প্রেমাভিসার । গল্প । সিন্টু কুমার চৌধুরী

  •  
  •  
  •  
  •  

 268 views

রসিয়া রাগ বাজছে সেতারে। অনুষ্কা শঙ্কর ও পণ্ডিত শ্রী রবিশঙ্কর বাদক বা রাগ বিস্তারি সাথে সঙ্গদ করছেন পণ্ডিত বিক্রম। স্টাডি রুম জুড়ে সুরের বন্যা বইছে। ধীর লয়ে এগিয়ে গিয়ে, দ্রুত লয় প্রলম্বিত হবার আগে শ্রোতাকে অবাক করে আবার ধীর লয়ে এনে স্থির করে রেখেছে। যেমনটি ঘটেছে আমার জীবনে। স্বামী শ্বাশুড়ি ও এক কন্যা নিয়ে দায়িত্ব কর্তব্যে বাঁধা আমার সাজানো সংসার। মাঝে মাঝে ঝড় যে আসেনা, তা নয়। তবে সুন্দরবন হয়ে ঝড়ের আঘাত সয়ে আগলে রাখে আমার বর, প্রসাদ। কখনো আমার মা অপরাজিতা। আমি শুধু ওদের সাথে থাকি, আমার কি দরকার কতটুকু দরকার সব বুঝে ওরা মা-ছেলে। ঘরের একমাত্র বউমাকে সবার সামনে তুই বলা শুনে আমি প্রথম দিনই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ইনি আবার কেমন শ্বাশুড়ি নতুন বউকে তুই তুকারী করছে। ঠাকুর ঘরে না নিয়ে গিয়ে পড়ার ঘরে এনে বসালো।

ঘর ভর্তি বই আর বই। একটা গোল টেবিল ঘিরে তিনটা কাঠের চেয়ার। দুটো পুরানো এবং একটি নতুন। আমাকে নতুন চেয়ারটাতে বসিয়ে হাত দুটো ধরে বললেন, “মারে, তুই আমার কি হতে চাস বউমা না মা। তুই ভয় পাস না আমার চাহিদা খুবই কম, খাইও কম। তোর বরের সাথে আমার বন্ধুত্ব, তোর বরের টাকায় সংসার চলে, বই কেনা চলে, ঘুরাঘুরি চলে। এমনকি আমরা দুই বন্ধু মিলে সিনেমায় যাই একসাথে। আমার বাঁহাত তোর বরের ডানহাত জড়িয়ে ধরে হাঁটি, তুই বাঁহাত জড়াবি।” আমি চুপ করে থাকি, বুঝে উঠতে পারি না যে এ আবার কেমন কথা। যত অভিজ্ঞতা আমি সদ্য বিবাহিতদের কাছ থেকে নিয়েছি সেখানে এমন অভিজ্ঞতার কথা কেউ বলেনি। আমার নীরবতায় ওনার চেয়ারটা আর একটু কাছে টেনে এনে, বললেন, “কিরে, ভয় পাচ্ছিস! চল তাহলে অপশন বদলাই। মেয়ে হবি না বউ মা হবি?”

আমি কোনো কিছু না ভেবে বললাম, মেয়ে। পরে অস্বীকার করবি না তো!
না।
বেশ, সামনে এসে দাঁড়া। বুকে আয়।
আমার দুই সন্তানকে প্রথম দেখায় জড়িয়ে ধরেছিলাম। তোকেও বুকে নিই।
আমি কলের পুতুলের মত সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পরম মমতায় জড়ালেন শরীরে শরীর, মনে হল আমি শরীর ও সত্তায় মিশে যাচ্ছি ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে মিশে যাচ্ছি প্রতিটি ক্ষণে। বাইরে এসে সবাইকে আনুষ্ঠানিকতা সারতে বলে সরে গেলেন। বিয়ে বাড়ির ব্যস্ততা শেষে যে যার বাড়ি ফিরে গেলেন কিছু স্বজন। আমার ঠাঁই হলো মায়ের ঘরে। সারাদিনে পতিদেবের দেখা পাইনি। শুনে এসেছি বরেরা নতুন বউয়ের কাছে ঘুর ঘুর করতে থাকে। আমার বেলায় সব উল্টো।

কাল রাত্রি পরের রাতে শুভরাত্রির আয়োজন চলছে, দুপুরে বউ ভাতের ব্যস্ততায় স্টেজে আমি একাই ছিলাম। খাবারের সময় তুতো ভাইবোনদের হৈচৈ দু পক্ষের ইয়ার্কি ঠাট্টা সব শেষে আমার পাশে এসে বলল, চলো, আমরা খাব। মা অপেক্ষা করছেন। এই বাড়িতে এসে তিনদিনে এই একবারই তার দেখা পেলাম। তুতো এক জা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো সাজতে যাব কিনা। আমি জানালাম মাকে জিজ্ঞেস করতে। একচোট হাসাহাসি হলো। কিছুটা বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। রাতের খাবারের পরে আমাদের এনে বসানো হলো ঠাকুর ঘরের সামনে। প্রথা ও রীতি পালন শেষে অন্য একটা ঘরে আনলো বিশেষ কয়েকজন নারী, সাথে সমানে চলছে আদি রসের শব্দ প্রয়োগের প্রতিযোগিতা। পতিবর এলো আরো পরে। আমার সাথে লোকটার কোনো কথা হলোনা। মনে মনে তৈরি হচ্ছিলাম আক্রান্ত হবার জন্য। এমন বরও আছে! কনে দেখবে না, মা যা বলে। বিয়ে হলো দায় শেষ। বেশ ঠাণ্ডা গলায় বললো, প্রিয়ন্তি, যাও ফ্রেস হয়ে এসো। কিসব পরে আছো এখনও।

আমি ওয়াস রুমে গেলাম, এসে দেখি বিছানায় দুটোর জায়গায় চারটি পাশ-বালিশ। একটা লন্ড্রি প্যাকেট আমাকে এগিয়ে দিয়ে নিজে ফ্রেস হতে গেল। আমি প্যাকেট খুলে বেশ অবাক হলাম। আমার ঘুমানোর পোশাকে ভরা এটি। এসে বলল, কিরে এখনও তৈরি হওনি! নিজে নিজে বিছানার চাদর সরালো। মশারি টানলো। আমি ত্রস্ত পায়ে বিছানায় এলাম। মনে অজানা ভয়। কখন যে হামলে পড়ে শিকারি। পাশে শোবার পর জানতে চাইলো কালকের করণীয়। আমি বললাম, মা বলেছেন খুব ভোরে জাগতে হবে। স্নান সেরে ঠাকুর ঘরে যেতে।

ফ্যানটা ফুল স্পিডে ঘুরছে, এখনও শীত পুরোপুরি যায়নি, তবুও ঘামছি। আদিবাসীদের বিশেষ তুলায় বোনা একটা চাদর আমার দিকে এগিয়ে দিল। নিজের গায়ে একটা জড়িয়ে নিল। ডাবল এই খাটে দুজনের শরীর ও চার চারটে পাশ-বালিশ। ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে শুভ রাত্রি বলে পাস ফিরে শুয়ে রইল। আমি ভাবছি কখন যে আক্রমন শুরু হবে। ভাবতে ভাবতে কখন যে ক্লান্ত শরীরটা ঘুমালো জানিনা। এভাবে প্রায় মাস পেরিয়ে গেলো। যে যার মতো ঘুমাই সজ্ঞানে অজ্ঞানে কোন জ্ঞানেই আমার কাছে আসেনা, ছোঁয় না। মায়ের চোখ এড়ায় না কোনো কিছু। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারেন দম্পতির আদর সোহাগ বলতে যা বুঝায় তার নূন্যতম পর্যায়ও আমাদের মাঝে ঘটেনি।

সবকিছু ঘটে চলেছে, যত্ন-আত্মীর কোনো কমতি নেই, আড্ডা-গল্প, চা কফি, রান্না করে খাওয়ানো সব সব। বিয়ের দিন দশেক পরে  তার কলেজে যাবার তাড়া। তাই ভোর বেলায় আটা রুটি বানিয়ে সাথে আলু ডিমের ঝোল রান্না করে টেবিলে সাজিয়ে আমায় ডেকেছিল। অন্য এক রবিবারের অলস বিকেলে মায়ের চুল আছড়ে দিচ্ছে দেখে আমার খুব লোভ হয়েছিল আমার মাথায় যদি পতিদেব এমন যত্নে হাত রাখতো! অন্তর্যামী হয়ে না বলা কথাটুকু পরে নিয়ে কাছে ডেকে  পরম যত্নে চুল বেঁধে দিয়েছিল। খেতে বসার পর মা তার ছেলে কোনো ধরনের ভনিতা ছাড়াই বলল, বাবা সোনা, প্রিয়ন্তির সাথে কেন স্বাভাবিক সম্পর্ক হচ্ছে না? ছেলেও মায়ের মত স্বাভাবিক স্বরে বলল, মন ছুঁয়ে প্রেমে অবগাহন করেই তো অভিসার এতো তাড়া কিসের! রাতের খাবার শেষে মায়ে ছেলে স্টাডি রুমে ঘন্টা খানেক কাটায়। আমিও যাই, তবে অনিয়মিত। নিত্যকর্ম সেরে শোবার ঘরে ঢুকছি, দেখি মাও আমার সাথে। আমার হাত ধরে সস্নেহে বললেন, প্রসাদকে কি তোর পছন্দ হয়নি?

আমি চুপ করে ছিলাম। শুধু মাথা ঝাঁকালাম উপরে নীচে। বড্ড বেশি স্থির ও ধৈর্য। এত ধৈর্য এক প্রকার দোষ। তবে যাই বলিস একদম খাঁটি, নিখাঁদ। যেমনটি তুই।
ঢং করছো, পটাচ্ছো!অভিমানী গলায় বললাম। কিরে তোদের বিছানায় এত পাশ-বালিশ কেন!আমি এঘরে এসে এদের মত কথা বলতে শুরু করেছি, নিজের কথা শুনে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। এরা মায়ে ছেলে দুষ্টামি করে খুনসুটি করে। কত সহজে সব কথা বলে।

সেদিন আমার এক দুস্টু বন্ধুকে ফোন করে জানতে চাইলাম কিভাবে ওসব হয়। ও যা বলল তা মুখে আনতে পারবো না।এত হাসতে হাসতে বলছিল আমি ফোনটা কাটলাম। পতিদেব এসে আমার লেখাপড়ার খোঁজ খবর নিয়ে। শোবার আয়োজন করছে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। কত রকমের কথা শুনে এসেছি, দাম্পত্য সম্পর্কে। আমি তার দেয়া স্লিভলেস টি-শার্ট ও ট্রাউজার পরে নিলাম। প্যাকেটে আমার অন্তর্বাস আছে দেখে কিছুটা অবাক হলাম স্যানিটারি ন্যাপকিন দেখে। এতো ক্যায়ার করে কিন্তু অভদ্রতা শিখেনি। তার প্রিয় একটি রাগ বাজিয়ে রেখে, টাইমার সেট করে আমার দিকে ঘুরে জানতে বলল তার মায়ের কথায় কিছু মনে না করতে। আগে মন রাজি হোক তারপর অভিসার। এমন কেন? আপনার ইচ্ছে করে না! নাকি আমি আপনার পছন্দের নই? তা নয়, তুমি লেখাপড়া শেষ করো। তারপর বংশবৃদ্ধির কথা ভাবা যাবে। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল, সবার মত আমরা হতে পারিনা। শিক্ষা আমাদের মহৎ করে, ধৈর্য ধারণ করতে শিখায়। শিখে প্রয়োগ না করলে কিভাবে চলবে।
তারপর আমি তার হাত ধরে বললাম, আপনাকে আমি খুব ভালোবাসি। আপনি বাসেন না?
বাসি তবে প্রকাশ করতে জানি না, পারিনা।

অলংকরণ: আসমা সুলতানা মিতা 

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments