প্রজাপতির ডানায় আর ওল্ড স্পাইসের মোহে আমাদের সেই সব দিনরাত্রি -আহমেদ শরীফ শুভ

  •  
  •  
  •  
  •  

 
সেলিম সোলায়মান একই সময়ে একই শহরে আমাদের সাথে বেড়ে উঠেছেন। সেই অর্থে তিনি সত্যিকারভাবেই আমাদের প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর ‘প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত’ এবং ‘ওল্ড স্পাইস নর্থ স্টার ও অন্যান্য’ বই দু’টি পড়তে গিয়ে মনে হলো এগুলো আমাদের প্রজন্মের শৈশব আর কৈশোরের দর্পণ। যদিও তার ‘ওল্ড স্পাইস নর্থ স্টার ও অন্যান্য’ গ্রন্থে সমকালীন জীবনাচার উঠে এসেছে অনেকটাই, তবুও সেখানে আমাদের শৈশব আর কৈশোরের দিনলিপিই মূখ্য। এ সব দিনলিপি নিছক রোজনামচা নয়, লেখক আমাদের বিচরণ করিয়েছেন ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান আর অর্থনীতির সহজপাঠে। তাই বলে বই দু’টো ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতির তথ্য উপাত্তে ঠাসা নয়, বরং যাপিত জীবনের ধারা বিবরনীতে তিনি খুব সন্তপর্ণে আমাদের নিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতায়, সমাজবিজ্ঞানের মাঠকর্মে এবং ফলিত অর্থনীতির ব্যখ্যায়। আর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন জীবনের গল্প, চারপাশের আখ্যান। সেলিম সোলায়মানের সবচেয়ে বড় সার্থকতা তাঁর দু’টি বইই সব বয়সের পাঠকের সমান পাঠযোগ্য, সমান বোধগম্য। একই বইয়ে সব বয়সের পাঠকে সমানভাবে বেঁধে রাখার সামর্থ সব লেখকের থাকে না। সেলিম সোলায়মানকে সেই বিরল সামর্থের অধিকারী মনে হয়েছে। তাঁর বই দু’টির গভীরে গেলে পাঠকের এই উপলব্ধি দৃঢ় হবে বলে আমার বিশ্বাস।
 
প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত
‘প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত’ সেলিম সোলায়মানের গদ্যে লেখা প্রথম বই। প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের এপ্রিলে। কৈশোরের পথে পা বাড়ানো একজন শিশুর স্মৃতির আয়নায় দেখানো হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহর থেকে ৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত উঠে এসেছে পর্যায়ক্রমে। ১৬ই ডিসেম্বর না এসে ৮ই ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কারণ লেখকের শহর কুমিল্লা শত্রুমুক্ত হয়েছিল এই দিনে। এখানেই তিনি থেমেছেন। এর চেয়ে বেশি  হলে শিশুটির পর্যবেক্ষনে বাহুল্য হয়ে যেত। এখানেই তার পরিমিতি বোধ।
 
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে, আরো সঠিকভাবে বললে হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ শুরু করার গোড়ার দিকে একজন শিশুর তার পরিবারের সাথে গ্রামের বাড়িতে পালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তার শহর মুক্ত হওয়া পর্যন্ত সে যে সব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছে তার অনুপুঙ্খ বিররণ উঠে এসেছে ‘প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত’ বইটিতে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের বিস্তারিত দৃশ্যপট উঠে এলেও বর্ণনায় লেখকের ছিল যথার্থ বাস্তবানুগতা। একজন শিশু সে সময়টাকে যেভাবে দেখেছে, যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গিয়েছে ঠিক সেভাবেই উঠে এসেছে বইয়ের পাতায়। কোথাও বর্ণনার বাহুল্য নেই। ইতিহাসকে বর্ণনা করেছেন ঘটনাপঞ্জির আতিশয্য ছাড়া। তিনি কোন সম্মুখ যুদ্ধের বিবরণ দেননি, কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের অবতারণা করেননি। সেটুকু করলে বাস্তবানুগ হতো না। কারণ, নিজের ভাষ্যে লেখক মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা লিখেছেন। তিনি যা প্রত্যক্ষ করেননি তা লিখেননি। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শৈশবের অভিজ্ঞতায় হওয়ার কথাও নয়। তিনি পুরোটুকোই তুলে ধরেছেন নিজে যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন ঠিক সেভাবেই। তবে তাই বলে মুক্তিযুদ্ধের অত্যাবশ্যকীয় কোন অনুষঙ্গই বাদ যায়নি, মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বা ইতিহাসের ক্ষন্ডাংশ মনে হয়নি। কারণ, যুদ্ধের সবিস্তার বর্ণনা না থাকলেও যুদ্ধের কথা ঘুরে ফিরেই এসেছে। তিনি অনেক জায়গায়ই দিন তারিখ উল্লেখ করেননি সচেতন ভাবে। বলেছেন, কয় তারিখ বা কি বার ছিল ঠিক জানা নেই। ইচ্ছে করলেই তিনি কিন্তু ইতিহাসের দলিল ঘেঁটে কিংবা সংরক্ষণাগারের দ্বারস্থ হয়ে সে সব দিন তারিখ বার এ সব বের করে নিতে পারতেন। করেননি। তাতে শৈশবের চোখে দেখা এবং শৈশব অভিজ্ঞতার ব্যত্যয় হতো। লেখক তাঁর দায়িত্বের পরিসীমার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন।
 
‘প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত’ একজন শিশুর মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা দিয়ে লেখা হলেও এটি কোন শিশুতোষ বই নয়। একই সাথে সব বয়সের পাঠকের উপযোগী করে লেখা বয়েছে বইটি। সব বয়সের পাঠকই বইটি পড়তে সমান স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। পড়তে গিয়ে কোথাও হোঁচট খাবেন না। প্রজাপতির ডানার পেছন ছুটে চলা আমাদের নিষ্পাপ শৈশব কেমন করে বেঁচে থাকার তাগিদে রক্তের হোলি খেলার ভেতর দিয়ে পলায়মান সময়গুলো কাটিয়েছে আর সে সময়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া কি ছিল – এই বইটি তার প্রামাণ্য দলিল।
 
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিমুখ  হওয়া আমাদের নতুন প্রজন্মকে তাদের মতো করে ইতিহাসের পাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সেলিম সোলায়মানের প্রয়াস নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য। শুধু নতুন প্রজন্মই নয়, যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন তাদের সে সময়ের স্মৃতিচারণের আয়না হিসেবেও বইটির আবেদন অস্বীকার করার উপায় নেই।
 
কোথাও কোথাও মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েছে। আগামী সংস্করণে সেগুলো সংশোধন হবে বলে আশা রাখি। মানিক দে’র আঁকা প্রচ্ছদ সুন্দর, অঙ্গসজ্জা মানানসই। ‘প্রকাশ করেছেন ‘তাম্রলিপি’। উদ্ধৃত মূল্য ২০০ টাকা। ‘প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত’এর পাতায় পাতায় আমাদের প্রজন্ম খুঁজে পাবে তাদের শৈশবের সবচেয়ে বিভিষিকাময় কিন্তু গৌরবোজ্জল দিনগুলো, আমাদের সন্তানেরা খুঁজে পাবে বাংলাদেশ ভূমিষ্ট হওয়ার প্রসব যন্ত্রণা। সবটুকুই বিধৃত হয়েছে প্রাঞ্জল ভাষায়, সাবলীল পাঠে।
 
 
ওল্ড স্পাইস নর্থ স্টার ও অন্যান্য
এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ওল্ড স্পাইস নর্থ স্টার ও অন্যান্য’। ডায়েরির আদলে লেখা এই বইটিতে লেখক শৈশব কৈশোর থেকে শুরু করে আজ অবধি তার দিনলিপি আর জীবনাচারের বিবরণে আমাদের সমাজের চালচিত্র তুলে এনেছেন। সেই বিবেচনায় এই বইটি ‘প্রজাপতি পলায়ন ও রক্ত’এর বর্ধিতাংশ বলেও মনে হতে পারে।
 
গ্রন্থটিতে একজন সচেতন পর্যবেক্ষকের চোখে আমাদের সমাজ বিশ্লেষন উঠে এসেছে বিস্তৃত ক্যানভাসে। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান আর অর্থনীতির বিশ্লেষনে কোথাও কোথাও অতি সরলীকরণ মনে হলেও লেখক তাঁর উপলব্ধিটি প্রকাশ করেছেন কোন রাখঢাক না করে। এটা তার চিন্তার সততার পরিচায়ক। বিষয়বস্তুর গভীরে ঢোকার আগে কোন গৌড়চন্দ্রিকা করেননি। পাঠককে সহজেই বিষয়বস্তুর অভ্যন্তরে নিয়ে গেছেন। কোথাও কোথাও যেটুকু ভূমিকা না থাকলেই নয়, বিষয়ের প্রয়োজনে সেটুকুই রেখেছেন।
 
আগেই বলেছি বইটি ডায়েরির আদলে লেখা হয়েছে। লেখক ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এ সব বিষয়ে তাঁর নিজস্ব মতামত, উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতা বিভিন্ন তারিখ দিয়ে লিখে রেখেছেন যখন যা মনে এসেছে। এ সব লেখাকে মলাটবন্দি রূপ দিয়ে তিনি শেয়ার করেছেন পাঠকের কাছে। যদিও তাঁর সন্তান ও তাদের বন্ধুদের প্রতি উৎসর্গপত্রে লিখেছেন যে, তিনি তাদের মাতা-পিতাদের শৈশব আর সে সময়ের স্বদেশ কেমন ছিল সেটা জানাতে চেয়েছেন, কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখা গেল সেখানে বর্তমান সময়ের সমসাময়িক জীবনও উঠে এসেছে। আর বর্ণনার ঢংটি এমন যে শুধু তাঁর সন্তানদের প্রজন্মই নয়, তাঁর নিজের প্রজন্ম এমনকি লেখকের পিতা-মাতার প্রজন্মও বইটি পড়তে পারবেন সমান স্বাচ্ছন্দ্যে, সমান আগ্রহে। কারণ, বইয়ের বিষবস্তুগুলোতে সব প্রজন্মেরই জানার এবং চিন্তার খোরাক রয়েছে। ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি আর সমাজবিজ্ঞানের মতো আপাত শুষ্ক বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর আলোচনা এমন প্রাঞ্জল ও সাবলীল যে পড়ার সময় বিষয়গুলোকে মোটেও শুষ্ক মনে হয়না। বর্ণনার গুনে অধ্যায়গুলো হয়ে উঠে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সহজপাঠ। সেলিম সোলায়মান খুব সজজেই তাঁর অভিজ্ঞতা আর বিচরণে পাঠককে সহযাত্রী করতে পেরেছেন।
 
দু’ একটি অধ্যায়ের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ না করলে গ্রন্থটির আলোচনায় সুবিচার করা হবে না। ‘বাঙালিত্বের সন্ধানে’ এমন একটি সুলিখিত অধ্যায়। খুব সহজ কথায় তিনি আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বরূপ উদঘাটনের প্রয়াস পেয়েছেন, দুই বাংলার মেলবন্ধন, মিল অমিলের দোলচাল আর বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রতি বিরাজমান হুমকিগুলো চিত্রায়িত করেছেন। ‘অর্থনীতির স্যান্ডেল সূচক’  অর্থনীতির জটিল মাপকাঠিগুলোকে একেবারে সহজবোধ্য করে প্রকাশের এক সার্থক প্রয়াস। জিডিপি জিএনপি’র জটিল তত্ত্বে না গিয়ে কেবলমাত্র দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতির সূচক কিভাবে নির্ণয় করা যায় তার সহজপাঠ দিয়েছেন এই অধ্যায়ে। তবে মনে হয়েছে কোথাও কোথাও লেখক চলমান দূর্নীতিকে জাষ্টিফাই না করলেও তাকে ট্রিভিয়ালাইজ করার চেষ্টা করেছেন। তা এই পরিচ্ছেদের উইক লিঙ্ক মনে হয়েছে। ‘ওল্ড স্পাইস’ আমাদের কৈশোরের এক অনিবার্য মোহের কথাচিত্র। পিতৃপ্রজন্মের সেভিং আচার এবং আফটার সেভের ঘ্রাণ কী করে আমাদের মোহাচ্ছন্ন করে যৌবনের আগাম বার্তা দিত তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ উঠে এসেছে এই নিবন্ধে। সেই কিশোর বয়েসে লেখকের পর্যবেক্ষন ক্ষমতা যে কত তীক্ষ্ণ ছিল এই লেখাটি তারই এক প্রতিবিম্ব। লেখাটি পড়তে গিয়ে এক জায়গায় অবশ্য হোঁচট খেতে হয়েছে; ‘ডিপার্টমেন্ট স্টোর’কে বোধ করি অসাবধানে ‘ডিপার্টমেন্টাল স্টোর’ উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি যে বিভিন্ন জটিল বিষয়ের তত্ত্বকথা সহজভাবে লিখেছেন তা ই নয়। কোথাও কোথাও হিউমারের অবতারনা করতেও পিছপা হননি। ফেইসবুকের চালচিত্র নিয়ে লিখেছেন ‘কী করিলে কী হয়’। এক শ্রেণির ফেইসবুক ব্যবহারকারীর প্রদর্শনকামিতা, কুপমণ্ডুকতা, ভন্ডামি এবং ছলাকলার মুখোশ উন্মোচন করে প্রচ্ছন্ন ব্যাঙ্গ বিদ্রুপের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন তাদের অবিমৃশ্যকারিতা। সেলিম সোলায়মান আরেকটি অসামান্য অধ্যায় লিখেছেন ‘স্কুল কিলস ক্রিয়েটিভিটি এন্ড এট টাইমস স্টুডেন্ট’ শিরোনামে। একটু খটকা লেগেছে। ‘স্টুডেন্ট’ এর বদলে ‘স্টুডেন্টস’ হতো কি? এই নিবন্ধে লেখক প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা, অসামঞ্জস্য এবং ক্ষেত্র বিশেষে অসারতা পাঠকের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। তিনি যথার্থভাবেই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবলমাত্র ‘সার্টিফিকেট বিতরণ ব্যবস্থা’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। এই ‘সার্টিফিকেট বিতরণ ব্যবস্থা’ থেকে শিক্ষাকে মুক্তি দিতে না পারলে আগামী প্রজন্মের সামনে অপেক্ষা করছে ব্যর্থ ভবিষ্যতের হুমকি। ‘ডানা গোথিয়া কাপ’ নিয়ে আমাদের লজ্জার উপাখ্যান আর সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের কিশোরী ফুটবলারদের সাফল্যের কথামালা নিয়ে লেখা ‘ফুটবল কথা ও লজ্জাগাঁথা’য় লুকানো আছে আমাদের কদর্যের কথকতা। তবে সেখানে কিছু চমৎকার উপলব্ধিও উঠে এসেছে। ‘আসলে পৃথিবীকে চমকে দিয়ে, বদলে দিতে পারে শুধু ছিটগ্রস্থরাই মনে হয়’ তেমন একটি বক্তব্য। লেখকের এই বক্তব্যে ধরা পড়েছে একটি অমোঘ জীবন দর্শন।
 
কিছু কিছু অসামঞ্জস্যতা ও তথ্যের সীমাবদ্ধতা যেমন কোন কোন পাঠকের চোখে পড়তে পারে তেমন কোন কোন বিষয়ে বিতর্কের অবকাশও থেকে যেতে পারে। লেখক বলেছেন তিনি কাবুলিওয়ালা দেখেননি। হয়তো তাই। কিন্তু আমরা যে সময়ে কুমিল্লায় বেড়ে উঠেছি সে সময়ে আমাদের শৈশবে হরহামেশাই কাবুলি ওয়ালা দেখেছি বাড়িতে বাড়িতে ধর্না দিতে। হয়তো তিনি কোন কারণে তাদের সামনা সামনি হননি। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন ‘বেডেছে বই কমেনি’ আরেক জায়গায় লিখেছেন ‘বাড়ে বৈ কমে না’। এই ‘বই’ ও ‘বৈ’ এর সামঞ্জস্য সাধনে তিনি নিশ্চয়ই পরবর্তী সংস্করণে সচেষ্ট হবেন। রাজনৈতিক শ্লোগান কিংবা দাবি নিয়ে দেয়ালের লিখনকে প্রচলিত কথায় ‘চিকা মারা’ বলা হয়। তার উৎপত্তি নিয়ে বলেছেন যে, রাজনৈতিক কর্মীরা গোয়েন্দাদের ফাঁকি দেয়ার জন্য দেয়াললিখনকে ‘চিকা মারা’ বলতেন। সত্যিই কি তাই? যেটা সব মানুষ জানত সেটা গোয়েন্দারা জানবে না, তা কি হয়? তার এই অভিমত যথাযথ গবেষণালব্ধ মনে হয়নি। আমাদের সময়ের ফুটবল তারকাদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি তাদের স্মরণ করেছেন। কিন্তু আমাদের সময়ে ‘ছোট বাদল’ নামের কাউকে মনে করতে পারি না। যতদূর মনে পড়ে, একজন ছিলেন ‘বাদল রায়’ আরেকজন ছিলেন ‘ছোট নাজির’। লেখক কিংবা আমার যে কোন একজনের স্মৃতি হয়তো ঝালিয়ে নিতে হবে।
 
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধিতাকারীদের প্রতি আমাদের প্রজন্মের ক্ষোভ তিনি লালন করেছেন সহজাত ঘৃণার উত্তাপে। কিন্তু ক্ষোভের প্রকাশ কোথাও কোথাও শ্রুতিকটু মনে হয়েছে। তেমন একটি প্রকাশ ‘ক্ষাঞ্চোৎ’ অভিব্যক্তিটি। লেখক তাঁর অনুভূতির প্রতি সৎ থেকে নিজেকে অকপটে প্রকাশ করেছেন বলেই হয়তো এমনটি লিখেছেন। তবে কারো কারো কাছে তা লেখকের পরিমিতি বোধের ব্যত্যয় বলে মনে হতে পারে। জামাত বিএনপি’র বাইরে যারা বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করে তাদের সবাইকে ঢালাও ভাবে ‘রাজাকার তোষনকারী’ কিংবা ‘বামাতি’ হিসাবে আখ্যায়িত করাকে অনেকেই রাজনৈতিক মেরুকরণের অতি সরলীকরণ কিংবা দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট মনে করতে পারেন। রাজনৈতিক মেরুকরণের এই আলোচনা আরো বিস্তৃত বিতর্কের অবকাশ রাখে বলে মনে হয়েছে। এখানেও লেখক তাঁর বিশ্লেষণের পরিপক্কতার উপর সুবিচার করতে পারেননি বলে মনে হয়েছে।
 
আব্দুল হামিদ মন্টুর করা প্রচ্ছদ আকর্ষণীয়। অঙ্গসজ্জা চমৎকার। ১৬০ পৃষ্ঠার ‘ওল্ড স্পাইস নর্থ স্টার ও অন্যান্য’ প্রকাশ করেছেন ‘উৎস প্রকাশন’। উদ্ধৃত মূল্য ৩০০ টাকা।
 
শেষের কথা
সেলিম সোলায়মানের গদ্য সাবলীল, প্রকাশভঙ্গী প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন রাখঢাক না করে। তিনি ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিকে নামিয়ে আনতে পারেন সাধারনের বোধের সীমানায়। হয়তো কোথাও কোথাও পাওয়া যাবে বিতর্কের অবকাশ। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক উস্কে দেয়া লেখকের দায়িত্ব নয়কি? সেলিম সোলায়মান তাঁর দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে অনেক দূর যাবেন বলে বিশ্বাস করি। তাঁর গ্রন্থদ্বয়ের বহুলপাঠ ও বহুলপ্রচার কামনা করি।
আহমেদ শরীফ শুভকবি, গল্পকার ও কলামিস্টচিকিৎসক, মেলবোর্ন।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
AffiliateLabz
1 year ago

Great content! Super high-quality! Keep it up! 🙂