্য।

রণেশ মৈত্র
: রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট
 একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক।
বাংলাদেশ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments