প্রবাসের ঈদ ও আনন্দ – কাজী সুলতানা শিমি

  •  
  •  
  •  
  •  

প্রবাসের ঈদ  আনন্দ

কাজী সুলতানা শিমি

মেয়েটা হাতে মেহেদী দেয়ার জন্য মেহেদী টিউব নিয়ে ঘুর ঘুর করছে। আমি বললাম হাতের কাজটা শেষ হলেই দিয়ে দিব। হাতের কাজ আর আমার শেষ হচ্ছেনা। একটার পর একটা কাজ লেগেই আছে। ঈদের জন্য ছুটি নিলাম দুদিন। এবারের ঈদ উইকএন্ড না হওয়ায় সাপ্তাহের মধ্য দিনে বুধ ও বৃহস্পতি ছুটি নিতে হলো। তা হোক। কাজ তো সারা বছরই লেগে থাকে। বাচ্চাদের বুঝতে দেয়া যে সামাজিকতার ও একটা গুরত্ব আছে। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার বাচ্চারা ঈদ দেশীয় আমেজে উপভোগ করে। বিদেশের মাটিতে জন্ম হলেও আমি তাদের দেশীয় ঐতিহ্য গ্রহণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করি। প্রতি ঈদে ওদের জন্য নতুন কাপড় কিনি। জুয়েলারি কিনি দেশীয় ডিজাইনের। মেহদি, আলতা, ক্লিপ, চুড়ি, ফিতা আরো যা যা দরকার সবই। ঈদ জেনে রাত থেকেই মেহেদী দেয়ার জন্য তার এই আকুলতা।

ঈদের রান্নার আয়োজন করতে করতে মেয়েকে বলি কাজ তো আমার শেষ হচ্ছেনা। তুমি কি আমাকে একটু হেল্প করবে। তাহলে তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারবো। আসলে এই অজুহাতে মেয়েকেও একটু টুকটাক কাজ শিখিয়ে নিলে মন্দ কি। কথা শুনে সে অতি উৎসাহে এগিয়ে এলো। কি করতে হবে বলে নিজেই খেজুর কাঁটা নিয়ে মুগ-পাকন’ পিঠাতে নকশা করা শুরু করলো। প্রথমে মনে হোল নষ্ট করে ফেলবে। পরে ভাবলাম নষ্ট হতে হতেই শিখবে। কিছু বললাম না। দেখিই না কেমন নকশা করে। আমি তো এই বয়েসেই নানু’বাড়ি গিয়ে সবসময় নানুকে অনুকরণ করতাম। নানু আমার সব ছেলেমানুষি সহ্য করেছিলেন। করেছিলেন বলেই আমি তার কাছ থেকে পিঠা বানাতে শিখেছি। এখনতো আমার মনে হয় আমি আমার মায়ের চেয়েও ভালো পিঠা বানাতে পারি। আমি দেখছি আমার মেয়েটিরও আমার মতো রান্নার প্রতি আগ্রহ। তাকে তারমতো করতে দিলাম। বাহ বেশ ভালই নকশা করছে তো! আমারও কাজ অনেকটা এগিয়ে গেলো।

শুধু মেয়েই কাজ করবে, ছেলে করবেনা তা তো হবেনা। ছেলেকে বললাম আইপেডের গেম আপাতত বন্ধ কর। জোরে ঈদের গান ছেড়ে দাও। গান না হলে কি আর ঈদ ঈদ লাগে! ছেলে তাই করে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল আর কি করতে পারি। ওকেও আরেকটা কাজ ধরিয়ে দিলাম। দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ- এখন আমার ঘরে সেই অবস্থা। সম্মিলিত ঈদের আয়োজন। তা না হলে ফেমেলি কমিটমেন্ট জন্মাবে কেমন করে। সবাই মিলে গিয়েছিলাম লিভারপুল। ঈদের কাপড় কিনতে। যার যার পছন্দ মতো কিনেছেও। যদিও দেশ থেকে প্রতিবারই নতুন কাপড় আসে। তাও আমি ওদের সাথে করে আবারো নিয়ে যাই। ঠিক যেমন করে আমি ছোট বেলায় যেতাম। সে আনন্দটা ছিল অনেক মজার। কাপড় কেনা শেষে লুকিয়ে রাখতাম। দেখে ফেললে পুরানো হয়ে যাবে এই উছিলায়। অদ্ভুত ছিল সেই পুলক।

ঈদের সকালে খুব ভোরে উঠে যাই সবাই। বাচ্চারা ও তাদের বাবা তিনজন তিন বাথরুমে ঢোকে। কে কার আগে গোসল সারবে সেই প্রতিযোগিতায়। আমি আবারো কিচেনে। কিচেনের কাজ থেকে যতই দুরে থাকতে চাই ঘুরে ফিরে আবার সেখানেই ফিরে আসি। যেন অন্তহীন রান্না। হবেনাই না বা কেন। সব বাহারি রান্না ঈদের দিনেই করতে ইচ্ছে করে। হরেক রকম পিঠা, মিষ্টি, দই, জর্দা, সেমাই, পায়েস সবই করতে ইচ্ছে করে। মোরগ, পোলাও মাংস, রেজালা, কাবাব কিছুই যেন বাদ না পরে। এদিকে গোসল সেরে ওরা তিনজন ঈদের নামাজের জন্য রেডি হয়। ঈদের নামাজের জন্য এক পোশাক, পাড়া বেড়ানোর এক পোশাক আবার রাতের জন্য আরেক পোশাক এভাবেই ঈদের কাপড় কেনে ওরা। নিদেন-পক্ষে তিন থেকে পাঁচটা তো থাকবেই। আমিও বারণ করিনা। ঈদ বলে কথা। এখানে তো আর মামা-চাচা’দের কাছ থেকে গিফট পায়না তাই আমিই কিনে দিই। অবশ্য দেশ থেকে পার্সেল আসে বলে মাঝে মাঝে এতো আর কিনিনা। দেশের কাপড়ও পরে।

ঈদের নামাজের জন্য কৈকারহিল মসজিদে যাবে এবার। ওখানে বাংলায় খুৎবা হয়। বাংলাদেশী কমিউনিটি এই মসজিদের দায়িত্বে থাকায় সব বাঙ্গালিরা ঐ মসজিদে নামাজ পড়ে। বিশেষ করে আমাদের পরিচিত ও বন্ধুদের সাথে দেখা হবে বলে বাসা থেকে একটু দুরে হলেও সেখানেই যেতে চায়। ওরা বেড়িয়ে গেলে আমার কাজের মাত্রা আরও যেন বহুগুন বেড়ে যায়। তখন তাড়াহুড়া করে জরুরি কাজ গুলো কোন রকমে মোটামুটি গুছিয়ে নিই। বেড়িয়ে গেলে কখন বাসায় ফিরবো তার কোন ঠিক থাকেনা। প্রতিবার আমাদের ঈদের পাড়া বেড়ানো শুরু হয় ক্যালিভালী থেকে। এবার নাকি শুরু হবে ক্যাসেল হিল থেকে। সবাই এক সাথে এক বাসায় মিলিত হয়ে দলে দলে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় জড়ো হতে থাকি। সব বাচ্চারা ও বড়োরা রঙ বেরঙের জামা কাপড় পড়ে এক সাথে ঘুরে বেড়ায় পাড়াময় এ যেন একেবারে দেশীয় আমেজ।

এখানে অবশ্য আমাদের আরেকটু বাড়তি আকর্ষণ থাকে। সবাই মিলে নীপবন পল্লী’তে হৈ হুল্লোড় করে জড়ো হওয়া। নীপবন পল্লী আমাদের বন্ধুদের সবার সম্মিলিত একটা ফার্ম। বলা যায় সিডনীতে গ্রামের বাড়ি। বাংলাদেশের গ্রামের বাড়ির মতো দুটো পুকুর, দোতলা বাড়ি ও বিস্তীর্ণ জমির এক খোলা প্রান্তর। ফার্মে গরু, ভেড়া, ঘোড়া সবই আছে। নির্বিঘ্নে চড়ে বেড়ায়। ঈদের পাড়া বেড়ানো থেকে যাদের বাসা বাদ পরে যায় তাদের বাসায় পরদিন যাওয়া হবে এই আয়োজন থাকে আগে থেকেই। তাই ঈদের সাক্ষাৎ মিস হয়না কখনই। দেশ থেকে দূরে থাকলেও দেশীয় ঈদের আমেজ থেকে দূরত্বে নেই একেবারেই। একেক বাসার রকমারি রান্না খেতে খেতে প্রত্যেকেই ঈদের আনন্দ উপভোগ করে একেবারেই প্রাণ খুলে।

ঈদের পরদিন আবারো ঈদের আয়োজন যাদের বাসায় যাওয়া হয়নি তাদের বাসায় যাওয়ার। শনিবার উইকএন্ড হওয়ায় আমার বাসায় ঈদের সম্মেলন। আমার বরাবরই আড্ডা ও আপ্যায়ন পছন্দ। সুতরাং নতুন উদ্যমে আবারো আয়োজন। অনেক রাত অব্দি চলল আনন্দ উচ্ছ্বাস। এ যেন শেষ হয়েও হয়না শেষ। এভাবে প্রতি ঈদেই আমাদের আনন্দের রেশ থাকে অনন্ত অনাবিল। প্রবাসের ঈদ নিয়ে যে কটা লিখা আমি পড়ি প্রায় সব কটাতেই শুধু হতাশা ও দুঃখ বোধ নিয়েই লিখা। তবে এটাও ঠিক যে, বাবা মা এবং পরিবার ছাড়া ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণ হয়না। ঈদের দিনে তাদের শূন্যতা অনুভব করি। মনেও পড়ে খুব করে, দুঃখবোধ হয়। এটা অনস্বীকার্য। তাই বলে প্রবাসে কিন্তু ঈদ আসলে অতটা নিরানন্দ ও শূন্য নয়। কেননা প্রাণের টানে যে বন্ধুত্ব হয় তারা পরিবারের কেউ না হলেও কখনো কখনো হয়ে যায় বিকল্প পরিজন, একান্ত স্বজন। আর এই স্বজনদের ঘিরেই বিদেশের মাটিতেও খুঁজে পাই দেশীয় ঈদের অনাবিল আনন্দ।

কাজী সুলতানা শিমি
লেখক, কবি ও কলামিস্ট
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।