প্রেম ও দ্রোহের শানিত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ । মানিক বৈরাগী

  •  
  •  
  •  
  •  

 354 views

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নতশ্রদ্ধা হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সানাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে উঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে……….

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর আজ ৬৫তম জন্মদিন । ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বেঁচে থাকলে তাঁকে নিয়ে আজ হৈ চৈ করবার দিন ছিলো। তবুও দিনটাকে স্মরণ করি এই ভেবে যে বাংলার মাটিতে সুকান্তের মতো কম জীবন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন আমাদের বড় একজন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আজকের এই দিনে।

স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাতটি কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, কাব্যনাট্য এবং ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ সহ অর্ধশতাধিক গান লিখেছেন ও সুর করেছেন। ১৯৯২ সালের ২১ জুন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ক্ষণজন্মা এই কবি।
কবি কক্সবাজারেও অতিথি হয়ে এসেছিলেন।
কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরী ও ইনস্টিটিউট এর উদ্যোগে আয়োজিত বই মেলায় সেই নব্বই দশকে রুদ্রকে নিয়েই ছিলো আমাদের সকল উচ্ছ্বাস। সেদিন সাথে ছিলেন তাঁর অগ্রজ ও অনুজ বন্ধুরাও। যতটুকু মনে পড়ে কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা, ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন, কবি সমুদ্র গুপ্ত, কবি মোহন রায়হান, কবি ও লেখক তসলিমা নাসরিন প্রমুখ।

সেই মেলায় আমারও একটি স্টল ছিল। আমার স্টলে রুদ্র ও নাসরিন এসেছিলেন, বইও দেখেছেন, বসে লাল চা পান করেছিলেন। সেই থেকে কবির সাথে আমার আমৃত্যু ভাতৃত্ব পূর্ণ বন্ধুত্ব হয়।
আমি যতোবারই কক্সবাজার থেকে ঢাকা গেছি, কবি অসিম সাহা’র ইত্যাদি প্রেসে যেয়ে দেখা করি। রুদ্রের কাজ না থাকলে সেখানেই তিনি আমাকে সময় দিয়েছেন।

কবি আমাদের কক্সবাজারের রাখাইনদের তৈরি ভাতের মদ খুব পছন্দ করতেন। আমার সুযোগ হলে ব্যাগে ভরে কবির জন্য নিয়ে যেতাম।
আমি ঢাকা গেলে তোপখানা রোডের হোটেল কর্ণফুলীতে উঠতাম। সেখানে স্থায়ী আবাস আরেক এক প্রিয় কবি হেলাল হাফিজ। আমি কর্ণফুলীতে উঠতাম মুলত কবি হেলাল হাফিজের প্রতি আমার প্রেমের কারণে। রুদ্রও ওখানে আসতেন। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বইমেলা ছাড়াও আরও কয়েকবার কক্সবাজার এসেছিলেন কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা সহ বিভিন্ন কবিতার অনুষ্ঠানে।
তাঁর সাথে যতোই মিশেছি ততোই গভীরের মধুসুধা পান করেছি।

কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরী ও ইনিস্টিউটের পক্ষ থেকে একটি স্মারক পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পত্রিকার কপি এখন আমার হাতে নাই। বর্তমানে লাইব্রেরি পূণঃনির্মাণের কাজ চলছে। আপাতত লাইব্রেরিও বন্ধ হয়ে আছে প্রায় এক যুগ হয়।
রুদ্রের অভিমানের খেয়া কবিতার প্রিয় একটি পংক্তি: অভিলাষী মন আমার চন্দ্রে না পাক, জোছনায় পাক সামান্য ঠাঁই।
আজ কবির জন্মদিনে তাঁর মৃত্যুর এতো বছর পরেও এসে ভাবি- তিনি জোছনার আলোয় ঠাঁই পেয়েছেন বলেই এখনও আলোকিত এবং উজ্জ্বল হয়ে রয়েছেন। ভবিষ্যতে উজ্জ্বলতর হয়ে থাকবেন যতদিন বাংলা এবং বাংলা ভাষা থাকে।
কবির ৬৫তম জন্মদিনে জানাই আমার টুপিখোলা অভিবাদন ও প্রণতি।

মানিক বৈরাগী
কবি
কক্সবাজার, বাংলাদেশ।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments