প্রাণ থৈথৈ হৃদমঙ্গলে । গুচ্ছকবিতা । মাহফুজ সজল

  •  
  •  
  •  
  •  

 49 views

তাহারে আমার সমব্যথা বলো

কে এসে দাঁড়ায় বোধের তাড়ায়
কোন এক বহুলোক; কার শতমুখ ভাঙাভাঙি
এসে তড়পায় একমুখ গড়নের ছাঁচে!

কোন হারার রঙ-ধাবিত ক্রোশ
পাখির আনন্দস্বরে ভুলে থেকে ঠোঁটজ মানুষ
যত পথ যায় যতো দূর বরণাহুত মালা লৈয়ে
কার আবোধ নাড়িয়ে আসে উদাসী মেঘেদের
মেয়ে- কোন্ বালিকার সুচারু কাজলের আঁচে।

কার কথা শুনেশুনে কেউ শোনে না-কো
পৃথিবী কাহারে দেয় নিগৃহ জঙ্গমের সাঁকো
শুকানো সময়মূলে মেদুর শ্যামল ভরে ফোটে
কার আরঙ সুপ্তধারে অসময় ওঠে বর্তে ওঠে
জীবনের ডাক দিয়ে যায় প্রতীক্ষানন্দিত বেঁচে।

কে তোমার মনোযোগও নয় শুধু ক্ষণিক আহুতি
বওয়া দান, মেঙেছে সহজ মনে ভুলের পৃথিবী
হতে নির্ভুল বাঁশরীর টান- কোন্ প্রেমিক পান্থ
হারাবার লাগি এসে যায় চিত্রিত সুরের আনাচে।

যদি তাঁর দেখা পাও কোনদিন খোঁজ করো তাঁর
আমার প্রণতি বলো আমি অর্ধেক মুখ দেখি যার
বাকি অর্ধেক জানতে পারিনি তাঁর বহুলোক মন
অভিধায়; কবে এসে গেল একমুখ গড়নের ছাঁচে
বিপন্ন বিষাদ প্রভায়।

তাঁকে বলো আমি তাঁর জন্য
রাত্রির প্রাচীনতা ভরে সেধে যাই সমব্যথী বীণা
সত্যটা জেনে নিয়ো- কেনো সে এমন হেরেছে
তাঁর গহনবিদিত কোন কবিতার দায় ছিল কী-না!

প্রাণবাদি ছায়ামুখিতা

পৃথিবীটা দাঁড়াক-
মরু-তাওয়া ঝাঁপটানো জলজ পাখনার
আধি’রে। বালির আভরণে তথাপি জীবনমুখ-
সহনে ছবক পেলে আমি, অদ্বৈত একডানা
উড়াল হবো; আবশ্যক বুনন মুখে নিয়ে
যেমন বিহঙ্গনাম- পরিযায়ী অমায়িক দূরে…

শুধু অভিমানে বলবোনা- কেমন আছো;
আজও বুকের পরে বিধেয় জলের
আশ্রম-আকাশ জাগে কী-না!
..
তুমিতো জানো- দুঃখান্ত দিন যত যায়…
ওমের নিচয় হতে কখন বেরিয়ে পড়ে
আত্মজ শীতের প্রকোপ; যেমন হাতগুলো
বেড়িয়ে এলেই, বদলি হাওয়ায় আসে-
বৃক্ষের পাতারু সুদিন।

অথচ দ্যাখো-
পরিচিত না পেলে ওড়িবার স্মৃত শ্বসন
পাখিরও নিশ্বাসপুরে দাহকাল-
পৃথিবীটা কুলায় মেলে না!

কারণ করেই জানো-
নিজস্ব বর্ণবিহনে অনেক আক্রান্ত হলে বরং
সাইবেরিয়ার বালিহাঁস বুঝে- পথভোলা
মেঘের চলকও বরফিত মার্জনা
বৈমুখ রাখে না কিছুই।

মূলতই তার শুধু কোনপানে ফিরে ফিরে আসা!

অবরোহ দাও প্রিয়তম
অবধান কল্লোলে বলো,,,
ঘুমের কী ফোঁটা ফোঁটা কাঠালিয়া রঙ
জরির ঝিলমিলে ধায়; কী-বা জাদু স্বপ্ন
যেনো! স্বপন কী জলবিনা মৎস্যকারন;
স্বপ্ন কী জারি হওয়া মরুর সমন;
স্বপ্ন কী আমিই ইঁদুর-মূষিক-
ঘুম তার পথে পথে আঁধার কলন?
কিংবা স্বপ্ন কী আশা- আশা কী তারকার
বেদনা প্রসব- পতনঞ্জলি ভারা জোর তর্পণ?

তাও তোমাকে ভুলেই ঘুমিয়েছি;
তোমাকে রেখেই স্বপ্ন-তল্লাটে হারিয়েছি
কে বলে কখন অতিশয়?

বোধের তপ্তশ্লেটে আমঞ্চ ফ্রাইলিপি নিয়ে
তারপরও ডাঙায় পোড়া মাছেরা দ্যাখো
তাড়ন আভাস বুকে নিয়ে কাতরানো লিখে
চলে- নিধার্য ফুলকা জীবন।

জলছন্দ নিদ কামনায় আমার নিগড়ে তুমি
তাই অনাদি গর্গন লতা- সাগরের গুল্মকথন;
অথবা পক্ষী’র আকল- বৃক্ষচারী ছায়াসাধনায়
আমার ভেতরে তুমি আসলে সুরের কিয়াস-
অনুরাগী শ্যামলের সঙ্গত লাল আচ্ছাদন।

আমি সত্যের মতো আনমন
তোমারই কাছে আসি, ফিরে আসি বারবার।

তারার বায়াত

তারার বিপণি যেন সন্ধ্যার থোকা ঘাসফুল-
মিটিমিটি জুনিপোকা নৈশ গীতিকা সংকুল।

তারার কাহিনী বুঝি রাতে দূর পল্লীর দীপ-
অথৈ আঁধারে ফেলা থৈথৈ আলেয়ার ছিপ।

রাত্রি কালোডিঙায় তারা যেন ঝাঁকঝাঁক পুঁটি
বেদনার ছায়াপথে নন্দিত আশা কোটিকোটি।

তারা কী নিজন উঠোনে বিথার সন্ধ্যামালতী
সুরের কন্ঠহারে কেমন সঞ্চারী বিরহ প্রতীতি!

আকাশ কাঁথার পরে তারা যেন নকশি ব্যাপন
সুন্দরের খাঁজেখাঁজে সুচারু কী ব্যথার সৃজন!

মৃদুমধু হাসে তারা কোন্ ঐশী হিয়ার কাঁন্নাবরেষু
বিশ্বমাতার কোলে ও-কী আনমনা বিজ্ঞান শিশু।

জীবন অচিন মোহিত জন্মেই বিস্মিত সুতোকাটা ঘুড়ি
অস্ফুট চলেছে কোথা তরঙ্গায়িত-টোল-তারাদের বাড়ি?

সুমতির তাড়াপথে কবে তাই হারিয়েছে বালকের শোক
আমাদের হৃদিপট সেই থেকে মন্দ্রিত তারার শ্রী-লোক!

পৃথিবী ঘুমায়ে গেলে চোখ মেলে তিমিমের কাব্য দোসর
জাগরী তারার সখা নীলনীল নিজ্ঝুম ভাবনার  চর।

জীবনের জয় সমিলে এ মধু ক্ষরণেরে আনি বয়ে আনি
সর্বসহন ভারে এ সহজ অন্তরে সন্ত তারাদের বানী।

বোধে মুকুলের চিরায়ুতা ঝরে না ছলছল অশ্রু সারা
মাঝারে মৌনতা সাক্ষী দুনিয়া মশগুল আনন্দধারা!

বিমূর্ত জীবনের মুখ

কাজের দৈর্ঘ্য ঘুরতেই
মনেহয় কোন ফাঁকে পথখানি-
একটুকু মায়াভ্রম খেলা।

নতুন নতুন ক্ষেপে সাজতেই দেখি-
এ-তো জীবন এক অনন্তরেখা ঘোর-
ক্রমমূর্ত শূন্যতায় স্মৃতিজ পূর্ণতা ভেলা-
জন্ম-আলোর নূরে অদৃশ্য তাড়নের
বিম্বিত মাত্রা সমান।

তা’র বিভূত মুখ দেখি-
অচেনা দিগন্ত যেনো মুহুর্ত একটু আগের!

আধেক ঘুম- আচ্ছন্ন তন্দ্রার নদী
সমধিক অজানার খানিকটা বোধি
কোন মোহের এই নির্ঘুম আঁখি
সবচক্ষে ধাঁধাঁ লাগা অর্ধেকটা দেখি
নির্ভুল জাগরণের এ রূপকথা-পঙ্খীরাজ হাটে।

তা’র তাজ্জব অন্তপ্রাণ দেখি-
চিরশিশুর সোজা কৌতুহলে!

ওড়ে সে ওড়ায়
বহু বৃত্তান্ত ভ্রমণের সযতন ক্লান্তি জমায়
আর তাজ্জবতা সঞ্চিতে আসে, মৌসুম
বদলের বাঁকে। কথা হয় না- ধীরে
তা’র যেনো স্ফুট কোন কথাপত্র নাই,
কথা-কাননের এমন উত্তল বোধিবৃক্ষ শাখে!

মনে হয় থেকে থেকে রয়ে আছি
ছিলাম না-তো কখনো ছিলাম না জেনেশুনে
মহাজগত মরমিয়া- মৌনতার এ উঠোনে।

তা’র বোবালাগা সৌকর্য দেখি
সকল সাধনাবাদি ঢেউয়ের নিকরে!

মনে হয় এক সুনসান নির্বিবাদী জোছনা আমি
আদিম আঁধারের পূর্ণখানি রঙসঙ্গে জ্বলা;
স্থৈর্যহীন এ পরিক্রমার নিশ্চিদ্র ভ্রমঘোরে!

হারার অপরাজয়

যা দেখছি দু’চোখে
বিপন্ন মানুষের ভীড় বয়ে আসে
যত কথা শুনিতেছি কোলাহল ভর
তাদেরই জয় উঠে আসে পরাজিত বিধির বাহাসে।

দুর্দশার সঙ্গী কারা আছে
কারা সুখের আশায় আরো দুঃখে বেঁধেছে ঘর
জীবনের দান কার দৃশ্যের নরকে উবে আসে
কারা তবু হেসে গিয়ে হৈছে স্বর্গীয় পুষ্পদোসর!

কী হবে না হবে- এ হিসাব না-মিলিয়ে কারা
সরল পরার্থে শুধু প্রেম দিয়ে গ্যাছে
হয়েছে বিরান আবাদি ক্লিশিত জলের
ফোয়ারা; আহা না-পাওয়া মনীষার চর…

সেই মানুষেরা শঙ্খনাদ হয়ে বেজে ওঠে বুকের ভিতর!

হৃদয়ালোক অভিসারে

রাতও কী দিন বনে যায়
মলিন জরায় ঠুকে প্রসন্নতার শেষ পেরেক
স্মিতহাস্যে এঁকে দিয়ে সদ্য জনমের বোল
জেগে রই দুর্দমনীয় বাসনা আমার
তোমার সাথে দেখা করি হৃদয়ানুসারে।

পৃথিবী প্রবিষ্ট হলে যামিনী নিশীথে
তোমার আলোর সুরাকে দিবসাপন্ন হই
আমার ঘরবাড়ি আনাজপাতি
ছাইয়ের বাগানে অরূপ কমল হয়ে ফোটে।

আর কইতে পারি না বাড়াবাড়ি অপ্রাপ্তি
দাহ- কা’কে তাঁরা দুর্দিনের বলিরেখা বলে
কাঁটার বুকে অনড় শিশিরে কে জানে
মাটির মানসচক্রে কোন্ পরশমণি
মিলন সুরের জেল্লা দিয়ে গ্যাছে!

আমিতো দীনহীন ধুলার আঁতুড়
এমনিতেই চির শোকরানায় থাকবার
কথা থাকে। তার-উপর কেনযে তোমার
ভাবের কুঠুরি হল দেখা!

আমি আর কইতে পারি না ভুবনবেলার আক্ষেপ
হৃদয় উদিত হেসে যায় সংবৃত আঁধারালোকে!

মাহফুজ সজল
কবিতাপ্রবণ ভাঙনের এক ‘কাইমেরবাউলি’ মেলা । জন্ম, বেড়ে ওঠা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে ঘোড়াউত্রা নদীবর্তী বলিয়ারদী গ্রামে। বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে বর্তমানে একটি সেবামূলক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। অবসর পেলেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ভাটিবাংলার রূপ রহম পানে। কিছুকাল মঞ্চনাটকে যুক্ত ছিলেন। বাজিতপুর ‘পৌরাণিক থিয়েটার’ এর একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments